মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬

কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

অনেকে বলে থাকেন, দান, ধ্যান, ভজন, তপস্যাদি—এ সব ত্যাগী সন্ন্যাসীদের কর্তব্য। গৃহস্থ হয়ে এ সব করা একপ্রকার অসম্ভব। আনন্দ, সন্তোষ লাভে ইচ্ছুক, গৃহস্থ যাঁরা সংসার আশ্রমে আছেন বা সন্ন্যাসী; সন্ন্যাস আশ্রমে আছেন তাদের ত্যাগ ছাড়া সে সম্পদ লাভ করা সুদূর পরাহত। বিষয় ভোগ-তৃষ্ণা, সেই হরিণের মতো যে বালিতে জলের আশায় ছুটে ছুটে অবশেষে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। গৃহস্থ বা সন্ন্যাসী যে যেখানে আছেন তিনি তার কর্তব্য পালনে মহান এবং অবশেষে পরমেশ্বরকেই লাভ করেন। ‘…ত্যাগেনৈকে অমৃতত্বমানশুঃ’ (কৈঃউঃ ৩) একমাত্র ত্যাগের দ্বারাই অমৃতত্ব লাভ করা যায়। অন্য কোনও উপায়ে নয়। লৌকিক বাসনা ত্যাগই ঈশ্বর প্রাপ্তির হেতু।
মুন্ডক উপনিষদের মন্ত্রে আছে, “শৌনক হ বৈ মহাশালোঽঙ্গিরসং বিধিবদুপসন্নঃ পপ্রচ্ছ-কস্মিন্নু ভগবো বিজ্ঞাতে সর্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতীতি।” মহাশালঃ অর্থাৎ গৃহস্থ শ্রেষ্ঠ শৌনক যথাশাস্ত্র অঙ্গিরার কাছে উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, কোনও বস্তু বা এমন কোনও বিশেষ উপাদান কারণ আছে যা বিশেষ ভাবে জানলে অখিল বস্তু সুবিধিত হয়? মহাশাল যিনি গৃহস্থের সকল ধর্ম যথাযথভাবে পালন করত শ্রেষ্ঠ হয়েছেন ও তাঁর মধ্যেও ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা জেগেছে। ঋষি সমীপে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর ইপ্সিত এক সেই তত্ত্ব যা লাভে অন্য কিছুর অবশেষ থাকে না, তা তিনি লাভ করতে চান।
আরও পড়ুন:

অনন্ত এক পথ পরিক্রমা, পর্ব-৮৬: তিন টান একত্র হলে তবেই ঈশ্বর দর্শন সম্ভব

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাময়

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

“ওঁ উশন্ হ বৈ বাজশ্রবসঃ সর্ববেদসং দদৌ।…” [কঃউঃ ১|১|১]
বাজশ্রবস যিনি উদ্দালক নামে পরিচিত, তিনি যজ্ঞফলাকাক্ষী হয়ে সর্বস্ব দান করছেন। ‘বাজ’ অর্থ অন্ন, তা অত্যাধিক দানের জন্য যিনি যশ লাভ করেন; তিনি বাজশ্রবা, তাঁর পুত্র বাজশ্রবস। পিতার মতো পুত্রও একই পথ অনুসরণ করেন। গৃহস্থও তার ধর্মের যথাযত পালনে পুরুষার্থ লাভের অধিকারী হতে পারেন। ভিন্ন ভিন্ন থেকে বিশেষ কে জানা, আবার বিশেষ থেকে ভিন্নকে জানা। তিনি এক আবার ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রতিীয়মান হচ্ছেন এ তথ্য উপলব্ধি করা।

“অঙ্গুষ্টমাত্রঃ পুরুষোঽন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ।” [কঃউঃ ২|৩|১৭]
অঙ্গুষ্ট পরিমিত অন্তরাত্মা পুরুষ সর্বজনের হৃদয়ে সর্বদা অবস্থিত আছেন। তিনি ভিন্ন নাম রূপের আড়ালে সকলের হৃদয়ে অবস্থান করেন। এ সত্য উপলব্ধির মাধ্যম মুক্ত হয়ে যাওয়া।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৪: দিগম্বরী দেবী : ঠাকুরবাড়ির সেরা সুন্দরী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৩: বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় বিঘ্নসৃষ্টিকারী দেবরাজ ইন্দ্র ও মেনকার কাহিনি কি আধুনিক যুগের সঙ্গে

গৃহস্থ ছিলেন গৌতম, তিনি পুত্র শ্বেতকেতু কে জীবল পুত্র প্রবাহণের কাছে পাঠিয়েছিলেন, যিনি রাজা ছিলেন। পিতার দ্বারা উপদেষ্ট হয়ে রাজার কাছে ব্রহ্মাজ্ঞান লাভের এসেছিলেন। কিন্তু শ্বেতকেতু রাজা প্রবাহাণের প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে পিতার কাছে ফিরে যান। অবশেষে গৌতম নিজে সেখানে উপস্থিত হয়ে রাজ দরবারে, তাহার সমস্ত সম্পদ স্বর্ণ, গরু, অশ্ব, দাসী, পরিবার, বস্ত্র দান দিয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রাজা, গৌতমকে শিষ্যতে বরণ করেন ও উপদেশ প্রদান করেন। তিনি গৃহস্থের শ্রেষ্ঠ কর্ম ও দান সাধনের দ্বারা ব্রহ্মজ্ঞান লাভের অধিকারী হয়েছিলেন।

এরকম মহানির্বাণ তন্ত্রে গৃহস্থদের জন্য মূল কতগুলি কর্তব্য বর্ণনা রয়েছে। যা আচরণে গৃহস্থ শ্রেষ্ঠ আশ্রমে করতে পারেন। “ব্রহ্মনিষ্টো গৃহস্থঃ স্যাৎ ব্রহ্মজ্ঞানপরায়ণঃ, যদ্ যৎ কর্ম প্রকুর্বীত তদ্ ব্রহ্মণি সমর্পয়েৎ।।” [মহানির্বাণ তন্ত্র ২] গৃহস্থ ব্যক্তি ঈশ্বর পরায়ন হবেন। ব্রহ্ম জ্ঞান লাভই যেন তাঁর জীবনের চরম লক্ষ্য হয়। তথাপি সর্বদা কর্ম করতে হবে, তাঁর সমুদয় কর্তব্য করতে হবে এবং তিনি যা করবেন তা তাকে ব্রহ্মে সমর্থন করতে হবে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা

স্বামীজি বলছেন “কর্ম করা অথচ ফলাকাঙ্খা না করা, লোককে সাহায্য করা অথচ তাহার নিকট হইতে কোন প্রকার কৃতজ্ঞতার প্রত্যাশা না করা, সৎকর্ম করা অথচ উহাতে নাম-যশ হইল বা না হইল, এ বিষয়ে একেবারে দৃষ্টি না দেওয়া—এইটিই জগতের সর্বপেক্ষা কঠিন ব্যাপার। জগতের লোক যখন প্রশংসা করে, তখন ঘোর কাপুরুষও সাহসী হয়। সমাজের অনুমোদন ও প্রশংসা পাইলে নির্বোধ ব্যক্তি ও বীরোচিত কার্য করিতে পারে, কিন্তু কাহারও স্তুতি-প্রশংসার না চাহিয়া অথবা সেদিকে আদৌ দৃষ্টি না দিয়া সর্বদা সৎকার্য করাই প্রকৃতপক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ স্বার্থত্যাগ।” [বাণী ও রচনা, কর্মযোগ ৩৬] গৃহস্থের প্রধান কর্তব্য জীবির্কাজন, কিন্তু তাকে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হবে মিথ্যা কথা বলে, প্রতারণা দ্বারা অথবা চুরি করে যেন তার সংগ্রহ না করেন। আর তাকে স্মরণ রাখত হবে, তার জীবন ঈশ্বরের সেবার জন্য, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থদের সেবার জন্য। গৃহস্থকে প্রথমত: জ্ঞান। দ্বিতীয়ত: ধন উপার্জনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে। এই তার কর্তব্য। যদি গৃহস্থ তার কর্তব্য পালন না করে, তাকে তো মানুষ বলিয়াই গণনা করা যেতে পারে না।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৭: অসুস্থ মা সারদার জন্য ভক্তদের উদ্বেগ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক

অর্থ উপার্জন অন্যায় নয় কারণ ওই অর্থ বিতরণের জন্য। গৃহস্থই জীবন ও সমাজের কেন্দ্র অর্থ উপার্জন অসৎ কাজে অর্থ ব্যয় করা তার পক্ষে উপাসনা, কারণ যে গৃহস্থ সদুপায়ে ও সৎ উদ্দেশ্যে ধনী হবার চেষ্টা করছেন—সন্ন্যাসী নিজ কুঠিরে বসে উপাসনা করলে উহা যেমন তার মুক্তি লাভের সহায় হয়, সেই গৃহস্থেরও ঠিক তাই হয়ে থাকে। যেহেতু উভয়ের মধ্যে আমরা ঈশ্বর ও তাঁর সবকিছুর উপর ভক্তিভাব প্রণোদিত আত্মসমর্পণ ও ত্যাগরূপ একই ধর্ম ভাবে বিভিন্ন বিকাশ মাত্রা দেখছি। বড় বড় যোগিগণ যে পথপ্রাপ্ত হন, গৃহস্থ এই সকল দান ও উৎসর্গ কর্তব্য কর্ম করে সেই পদ লাভের দিকেই অগ্রসর হতে থাকেন। বিভিন্ন দেশ কাল ও পাত্রে বিভিন্ন কর্তব্য রয়েছে। আমরা যে অবস্থায় রয়েছি, সে অনুযায়ী কর্তব্য পালনও করতে হবে।—চলবে।
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content