
মা দুইগ্গা আইতাছেন চাঁদ। দশ হাতে তাঁর মন্ডা মেঠাই, নূতন শাড়ি, জামা, কাপড় রাশি রাশি। আমরা ক্ষ্যাতের মিট্টি চাপড়ে লিয়ে ঘর দুয়োর নিকোবো…গিরিমাটি দে পেত্তেক বারের মতো দাওয়ায় এত্ত ছবি আঁকবা তুমি… সোন্দর সোন্দর চিত্তির…।
ঠাকমার নিদ্রা বিজড়িত অলস অবশ হাত। অভ্যাসবশে সন্তুর পিঠে ঢেঁকির মত আলতো করে উঠছে আর পড়ছে। সঙ্গে কানের পাশে একটানা কল্পিত পাঁচালি, বাহারি স্বপ্নের উড়োখই…
পূজার দিন বামন কায়েতদের বাড়িত মনিব কুটুমজন ভিড় জমায়, অ্যাকব্যালা বানশি বাজনেই কত্তগুলা বকশিশ পাবে আমার সোনার চাঁদ… এহন খানিক ঘুম যাও দিকিন নন্দদুলাল…
মানিক আমার… জাদু আমার ঘুমাও, এইতো পুজো এইলো বলে…
গভীর ঘুমে ঠাকমা কন্ঠ দিয়ে উ উ শব্দ করে। শ্বাস ফ্যালে ফোঁস ফোঁস। সন্তু সেই অপেক্ষায়। বকতে বকতে একসময় ক্ষান্ত হবে ফোকলা বুড়ি। নিদের দাপে থমকে যাবে শীর্ণ হাত। আর তখনই সন্তু পা টিপে টিপে দরজার হুড়কোখানা সন্তর্পণে খুলে দে ছুট।
এ নিত্যিকার ঘটনা। দুগ্গোপুজো বলে তো নয়, এ হল সম্বৎসরের রুটিন। চিল কাক ঘুঘু আর পায়রা ডাকা ভরদুপুরে, নিঝুম যখন চারপাশ… তখন ঠাকমার অঘোর সুপ্তির সুযোগে ঘরের খিল খুলে বছর চোদ্দ পনেরর ওই ডানপিটে মাটির দাওয়া ডিঙিয়ে হাওয়া হবেই। তারপর শুধু দৌড় আর দৌড়। বাড়ির সামনের কাঁচা রাস্তা ছাড়িয়ে আধপাকা মোরাম রাস্তার এবড়োখেবড়ো লালপথ দিয়ে অনেকখানি ছুটে, কালভার্ট পেরিয়ে, রাস্তার বাঁক ঘুরে রেল লাইনের বাঁধ টপকে ঘাস জমির ঢালের উপর দিয়ে পৌঁছে যাবে কবরমারি টিলায়। যেখানে আকাশ মিশেছে মাটিতে। ওখানেই অপেক্ষা করে তারক গদাই রাখাল অংশুরা। তারপর শুধু উদ্দাম খেলা আর খেলা। বৃক্ষগুল্ম আকাশ বাতাস পশুপাখি সকলে মিলে, সবুজের সমুদ্রে, একই সঙ্গে। একখানা শেষ হতে না হতে আরেক খেলার জল্পনা। বৈরাল মাঠে পাশাপাশি দু’ গ্রামের ছেলে পিলে জড়ো হয়ে ফুটবল গাদি কবাডি হাডুডু… খেলতে খেলতে ঘুষোঘুষি চুলোচুলি। আবার বেধড়ক পিটতে পিটতেই এক গলা ভাব। মাঠের ধারের ঝাঁকরা যজ্ঞি ডুমুর, ঘন সবুজ টসটসে কেয়াবন আর বুনো টগরের ঝাড়ের নীচে গড়াগড়ি। মাথার ওপরকার গনগনে সূর্য হেলতে দুলতে পশ্চিমপাড়ি খালের জলটাকে ততক্ষণে লাল করে দিয়েছে। ঝিঁ পোকা ডাকা ঝাপড়া অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে এবার লোকচক্ষুর আড়ালে সুখটান। আস্ত বা আধপোড়া বিড়ি ফুঁকে দেখবার সে কি উত্তেজনা! অবশ্য রোজ নয়, মাঝে মধ্যে। এধার ওধার থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে।
খেলা শেষে সন্তু বিড়ি খায় না। বাঁশি বাজায়। গেল বছর বিশ্বকর্মা পুজোর সন্ধ্যেবেলা সারাদিন ঘুড়ি ফুরি উড়িয়ে খালধারে বসে একবার মাত্র জমিয়ে বিড়ি টেনেছিল। তারপর নাগাড়ে হাঁচি আর কাশি, কাশতে কাশতে বুক চেপে সেই যে প্রতিজ্ঞা করেছে ওকে আর কিছুতেই টানানো যায়নি।
ঠাকমার নিদ্রা বিজড়িত অলস অবশ হাত। অভ্যাসবশে সন্তুর পিঠে ঢেঁকির মত আলতো করে উঠছে আর পড়ছে। সঙ্গে কানের পাশে একটানা কল্পিত পাঁচালি, বাহারি স্বপ্নের উড়োখই…
পূজার দিন বামন কায়েতদের বাড়িত মনিব কুটুমজন ভিড় জমায়, অ্যাকব্যালা বানশি বাজনেই কত্তগুলা বকশিশ পাবে আমার সোনার চাঁদ… এহন খানিক ঘুম যাও দিকিন নন্দদুলাল…
মানিক আমার… জাদু আমার ঘুমাও, এইতো পুজো এইলো বলে…
গভীর ঘুমে ঠাকমা কন্ঠ দিয়ে উ উ শব্দ করে। শ্বাস ফ্যালে ফোঁস ফোঁস। সন্তু সেই অপেক্ষায়। বকতে বকতে একসময় ক্ষান্ত হবে ফোকলা বুড়ি। নিদের দাপে থমকে যাবে শীর্ণ হাত। আর তখনই সন্তু পা টিপে টিপে দরজার হুড়কোখানা সন্তর্পণে খুলে দে ছুট।
এ নিত্যিকার ঘটনা। দুগ্গোপুজো বলে তো নয়, এ হল সম্বৎসরের রুটিন। চিল কাক ঘুঘু আর পায়রা ডাকা ভরদুপুরে, নিঝুম যখন চারপাশ… তখন ঠাকমার অঘোর সুপ্তির সুযোগে ঘরের খিল খুলে বছর চোদ্দ পনেরর ওই ডানপিটে মাটির দাওয়া ডিঙিয়ে হাওয়া হবেই। তারপর শুধু দৌড় আর দৌড়। বাড়ির সামনের কাঁচা রাস্তা ছাড়িয়ে আধপাকা মোরাম রাস্তার এবড়োখেবড়ো লালপথ দিয়ে অনেকখানি ছুটে, কালভার্ট পেরিয়ে, রাস্তার বাঁক ঘুরে রেল লাইনের বাঁধ টপকে ঘাস জমির ঢালের উপর দিয়ে পৌঁছে যাবে কবরমারি টিলায়। যেখানে আকাশ মিশেছে মাটিতে। ওখানেই অপেক্ষা করে তারক গদাই রাখাল অংশুরা। তারপর শুধু উদ্দাম খেলা আর খেলা। বৃক্ষগুল্ম আকাশ বাতাস পশুপাখি সকলে মিলে, সবুজের সমুদ্রে, একই সঙ্গে। একখানা শেষ হতে না হতে আরেক খেলার জল্পনা। বৈরাল মাঠে পাশাপাশি দু’ গ্রামের ছেলে পিলে জড়ো হয়ে ফুটবল গাদি কবাডি হাডুডু… খেলতে খেলতে ঘুষোঘুষি চুলোচুলি। আবার বেধড়ক পিটতে পিটতেই এক গলা ভাব। মাঠের ধারের ঝাঁকরা যজ্ঞি ডুমুর, ঘন সবুজ টসটসে কেয়াবন আর বুনো টগরের ঝাড়ের নীচে গড়াগড়ি। মাথার ওপরকার গনগনে সূর্য হেলতে দুলতে পশ্চিমপাড়ি খালের জলটাকে ততক্ষণে লাল করে দিয়েছে। ঝিঁ পোকা ডাকা ঝাপড়া অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে এবার লোকচক্ষুর আড়ালে সুখটান। আস্ত বা আধপোড়া বিড়ি ফুঁকে দেখবার সে কি উত্তেজনা! অবশ্য রোজ নয়, মাঝে মধ্যে। এধার ওধার থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে।
খেলা শেষে সন্তু বিড়ি খায় না। বাঁশি বাজায়। গেল বছর বিশ্বকর্মা পুজোর সন্ধ্যেবেলা সারাদিন ঘুড়ি ফুরি উড়িয়ে খালধারে বসে একবার মাত্র জমিয়ে বিড়ি টেনেছিল। তারপর নাগাড়ে হাঁচি আর কাশি, কাশতে কাশতে বুক চেপে সেই যে প্রতিজ্ঞা করেছে ওকে আর কিছুতেই টানানো যায়নি।
তেমনধারা জেদি একবগ্গা ছেলেকে টানতে টানতে সন্তুর বাপ সুদর্শন শারদ পুজোয় নিয়ে এল কলকাতা। অত সোজা নাকি সন্তুকে ইচ্ছেমত টান মারা! এমনিতেই বাপের সঙ্গে ওর বনে না। সারাক্ষণ বকা আর পিটুনি। জোঁকের মতো নজর রাখা আর মোষের মতো তাড়ন। কেন যাবে সন্তু পুজোর আনন্দে ছাই দিতে অমন বাপের সঙ্গে কলকাতায়! যেখানে গ্রামের পুজোয় এত সুখ! সবচেয়ে বড় কথা ওর বিরাট দায়িত্ব যেখানে! বিশালাক্ষীতলায় ডাকের সাজে মা বসবেন। দেবী দুগ্গার বোধন হবে ষষ্ঠীর সন্ধ্যেয়। সেখানটা ধোয়া মোছা পরিষ্কার করবে কারা…সন্তুদের দল। কুমোর পাড়ায় ঠাকুরের বায়নায় বড়দের সঙ্গে যাবে কারা …সন্তুরা। মায়ের একচালা মূর্তি ভ্যানে চাপিয়ে আনবে কারা…ওরা। ইলেকট্রিকের মিন্টুদাকে ধরে পাঁচ ছরা টুনি দিয়ে মন্ডপ সাজানোর কাজ কাদের, সে তো ওদেরই!
সেই নিয়েই সংসারে বিশাল ঝামেলা। সুদর্শন কলকাতায় ঢাক বাজাতে যায় পুজোর সময়। অনেক বছর হল। এবার নাকি তার বয়স হয়েছে তাই সে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাবে ঠিক করেছে। হাত পা ছুঁড়ে লাফিয়ে দাপিয়ে চেঁচিয়ে যথাসাধ্য প্রতিবাদ জানিয়েছিল সন্তু। কোনোভাবেই বাগে আনতে পারেনি বাপকে। ঠাকমা আর মাকে দিয়েও সেটা সম্ভব হয়নি। কারণ বাবাকে ওরা ভয় পায়। ঠাকমা আর মা দুইজনাই। আর তাই বাবাকে আরও অপছন্দ সন্তুর। কেন ঠাকমার কথা শেষ কথা হবে না? মায়ের কথাও কেন নয়? সন্তু তো জানে পুজোর সময় ও না থাকলে সক্কলের কত কষ্ট হবে। কিন্তু ওই লোকটাকে বোঝানোর ঠেকানোর সাহস কারও নাই। আসলে বাবা ইচ্ছে করেই নিয়ে যাচ্ছে। গাঁয়ের পুজোতে যাতে বন্ধুদের সঙ্গে হুল্লোড় করতে না পারে। সব বুঝেছে।
মা আর ঠাকমার অঝোর কান্নার মধ্যে ঘন মেঘ বুকে করে বাষ্প রুদ্ধ চোয়াল চেপে ট্রেন ধরেছিল সন্তু। বাপের সঙ্গে শেয়ালদার ট্রেন। চতুর্থীর দিন সাত সকালে। এক হাতে মোয়া মুড়কি নাড়ুর ছোট ব্যাগ আর অন্য হাতে জামাকাপড়ের থলে। রওনা দিয়েছিল সুদর্শন বাউরির একমাত্র পুত্র। সাত রাজার ধন এক মানিক। একথাটা ঠাকমা বলে। মা ও বলে মাঝেসাঝে। বাপ কোনওদিন বলে না। মা বলে রাত্তির বেলা ঘুমের সময়। যেদিন মায়ের শরীর মনে আরাম থাকে সেদিন বলে। সারাদিন কাজের পরে যখন ঠান্ডা বাতাস বয়। গুমোট কাটে। ঝিঁঝিঁ ডাকে। জোনাক ফোটে। চাঁদের আলোয় মাঠঘাট ভাসে। জোছনা দুধ ছড়ায়। সামনের পুকুরে গা ধুয়ে শীতল হয়ে আসে মা। খেজুর গাছটার গায়ে চোখ আটকে, দূরের মাঠ পথের দিকে তাকিয়ে আপন মনে মা তখন বলে যে সন্তু নাকি তাদের সাত রাজার ধন এক মানিক। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলে, ও হল দেবতা মল্লেশ্বরের দোর ধরা সন্তান। ওর বাবা সুদর্শন আর মা সুচাঁদ নাকি অনেক বছর তপেস্যা করে তবে লিঙ্গ শিবের দয়ায় ওকে পেয়েছে। হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছে তারা মায়ের মহাথানে। শুনতে শুনতে ছায়া নামা আঁধার ঘরে গা শিরশির করে সন্তুর।
সেই নিয়েই সংসারে বিশাল ঝামেলা। সুদর্শন কলকাতায় ঢাক বাজাতে যায় পুজোর সময়। অনেক বছর হল। এবার নাকি তার বয়স হয়েছে তাই সে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাবে ঠিক করেছে। হাত পা ছুঁড়ে লাফিয়ে দাপিয়ে চেঁচিয়ে যথাসাধ্য প্রতিবাদ জানিয়েছিল সন্তু। কোনোভাবেই বাগে আনতে পারেনি বাপকে। ঠাকমা আর মাকে দিয়েও সেটা সম্ভব হয়নি। কারণ বাবাকে ওরা ভয় পায়। ঠাকমা আর মা দুইজনাই। আর তাই বাবাকে আরও অপছন্দ সন্তুর। কেন ঠাকমার কথা শেষ কথা হবে না? মায়ের কথাও কেন নয়? সন্তু তো জানে পুজোর সময় ও না থাকলে সক্কলের কত কষ্ট হবে। কিন্তু ওই লোকটাকে বোঝানোর ঠেকানোর সাহস কারও নাই। আসলে বাবা ইচ্ছে করেই নিয়ে যাচ্ছে। গাঁয়ের পুজোতে যাতে বন্ধুদের সঙ্গে হুল্লোড় করতে না পারে। সব বুঝেছে।
মা আর ঠাকমার অঝোর কান্নার মধ্যে ঘন মেঘ বুকে করে বাষ্প রুদ্ধ চোয়াল চেপে ট্রেন ধরেছিল সন্তু। বাপের সঙ্গে শেয়ালদার ট্রেন। চতুর্থীর দিন সাত সকালে। এক হাতে মোয়া মুড়কি নাড়ুর ছোট ব্যাগ আর অন্য হাতে জামাকাপড়ের থলে। রওনা দিয়েছিল সুদর্শন বাউরির একমাত্র পুত্র। সাত রাজার ধন এক মানিক। একথাটা ঠাকমা বলে। মা ও বলে মাঝেসাঝে। বাপ কোনওদিন বলে না। মা বলে রাত্তির বেলা ঘুমের সময়। যেদিন মায়ের শরীর মনে আরাম থাকে সেদিন বলে। সারাদিন কাজের পরে যখন ঠান্ডা বাতাস বয়। গুমোট কাটে। ঝিঁঝিঁ ডাকে। জোনাক ফোটে। চাঁদের আলোয় মাঠঘাট ভাসে। জোছনা দুধ ছড়ায়। সামনের পুকুরে গা ধুয়ে শীতল হয়ে আসে মা। খেজুর গাছটার গায়ে চোখ আটকে, দূরের মাঠ পথের দিকে তাকিয়ে আপন মনে মা তখন বলে যে সন্তু নাকি তাদের সাত রাজার ধন এক মানিক। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলে, ও হল দেবতা মল্লেশ্বরের দোর ধরা সন্তান। ওর বাবা সুদর্শন আর মা সুচাঁদ নাকি অনেক বছর তপেস্যা করে তবে লিঙ্গ শিবের দয়ায় ওকে পেয়েছে। হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেছে তারা মায়ের মহাথানে। শুনতে শুনতে ছায়া নামা আঁধার ঘরে গা শিরশির করে সন্তুর।
আরও পড়ুন:

শারদীয়ার গল্প-৫: হটস্পট

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১: সুধারানির কথা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৯: হাট্টিমা
কিন্তু এত কষ্ট করে যাকে পাওয়া তার সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার, এমনধারা অত্যেচার করে কী করে ওই সুদর্শন ঢাকি..! সারাক্ষণ নিজের ছেলেকে নিয়ে গজর গজর! ও নাকি কোনও কম্মে লাগে না। দিনভর ওরলা গরুর মতো ডোগলা মেরে বেড়ায়। চোদ্দো পনেরো বছর বয়স…এখনও ক্ষেতির কাজের অ আ ক খ শেখেনি! সুদর্শন যখন চেঁচায় তাড়স্বরে… মাকে খামোখা দোষ দেয়, বলে মা-ই নাকি ওকে আদর দিয়ে বাঁদর করেছে…আর ঠাকমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে এই ঠ্যাঙাড়ে নাতিকে দিয়ে কোনও জম্মে বুড়ির সগ্গে বাতি পরবে না, সন্তুর মতো পালোয়ান তখন কেবল বাপ বলেই মুখ বুজে সহ্য করে সব। সাঁঝের বেলা ঠাকমার ঘরে তেলের দীপ জ্বলে, গপ্প বলতে চায় বুড়ির ঝুলির কথারা… ঘরের মধ্যে পাক খায় ধুনোর গন্ধ, দাওয়ার এক পাশে কূপি জ্বালিয়ে গরম গরম রুটি তরকারি বানায় মা, ভাসতে থাকে সেই রান্নার সুবাস বাড়ি ছাড়িয়ে পাড়াময়, নিশ্চিন্দি হয়ে তখন একটুখান ফুঁ দেওয়া যায় বাঁশিতে… দাওয়ার আর এক কোণে বসে। বুকের দমটুক শ্বাসটুক ছাতিমের গন্ধের সঙ্গে মিশিয়ে যতখুশি বাজানো যায় প্রাণভরে… কিন্তু সে’সব তো হবার নয়। বেশির ভাগ দিনই মাঠের কাজ সেরে সাঁঝের আগে তিনি ঢুকে আসেন বাড়িতে। এক পেট খিদে নিয়ে সন্তু তখন বাধ্য হয় হারিকেন জ্বালিয়ে চৌকির ওপর পড়তে বসতে। অত্যাচারী বাপের ভয়ে। প্রবল অনিচ্ছেয় ভুলভাল অংক কষে আর অন্তরের অতলে করে বাপের বাপ বাপান্ত। অবশ্য সন্তুরও দোষ আছে। সেটা সে মানে। রাগ তো করবেই বাবা। ইস্কুলের হেডমাস্টারটা সুযোগ পেলেই বাবাকে রিপোর্ট করে। অন্য মাস্টাররাও বাদ যায় না। মাঠ ঘাট ব্রিজ গ্রাম মফস্বল বাজার ফুঁড়ে তীরের গতিতে ছুটে চলেছে ট্রেন। গাঢ় অভিমানে অন্যমনস্ক সন্তু। গ্রামের পেছুটানে বুক ফেটে খান খান। মুখ খানা থমথমে। কিচ্ছু দেখছে না তাকিয়ে। চারপাশ থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে দু’পাশের পৃথিবী। ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে এক আধবার চোখ চলে যাচ্ছে। আর তখনই সন্তুর উদাস দৃষ্টির সামনে দুলে উঠছে অফুরন্ত সাদার ঢেউ। বাতাসের নদীতে কাশ ফুলের জোয়ার। কোথাও কোথাও শ্যাওলা ধরা মজা পুকুরে জাগ্রত পদ্ম। ঠিক ওদের মল্লারপুরের মতো। উদ্বেলিত শোক দলা পাকিয়ে ইচ্ছেখুশি ঘুঁষি মারছে সন্তুর কিশোর বুকে। ও বসেছে জানলার ধারে। পাশেই বাবা। কেমন অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে দেখ মানুষটা। যেন কোনো অন্যায় করেনি এমন সাদামাঠা ভাব! মাথাটা ঝুঁকে পড়েছে হাঁটুর দিকে। তবু হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছে
লাল-নীল-সবুজ পালক লাগানো মস্ত ঢাকের দড়ি। রাগী মানুষটা এখন দুর্বল হয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক গে। শেয়ালদা এসে গেলেও ডাকবে না। তারপর ট্রেনটা আবার ফিরে গ্রামে টেনে নিয়ে যাবে। বুঝবে মজা। আর যদি তার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ে তখন বাধ্য হয়ে এই লোকটার সঙ্গে চুপচাপ কাটিয়ে দেবে কলকাতায় কটা দিন। এখন আর কিচ্ছু করার নেই। এই একটা লোকের জন্য পুজোটা পুরো মাঠে মারা গেল সন্তুর। বাঁ হাতের তালু দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মোছে।
চতুর্থীর কলকাতা। গোধূলি সময়। ট্রেন থেকে নেমেই জনসমুদ্র। চোখ ঝলসানো আলোর রোশনাই। সন্তুর দিশেহারা লাগছে। বাবা খুব যত্ন করে ওকে আগলে রেখেছে। বাড়িতে কখনও যেটা করে না। স্টেশন থেকে বাস রাস্তায় উঠে দ্যাখে আরও থিকথিকে ভিড়।বাদুর ঝোলা বাস আসছে ধেয়ে। একের পর এক। তাড়া খাওয়া ষাঁড়ের মতো। এখনই ধাক্কা মেরে ঘাড়ে এসে পড়বে… ওরেব্বাবা… কী ভয়ংকর!! সন্তু রাগ অভিমান ভুলে সিঁটিয়ে যাচ্ছে বাবার গায়ে। কিছুতেই ও’সবে উঠতে পারবে না। অত পেল্লাই একখানা ঢাক নিয়ে। গ্রামের পুকুরে রাত দিন কেরামতি দেখিয়ে সাঁতার কাটা, হাডু ডু, ফুটবলের মাতব্বরি এক নিমেষে ভো কাট্টা! বোলচাল এক দমকে চুপসে চিড়ে! ভয়ে ঢিপ ঢিপ করছে কলজেখান। ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে তাকায় একবার। বাবার নির্বিকার হাসি হাসি মুখ। সন্তুকেই দেখছে। আলোর রাজ্যিতে এসে বাবা যেন ওদের গাঁয়ের ভাড়া করা পালার হিরো, জয়কেষ্ট সাপুই। নাকি নীলমণি বাজিকর, ওই ভিন দেশের ম্যাজিকওলাটা! দূরবিন ক্যামেরা ঝুলি অনেকগুলো পকেটয়ালা রংবেরঙের তালি মারা ফতুয়া আর লম্বা চকচকে টুপি পরে যে লোকটা মাঝে মাঝেই ভেলকির খেলা দেখাতে আসে। সে নয় হল, কিন্তু ও নিজে কী, নিজে তো একটা ফুঁটো হয়ে যাওয়া বেলুন… ছি ছি, নিজের এমন অভাবনীয় পরাভব লক্ষ্য করে লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে মল্লারপুর কিশোর সংঘের ক্যাপটেন!
লাল-নীল-সবুজ পালক লাগানো মস্ত ঢাকের দড়ি। রাগী মানুষটা এখন দুর্বল হয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক গে। শেয়ালদা এসে গেলেও ডাকবে না। তারপর ট্রেনটা আবার ফিরে গ্রামে টেনে নিয়ে যাবে। বুঝবে মজা। আর যদি তার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ে তখন বাধ্য হয়ে এই লোকটার সঙ্গে চুপচাপ কাটিয়ে দেবে কলকাতায় কটা দিন। এখন আর কিচ্ছু করার নেই। এই একটা লোকের জন্য পুজোটা পুরো মাঠে মারা গেল সন্তুর। বাঁ হাতের তালু দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মোছে।
চতুর্থীর কলকাতা। গোধূলি সময়। ট্রেন থেকে নেমেই জনসমুদ্র। চোখ ঝলসানো আলোর রোশনাই। সন্তুর দিশেহারা লাগছে। বাবা খুব যত্ন করে ওকে আগলে রেখেছে। বাড়িতে কখনও যেটা করে না। স্টেশন থেকে বাস রাস্তায় উঠে দ্যাখে আরও থিকথিকে ভিড়।বাদুর ঝোলা বাস আসছে ধেয়ে। একের পর এক। তাড়া খাওয়া ষাঁড়ের মতো। এখনই ধাক্কা মেরে ঘাড়ে এসে পড়বে… ওরেব্বাবা… কী ভয়ংকর!! সন্তু রাগ অভিমান ভুলে সিঁটিয়ে যাচ্ছে বাবার গায়ে। কিছুতেই ও’সবে উঠতে পারবে না। অত পেল্লাই একখানা ঢাক নিয়ে। গ্রামের পুকুরে রাত দিন কেরামতি দেখিয়ে সাঁতার কাটা, হাডু ডু, ফুটবলের মাতব্বরি এক নিমেষে ভো কাট্টা! বোলচাল এক দমকে চুপসে চিড়ে! ভয়ে ঢিপ ঢিপ করছে কলজেখান। ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে তাকায় একবার। বাবার নির্বিকার হাসি হাসি মুখ। সন্তুকেই দেখছে। আলোর রাজ্যিতে এসে বাবা যেন ওদের গাঁয়ের ভাড়া করা পালার হিরো, জয়কেষ্ট সাপুই। নাকি নীলমণি বাজিকর, ওই ভিন দেশের ম্যাজিকওলাটা! দূরবিন ক্যামেরা ঝুলি অনেকগুলো পকেটয়ালা রংবেরঙের তালি মারা ফতুয়া আর লম্বা চকচকে টুপি পরে যে লোকটা মাঝে মাঝেই ভেলকির খেলা দেখাতে আসে। সে নয় হল, কিন্তু ও নিজে কী, নিজে তো একটা ফুঁটো হয়ে যাওয়া বেলুন… ছি ছি, নিজের এমন অভাবনীয় পরাভব লক্ষ্য করে লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে মল্লারপুর কিশোর সংঘের ক্যাপটেন!
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৪: অনুসরণ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
কিন্তু বাবা সন্তুকে আদরে জড়িয়ে রেখেছে। গোটা জীবনে মনে হয় এই প্রথম। এবার একখানা অটোয় ওঠালো। শুধু সন্তুর কষ্ট হচ্ছে বলে বাবা পুরো অটোখানা কত্ত টাকা দিয়ে ভাড়া করে নিল! অতক্ষণ দরাদরি করেও পঞ্চাশ টাকা!! ভাবতেই পারেনা! অটোয় বসে, জল টল খেয়ে এবার একটু শান্তি। চারপাশের লাইটিং, জমকালো প্যান্ডেল, পুজোর ভিড় সামলাতে বাঁশের বাঁধন দেওয়া লম্বা চওড়া পথঘাট… দেখতে দেখতে খানিক বাদে পৌঁছে গেল সুরভি আবাসন। রাস্তায় বাপের সঙ্গে কত কথা, এটা ওটা সেটা.. প্রশ্নের পর প্রশ্ন । তবু বাবার ধৈর্যের শেষ নেই। মাথার পেছনে একটাও চাটি মারছে না। ধমক তো নয়ই। আর লোকটা জানেও কত কিছু! সন্তু যা জিজ্ঞেস করছে, সবেরই উত্তর বাবার জানা! বাবাকে দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছে সন্তু! ওই মানুষটা কি সুদর্শন বাউরি নয়! অন্য কেউ? না হলে এই একটু সময় এক সঙ্গে থেকে সন্তুর বুকে বয়ে বেড়ানো যত রাজ্যের রাগ ঝাল দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দিচ্ছে কী করে?
সুরভি আবাসনের সামনে অনেকজন বাবু দাঁড়িয়ে। বেশিরভাগই বয়স্ক। কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েও আছে। ওর চেয়ে একটু বড় হবে। ছেলেগুলো মোটামুটি ঠিকই আছে, কিন্তু মেয়ে তিনটের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল সন্তু। অত বড় বড় মেয়ে, ছেলেদের মতন গেঞ্জি হাফপ্যান্ট পড়ে হাসাহাসি করছে, এতোটুকুন লজ্জা নাই গো… ঠাকমা ঠিকই বলেছিল, কলকাতায় আসবার আগে পই পই করে…কলকাতার ছেমড়িরা সুবিধার লয়, ওরা ধিঙ্গিপানা, ওদের চলন বলনে বজ্জাতি। না, সন্তু আর তাকাবে না ওদের দিকে। কিন্তু ঠাকমা এ’সব জানলো কী করে?
কী দারুণ সাজানো আবাসন! সগ্গের মতো। মেন গেটে বড় বড় লাইট। এক একটা বাড়ি যেন জিরাফের লম্বা গলা। এই নিচে শুরু আর ওই উপরে শেষ। বাবা বলে এগুলোর নাম হল বিল্ডিং। সাদায় আকাশ নীলে চোবানো বিল্ডিং। তাতে লাল নীল সবুজ ঝলমলে টুনির চেন ঝুলছে। মূল ফটক দিয়ে সোজা ভেতরে তাকালে মণ্ডপ। মন্ডপের প্রান্তে উঁচু বেদি। সেখানে সাদা শোলার অপূর্ব চালচিত্তির, আর আলোর সাজ। আলোর পাখি, আলোর গাছ। জ্বলছে নিবছে। আলোর পঞ্চপ্রদীপ দুখানা শুধু জ্বলেই আছে। বেদির সামনে আলপনা আঁকা, খুব সুন্দর, অনেক বড়, গোলপানা। লতা পাতা ফুল। দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। পুজোর দিনে সন্তুও দাওয়ায় আলপনা আঁকে কিন্তু এর কাছে সে কিছুই নয়। বেদি এখন ফাঁকা, একটু পরেই নাকি ঠাকুর আসবে। এরা সব যাবে ঠাকুর আনতে। সন্তুও যাবে, বাবার সঙ্গে।
অনেকেই বাবাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। বলছে, এত কেন দেরি রে সুদর্শন, ওই সাদা ধুতি পাঞ্জাবি গায়ে বুড়োবাবুটা বলছে আর বাকিরাও। বলছে, তোর জন্য অপেক্ষা করছি এক ঘন্টা, গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছি বহুক্ষণ। তুই না এলে ঢাকে তো কাঠিই পড়বে না… দেবী তো ঢুকতেই পারবেন না আমাদের আবাসনে। চারপাশে শুধু সুদর্শন আর সুদর্শন। সন্তুর বুকের ভেতর কেমন জল থই-থই ভরাট পুকুর। বাবার জন্য। ইচ্ছে করছে বাড়িতে আর বন্ধুদের কাছে এ সব গুছিয়ে বলে, কলকাতা শহরে বাবার এই নাম ডাকের কথা। মায়ের বয়সী মহিলারাও এসেছে কয়েকজন। কত্ত সাজ। কত রং চং ঢং। তার মায়ের কিছু সাজ নাই। অবশ্য এমনিতেই মা দুগ্গা প্রতিমার মত, আর সে হল তার মায়ের ছাচ।
সুরভি আবাসনের সামনে অনেকজন বাবু দাঁড়িয়ে। বেশিরভাগই বয়স্ক। কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েও আছে। ওর চেয়ে একটু বড় হবে। ছেলেগুলো মোটামুটি ঠিকই আছে, কিন্তু মেয়ে তিনটের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল সন্তু। অত বড় বড় মেয়ে, ছেলেদের মতন গেঞ্জি হাফপ্যান্ট পড়ে হাসাহাসি করছে, এতোটুকুন লজ্জা নাই গো… ঠাকমা ঠিকই বলেছিল, কলকাতায় আসবার আগে পই পই করে…কলকাতার ছেমড়িরা সুবিধার লয়, ওরা ধিঙ্গিপানা, ওদের চলন বলনে বজ্জাতি। না, সন্তু আর তাকাবে না ওদের দিকে। কিন্তু ঠাকমা এ’সব জানলো কী করে?
কী দারুণ সাজানো আবাসন! সগ্গের মতো। মেন গেটে বড় বড় লাইট। এক একটা বাড়ি যেন জিরাফের লম্বা গলা। এই নিচে শুরু আর ওই উপরে শেষ। বাবা বলে এগুলোর নাম হল বিল্ডিং। সাদায় আকাশ নীলে চোবানো বিল্ডিং। তাতে লাল নীল সবুজ ঝলমলে টুনির চেন ঝুলছে। মূল ফটক দিয়ে সোজা ভেতরে তাকালে মণ্ডপ। মন্ডপের প্রান্তে উঁচু বেদি। সেখানে সাদা শোলার অপূর্ব চালচিত্তির, আর আলোর সাজ। আলোর পাখি, আলোর গাছ। জ্বলছে নিবছে। আলোর পঞ্চপ্রদীপ দুখানা শুধু জ্বলেই আছে। বেদির সামনে আলপনা আঁকা, খুব সুন্দর, অনেক বড়, গোলপানা। লতা পাতা ফুল। দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। পুজোর দিনে সন্তুও দাওয়ায় আলপনা আঁকে কিন্তু এর কাছে সে কিছুই নয়। বেদি এখন ফাঁকা, একটু পরেই নাকি ঠাকুর আসবে। এরা সব যাবে ঠাকুর আনতে। সন্তুও যাবে, বাবার সঙ্গে।
অনেকেই বাবাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। বলছে, এত কেন দেরি রে সুদর্শন, ওই সাদা ধুতি পাঞ্জাবি গায়ে বুড়োবাবুটা বলছে আর বাকিরাও। বলছে, তোর জন্য অপেক্ষা করছি এক ঘন্টা, গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছি বহুক্ষণ। তুই না এলে ঢাকে তো কাঠিই পড়বে না… দেবী তো ঢুকতেই পারবেন না আমাদের আবাসনে। চারপাশে শুধু সুদর্শন আর সুদর্শন। সন্তুর বুকের ভেতর কেমন জল থই-থই ভরাট পুকুর। বাবার জন্য। ইচ্ছে করছে বাড়িতে আর বন্ধুদের কাছে এ সব গুছিয়ে বলে, কলকাতা শহরে বাবার এই নাম ডাকের কথা। মায়ের বয়সী মহিলারাও এসেছে কয়েকজন। কত্ত সাজ। কত রং চং ঢং। তার মায়ের কিছু সাজ নাই। অবশ্য এমনিতেই মা দুগ্গা প্রতিমার মত, আর সে হল তার মায়ের ছাচ।
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ
সকলে তাই বলে। মাতৃমুখী পুত্র সুখী। ঠাকমার মতো একজন বুড়ি বসে আছে টুনি লাগানো টগর গাছের নিচে। হাতলওলা সিমেন্ট চেয়ারে। একই রকম দন্তহীন। একই রকম হাসি মুখ। শুধু ঠাকমার সাদা থান, এই বুড়িটা লাল পেড়ে শাড়ি আর সিঁদুর টিপ। সেই বুড়ি বাবাকে হাঁক দেয়। বলে, অ সুদর্শন, তোর সঙ্গে ও কি তোর পুত্র নাকি…এমন কাত্তিকের মতো ব্যাটা, আগে তো বলিসনি?
ব্যস, বলামাত্র জমায়েতের জোড়া জোড়া চোখ সেঁটে গেল সন্তুর দিকে। ধুতি পাঞ্জাবি বাবু বলে, তাই তো, নাতি এসেছে দেখছি, আয় আয়, বাহ্, এ তো আধা রাজপুত্তুর রে সুদর্শন…
হাসাহাসি, দেখাদেখি, টানাটানি র মধ্যে পড়ে সন্তু গুটিয়ে একরত্তি শামুক। টপ টপ পেন্নাম ঠুকছে, মাথা না তুলেই, যে পা সামনে পাচ্ছে সেখানেই। বাবা অটোতে আগেই শিখিয়েছিল। কিন্তু চ্যাংড়া ছোঁড়া ছুঁড়িরা ওর চেয়ে বয়সে বড় হলেও ওদের পা ছোঁবে না সন্তু।
ঠাকুর এসে গেছে। ‘বল বল দুগ্গা এলো দুগ্গা এল’ গানে মাইক বাজছে। সঙ্গে বাবার ঢাক। সে এক দারুণ জমজমাট সন্ধ্যা। ঠাকুরের মণ্ডপের সামনে অনেক বড় চওড়া রাস্তা আর পাশের ছোট বাগানে লাল সবুজ প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। আবাসনের সবাই সেখানে বসে গল্প করছে। দারোয়ানরা বাবুদের হাতে প্লাস্টিকের চায়ের কাপ তুলে দিচ্ছে। সন্তু ও পেল চা বিস্কুট। একটু দূরে আর একটা মঞ্চ। চেকনাই কমলা কাপড়ের গায়ে হলুদ সিল্কের কুঁচি। খুব সুন্দর এ পাড়ায় নাকি প্রতি বছর পুজোয় নাচ গান নাটক হয়, এবারেও হবে। ওই মঞ্চটায়। এখন সানাই বাজছে। গমগম করছে পাড়া। ম ম করছে চাঁপা আর বকুল ফুলের গন্ধ। গেটের গায়ে ভরন্ত বকুল গাছটা ও দেখেছে।
হঠাৎ শোনে বাবা গায়ে পড়ে বাবুদের বলছে, জানেন কত্তা সন্তু কিন্তুক খুব ভালো ফুলুট বাজায় বাবুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে কৌতুকে হেসেছে। বলেছে, তাই বুঝি…কি রে সন্তু বাজাবি তো আমাদের প্রোগ্রামে? বাঁশি এনেছিস সঙ্গে করে? মাথা নাড়ে সন্তু। আনেনি। তখন এক গাল হেসে বাবা বলে কি না… সে নিজেই লুকিয়ে নিয়ে এসেছে ছেলের বাঁশি। বিস্ময়ের পরিসীমা নেই সন্তুর! সারাক্ষণ বাঁশি নিয়ে পু পু করত বলে একদিন রেগে গিয়ে যে বাবা জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল সন্তুর আস্ত একখানা বাঁশি, পরে মা কোথা থেকে যেন আরো সুন্দর আর একটা যোগাড় করে দিয়েছিল, এ কি সেই বাবা!! মায়ের ঠাকুরের আসনে লুকোনো বাঁশিখানা কলকাতায় আসবার সময় ঠিক সঙ্গে নিয়ে এসেছে! এখন আবার সকলকে বড়াই করে বলছে, গাঁয়ের শ্যামা পূজোয় গেল বার যে ঝুমুর দল এয়েছেল সেখানকার বাঁশিয়ালা টাকা না পোষানোয় দল ছেড়ে রাগ দেখিয়ে গটমট চলে গেছল কত্তা, আর তখন বাঁশি বাজিয়ে গোটা তল্লাট মাৎ করে দিছিল আমার ব্যাটা… হাজার লোকের সুমুখে!
মোটেও হাজার না, মেরে কেটে দুই আড়াইশো হবে…বাবা সেটাকে বানিয়ে দিল হাজার। আর বাঁশি বাজানোর সময় বাবাকে তো সে চার সীমানায় দেখতে পায়নি, কোনও আড়ালে তার মানে লুকিয়ে ছিল তখন। নাকি কারো থেকে শুনে বলছে!
ভেরি গুড, আমরাও শুনবো…গলায় ঠাট্টা, আবাসনের মান্যি মানুষদের, ওরা মজা করছিল। সন্তু এগুলো বোঝে বড় বড় বাবু আর মেম সাহেবরা। একটুও ভালো লাগছে না বাবার এমন গায়ে পড়া নিকিরি ব্যাভার। কারোর শোনবার ছিটা মন নাই তাও বাবা নিলাজের মত বকছে।
ব্যস, বলামাত্র জমায়েতের জোড়া জোড়া চোখ সেঁটে গেল সন্তুর দিকে। ধুতি পাঞ্জাবি বাবু বলে, তাই তো, নাতি এসেছে দেখছি, আয় আয়, বাহ্, এ তো আধা রাজপুত্তুর রে সুদর্শন…
হাসাহাসি, দেখাদেখি, টানাটানি র মধ্যে পড়ে সন্তু গুটিয়ে একরত্তি শামুক। টপ টপ পেন্নাম ঠুকছে, মাথা না তুলেই, যে পা সামনে পাচ্ছে সেখানেই। বাবা অটোতে আগেই শিখিয়েছিল। কিন্তু চ্যাংড়া ছোঁড়া ছুঁড়িরা ওর চেয়ে বয়সে বড় হলেও ওদের পা ছোঁবে না সন্তু।
ঠাকুর এসে গেছে। ‘বল বল দুগ্গা এলো দুগ্গা এল’ গানে মাইক বাজছে। সঙ্গে বাবার ঢাক। সে এক দারুণ জমজমাট সন্ধ্যা। ঠাকুরের মণ্ডপের সামনে অনেক বড় চওড়া রাস্তা আর পাশের ছোট বাগানে লাল সবুজ প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। আবাসনের সবাই সেখানে বসে গল্প করছে। দারোয়ানরা বাবুদের হাতে প্লাস্টিকের চায়ের কাপ তুলে দিচ্ছে। সন্তু ও পেল চা বিস্কুট। একটু দূরে আর একটা মঞ্চ। চেকনাই কমলা কাপড়ের গায়ে হলুদ সিল্কের কুঁচি। খুব সুন্দর এ পাড়ায় নাকি প্রতি বছর পুজোয় নাচ গান নাটক হয়, এবারেও হবে। ওই মঞ্চটায়। এখন সানাই বাজছে। গমগম করছে পাড়া। ম ম করছে চাঁপা আর বকুল ফুলের গন্ধ। গেটের গায়ে ভরন্ত বকুল গাছটা ও দেখেছে।
হঠাৎ শোনে বাবা গায়ে পড়ে বাবুদের বলছে, জানেন কত্তা সন্তু কিন্তুক খুব ভালো ফুলুট বাজায় বাবুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে কৌতুকে হেসেছে। বলেছে, তাই বুঝি…কি রে সন্তু বাজাবি তো আমাদের প্রোগ্রামে? বাঁশি এনেছিস সঙ্গে করে? মাথা নাড়ে সন্তু। আনেনি। তখন এক গাল হেসে বাবা বলে কি না… সে নিজেই লুকিয়ে নিয়ে এসেছে ছেলের বাঁশি। বিস্ময়ের পরিসীমা নেই সন্তুর! সারাক্ষণ বাঁশি নিয়ে পু পু করত বলে একদিন রেগে গিয়ে যে বাবা জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল সন্তুর আস্ত একখানা বাঁশি, পরে মা কোথা থেকে যেন আরো সুন্দর আর একটা যোগাড় করে দিয়েছিল, এ কি সেই বাবা!! মায়ের ঠাকুরের আসনে লুকোনো বাঁশিখানা কলকাতায় আসবার সময় ঠিক সঙ্গে নিয়ে এসেছে! এখন আবার সকলকে বড়াই করে বলছে, গাঁয়ের শ্যামা পূজোয় গেল বার যে ঝুমুর দল এয়েছেল সেখানকার বাঁশিয়ালা টাকা না পোষানোয় দল ছেড়ে রাগ দেখিয়ে গটমট চলে গেছল কত্তা, আর তখন বাঁশি বাজিয়ে গোটা তল্লাট মাৎ করে দিছিল আমার ব্যাটা… হাজার লোকের সুমুখে!
মোটেও হাজার না, মেরে কেটে দুই আড়াইশো হবে…বাবা সেটাকে বানিয়ে দিল হাজার। আর বাঁশি বাজানোর সময় বাবাকে তো সে চার সীমানায় দেখতে পায়নি, কোনও আড়ালে তার মানে লুকিয়ে ছিল তখন। নাকি কারো থেকে শুনে বলছে!
ভেরি গুড, আমরাও শুনবো…গলায় ঠাট্টা, আবাসনের মান্যি মানুষদের, ওরা মজা করছিল। সন্তু এগুলো বোঝে বড় বড় বাবু আর মেম সাহেবরা। একটুও ভালো লাগছে না বাবার এমন গায়ে পড়া নিকিরি ব্যাভার। কারোর শোনবার ছিটা মন নাই তাও বাবা নিলাজের মত বকছে।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
একজনকে শুধু ভালো লেগেছে সন্তুর। সাধারণ জামা প্যান্ট আর মোটা চশমা পরা। ওখানকার লোকজন মাস্টারমশাই বলে ডাকছে। তিনি বললেন, সুদর্শন ভাই, ওকে কোনও বড় স্কুলে তালিম দেওয়ার জন্য ভর্তি কর, এই কোয়ালিটি তো সচরাচর দেখা যায় না। একটু দূরে পাজামা পাঞ্জাবির ঢ্যাঙা লোকটা সদলবলে গুলতানি মারছিল। সন্তু এক পলক চেয়েই বোঝে ওই ফোতোকাপ্তেনদের চোখে অবিশ্বাস। গোঁফে বাঁকা হাসি। লোকটা বলে, আজই হয়ে যাক না ওস্তাদের মার, আমরা শুনি এক আধ খানা মাস্টার পিস…হো হো হাসছে লোকটা, হাসছে মদ্দ জোয়ানদের দল। এমন চ্যালেঞ্জ গাঁয়ে প্রচুর নিয়েছে সন্তু। সাঁতারে, কাবাডিতে…। মল্লারপুরের সঙ্গে ফতেপুর, বুড়াশিবপুরের টুর্নামেন্টগুলায়। এই সব সময়ে ওর সাহস ধক ধক করে বেড়ে যায়। সন্তু তাকাল বাবার দিকে …উদ্বেগহীন। ঝলক ঝলক আলো পড়ে বাবার চোখ দুটো তখন মানিকের মতো জ্বলছে। মুখটা উত্তেজনায় লালচে। সন্তু ছোট হলেও বাবার ভয়টা টের পায়। ভাবছে পারবে তো তার ছেলে! আমতা আমতা করছে সুদর্শন। মিনতিতে বলছে, বাবু, সারাদিন টোটো করে ব্যাটা কেলান্ত, আজ মনে হয় দম পাবে না, কাল-পরশু যদি সময় দ্যান লিশ্চয় শোনাবে।
কিন্তু স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে বাঁশি হাতে নিয়েছিল সন্তু। বাজিয়েছিল মঞ্চের ঠিক মধ্যিখানে বসে। মায়ের উপহার দেওয়া বাঁশিখানার বুকে নিজের সবটুকু শ্বাস সুরে ডুবিয়ে। আবাসনের লোকদের শোনানোর জন্য নয়, আত্মশক্তি উজাড় করে শুধু শোধ করছিল পিতৃঋণ। প্রতিবছর দুগ্গা পুজোর সাতদিন আগে ঠাকমার সঙ্গে একই কাঁথার নিচে শুয়ে ঘরঘরে রেডিওখানায় ভোররাতে শোনা আগমনী গানের একখানা সুর। চোখ বুজে বাজাচ্ছিল সন্তু। সা রে মা পা ধা সা-র নিবিড় স্বরবিন্যাসে ধীরে ধীরে জাগ্রত হচ্ছিল দুর্গারাগ। রাগ রাগিণীর ও কী বা বোঝে? কেবল লাভপুর, গণপুর আর মেতলাগড়ের বাউলরা যখন মল্লারপুর আসে তখন তাদের কাছ থেকে কিছু কিছু তালিম নিয়েছে সে। সারাক্ষণ ওদের সঙ্গে লেগে থেকে থেকে। প্রশিক্ষণ বলতে এটুকুই। আর এক মনে শোনবার জোর। সেই জোরেই হিম লাগা শেষ আশ্বিনের সান্ধ্য বাতাসে ঘোর তুলেছিল কিশোরের বংশীধ্বনি। নাগরিক আকাশ শিউরে উঠেছিল সুরের কাঁপনে। সে কম্পন অলীক বাহনে ভর করে তারার বুটিওয়ালা দিগন্ত পথ ধরে উড়ে গেছিল কলকাতা ছেড়ে বহুদূর। কোন তেপান্তরে… সন্তুদের কবরমারি টিলা, বৈরাল মাঠ ছুঁয়ে নিরালা অশ্বত্থের শূন্য ফোকড় গলে এক্কেবারে মা ঠাকমার দীপ জ্বলা কুটিরের আধবোজা দরজায়। বাজানো শেষ হল একসময়। সন্তু চোখ খুলে দেখে রাশি রাশি নির্বাক শ্রোতা। ক্ষুদে মাঝারি বড় নির্বিশেষে। সবাই ওকে স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখছে। আশ্চর্য মগ্নতায় যেন দ্রবীভূত হয়ে গিয়েছে কলকাতার বিখ্যাত সুরভি আবাসন। বাজনার শেষে শুধু হাততালি আর হাততালি। মঞ্চ থেকে নামতেই সাবাস সাবাস বলে বুকে জড়িয়ে ধরল ওই বুড়ো বাবু। পুজোর প্রেসিডেন্ট উনি। এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল ওই ঢ্যাঙা বাবুটাও।
মাস্টারমশাই হাত রাখলেন মাথায়। সে ছোঁয়ায় আশীর্বাদ। কিন্তু সন্তুর কোনও দিকে মন নেই, ও শুধু দেখছে বাবাকে। দেখছে, সুদর্শন ঢাকির রোগা হয়ে আসা বুকখানা পুত্র গৌরবে ওই মস্ত ঢাকের চেয়েও যেন ফুলে উঠেছে দশগুণ। রাত দশটার মধ্যে ডিমের ঝোল ভাত খেয়ে মন্ডপের একপাশে মশারি টাঙিয়ে বাবার সঙ্গে খাটিয়ায় শুয়ে পড়েছিল সন্তু। বাবার বড্ড কাছে, সংকোচে একটু গুটিয়ে। খাটিয়া থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল দশভূজা দেবীর সপরিবার মূর্তি, পদতলে শায়িত মহাদেব। মহাদেবই তো মল্লেশ্বর। মৌলা থানের পুরোহিত বলেছিলেন… উনি লিঙ্গ শিবের দেহীরূপ। বিড়ি আর ঘাম মেশানো বাবার গন্ধ এখন সন্তুর ঘ্রাণ জুড়ে। গুটিসুটি সন্তু বাবার পাঁজর ওঠা বুকের কাছে লুকিয়ে কান পাতলেই যেন শুনতে পাবে ভিতরকার সেই কথা, বাবার মুখ দিয়ে সন্তুকে কক্ষনো না বলা সেই গহীন বাক্য, দেবতা মল্লেশ্বরের দোর ধরা ছেলে তুই, আমাদের সাত রাজার ধন এক মানিক। কিন্তু সুদর্শন ঢাকি মুখে কিছু বলেনি। একমাত্র পুত্রের ঝুমকো ঝুমকো কোঁচকানো চুলের মধ্যে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়েছে। অনেকক্ষণ। ঘুম পাড়াচ্ছে ছেলেকে, একরত্তি বেলার মতো। এখনই ঘুমিয়ে পড়বে সন্তু। বাবার পাশে। পরম সুখে। ওর জ্ঞানে এই প্রথম। — শেষ
কিন্তু স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে বাঁশি হাতে নিয়েছিল সন্তু। বাজিয়েছিল মঞ্চের ঠিক মধ্যিখানে বসে। মায়ের উপহার দেওয়া বাঁশিখানার বুকে নিজের সবটুকু শ্বাস সুরে ডুবিয়ে। আবাসনের লোকদের শোনানোর জন্য নয়, আত্মশক্তি উজাড় করে শুধু শোধ করছিল পিতৃঋণ। প্রতিবছর দুগ্গা পুজোর সাতদিন আগে ঠাকমার সঙ্গে একই কাঁথার নিচে শুয়ে ঘরঘরে রেডিওখানায় ভোররাতে শোনা আগমনী গানের একখানা সুর। চোখ বুজে বাজাচ্ছিল সন্তু। সা রে মা পা ধা সা-র নিবিড় স্বরবিন্যাসে ধীরে ধীরে জাগ্রত হচ্ছিল দুর্গারাগ। রাগ রাগিণীর ও কী বা বোঝে? কেবল লাভপুর, গণপুর আর মেতলাগড়ের বাউলরা যখন মল্লারপুর আসে তখন তাদের কাছ থেকে কিছু কিছু তালিম নিয়েছে সে। সারাক্ষণ ওদের সঙ্গে লেগে থেকে থেকে। প্রশিক্ষণ বলতে এটুকুই। আর এক মনে শোনবার জোর। সেই জোরেই হিম লাগা শেষ আশ্বিনের সান্ধ্য বাতাসে ঘোর তুলেছিল কিশোরের বংশীধ্বনি। নাগরিক আকাশ শিউরে উঠেছিল সুরের কাঁপনে। সে কম্পন অলীক বাহনে ভর করে তারার বুটিওয়ালা দিগন্ত পথ ধরে উড়ে গেছিল কলকাতা ছেড়ে বহুদূর। কোন তেপান্তরে… সন্তুদের কবরমারি টিলা, বৈরাল মাঠ ছুঁয়ে নিরালা অশ্বত্থের শূন্য ফোকড় গলে এক্কেবারে মা ঠাকমার দীপ জ্বলা কুটিরের আধবোজা দরজায়। বাজানো শেষ হল একসময়। সন্তু চোখ খুলে দেখে রাশি রাশি নির্বাক শ্রোতা। ক্ষুদে মাঝারি বড় নির্বিশেষে। সবাই ওকে স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখছে। আশ্চর্য মগ্নতায় যেন দ্রবীভূত হয়ে গিয়েছে কলকাতার বিখ্যাত সুরভি আবাসন। বাজনার শেষে শুধু হাততালি আর হাততালি। মঞ্চ থেকে নামতেই সাবাস সাবাস বলে বুকে জড়িয়ে ধরল ওই বুড়ো বাবু। পুজোর প্রেসিডেন্ট উনি। এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল ওই ঢ্যাঙা বাবুটাও।
মাস্টারমশাই হাত রাখলেন মাথায়। সে ছোঁয়ায় আশীর্বাদ। কিন্তু সন্তুর কোনও দিকে মন নেই, ও শুধু দেখছে বাবাকে। দেখছে, সুদর্শন ঢাকির রোগা হয়ে আসা বুকখানা পুত্র গৌরবে ওই মস্ত ঢাকের চেয়েও যেন ফুলে উঠেছে দশগুণ। রাত দশটার মধ্যে ডিমের ঝোল ভাত খেয়ে মন্ডপের একপাশে মশারি টাঙিয়ে বাবার সঙ্গে খাটিয়ায় শুয়ে পড়েছিল সন্তু। বাবার বড্ড কাছে, সংকোচে একটু গুটিয়ে। খাটিয়া থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল দশভূজা দেবীর সপরিবার মূর্তি, পদতলে শায়িত মহাদেব। মহাদেবই তো মল্লেশ্বর। মৌলা থানের পুরোহিত বলেছিলেন… উনি লিঙ্গ শিবের দেহীরূপ। বিড়ি আর ঘাম মেশানো বাবার গন্ধ এখন সন্তুর ঘ্রাণ জুড়ে। গুটিসুটি সন্তু বাবার পাঁজর ওঠা বুকের কাছে লুকিয়ে কান পাতলেই যেন শুনতে পাবে ভিতরকার সেই কথা, বাবার মুখ দিয়ে সন্তুকে কক্ষনো না বলা সেই গহীন বাক্য, দেবতা মল্লেশ্বরের দোর ধরা ছেলে তুই, আমাদের সাত রাজার ধন এক মানিক। কিন্তু সুদর্শন ঢাকি মুখে কিছু বলেনি। একমাত্র পুত্রের ঝুমকো ঝুমকো কোঁচকানো চুলের মধ্যে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়েছে। অনেকক্ষণ। ঘুম পাড়াচ্ছে ছেলেকে, একরত্তি বেলার মতো। এখনই ঘুমিয়ে পড়বে সন্তু। বাবার পাশে। পরম সুখে। ওর জ্ঞানে এই প্রথম। — শেষ
* জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজে কর্মরত। www.samayupdates.in এ জয়িতা দত্তর ধারাবাহিক উপন্যাস দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh) প্রকাশিত হয় প্রতি শুক্রবার।


















