
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
ইন্দ্রেপ্রস্থে সভাগৃহ প্রস্তুত। স্থপতি ময়দানবের অপূর্ব সৃষ্টি, এই সভা। খাণ্ডববনদহনের সময়ে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন, ময়ের প্রাণরক্ষা করেছিলেন। তাই ময়দানব, এই বিনির্মাণের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতার ঋণ, পরিশোধ করেছিলেন। তিনি তাঁর নির্মাণকৌশল ও মনের শিল্পীসত্তার সংমিশ্রণে সৃষ্টি করলেন এই সভা। এবারে সভায় আনুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার রাজার। রাজা যুধিষ্ঠির অযুত সংখ্যক (দশ সহস্র) ব্রাহ্মণদের উত্তম ভোজনে আপ্যায়িত করলেন। খাদ্যতালিকায় ছিল ঘৃত ও মধুসংযুক্ত পায়েস, ফল, মূল, বরাহ ও মৃগমাংস, তিলযুক্ত অন্ন, জীবন্তীলতার শাকদিয়ে প্রস্তুত হবিষ্যান্ন, ঘৃতসহযোগে প্রস্তুত নানাবিধ মাংস। এ ছাড়াও ছিল বিবিধ চোষ্য ও বহু প্রকার পেয় বস্তু। নানা দিক হতে সমাগত, মান্যবর দ্বিজদের বসন ও মাল্য, বিভিন্ন উপকরণ দান করে সম্মানিত করলেন রাজা যুধিষ্ঠির। তিনি ব্রাহ্মণদের প্রত্যেককে সহস্র গরু দান করলেন। পবিত্রদিবসে যুধিষ্ঠিরের জয়ধ্বনি আকাশ স্পর্শ করল। দেবতাদের বিবিধ বাদ্য ও গীত-সহ গন্ধদ্রব্য দিয়ে পুজো করে সভায় তাঁদের স্থাপন করলেন। সেখানে বাহুবলী মল্লযোদ্ধা, বিচিত্রযোদ্ধারা, নট ও বৈতালিক বন্দীগণ সাত রাত্রি পর্যন্ত মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের সেবা করলেন।
সুন্দর সেই সভায় ভ্রাতাদের সঙ্গে যুধিষ্ঠির, সেই দেব ও ব্রাহ্মণদের সেবা করে, ইন্দ্রতুল্য প্রসন্ন হলেন। ঋষিগণ সভাস্থলে পাণ্ডবদের সঙ্গে অবস্থান করতেন। নানা দেশ হতে সমাগত, শ্রেষ্ঠ নৃপতিগণ, সেই সভায়, আসন গ্রহণ করতেন।মৃগচর্ম পরিধান করে অর্জুনের কাছে ধনুর্বেদশিক্ষার্থী, মহাবলশালী রাজপুত্রগণ, যেমন, বৃষ্ণিবংশীয় কুমারবৃন্দ, রুক্মিণীর পুত্র, শাম্ব, যুযুধান, সাত্যকি, সুধর্মা, অনিরুদ্ধ ও শৈব্য, এমন অনেক রাজপুত্ররা (রাজা যুধিষ্ঠিরের সম্মানার্থে) সেখানে থাকতেন। অর্জুনসখা তুম্বুরু, অমাত্যগণের সঙ্গে চিত্রসেন, গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণ সেখানে সর্বদাই অবস্থান করতেন। গীত ও বাদ্যে সুনিপুণ,সেই সঙ্গে তাল, পরিমিতিবোধ ও লয়সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞান আছে, এমন কিন্নররা, তুম্বুরুর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে,স্বর্গীয় তান বিস্তার করে, গাইতেন।সেই সভায় উপবিষ্ট, ব্রতনিষ্ঠ, সত্যপ্রতিজ্ঞ সেই কিন্নরবৃন্দ ও গন্ধর্বগণ, পাণ্ডুপুত্র ও ঋষিদের বিনোদনরত অবস্থায়, স্বর্গে উপস্থিত ব্রহ্মাসদৃশ যুধিষ্ঠিরের সেবা করতে লাগলেন।
সুন্দর সেই সভায় ভ্রাতাদের সঙ্গে যুধিষ্ঠির, সেই দেব ও ব্রাহ্মণদের সেবা করে, ইন্দ্রতুল্য প্রসন্ন হলেন। ঋষিগণ সভাস্থলে পাণ্ডবদের সঙ্গে অবস্থান করতেন। নানা দেশ হতে সমাগত, শ্রেষ্ঠ নৃপতিগণ, সেই সভায়, আসন গ্রহণ করতেন।মৃগচর্ম পরিধান করে অর্জুনের কাছে ধনুর্বেদশিক্ষার্থী, মহাবলশালী রাজপুত্রগণ, যেমন, বৃষ্ণিবংশীয় কুমারবৃন্দ, রুক্মিণীর পুত্র, শাম্ব, যুযুধান, সাত্যকি, সুধর্মা, অনিরুদ্ধ ও শৈব্য, এমন অনেক রাজপুত্ররা (রাজা যুধিষ্ঠিরের সম্মানার্থে) সেখানে থাকতেন। অর্জুনসখা তুম্বুরু, অমাত্যগণের সঙ্গে চিত্রসেন, গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণ সেখানে সর্বদাই অবস্থান করতেন। গীত ও বাদ্যে সুনিপুণ,সেই সঙ্গে তাল, পরিমিতিবোধ ও লয়সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞান আছে, এমন কিন্নররা, তুম্বুরুর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে,স্বর্গীয় তান বিস্তার করে, গাইতেন।সেই সভায় উপবিষ্ট, ব্রতনিষ্ঠ, সত্যপ্রতিজ্ঞ সেই কিন্নরবৃন্দ ও গন্ধর্বগণ, পাণ্ডুপুত্র ও ঋষিদের বিনোদনরত অবস্থায়, স্বর্গে উপস্থিত ব্রহ্মাসদৃশ যুধিষ্ঠিরের সেবা করতে লাগলেন।
একদা গন্ধর্ব ও মহাত্মাগণের সঙ্গে সভাসীন রয়েছেন মহান পাণ্ডবগণ, সেখানে উপস্থিত হলেন, দেবর্ষি নারদ। তিনি অসীম জ্ঞানী। কোনও বিষয় তাঁর জ্ঞানচর্চায় অগম্য নয়। তিনি, বেদ এবং উপনিষদে পারঙ্গম, ইতিহাস ও পুরাণাভিজ্ঞ, পূর্ব কল্পবিষয়ে তিনি, বিশেষজ্ঞ, ন্যায়দর্শনবিদ্যাবিদ, ধর্মতত্ত্বজ্ঞ, বেদের ছয়টি অঙ্গ সম্বন্ধে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, জীব ও ব্রহ্মের ঐক্য ও সাযুজ্য এবং জীবের বহুত্ব ও জীবের ব্রহ্মে বিলয়বিষয়ে সম্যক জ্ঞান আছে তাঁর। দেবর্ষি নারদ একাধারে, বাগ্বিশারদ, বহুভাষী, মেধাবী, শাস্ত্রকার মনু প্রভৃতির স্মৃতিশাস্ত্র সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞানী, নীতিজ্ঞ ও ক্রান্তদর্শী, উপনিষদাদি অধ্যাত্মবিদ্যা ও লৌকিক নীতিশাস্ত্র—উভয়ের পার্থক্য তিনি জানেন এবং প্রত্যক্ষ অনুমান প্রভৃতি শাস্ত্রবিচারের দ্বারা ব্রহ্ম অবধারণ করেছেন। দার্শনিক মতানুসারে পঞ্চাবয়বযুক্ত বাক্যের গুণ ও দোষ বিষয়ে তিনি অবহিত, বৃহস্পতির তুলনায় তিনি উত্তম উত্তরদাতা। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ—এই চতুর্বর্গের যথাযথ মূল্যায়ন করেছিলেন এই নারদমুনি। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড ও লৌকিক জগতের ঊর্দ্ধ, অধ ও মধ্যবর্তী সবকিছু তাঁর প্রত্যক্ষগোচর ছিল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৫ ন হন্যতে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২: মালা বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৩: মহর্ষিকে অনুসরণ করে তাঁর পত্নীও বাড়ির পুজোতে যোগ দিতেন না
মহর্ষি কপিলপ্রোক্ত সাংখ্য ও পতঞ্জলি-উক্ত যোগদর্শনের বিভাগ অর্থাৎ মতবৈষম্য বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন। মহর্ষি নারদ, লোকসাধারণের মধ্যে যাঁরা ভোগাসক্ত তাঁদের (জ্ঞানোপদেশের মাধ্যমে) বিচার করতে (আত্মসমালোচনায় উদ্বুদ্ধ করতে) উদ্যোগী হয়েছিলেন। মহর্ষি নারদের রাজনীতিবিষয়েও অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি সাম, দান, ভেদ ও দণ্ড চারটি বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞ ছিলেন। অনুমানের দ্বারা এদের বিভাগ, জানতেন। সন্ধি, বিগ্রহ, যান, আসন, দ্বৈধীভাব ও সংশ্রয় এই ছয়টি গুণসম্বন্ধে রাজনৈতিক জ্ঞান, তাঁর সর্বশাস্ত্রে অবাধগতি প্রমাণ করেছিল। তিনি একাধারে বিরোধপ্রিয় আবার সঙ্গীতপ্রিয়ও ছিলেন। ক্রোধহীন ছিলেন মহর্ষি নারদ। এমন অনেক গুণে গুণী ছিলেন তিনি। পৃথিবীতে বিচরণকারী, অপরিমিত ঔজ্জ্বল্য বিশিষ্ট, মহান তেজের আধার, দেবর্ষি নারদ, পারিজাত, রৈবত, সুমুখ ও সৌম্য, এই চারজন ঋষি-সহ যুধিষ্ঠিরের সভায় উপস্থিত হলেন। অন্তরিন্দ্রিয় মনের তুল্য দ্রুতগতিসম্পন্ন মহর্ষি নারদ, সভাসীন পাণ্ডবদের দর্শনজনিত সন্তোষ অনুভবের ইচ্ছায় সভায় উপস্থিত হলেন। জয়সূচক আশীর্বাদ দান করে যুধিষ্ঠিরকে অভিনন্দন জানালেন তিনি। পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ, বিনয়াবনত যুধিষ্ঠির, সর্বধর্মজ্ঞ দেবর্ষিকে দেখে, অনুজদের সঙ্গে একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে, তাঁকে যথাযোগ্য আসন দান করলেন এবং সানন্দে, সম্বর্ধনা জানালেন। যুধিষ্ঠির, গাভী, মধুপর্ক, রত্ন, সমস্ত অভীষ্ট দিয়ে অর্ঘ্য সাজিয়ে দেবর্ষি নারদের উদ্দেশ্যে সম্মান প্রদর্শন করলেন। যুধিষ্ঠিরপ্রদত্ত, যথাযোগ্য সম্মানপ্রাপ্তিহেতু সন্তুষ্ট হলেন দেবর্ষি নারদ। সমস্ত পাণ্ডবদের দ্বারা অভিনন্দিত বেদবিদ্যাবিদ নারদমুনি, প্রথমে যুধিষ্ঠিরকে, ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গসম্বন্ধীয় প্রশ্ন করতে লাগলেন। পরবর্তীপর্যায়ে মহর্ষি, রাজধর্মের সম্পর্কিত একটি প্রশ্নমালা তুলে ধরলেন। তাঁর প্রথম প্রশ্নের অন্তরালে ছিল, প্রকারান্তরে রাজধর্মবিষয়ে উপদেশ, কল্যন্তে কচ্চিদর্থাস্তে ধর্ম্মে চ রমতে মনঃ। সুখানি চানুভূয়ন্তে মনশ্চ ন বিহন্যতে।।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৭: আকাশ এখনও মেঘলা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
রাজা অর্জিত অর্থ উপভোগ করেন তো? ধর্মে মতি আছে তো রাজার? কখনও কামজ সুখোপভোগ করেন তো, রাজা? তখন এই ধর্ম,অর্থ ও কাম অর্থাৎ বিষয়বাসনায় নিরত মনটি পরমাত্মার চিন্তা হতে বিচ্যুত হয়ে না তো? পুরুষার্থলাভ অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই চতুর্বর্গের সেবাবিষয়ে, যুধিষ্ঠির সমতা রক্ষা করছেন কি না, এই বিষয়েই বোধ হয় মহর্ষি জিজ্ঞাসু ছিলেন। রাজা যুধিষ্ঠির, পিতামহ প্রভৃতি পিতৃপুরুষদের আচরিত ধর্মসঙ্গত অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলি অনুসরণ করেন তো? সেগুলি, সাধারণ মানুষদের জন্যেই তো? অর্থাৎ রাজার অর্থসংগ্রহের প্রচেষ্টা ধর্মবিরুদ্ধ অর্থাৎ প্রজাপীড়নের কারণ যেন না হয়। রাজার অর্থচিন্তা ধর্মবিরোধী না হয় বা ধর্মোদ্যোগ যেন অর্থচিন্তা ব্যাহত না করে, আবার অতিরিক্ত কামাসক্তির (বিষয়োপভোগের লিপ্সা) দরুণ যেন এই দুটি (ধর্ম ও অর্থচিন্তা) পরিত্যক্ত না হয়। সময়ানুসারে ধর্ম, অর্থ ও কামের সেবারত রয়েছেন তো, রাজা? কচ্চিদর্থঞ্চ ধর্ম্মঞ্চ কামঞ্চ জয়তাং বর!।বিভজ্য কালে কালজ্ঞ! সমং বরদ! সেবসে।। মহর্ষি নারদের এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য হল—ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গের সমভাবে, সময়োপযোগী সেবাই,রাজার জন্যে কাম্য।
রাজা যুধিষ্ঠির সন্ধি, বিগ্রহ, যান, আসন, দ্বৈধীভাব ও সংশ্রয় এই ছয় প্রকার রাজগুণদ্বারা ও সাম, দান, ভেদ, দণ্ড, মন্ত্র, ঔষধ এবং ইন্দ্রজাল এই সপ্ত উপায়সমূহ (পরবশীকরণহেতুসমূহ), প্রবল ও দুর্বলভাবে বিবেচনা করে, চতুর্দশবিধ রাজদোষ যথাযথ পরীক্ষা করে থাকেন কী?নারদ মুনির বক্তব্য হল, হে ভরতবংশীয়, যুধিষ্ঠির, কখনও নিজেকে দুর্বল ও বিরোধী পক্ষকে প্রবল মনে করে, সাম ও দান দ্বারা তাঁদের সঙ্গে সন্ধি করে, কৃষি, বাণিজ্যপথ, দুর্গ, সেতু, কুঞ্জরবন্ধন, আকর স্বর্ণোৎপত্তিস্থান এবং খনি রত্নাদির শূন্য উৎপত্তিস্থানে যথাযথ স্থাপন প্রভৃতি, আটপ্রকার কাজ করেন তো? রাজার পারিপার্শ্বিকের দুর্গাধ্যক্ষ (দুর্গরক্ষক), বলাধ্যক্ষ (হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক), ধর্মাধ্যক্ষ(বিচারপতি), চমূপতি (সৈন্যাধিনায়ক), পুরোহিত,বৈদ্য ও দৈবজ্ঞ প্রভৃতি সপ্ত প্রকৃতি অর্থাৎ সাতজন প্রধান পুরুষ, তাঁরা লুব্ধ নন তো? তাঁরা বিপক্ষের কাছে ধনলাভের লোভে নিজেদের বিক্রয় করেননি তো? তাঁরা অক্ষক্রীড়া অর্থাৎ পাশাখেলা, মদ্যপানাদি ব্যসনাসক্ত নন? রাজার প্রতি সর্বদা অনুরক্ত আছেন তো? কৃত্রিম সুহৃদ, দূত, যাঁদের থেকে আশঙ্কার কোনও কারণ নেই এমন ব্যক্তিত্ব বা রাজার মন্ত্রীদের হতে মন্ত্রণাযোগ্য বিষয় প্রকাশ পায় না তো? মিত্র, উদাসীন অর্থাৎ নিরপেক্ষ, শত্রুদের পরিকল্পিত বিষয় রাজার (গুপ্তচরদের মাধ্যমে) অজ্ঞাত নয়, নিশ্চয়ই? রাজা কী যথাসময়ে সন্ধি ও বিগ্রহের আশ্রয় নিয়ে থাকেন? উদাসীন অর্থাৎ নিরপেক্ষ এবং মধ্যবর্তী অর্থাৎ উভয়পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পক্ষের সঙ্গে, নিরপেক্ষভাবে রাজা অবস্থান করেন কী? পরম হিতৈষী, বৃদ্ধ, নির্দোষস্বভাব, যথাযথ বুদ্ধিদানে সক্ষম, সৎকুলজাত, অনুগতদের মন্ত্রীত্ব দিয়েছেন তো?কারণ, রাজার বিজয়,মন্ত্রণাসর্বস্ব হয়ে থাকে। যাঁরা মন্ত্রণার গোপনীয়তারক্ষাবিষয়ে সচেতন এমন শাস্ত্রবিদ মন্ত্রীদের দ্বারাই রাষ্ট্ররক্ষা সম্ভব। শত্রুরা সেই রাষ্ট্র হরণ করতে পারে না।
রাজা যুধিষ্ঠির সন্ধি, বিগ্রহ, যান, আসন, দ্বৈধীভাব ও সংশ্রয় এই ছয় প্রকার রাজগুণদ্বারা ও সাম, দান, ভেদ, দণ্ড, মন্ত্র, ঔষধ এবং ইন্দ্রজাল এই সপ্ত উপায়সমূহ (পরবশীকরণহেতুসমূহ), প্রবল ও দুর্বলভাবে বিবেচনা করে, চতুর্দশবিধ রাজদোষ যথাযথ পরীক্ষা করে থাকেন কী?নারদ মুনির বক্তব্য হল, হে ভরতবংশীয়, যুধিষ্ঠির, কখনও নিজেকে দুর্বল ও বিরোধী পক্ষকে প্রবল মনে করে, সাম ও দান দ্বারা তাঁদের সঙ্গে সন্ধি করে, কৃষি, বাণিজ্যপথ, দুর্গ, সেতু, কুঞ্জরবন্ধন, আকর স্বর্ণোৎপত্তিস্থান এবং খনি রত্নাদির শূন্য উৎপত্তিস্থানে যথাযথ স্থাপন প্রভৃতি, আটপ্রকার কাজ করেন তো? রাজার পারিপার্শ্বিকের দুর্গাধ্যক্ষ (দুর্গরক্ষক), বলাধ্যক্ষ (হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক), ধর্মাধ্যক্ষ(বিচারপতি), চমূপতি (সৈন্যাধিনায়ক), পুরোহিত,বৈদ্য ও দৈবজ্ঞ প্রভৃতি সপ্ত প্রকৃতি অর্থাৎ সাতজন প্রধান পুরুষ, তাঁরা লুব্ধ নন তো? তাঁরা বিপক্ষের কাছে ধনলাভের লোভে নিজেদের বিক্রয় করেননি তো? তাঁরা অক্ষক্রীড়া অর্থাৎ পাশাখেলা, মদ্যপানাদি ব্যসনাসক্ত নন? রাজার প্রতি সর্বদা অনুরক্ত আছেন তো? কৃত্রিম সুহৃদ, দূত, যাঁদের থেকে আশঙ্কার কোনও কারণ নেই এমন ব্যক্তিত্ব বা রাজার মন্ত্রীদের হতে মন্ত্রণাযোগ্য বিষয় প্রকাশ পায় না তো? মিত্র, উদাসীন অর্থাৎ নিরপেক্ষ, শত্রুদের পরিকল্পিত বিষয় রাজার (গুপ্তচরদের মাধ্যমে) অজ্ঞাত নয়, নিশ্চয়ই? রাজা কী যথাসময়ে সন্ধি ও বিগ্রহের আশ্রয় নিয়ে থাকেন? উদাসীন অর্থাৎ নিরপেক্ষ এবং মধ্যবর্তী অর্থাৎ উভয়পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পক্ষের সঙ্গে, নিরপেক্ষভাবে রাজা অবস্থান করেন কী? পরম হিতৈষী, বৃদ্ধ, নির্দোষস্বভাব, যথাযথ বুদ্ধিদানে সক্ষম, সৎকুলজাত, অনুগতদের মন্ত্রীত্ব দিয়েছেন তো?কারণ, রাজার বিজয়,মন্ত্রণাসর্বস্ব হয়ে থাকে। যাঁরা মন্ত্রণার গোপনীয়তারক্ষাবিষয়ে সচেতন এমন শাস্ত্রবিদ মন্ত্রীদের দ্বারাই রাষ্ট্ররক্ষা সম্ভব। শত্রুরা সেই রাষ্ট্র হরণ করতে পারে না।
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৯: হাট্টিমা
মহর্ষি নারদ জানতে চাইলেন, যুধিষ্ঠির সময় অযথা আলস্যে অতিবাহিত করেন কি না। কর্তব্যসচেতন রাজা যুধিষ্ঠির, নিজের ইচ্ছানুসারে নিদ্রার বশীভূত হন না তো? যথাসময়ে জেগে ওঠেন তো? শেষ রাতে কর্তব্যবিষয়ে চিন্তা করেন কী? একাকী মন্ত্রণা করেন? না কি বহুজনের সঙ্গে? কখনও সম্পাদিত মন্ত্রণা, রাষ্ট্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে না তো? স্বল্পব্যয়সাধ্য অথচ লাভজনক পররাজ্যজয়াদিবিষয় নিশ্চিত হয়ে, দ্রুত সে বিষয়ে উদ্যমী হন তো? কখনও সেই বিষয়ে (বিলম্ব করে) বিঘ্ন সৃষ্টি করেন না তো? কোনও কার্যসমাপ্তি, রাজার অজ্ঞাত থাকে না তো? কার্যে নিরত পুরুষগণের কর্মপ্রচেষ্টা একক প্রচেষ্টা নয় তো? কারণ রাজার কর্মে যুক্ত থাকাই বাঞ্ছনীয়। বিশ্বস্ত, লোভহীন এবং বংশানুক্রমে যে সব মানুষ, রাজার কর্মসাধনে অংশগ্রহণ করেছেন বা প্রায় কার্য সম্পন্ন করে এনেছেন অথচ কার্যের ফললাভ হয়নি, এমন পরিস্থিতিতে অন্য কেউ সেটি জানেন না তো? স্বভাবত ধার্মিক, সর্বশাস্ত্রে পারঙ্গম মানুষরা, কুমারদের ও শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের যুদ্ধাদিবিষয়ে শিক্ষাদান করেন তো? নারদ মুনির প্রশ্ন, আপনি, সহস্র মূর্খের বিনিময়মূল্যে একজন পণ্ডিতকে ক্রয় করেন তো? কর্তব্যবিষয়ে অনর্থ উপস্থিত হলে, পণ্ডিতব্যক্তিই পরম মঙ্গল সাধন করে থাকেন। কচ্চিৎ সহস্রৈর্মূর্খাণামেকং ক্রীণাসি পণ্ডিতম্।পণ্ডিতো হ্যর্থকৃচ্ছ্রেষু কুর্য্যান্নিঃশ্রেয়সং পরম্।। দুর্গগুলি ধন, ধান্য, অস্ত্র, জল, যন্ত্র, শিল্পী ও ধনুর্দ্ধারী দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে তো? মহর্ষি নারদের এমন রাজধর্ম ও রাজনীতিবিষয়ক নানা বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন যুধিষ্ঠির।এখানেই শেষ নয়,আরও অনেক প্রশ্ন অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবনির্মিত সভাগৃহ, একটি অপূর্ব সৃষ্টিশীলতার নিদর্শন। সেই সভায়, মহর্ষি নারদ উপস্থিত হলেন যেন কোনও দৈবনির্দেশে। জ্ঞানী, গুণী, পাণ্ডিত্যের আধার মহর্ষি নারদের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব মহর্ষি নারদ। তিনি একাধারে, বেদজ্ঞ, শাস্ত্রবিদ ও দার্শনিক। লৌকিক জীবনের জ্ঞান তাঁর অধরা নয়। তিনি রাজনীতিজ্ঞও বটে। পার্থিব জগতে ও তথাকথিত স্বর্গলোকেও তাঁর অবাধগতি। অন্তরীক্ষলোকেও তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন।মহর্ষি নারদ এসেছেন সদ্য সিংহাসনাসীন যুধিষ্ঠিরের রাজসভায়। যুধিষ্ঠিরের আছে রাজকীয় পরম্পরার উত্তরাধিকার। কিন্তু রাজপদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়তো তাঁর ছিল না। তাই এমন ত্রিলোকজ্ঞ, প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, মহর্ষির উপদেশের হয়তো প্রয়োজন ছিল। নারদমুনির ধর্ম, অর্থ, কাম সম্বন্ধীয় প্রশ্নগুলি, নিঃসন্দেহে, একজন নবীন রাজার কর্তব্যবিষয়ে সচেতনতাবৃদ্ধির সহায়ক। ধর্ম, অর্থ ও কামের সমতা রক্ষা করে চললে তবেই সফল রাজা হওয়া সম্ভব।শাস্ত্রকারনির্দিষ্ট রাজধর্মপালনের ক্ষেত্রেও এটি বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তীকালে সাহিত্যেও প্রখ্যাত মহাকাব্যকারগণের রচনায়,এই ত্রিবর্গের সাম্যরক্ষাকারী সফল রাজাদের উল্লেখ আছে। রাজার স্বরাষ্ট্রপালনের ও পররাষ্ট্রের প্রতি নীতি, মহর্ষি প্রশ্নচ্ছলে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। রাজধর্মের অন্তর্গত রাজার আচরিত গুণ, উপায়সমূহ ও রাজদোষগুলি সদ্য রাজপদাধিকারী প্রশাসক যুধিষ্ঠিরকে স্মরণে এনেছেন তিনি। সাম, দান, দণ্ড ও ভেদের সার্থক প্রয়োগ করছেন কি না, এই প্রশ্নের অন্তরালে বোধ হয় সেই বার্তাই নিহিত। রাজার নিজের সুরক্ষার গুরুত্ব-বিষয়টি সমান তাৎপর্যপূর্ণ। রাজার রাজ্যশাসনবিষয়ে, প্রাজ্ঞদের পরামর্শ আবশ্যিক। আধুনিকযুগে দক্ষ প্রশাসকদেরও আপ্ত সহায়কদের উর্বর মস্তিষ্কের সাহায্যর প্রয়োজন হয়ে থাকে।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাজধর্মের প্রাথমিক ভিত্তি হল, ধর্ম, অর্থ ও কামের সাযুজ্যরক্ষা। মহাভারতে ‘ধর্মের’ একটি মুখ্য ভূমিকায় রয়েছে। এই মহাকাব্যে ধর্মসম্বন্ধে ব্যাখ্যার নতুনতর দিক উদ্ঘাটিত হয়েছে। যেখানে অবশ্যই বিতর্কের অবকাশ আছে। ত্রিবর্গের অন্যতম ‘অর্থ,’ যেটি ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজার অর্থবিষয়ে স্বচ্ছতারক্ষার কারণে, ধর্মবিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা বা ধর্মের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলা প্রয়োজন। তা না হলে অর্থ অনর্থের মূল হয়ে ওঠে। মহাভারতের কুরুপাণ্ডবদের দ্বৈরথ অর্থকেন্দ্রিক এবং সেটিতে ধর্মের সমর্থন আছে কি না, এ প্রশ্ন হয়তো রয়েই যায়। ত্রিবর্গের একটি হল ‘কাম’। কামনার বাঁধভাঙ্গা প্লাবন কুরুপাণ্ডব নির্বিশেষে, আদ্যন্ত ভরতবংশীয়দের ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তার সঙ্গে ধর্ম কী সর্বদাই সঙ্গী হয়েছে?বোধ হয় না। তাহলে যে কুরুপাণ্ডবের বিখ্যাত যুদ্ধটিই হোত না। মনের গভীরে পার্থিব ভোগলিপ্সার প্রাবল্য রাজাপ্রজা নির্বিশেষে সকলের মধ্যেই বিরাজমান।তবে সমাজের পথপ্রদর্শক রাজাদের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের আবশ্যকতা অবশ্যই আছে, এ কথা অনস্বীকার্য। তাই হয়তো ধর্ম,অর্থ ও কাম, এই ত্রিবর্গের একযোগে সম অবস্থান প্রয়োজন।
মহর্ষি নারদ, রাষ্ট্রনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি এবং রাজার অনুসৃত উপায়গুলিসম্বন্ধে যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছেন সেগুলি বর্তমান প্রশাসনেও তাৎপর্যপূর্ণ। পারিপার্শ্বিকের রাজসহায়কদের বিশ্বাসযোগ্যতা, মন্ত্রগুপ্তি, প্রশাসকের কর্তব্যবিষয়ে সচেতনতা, প্রভৃতি বিষয়ে প্রশ্নগুলি যুগান্তরেও অনুসৃত হয়, তবে অন্যভাবে,অন্য কোন নামে। এগুলির আধুনিকতা চিরন্তন বললেও অত্যুক্তি হয় না। যে কোনও প্রশাসনিক অধিকর্তার ক্ষেত্রেই নারদমুনির রাজোচিত আচরণবিধি বিষয়ক প্রশ্নগুলি কৌতূহলোদ্দীপক ও প্রাসঙ্গিক। তবে বাস্তবজীবনে কী প্রশাসকরা সেগুলি মনে রাখেন? — চলবে
মহর্ষি নারদ, রাষ্ট্রনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি এবং রাজার অনুসৃত উপায়গুলিসম্বন্ধে যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছেন সেগুলি বর্তমান প্রশাসনেও তাৎপর্যপূর্ণ। পারিপার্শ্বিকের রাজসহায়কদের বিশ্বাসযোগ্যতা, মন্ত্রগুপ্তি, প্রশাসকের কর্তব্যবিষয়ে সচেতনতা, প্রভৃতি বিষয়ে প্রশ্নগুলি যুগান্তরেও অনুসৃত হয়, তবে অন্যভাবে,অন্য কোন নামে। এগুলির আধুনিকতা চিরন্তন বললেও অত্যুক্তি হয় না। যে কোনও প্রশাসনিক অধিকর্তার ক্ষেত্রেই নারদমুনির রাজোচিত আচরণবিধি বিষয়ক প্রশ্নগুলি কৌতূহলোদ্দীপক ও প্রাসঙ্গিক। তবে বাস্তবজীবনে কী প্রশাসকরা সেগুলি মনে রাখেন? — চলবে
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















