মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সত্যজিত রায়ের চারুলতা ছবির একটি দৃশ্য। ভূপতি তাঁর ভাই অমলকে একটি বিয়ের সম্বন্ধের কথা বলছেন। প্রস্তাব আছে ভাবী বধূপক্ষ জামাতার বিলেত যাওয়ার ব্যয় বহন করবে। ব্রিটিশ ভারত, উনবিংশ শতকের বঙ্গদেশ। বিলেত তথা ইংল্যান্ড ও সমগ্র ইউরোপ মহাদেশকে প্রত্যক্ষ করার এ এক সুবর্ণ সুযোগ, এক সোনালী স্বপ্নজাল বুনে চলেন দাদা, অমল আবিষ্টের মতো স্তব্ধ হয়ে থাকে। বুঝি সে রাজি হয়ে যাবে এমনটাই যখন মনে হচ্ছে তখন অমল বলে ওঠে… সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং…. ঘরেবাইরে চলচ্চিত্রের শীর্ষসঙ্গীতে সেই মহাসঙ্গীত ফিরে আসে অগ্নিযুগের মহামন্ত্র হয়ে।
বন্দে মাতরম্ সঙ্গীতের সার্ধশতবর্ষ সম্প্রতি দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা গানটি ১৮৮০ সালের বঙ্গদর্শন পত্রিকায় আনন্দমঠ উপন্যাসের অংশ হিসাবে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। তবে গানটির রচনা এর-ও কয়েক বছর আগেই। প্রথম সুরারোপ করেন যদুভট্ট। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম দুটি স্তবকে সুর দিলেন। ১৮৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রহিমতুল্লা মহম্মদ সিয়ানির সভাপতিত্বে কলকাতার বিডন স্কোয়ারে কংগ্রেসের অধিবেশনে উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসাবে রবীন্দ্রনাথ গানটি গেয়েছিলেন। ধীর লয়, মধ্যম লয় কিংবা দ্রুতলয়ে বন্দে মাতরম্ গানটি ভারতবর্ষ শুনেছে, এই গানের সুরে ছন্দে লয়ে আসমুদ্রহিমাচল আলোড়িত হয়েছে কালে কালে। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, স্বাধীনতোত্তর দেশ রাজনৈতিক স্লোগানে, দ্রোহে, সংগ্রামে কিংবা উদযাপনে বন্দে মাতরম্ ধ্বনিকে সঙ্গে রেখেছে।

ঠিক কোন দিন গানটি রচিত হয়েছিল কিংবা কি ছিল এই গানের দীর্ঘ চলার পথের পাথেয় অথবা সঙ্গীত কোন্ শক্তি জাগিয়ে তোলে হর্ষে বিষাদে, তা বহুবিদিত। আশ্চর্য হতে হয় এই ভেবে যে, একটি গান, সংস্কৃত ভাষায় রচিত যার প্রথম দুটি স্তবক, সেই গান দেশমাতৃকার উপাসনামন্ত্র হয়ে বিপ্লবের বীজের জাগরণে, পূর্ণতায় এক মহীরূহ হয়ে ছায়া দিয়েছে এক বন্ধনজর্জর সময়কে। কী ছিল সেই সঙ্গীতের অন্তরে? কী থাকে সঙ্গীতের সুরে?
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭১: পুষ্পধনু

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

তবে বন্দে মাতরম্ কেবল সঙ্গীত নয়, মহাসঙ্গীত বললেও বুঝি তার ব্যাপ্তিকে ধরা যায় না। বন্দে মাতরম্ মন্ত্র, বন্দে মাতরম্ শোকোত্তীর্ণ হওয়ার শ্লোক, বন্দে মাতরম্ বন্ধনক্লিষ্ট রূদ্ধবাক্ মানবহৃদয়ের ভাষা। আমি মাতাকে বন্দনা করি এই তার অর্থ, যে মা হলেন দেশমাতৃকা। ধারণপালনের কর্ত্রী সেই ভূখণ্ডকে, ভূমিকে মাতৃরূপেই দেখেছে এই ভূখণ্ডের মানুষ। তার ফলে জলে সম্পদে পুষ্ট হয়ে পূর্ণ হয় মহাজীবন, সেই ভূমির কথা অথর্ববেদের ভূমিসূক্তে পাওয়া যায়। প্রাচীন মানুষ ধরিত্রীকে মাতৃরূপে জেনেছে, মেনেছে, উপাসনা করেছে। সেই রূপে ক্রমে যুক্ত হয়েছে দেবীর শক্তি, বরাভয়। মা পালিকা, ত্রাণকর্ত্রী, তারিণী, ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুসংহারিকা। বন্দে মাতরম্ সঙ্গীত সেই মাতৃরূপের বন্দনাগীত। রবীন্দ্রনাথের গান দেশের মাটির সেই মাতৃরূপকে তিলে তিলে তিলোত্তমা করে গড়ে তুলেছে তারপর। সেই দেশমাতৃকার শঙ্কাহারিণী অভয়দাত্রী ভাস্বররূপ দেশের মাটিকে শ্রদ্ধা, সম্মানের শিক্ষা দেয়, তাকে জন্মদাত্রী মায়ের মতো আপন করে তোলে, তার বেদনায় বিষণ্ন করে। রবীন্দ্রনাথের গানেই শোনা যায়, “কেন চেয়ে আছ, গো মা, মুখপানে/ এরা চাহে না তোমারে চাহে না যে, আপন মায়েরে নাহি জানে/ এরা তোমায় কিছু দেবে না, দেবে না— মিথ্যা কহে শুধু কত কী ভাণে।” দেশমাতৃকা তখন জন্মদাত্রী মাতার থেকে পৃথক নন, তাঁদের সঙ্কট তখন অভিন্ন, প্রেরণা কিংবা শক্তিও এক। বন্দে মাতরম্ গানেও এই ক্ষেত্রটি আছে তৃতীয় স্তবকে। বহুশ্রুত প্রথম দুটি স্তবক কীরকম?

বন্দে মাতরম্, বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং, মলয়জ শীতলাং
শ্যামলাং, সুরলাং, মাতরম্
বন্দে মাতরম্, বন্দে মাতরম্।

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্,
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্।

আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪০: কেঁচো খুঁড়তে কেউটে

আকাশ এখনও মেঘলা/৪২

দেখা যায়, সেই দেশমাতৃকা শস্যশ্যামল, মলয়বায়ুতে সুরম্য ও নদীবিধৌত জলময়ী। সেই মাতৃভূমিতে জ্যোত্স্নাপ্লাবিত রাত্রি নামে, ফুলে ফুলে ভরে যায় বৃক্ষরাজি, শোভাময়ী হয়ে ওঠে দেশের মাটি। সেই সুখদায়িনী বরদাত্রী দেশমাতৃকার হাস্যময়ী আনন্দরূপ, তিনি সুমধুর বাক্যে সিঞ্চিত করেন সন্তানকে। মায়ের এই পূর্ণরূপের বর্ণনা সংস্কৃতভাষায় সুললিত হয়ে সুরঝঙ্কার তোলে হৃদয়ে। এই মাতৃরূপের বর্ণনা, বন্দনা চিরন্তন, কিন্তু সঙ্কটের কালে স্পষ্টাক্ষরে, যুগোপযোগী ও মনোগ্রাহী হয়ে বন্দে মাতরম্ আবির্ভূত হয়ে বিপ্লবের বাণী, দীক্ষার মন্ত্র হয়ে উঠল। তৃতীয় স্তবকে কী আছে?

সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালে,
দ্বিসপ্তকোটিভুজৈর্ধৃতখর-করবালে,
অবলা কেন মা এত বলে৷৷
বহুবলধারিণীং
নমামি তারিণীং
রিপুদলবারিণীং
মাতরম্৷৷
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮১: ত্রিপুরা : ইতিহাস পুনর্নির্মাণে প্রত্ন সম্পদ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৩ : জনঅরণ্য: সরস্বতী না লক্ষ্মী?

তখন দেশের জনসংখ্যা সাত কোটি। অন্য দেশাত্মবোধক গানেও এটি পাওয়া যায়। সেই দেশমাতৃকার দৃপ্ত রূপটি কেমন? সপ্তকোটি কণ্ঠের কলস্বরের নাদধ্বনিতে তাঁর সেই মাতৃরূপ তখন করাল, তাঁর চৌদ্দকোটি হাতে খর তরবারি, তাঁর সেই সংহাররূপে মা বহুবলধারণ করে বিদ্যমানা, তাঁকে নমস্কার করি, রিপু বা শত্রুসমূহকে তিনি নিবৃত্ত করেন, সেই মা’কে বন্দনা করি। এই শত্রু আন্তর ও বাহ্য, দৃশ্য ও অদৃশ্য সকল শত্রুই। তাই রিপু শব্দের ব্যবহার। কিন্তু এর মাঝেই থেকে গেছে অন্য কথা। সঙ্গীতে মিশ্রভাষার ব্যবহার অর্থাত্ ফিউশন বেশ জনপ্রিয়। বন্দে মাতরম্ তার ব্যতিক্রম নয়। তৃতীয় স্তবকেই সংস্কৃতভাষার কোলে বাংলাভাষায় সেই নিদারুণ প্রশ্নটি থেকে গেছে “অবলা কেন মা এত বলে?” কেন, তার উত্তর সংগ্রামেরইতিহাস, সমাজেতিহাস দেয়। রবীন্দ্রনাথের গানেও দেশমাতৃকার উপেক্ষিত রূপটি মূর্ত হয়েছে, “এরা চাহে না তোমারে চাহে না যে, আপন মায়েরে নাহি জানে”… এই সঙ্কট স্বাধীনতার পূর্ব ও উত্তরকালে দেশকে ঘিরে রেখেছে, তাই বন্দে মাতরম্ আজ-ও প্রাসঙ্গিক।. এর পরের স্তবকগুলিতে মিশ্রভাষাতেই এগিয়েছে গান, যার মুখ্যভাগ বাংলায় লেখা।

তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে৷৷
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি
মন্দিরে মন্দিরে॥
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী
নমামি ত্বাং
নমামি কমলাম্
অমলাং অতুলাম্
সুজলাং সুফলাম্
মাতরম্॥
বন্দে মাতরম্
শ্যামলাং সরলাম্
সুস্মিতাং ভূষিতাম্
ধরণীং ভরণীম্
মাতরম্॥
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

যে অংশগুলি সংস্কৃতভাষাতে লেখা, সেখানে সেই দেশমাতৃকার সর্বাঙ্গীণ স্তুতিই মুখ্য। তিনি দেহে প্রাণবায়ুস্বরূপা। যে রূপ ক্রমশঃ গড়ে উঠেছে আগের স্তবকে স্তবকে, যে রূপকে সমৃদ্ধ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, সেই রূপ দেবী দুর্গার, দেবী কমলবাসিনী কমলার, দেবী সরস্বতীর তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সঙ্গীতের শেষে জানিয়েছেন সঙ্গীতকার। সেই দেশমাতৃকা দুর্গারূপে দশপ্রহরণধারিণী, লক্ষ্মীরূপে পদ্মাসনা, সরস্বতীরূপে বাণী বিদ্যাদায়িনী। সেই নির্মলা, অতুলা, সুজলা, সুফলা, সরলা, সুস্মিতা মৃদুহাসিনী, শোভিতা ভূষিতা পোষণকর্ত্রী ধরণী তথা দেশের মাটিকেই বন্দনা করেছেন ঋষি বঙ্কিম।

বাল্মীকি বেদব্যাসের রামায়ণ ও মহাভারত ভারতবর্ষের বুকে চির প্রেরণাস্রোত। এই দুটি মহাকাব্য দেখিয়েছে কবি হবেন ক্রান্তদর্শী, তাঁর বাণী হবে অভ্রান্ত, অজেয়। সকলেই কবি হন না, কেউ কেউ কবি। বন্দে মাতরম্ মহাসঙ্গীত আধুনিক ভারতবর্ষে চিরন্তন ভারতাত্মার সেই অন্তর্লীন মহাযাত্রার সার্থক উত্তরসূরী।

* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content