বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

পঞ্চবটীবনে রাক্ষসী শূর্পনখার সম্মুখীন হলেন রাম। রামের রূপ দেখে শূর্পনখা, কামমুগ্ধা হল। দর্শনমাত্র শুধু প্রণয় নয়, সোজাসুজি বিবাহপ্রস্তাব নিবেদন করল, সে। রাক্ষসী সদম্ভে তার আত্মপরিচয় দিল। রাক্ষসভাই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, খর ও দূষণের বোন, এই শূর্পনখা। রাক্ষসী, সীতা ও লক্ষ্মণের ভবিতব্য কী হবে সেটাও নির্ধারণ করল। সে পথের কাঁটা এই দু’ জনকে খেয়ে ফেলবে। রামের প্রস্তাবানুযায়ী লক্ষ্মণের কাছে বিবাহপ্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাতা রাক্ষসী, হিতাহিতজ্ঞানশূন্যা হয়ে সীতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হল। রামের আদেশে লক্ষ্মণ শূর্পনখার নাক ও কান কেটে, তাকে শাস্তি দিলেন।রক্তাক্তশরীরে রাক্ষসী,তার ভাই খরের কাছে লক্ষ্মণসহ সস্ত্রীক রামের অরণ্যে আগমনবৃত্তান্ত ও রাক্ষসীর নিজের দুরবস্থার কারণ বর্ণনা করল।

সেই রক্তাপ্লুতদেহে, বিকৃতরূপা, চরণে লুণ্ঠিতা, ভগিনীকে দেখে, রাগে কেঁপে উঠল রাক্ষস খর। সে রাক্ষসীকে প্রশ্ন করল, ভয় ও মোহ আর নয়, ওঠ, স্পষ্ট করে বল,কে তোমায় এমন বিরূপা করেছে? ব্যক্তমাখ্যাহি কেন ত্বমেবংরূপা বিরূপিতা। কে এমন আছে, যে কিনা স্বেচ্ছায়, সামনের নিরীহ কৃষ্ণবর্ণের সাপকে হেলাভরে আঙ্গুলের ডগা দিয়ে আঘাত করে? মোহাচ্ছন্ন হয়ে কালসাপ গলায় পড়ে, বুঝতে পারছে না, সে তীব্র বিষ পান করেছে। খর যেন ভগিনীর আত্মশক্তি জাগিয়ে তুলতে বলে চললেন, রাক্ষসী, বল ও বিক্রমসম্পন্না, স্বেচ্ছানুসারে রূপ ধারণ করতে সক্ষম ও সর্বত্রগামিনীও বটে। তুমি নিজে যমতুল্যা, এমন কে আছে, যে তোমার এই দুরবস্থার কারণ হতে পারে? ইমামবস্থাং নীতা ত্বং কেনান্তকসমা গতা। দেবতা, গন্ধর্ব, ঋষি ও প্রাণীদের মধ্যে কে এমন মহান শ্রেষ্ঠ শৌর্যশালী আছেন যে রাক্ষসীকে বিকৃতাঙ্গী করেছেন? রাক্ষস খরের বিবেচনায়, দেবতাদের মধ্যে সহস্রাক্ষ পাকশাসন ইন্দ্র বিনা এমন কেউ নেই যে কিনা রাক্ষস খরের অপ্রিয় এই কাজ করতে পারেন। রাক্ষস খর, ঘোষণা করল, সে আজ পানোন্মুখ সারসের মতো, দেহ হতে জলে মিশ্রিত ক্ষীরসম সেই প্রাণ,হরণ করবেন। যুদ্ধে খর যাকে বাণবিদ্ধ করে হত্যা করবে,তার সফেন রক্ত পান করতে ধরিত্রীর আগ্রহ হয়েছে বুঝি? যুদ্ধে খরের দ্বারা নিহত কার দেহ হতে সমবেত পাখিরা খুশিমনে মাংস ভক্ষণ করবে? সদম্ভে সে ঘোষণা করল, মহাযুদ্ধে আমি যাকে আক্রমণ করব, সেই হতভাগ্যকে, দেব, গন্ধর্ব, পিশাচ, রাক্ষস, কেউই রক্ষা করতে পারবেন না। তং ন দেবা ন গন্ধর্ব্বা ন পিশাচা ন রাক্ষসাঃ। ময়াপকৃষ্টং কৃপণং শক্তাস্ত্রাতুং মহাহবে।।
ভগিনীকে রাক্ষস খরের অনুরোধ—ক্রমশ সংজ্ঞা লাভ করে, যে দুর্বিনীত বনের মধ্যে বলপ্রয়োগ করে, তোমায় পরাজিত করেছে,আমায় তার সম্বন্ধে বিস্তারিত বল। উপলভ্য শনৈঃ সংজ্ঞাং তং মে শংসিতুমর্হসি। যেন ত্বং দুর্ব্বিনীতেন বনে বিক্রম্য নির্জ্জিতা।। ক্রুদ্ধ ভাই খরের কথা শুনে, শূর্পনখা চোখের জলে ভেসে গেল। সে বলতে লাগল, রাজা দশরথের দুই পুত্র, রাম ও লক্ষ্মণ। তারা দুজন তরুণ, রূপবান, সুকুমারাকৃতিবিশিষ্ট, মহাবলশালী, তাদের কমলসম আয়তনয়ন, পরনে বল্কল ও তাদের উত্তরীয় কৃষ্ণবর্ণের অজিন।ফলমূল তাদের আহার্য, তারা জিতেন্দ্রিয়, তপশ্চর্যায় নিরত এবং ধার্মিক। তারা গন্ধর্বরাজতুল্য (দর্শনীয়) এবং রাজলক্ষণান্বিত। রাক্ষসী জানাল,সে বুঝতে পারছে না তারা দুজন দেবতা? না দানব?

রাক্ষসী অকপটে জানাল, তাদের সঙ্গে তরুণী, সর্বালঙ্কারমণ্ডিতা, রূপবতী, সুমধ্যমা এক নারীকে সে দেখেছে। সেই নারীর জন্য, তারা দু’জনে মিলে অনাথা অসতীর মতো আমার এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে। তাভ্যামুভাভ্যাং সম্ভূয় প্রমদামধিকৃত্য তাম্। ইমামবস্থাং নীতাহং যথানাথাসতী তথা।। রাক্ষসী ক্ষিপ্ত হয়ে ভয়ঙ্কর ইচ্ছা প্রকাশ করল। রণক্ষেত্রে সেই কুটিলা নারীর সঙ্গে ওই দু’জন নিহত হলে সে তাদের সফেন রক্ত পান করতে ইচ্ছুক। ভাইয়ের কাছে শূর্পনখা অনুরোধ জানাল,আমার প্রথম মনোবাসনা পূর্ণ কর। আমি মহাযুদ্ধে তাদের রক্ত পান করি। এষ মে প্রথমঃ কামঃ কৃতস্তত্র ত্বয়া ভবেৎ। তস্যাস্তয়োশ্চ রুধিরং পবেয়মহমাহবে।। শূর্পনখার বক্তব্য শেষ হলে, ক্রুদ্ধ খর, যমতুল্য মহাবলশালী চোদ্দজন রাক্ষসকে আদেশ করল, চীর ও কৃষ্ণাজিনধারী সশস্ত্র দুই জন ব্যক্তি এক নারীর সঙ্গে দণ্ডকারণ্যের গভীরে প্রবেশ করেছে। তোমরা সেই দুশ্চরিত্রাসহ তাদের দুজনকে হত্যা করে, ফিরে এস। আমার এই ভগিনী তাদের রক্ত পান করবে। মানুষৌ শস্ত্রসম্পন্নৌ চীরকৃষ্ণাজিনাম্বরৌ। প্রবিষ্টৌ দণ্ডকারণ্যং ঘোরং প্রমদয়া সহ।। তৌ হত্বা তাঞ্চ দুর্ব্বৃত্তামুপাবর্ত্তিতুমর্হথ। ইয়ঞ্চ ভগিনী তেষাং রুধিরং মম পাস্যতি।।

রাক্ষস খর, ভগিনীর ইচ্ছাপূরণে তৎপর হল। সে রাক্ষসদের উদ্দিষ্ট সিদ্ধির জন্য তাড়া দিল। রাক্ষসরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছিয়ে, সবলে তাদের নিধন করে, ভগিনীর মনস্কামনা পূর্ণ করুক। রাক্ষস খর যেন ভগিনীর সন্তুষ্টির জন্য আরও বিশদে বলল, যুদ্ধে তোমরা তাদের দুই ভাইকে হত্যা করেছ, এই দৃশ্য দেখে, ইনি তুষ্ট হবেন এবং আনন্দে রক্ত পান করবেন। যুষ্মাভির্নিহতৌ দৃষ্ট্বা তাবুভৌ ভ্রাতরৌ রণে। ইয়ং প্রহৃষ্টা মুদিতা রুধিরং যুধি পাস্যতি।। খরের আদেশানুসারে চোদ্দজন রাক্ষস তৎক্ষণাৎ শূর্পনখার সঙ্গে, বায়ুচালিত মেঘের মতো সবেগে ধেয়ে চলল সেখানে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫১: জরাসন্ধ কাহিনির আধুনিকতা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৬: ব্রিটিশ বাংলার বিপ্লবীরা অনেক সময় পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতেন ত্রিপুরায়

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৫ : যে জন রহে মাঝখানে

ভয়ঙ্করাকৃতি শূর্পনখা, রামের আশ্রমে উপস্থিত হয়ে, রাক্ষসদের, সীতা-সহ দুই ভাইকে দেখিয়ে দিলেন। রাক্ষসরা দেখল, রাম ও সীতা বসে আছেন,তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন সেবারত লক্ষ্মণ। রাঘব রাম, সেই রাক্ষসী ও সঙ্গে সমাগত রাক্ষসদের দেখে, দীপ্ততেজস্বী ভাই লক্ষ্মণকে সীতার কাছে ক্ষণিকের জন্য অবস্থান করতে বলে, সিদ্ধান্ত নিলেন— ইমানস্যা বধিষ্যামি পদবীমাগতানিহ।

রাক্ষসীর পক্ষ অবলম্বনকারী এই রাক্ষসদের আমি বধ করব। রামের কথায় মর্যাদা দিয়ে সহমত হলেন লক্ষ্মণ। স্বর্ণমণ্ডিতধনুকে জ্যা যুক্ত করে,রাক্ষসদের বললেন, তাঁরা দুই ভাই রাম ও লক্ষ্মণ, রাজা দশরথের দুই পুত্র। সীতার সঙ্গে,তাঁরা এই দুর্গম দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করেছেন।ফলমূল তাঁদের ভোজ্যদ্রব্য। তাঁরা ইন্দ্রিয়সংযম ও তপশ্চর্যায় নিরত। ধর্মাচরণে অভ্যস্ত, অরণ্যবাসী, তাঁদের প্রতি রাক্ষসদের এই হিংস্র আচরণ কেন? রাম যেন সরোষে বললেন, এই মহারণ্যে তোরা ঋষিদের অনিষ্ট কাজ করিস। পাপাত্মা তোদের বিনাশের জন্য,ঋষিরা আমাদের নিয়োগ করেছেন। ধনুর্বাণসহ আমরা এখানে এসেছি। যুষ্মান্ পাপাত্মকান্ হন্তুং বিপ্রকারান্মহাবনে। ঋষীণান্তু নিয়োগেন সম্প্রাপ্তঃ সশরাসনঃ।।

রাম রাক্ষসদের সতর্ক করলেন,ওহে নিশাচর রাক্ষসরা, তোরা এখানে সন্তুষ্টমনে থাক, ফিরে যেতেও পারবি না। আর যদি, তোদের প্রাণের মায়া থাকে তবে ফিরে যা। তিষ্ঠতৈবাত্র সন্তুষ্টা নোপবর্ত্তিতুমর্হথ। যদি প্রাণৈরিহার্থো বো নিবর্ত্তধ্বং নিশাচরাঃ।। রামের কথা শুনে ব্রাহ্মণদের হত্যাকারী, শূলধারী,ভয়ানক ক্রুদ্ধ, চোদ্দটি রাক্ষস, সক্রোধে বলল। আরক্তনয়ন, মধুরভাষী,রামের ক্ষমতাসম্বন্ধে ধারণাহীন রোষে রক্তলোচন ভয়ঙ্কর রাক্ষসদের কর্কশভাষায় যেন তাচ্ছিল্যের সুর—আমাদের প্রভু সুমহান খরের ক্রোধ সৃষ্টি করেছিস। আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে,তুই অচিরেই প্রাণ হারাবি। ক্রোধমুৎপাদ্য নো ভর্ত্তুঃ খরস্য সুমহাত্মনঃ। ত্বমেব হাস্যসে প্রাণান্ সদ্যো২স্মাভির্হতো যুধি।।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৪ : দেবী — ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন

রামকে রাক্ষসরা হুঁশিয়ার করল, তারা বহু, রাম একাকী, তার কি শক্তি আছে? রাম তাদের সামনে টিকতে পারে? যুদ্ধ করা তো দূরের কথা। অবিলম্বে রাক্ষসদের হাত হতে ছুঁড়ে দেওয়া পরিঘ, শূল, পট্টিশের আঘাতে রামের বল, বীর্য্য, ধনুক হাত হতে খসে পড়বে, সে প্রাণও পরিত্যাগ করবে।এই বলে সেই চোদ্দজন রাক্ষস অস্ত্র উদ্যত করে রামের দিকে ধেয়ে গেল। কাকুৎস্থ রাম, স্বর্ণনির্মিত বাণ দিয়ে চোদ্দটি শূল ছেদ করলেন। দেখতে দেখতে মহাতেজস্বী রাম, সক্রোধে, পাথরে শাণিত সূর্যসম চোদ্দটি নারাচ অস্ত্র তুলে নিলেন। শতক্রতু ইন্দ্রের বজ্র উৎক্ষেপণের মতো ধনুক নত করে, শরগুলি রাক্ষসদের লক্ষ্য করে, নিক্ষেপ করলেন,রাম।বাণগুলি তীব্রগতিতে রাক্ষসদের বক্ষ ভেদ করে রক্তরঞ্জিত অবস্থায়, বল্মীক (উই) হতে নিক্ষিপ্ত সাপদের মতো ভূলুণ্ঠিত হল।

বিদীর্ণহৃদয়, রক্তস্নাত, বিকৃতাকৃতি প্রাণহীন রাক্ষসরা ছিন্নমূল গাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পরল। প্রাণহীন, মৃত, রক্তপ্লাবিত, বিকৃতদেহ, রাক্ষসরা মাটিতে পড়ে আছে, দেখে, রাক্ষসী ক্রোধে হিতাহিতজ্ঞানশূন্যা হল। যেন কিছুটা রক্ত শুকিয়ে গিয়েছে তার, এমন কাতর-অবস্থায় শুধুমাত্র নির্যাস অবশিষ্ট আছে এমন লতার মতো, খরের কাছে উপস্থিত হয়ে,আবার লুটিয়ে পড়ল।ভাইয়ের সামনে শোকাকুলা, রাক্ষসী শূর্পনখা, বিবর্ণমুখে ঘোরশব্দে চিৎকার করতে করতে, চোখের জল ফেলতে লাগল। যুদ্ধে রাক্ষসদের পতন দেখে, রাক্ষস খরের ভগিনী শূর্পনখা, সেখানে ফিরে এসে, রাক্ষসবধকাহিনি সবিস্তারে বর্ণনা করল।
আরও পড়ুন:

সংসার ভেঙে… চলে গেলেন শঙ্কর

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

দণ্ডকারণ্যের নিবিড় বনে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতার নিশ্চিন্ত বনবাসজীবনে সহসা বিপদসংকেতের সূচনা, রাক্ষসী শূর্পনখা রামকে দেখে রূপমুগ্ধা হল। রাম বিবাহিত পুরুষ, সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী সীতা। এই সব তথ্য জেনেও রাক্ষসী মরিয়া হয়ে উঠল। রামকে প্রণয় নিবেদন করল শূর্পনখা। সদম্ভে আত্মপরিচয় প্রকাশ করল সে। শূর্পনখা, রাক্ষসবীর রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ, খর ও দূষণের ভগিনী।সীতার রূপের সমালোচনা করে বলল সে, সীতা রামের যোগ্যা নন মোটেই। রাক্ষসীর শেষ প্রস্তাব ছিল—রাক্ষসী বরং পথের কাঁটা ওই সীতা ও লক্ষ্মণকে খেয়ে ফেলবে। রামের বিকল্প প্রস্তাব ছিল, রাক্ষসী বরং তরুণ, সুদর্শন লক্ষ্মণকে বরণ করুক। লক্ষণ কথার প্যাঁচে রাক্ষসীর বিবাহপ্রস্তাব নাকচ করলেন। রামের কাছে ফিরে, রাক্ষসী সীতাকে আক্রমণ করতে ধেয়ে গেল। রামের ধৈর্যের বাধ ভাঙল এবার। তিনি লক্ষ্মণকে আদেশ দিলেন ইমাং বিরূপামসতীমতিমত্তাং মহোদরীম্।রাক্ষসীং পুরুষব্যাঘ্র বিরূপয়িতুমর্হসি।।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা : দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৬১: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

পুরুষশ্রেষ্ঠ লক্ষ্মণ এই বিরূপা অবিশ্বস্তা অতিপ্রমত্তা মহোদরবিশিষ্টা রাক্ষসীকে বিকৃতাকার করতে সক্ষম। জ্যেষ্ঠর আদেশমাত্র লক্ষ্মণ শূর্পনখার নাক ও কান কেটে ছিন্ন করলেন। রক্তাক্তদেহে রাক্ষসী তার ভাই খরের শরণাপন্ন হল। রাক্ষসীর মর্মান্তিক অবস্থা দেখে ক্রোধে কেঁপে উঠল খর। সে ভগিনীকে প্রশ্ন করে জেনে নিল তার এই দুরবস্থার কারণ। প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলে উঠল খর ও ভগিনী শূর্পনখা। তৎক্ষণাৎ খর, পরিবারসহ রামের বধের জন্য, শূর্পনখার সঙ্গে চোদ্দজন রাক্ষসকে, পাঠিয়ে দিলেন। রাম রাক্ষসীর সঙ্গীদের নিধন করতে তিনি একাই নিজেকে যথেষ্ট বলে মনে করলেন। রাম মধুরসুরে তাদর যেন বুঝিয়ে বলতে চাইলেন বনবাসী রাম ও লক্ষ্মণভাই, দু’ জনেই নিতান্ত নিরীহ, সরল, সংযমী, ধার্মিকের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। দণ্ডকারণ্যবাসী তাঁদের প্রতি রাক্ষসদের এই হিংস্রতার প্রকাশ কেন? বসন্তৌ দণ্ডকারণ্যে কিমর্থমুপহিংসথ। রাম বললেন, রাক্ষসদের বিরুদ্ধাচরণের মূল কারণ—পাপাত্মা রাক্ষসরা ঋষিদের অনিষ্টকারী, তাই ঋষিদের আদেশানুসারে তাঁরা,রাক্ষসদের দমন করতে, ধনুর্বাণসহ অরণ্যে এসেছেন। আত্মবিশ্বাসী রাম একাকী রাক্ষসদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে তাদের হত্যা করতে সক্ষম হলেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাক্ষসী শূর্পনখার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে রামের জীবনের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হল। রামের নির্দেশে, প্রভাবশালী রাক্ষসদের ভগিনী শূর্পনখার নাক ও কান ছিন্ন করলেন লক্ষ্মণ। রাম যেন তাকে সহবত শিক্ষা দিলেন। দু’ কান কাটা কথাটি নির্লজ্জ ব্যক্তির প্রতীক। বিবাহিত পুরুষ রামের প্রতি শূর্পনখার কামোন্মত্ততাময় উচ্ছৃঙ্খল আচরণে সেই নির্লজ্জতার প্রকাশ ছিল। রামের জীবনের পালাবদলের সন্ধিক্ষণে ছিল বিমাতা কৈকেয়ীর কুব্জা দাসী মন্থরা। সে ছিল বিকৃতাকার, তার মনটিও ছিল সরলতাহীন জটিল। মনে মনেও সে ছিল কুব্জ। নীচ মনোবৃত্তি তাকে লোকচক্ষুতে আজও হীন ও হেয় প্রতিপন্ন করে থাকে। মন্থরার পরামর্শ ও প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে,রামের রাজকীয় জীবন ছিনিয়ে নিয়েছিলেন রানি কৈকেয়ী। আর এক রাক্ষসী রামের জীবন চরম অনিশ্চয়তাময় জটিলতার সৃষ্টি করল। রাক্ষসভাই খর ভগিনীর দুর্দশার প্রতিকার করতে তৎপর হল। সেই সঙ্গে শুরু হল রাক্ষস ও মানুষের সংঘাত। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবে অচিরেই আরও বৃহত্তর বিরোধের সূত্রপাত হতে চলেছে, এ তথ্য অজানা নয়। কুখ্যাত মন্থরার প্রতি ক্ষমাশীল ছিলেন রাম। স্ত্রীকে ভক্ষণ করতে উদ্যত রাক্ষসী শূর্পনখাকে অনায়াসে তিনি হত্যা করতে পারতেন, তিনি কিন্তু তা করেননি। শুধু তার সৌন্দর্যহরণের নির্দেশ দিয়েছেনমাত্র।রামের মহানুভবতা, ঔদার্য, নারীজাতির প্রতি সম্মানবোধ যেন তাঁর চরিত্রমাধুরীর প্রকাশ। এক প্রতিহিংসা যে শত্রুতার বীজ প্রোথিত করে,তার মূল অনেক গভীরে প্রসারিত হয়ে ঘৃণা, নৈতিক অবক্ষয়, হিংসা ও জিঘাংসার শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে, যার পরিসমাপ্তি হয় রক্তপাত, জীবনহানি ধ্বংস ও মৃত্যুতে। রামের জীবন তার প্রমাণ।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content