সোমবার ৯ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
ফোনটা করে চুপচাপ এসে সোফায় বসল স্পন্দিতা। কী করবে ভেবে পেল না। বুঝতে পারছে না কী করা উচিত। শুধু প্রথমেই মনে হয়েছিল আকাশকে একটা ফোন করা দরকার। যতই সম্পর্ক না থাক, শত হোক ওর তো বাবা। প্রফেসর ব্যানার্জির ফোনে আকাশের নম্বরটা ছিল। বহু বছর আকাশ কিংবা তার মায়ের সঙ্গে প্রফেসর ব্যানার্জির কোনও সম্পর্ক নেই। তবু নম্বরটা কীভাবে তিনি পেয়েছিলেন, স্পন্দিতা জানে না। স্পন্দিতা প্রফেসর ব্যানার্জিকে চেনে মোটে তিন বছর, আর তারা একসঙ্গে থাকছে দেড় বছর প্রায়। ওঁর মুখ থেকেই শুনেছে আকাশ আর তার মায়ের কথা। আকাশের যখন বছর পাঁচেক বয়স, তখন থেকেই সে মায়ের সঙ্গে আলাদা থাকে। তার মা, মানে আনন্দ ব্যানার্জির স্ত্রী একটি কলেজে পড়ান। ডিভোর্স তাদের আজও হয়নি। মনে মনে হিসেব করে দেখেছে আকাশ তার থেকে তিন বছরের বড়।

নিজের পড়াশুনো আর গবেষণা থেকে কখনোসখনো মুখ তুলতেন তিনি। তখন হয়তো আধঘণ্টা গল্প করতেন। গল্প করতে করতেই হয়তো বা কখনও বলতেন এসব, দৈবাৎ, কদাচিৎ। আর যেদিন মাঝরাতে ল্যাবরেটরি থেকে বেডরুমে আসতেন, সেদিন অবশ্য গল্প নয়, সেদিন …। যদিও এরকম দিন এই দেড় বছরে হাতে গোনা কয়েকটিই এসেছে। বেশিরভাগ দিনই প্রফেসর ব্যানার্জি রাতে ল্যাবরেটরিতেই থেকে যেতেন। কাজ করতে করতে হয়তো শেষ রাতে সোফাটায় শুয়ে পড়তেন। সকালে কফি নিয়ে গিয়ে স্পন্দিতা দেখত মানুষটা শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম থেকে তুলত।

চোখ খুলে অবাক হয়ে স্পন্দিতার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন। তারপর দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরতেন ওকে। স্পন্দিতা মৃদু স্বরে বলত, ‘কফি তো ঠাণ্ডা হয়ে গেল!’ স্পন্দিতাকে ছেড়ে দিয়ে চটপট ব্রাশ করে মুখ-হাত ধুয়ে কফির কাপটা হাতে আবার ডুবে যেতেন নিজের রাজত্বে। স্পন্দিতাও চলে আসত কিচেনে। রান্নার মাসি ততক্ষণে এসে যেত। কী রান্না হবে তাকে বলে দিয়ে নিজের থিসিসের কাজকর্ম নিয়ে বসত। প্রফেসর ব্যানার্জির বাড়ি কলেজস্ট্রিটে, তাই রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ সামান্য পথ, মিনিট পনেরো, কখনও রিকশায় আরো কম সময়ে। স্পন্দিতা এখানে থাকতে শুরু করার আগে পর্যন্ত নাকি হোমসার্ভিস থেকে খাবার আসত। কখনো বা ইউনিভার্সিটি ক্যান্টিন-ই ছিল ভরসা।

প্রফেসর ব্যানার্জির ক্লাস বেশিরভাগ দিনই থাকত পরের দিকে, তাই সকালটা নিশ্চিন্ত মনে তিনি ল্যাবে কাজ করতেন। ক্লাসের সময় বুঝে স্পন্দিতা ল্যাব থেকে তাঁকে ডেকে আনত। স্নানে পাঠাত, সামনে বসিয়ে খাওয়াত। তারপর উনি ইউনিভার্সিটি বেরিয়ে গেলে আবার নিজের কাজ নিয়ে বসত। কোনও কোনও দিন ল্যাবের কাজ থাকলে স্পন্দিতাকেও ইউনিভার্সিটি যেতে হত। মাঝে মাঝে লাইব্রেরিও যেত।
সোফায় বসে বসে স্পন্দিতা আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল। খুব কি কষ্ট হচ্ছে ওর! নিজেই বুঝতে চেষ্টা করল। এখন ওকে দেখলে বোঝা যায় ওর গর্ভে বেড়ে উঠছে একটা প্রাণ। কষ্টের থেকেও বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছে। সবকিছু অন্ধকার লাগছে। মনে হচ্ছে, একফোঁটাও আলো নেই যেন। কী করবে, কোথায় যাবে, কী করে একটা নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে আনবে! কিচ্ছু ভেবে পেল না। এই বাড়িতে তো থাকতে পারে না সে। প্রফেসর আনন্দ ব্যানার্জির অবর্তমানে এই বাড়ি তাঁর স্ত্রী এবং ছেলের। যদিও তাদের নামটুকু ছাড়া আর কিছুই জানে না তাদের সম্বন্ধে স্পন্দিতা। তাদের কাছ থেকে প্রফেসর ব্যানার্জিকে সে কেড়েও নেয়নি।

প্রফেসর ব্যানার্জির জীবন থেকে তারা চলে যাবার অনেক…অনেকগুলো বছর পর স্পন্দিতা এসেছিল তাঁর জীবনে। তবু কোনও স্ত্রী কখনওই তার স্বামীর জীবনের দ্বিতীয় নারীকে মেনে নিতে পারে না। সেটাই স্বাভাবিক। সবই বোঝে স্পন্দিতা। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথও বন্ধ। বাড়ির সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করেই এখানে এসেছিল সে। বাবা-মা সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন তার সঙ্গে। তাদের কোনও দোষ দিতে পারে না। মেয়ে যদি নিজের থেকে ত্রিশ-বত্রিশ বছরের বড় কোনও পুরুষের সঙ্গে থাকতে চায়, কোন বাবা-মা-ই বা তা মেনে নিতে পারেন। সব জেনে,সব বুঝেও নিজেকে আটকাতে পারেনি।

এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে বসে কত কথাই মনে পড়ছে স্পন্দিতার। তিন বছর আগে অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করতে এসেছিল। প্রথম থেকেই সিনিয়রদের মুখে শুনেছিল প্রফেসর আনন্দ ব্যানার্জির কথা। সুপুরুষ কিন্তু আত্মভোলা। নিজের পড়াশুনো আর গবেষণার বাইরে আর কোনও জগৎ নেই তাঁর। আর কোনও প্রফেসরই নাকি তাঁর মতো করে পড়াতে পারেন না, বোঝাতে পারেন না। তাই একজন স্টুডেন্টও প্রফেসর ব্যানার্জির ক্লাস মিস করে না। এসব কথা সে সিনিয়রদের কাছ থেকেই শুনেছিল। আরও শুনেছিল, মানুষটা নাকি একেবারেই সংসারী নন। বাড়িতেও সবসময় নিজের ল্যাবরেটরিতেই পড়ে থাকেন। স্ত্রী-পুত্রের খেয়ালও সেভাবে রাখেননি কখনও। তাঁর এই সাংসারিক ঔদাসীন্যই নাকি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের একমাত্র কারণ। যদিও আইনত বিচ্ছেদ হয়নি। কিন্তু ছেলেকে নিয়ে তাঁর স্ত্রী বহুদিন পৃথক থাকেন। এসব স্পন্দিতা ইউনিভার্সটিতে ভর্তি হবার পরপরই শুনেছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের ক্লাসও নিতে এলেন প্রফেসর ব্যানার্জি। সত্যি অনবদ্য তাঁর ক্লাস। একটু একটু করে কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে গেল স্পন্দিতা। একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে সবে বেরিয়েছে, প্রফেসর ব্যানার্জিও বাড়ি যাচ্ছেন। সাহস করে কাছে গিয়ে স্পন্দিতা বলেছিল, ‘আপনার ল্যাবরেটরির কথা খুব শুনেছি স্যার।
আরও পড়ুন:

শারদীয়ার গল্প-৩: নতুন পৃথিবীর সন্ধানে

দশভুজা : আমার দুর্গা—বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান

একদিন নিজের চোখে দেখতে ইচ্ছে করে।’ হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন প্রফেসর ব্যানার্জি, ‘বেশ তো এখনই চলো, আমি তো বাড়িই যাচ্ছি।’ সেই শুরু। বাড়ি এসে স্পন্দিতা দেখেছিল একজন আত্মভোলা মানুষের বাড়ি কতটা অগোছালো হতে পারে! চতুর্দিক এলোমেলো। আস্তে করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আর কেউ থাকেন না স্যার, জিনিসপত্রগুলো একটু গুছিয়ে রাখার মতো?’ ‘কে থাকবে বলো! একটা মানুষ যদি সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে সবসময় ল্যাবেই পড়ে থাকে, তবে তার সঙ্গে আর কে থাকতে চায়!’ হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন প্রফেসর ব্যানার্জি। তারপর খানিকটা স্বগতোক্তির সুরে বলেছিলেন, ‘কিন্তু এটাই আমার জীবন, এখানেই আমার মুক্তি।’ বলতে বলতে ঢুকে গিয়েছিলেন ল্যাবরেটরিতে, তাঁর নিজের জগতে। স্পন্দিতা যতটা পেরেছিল সেদিন গুছিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অপরিষ্কৃত থাকার জন্য একদিনেই সবকিছু গুছিয়ে উঠতে পারেনি। সন্ধে হয়ে আসছিল। বাড়ি ফিরতে হবে।

ল্যাবে ঢুকে দেখেছিল একটা বইয়ের মধ্যে ডুবে আছেন প্রফেসর ব্যানার্জি। পাশে গিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনি তো কিছু খেলেন না স্যার? কিছু খাবেন?’ বই থেকে মুখ তুলে কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন স্পন্দিতার মুখের দিকে। তারপর হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে বলেছিলেন, ‘এখন তো কিছু খাই না! সে রাত্রে কিছু একটা আনিয়ে নেব।’ ‘সেই সকালে খেয়ে বেরিয়েছেন, আবার রাত্রে খাবেন? এতটা সময় খিদে পায় না আপনার?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল স্পন্দিতা। প্রফেসর ব্যানার্জি হাসতে হাসতে বললেন, ‘খেয়ে বেরোইনি তো, গিয়ে খেয়েছি।’ ‘মানে?’ কিছু না বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করে স্পন্দিতা। প্রফেসর ব্যানার্জি এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘গিয়ে খেয়েছি মানে ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে খেয়েছি। বেশিরভাগ দিনই তো ওখানেই খাই।’ কেমন একটা মায়া লাগলো স্পন্দিতার। বলল, ‘আচ্ছা, আমি একটু কফি করে আনছি।’ প্রফেসর ব্যানার্জি বললেন, ‘কফি যে করবে দুধ পাবে কোথায়? কফিও তো নেই।’ ‘আমি সব নিয়ে আসছি’ বলে আর না দাঁড়িয়ে স্পন্দিতা বাইরে এসে সামনের দোকান থেকে কফি, দুধ, চিনি, বিস্কিট কিনে কিচেনে গিয়ে তো থ। কফিটা করবে কী করে! কিছুই তো নেই। অনেক খুঁজে স্ল্যাবের নিচে থেকে বের করল একটা ইন্ডাকশন। প্লাগে লাগিয়ে সুইচ দিয়ে দেখল ঠিকই আছে। অনেক খুঁজে একটা স্টিলের প্যান বের করল। ভালো করে ধুয়ে দু-কাপ কফি বানালো। তারপর প্লেটে বিস্কিট সাজিয়ে নিয়ে গেল ল্যাবরেটরিতে। আস্তে করে ডাকল, ‘নিন স্যার, কফি নিন।’ হাসলেন প্রফেসর ব্যানার্জি। স্পন্দিতার মনে হয়েছিল একেবারে শিশুর মতো সরল সেই হাসি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৪: অনুসরণ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

সেদিন বাড়ি চলে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু মন পড়েছিল সেখানেই। বারবার মনে হচ্ছিল কী জানি রাত্রে কী খাবেন, আদৌ খাবেন কিনা। পরের দিনেও ক্লাস শেষ হবার পর স্পন্দিতা প্রফেসর ব্যানার্জির বাড়িতে না গিয়ে পারল না। সেদিনও কফি বানিয়েছিল। পাউরুটি কিনে নিয়ে গিয়েছিল, টোস্ট করে মাখন লাগিয়ে দিয়েছিল। খুব তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন। স্পন্দিতা বুঝল, খিদে ঠিকই পায়, কিন্তু খাবার বানিয়ে দেবার কেউ নেই। আরও বেশি করে মায়ায় জড়াল। এরপর থেকে ক্লাসের পর রোজই প্রায় যেতে লাগলো। অগোছালো, অপরিষ্কৃত ঘর-দোর এখন অনেকটাই পরিছন্ন। কয়েকদিন হল রাতের খাবারটাও করে রেখে আসে স্পন্দিতা। সাবজেক্টের কিছু বোঝার থাকলে সেটাও বুঝে নেয়। বোঝানোর ব্যাপারে, শেখানোর ব্যাপারে অতুলনীয় উনি। দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। ছয় মাসে বেশ কয়েকদিন এমনও হয়েছে বিকেলে গিয়ে স্পন্দিতা দেখেছ রাতের খাবার যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই পড়ে আছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছে ‘কাল তো আর ল্যাব ছেড়ে যেতেই পারিনি।’ কখনও বা শুনেছে, ‘এতো ক্লান্ত লাগছিল, আর ইচ্ছেই হল না খেতে।’ ‘আহা রে!’ বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠেছে স্পন্দিতার।

এলোমেলো ভাবে সব কিছু মনে পড়ছে। যেদিন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এখানেই থেকে যাবে, সেদিনের কথা মনে পড়ল। বৃষ্টি পড়ছিল অল্প অল্প। রাতের খাবার তৈরি করে চাপা দিয়ে স্পন্দিতা নিয়ে গিয়েছিল ল্যাবরেটরিতে। ‘রাতের খাবারটা এখানেই দিয়ে গেলাম। আর নিশ্চয়ই ভুল হবে না?’ কপট রাগ দেখিয়েছিল সে। তখন স্পন্দিতা এ বাড়িতে অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছে। প্রফেসর ব্যানার্জি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘কী জানি, হতেও পারে ভুল।’ রাগ করেছিল স্পন্দিতা। ‘তবে কী করলে মনে থাকবে আপনার?’ শিশুর সারল্যে প্রফেসর ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘থেকেই যাও না আমার কাছে। তুমি থাকলে ভালোলাগে।’ তা যে হয় না, তার বাড়ি যে এ প্রস্তাবে কিছুতেই রাজি হবে না, সে-সব ওঁকে বোঝানো বৃথা। কিন্তু তাঁর অনুরোধের মধ্যে এত গভীরতা ছিল মনটা দুলে উঠেছিল স্পন্দিতার। কিছু একটা করতেই হবে। এই টানাপোড়েন তারও আর ভালোলাগছিল না। বাড়িতে জানিয়েছিল। যথারীতি কেউ মেনে নেয়নি। দারুণ অশান্তি। বাবা জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর কখনও মুখ দেখবেন না। আপনজনদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে সেই থেকে স্পন্দিতা এখানে। সব মনে পড়ছে। কিন্তু বুঝতেই পারছে না এখন কী করবে সে, কী তার করা উচিত।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ

হঠাৎ বর্তমানে ফিরে আসে স্পন্দিতা। আকাশ জানিয়েছিল আসছে। কিন্তু সে তো প্রায় দু-ঘণ্টা হয়ে গেল। এখনও আসছে না তো! তবে কি আসবে না! কিন্তু সে বা তার মা না এলে কী করবে একা স্পন্দিতা! ভাবতে ভাবতেই দরজায় কলিংবেল। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই বছর আঠাশের এক যুবক। ভীষণ অবাক হল স্পন্দিতা। একবারে প্রফেসর ব্যানার্জির মুখ। আকাশ। ‘আমি আকাশ’, পরিচয় দিল সে। ‘বুঝেছি। আপনি অবিকল আপনার বাবার মতো। আসুন, ভিতরে আসুন।’ ‘সেটাই আমার ট্রাজেডি।’ ক্ষোভের সঙ্গে জানালো আকাশ। স্পন্দিতা মুখ নীচু করে বলল, ‘অমন করে বলবেন না। আমি জানি না আপনার মায়ের সঙ্গে কী নিয়ে ওঁর বিরোধ ছিল। কেন আপনারা ওঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন…’ আরও কিছু বলার আগেই আকাশ জানতে চাইল, ‘কেন, এতদিন ওঁর সঙ্গে আছেন, উনি কি কিছুই বলেননি আপনাকে?’ ‘আমি কখনও জানতে চাইনি। আর কারও সঙ্গে সাংসারিক কথাবার্তার গল্প সাজিয়ে বসার মানুষ উনি ছিলেন না। আপনি খুব ছোট ছিলেন তো তখন, তাই এসব আপনার বোঝার কথা নয়। আপনার মাকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন। আমার বিশ্বাস উনিও এই একই কথা বলবেন।’

এবার আকাশ অপেক্ষাকৃত মৃদু স্বরে বলল, ‘হুঁ, মা মাঝেমধ্যে বলছেন আমাকে। সংসারের কোনও ব্যাপারেই নাকি ওঁর আগ্রহ ছিল না। শুধু নিজের গবেষণা আর পড়াশুনো। আমরা যেদিন চলে গেলাম, সেদিনও নাকি মাকে সেভাবে বাধা দেবার চেষ্টা করেননি উনি।’ কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তারপর আবার স্পন্দিতার কাছে জানতে চাইল, ‘মানুষটা কি বদলে গিয়েছিল? আপনি কোনও আকর্ষণে রইলেন তাহলে?’ স্পন্দিতা কোনও উত্তর দিল না। আকাশ আবার বলতে শুরু করল, ‘দেখুন, থাকতাম না মানে এমন নয় যে ওঁর কোনও খবর আমরা পেতাম না। আর উনি নিজের জগতে এতটাই বিখ্যাত ছিলেন যে, না চাইলেও ওঁর খবরাখবর কানে ঠিকই এসে যেত। আমার বেশ কিছু বন্ধু এই ইউনিভার্সিটিতে ওঁর কাছে পড়াশুনা করেছে। ওদের কাছ থেকেই আমি আপনার কথা শুনেছি। প্রথম প্রথম রাগ হয়েছিল। মা বলেছিলেন পাঁচ-ছয় মাসের বেশি ওঁর সঙ্গে থাকা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। পাঁচ-ছয় মাস ছেড়ে এক বছর কেটে গেল, দু’বছর কেটে গেল। শুনলাম আপনি বাড়ির সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ওঁর সঙ্গেই থেকে গিয়েছেন। শুনলাম, ওঁর সবরকমের, সবধরনের খেয়াল রাখেন, যত্ন করেন। তাই জানতে চাইছি উনি কি বদলে গিয়েছিলেন?’ ‘আমি তো কোনও প্রত্যাশা নিয়ে আসিনি। প্রথম থেকেই চিনেছি একজন আত্মভোলা, নিজের জগতে ডুবে থাকা মানুষকে। যাঁর একটু যত্নের প্রয়োজন ছিল। কেমন একটা মায়া হতো। সেই মায়া থেকেই…’ কথাটা শেষ করে না স্পন্দিতা। গলাটা বুজে আসে কান্নায়। কিচ্ছুক্ষণ চুপচাপ দু-জনেই।

আকাশই নীরবতা ভাঙে। ‘ঠিক কী হয়েছিল ওঁর?’ ‘সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক’। ধরা গলায় বলে স্পন্দিতা। আকাশ আবার একটু উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘সম্ভবত কেন, আপনি ছিলেন না তখন পাশে?’ মাথা নাড়ল স্পন্দিতা। ‘বেশিরভাগ রাত উনি ল্যাবেই কাটাতেন। শেষ রাতের দিকে হয়তো পাশের সোফাটায় শুয়ে পড়তেন। সেই কারণেই আমি একটু বেলা করেই যেতাম কফি নিয়ে। আজও তাই গিয়েছিলাম। দেখলাম, সোফায় নয়, ল্যাবের সেন্টার টেবিলের ওপর মাথা রেখে উনি শুয়ে আছেন। ভাবলাম কাজ করতে করতেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন টেবিলে মাথা রেখে। কফির ট্রেটা টেবিলের উপর নামিয়ে ওঁকে ঘুম থেকে তুলতে আলতো করে ঠেলতেই চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে যান। আমি কী করব বুঝতে না পেরে ওঁর ফোন থেকে দু-একজন প্রফেসরকে ফোন করি, যাঁদের সঙ্গে ওঁর একটু-আধটু ঘনিষ্ঠতা ছিল। মিনিট কুড়ির মধ্যেই ওঁরা চলে আসেন, কিছু ছাত্রও আসে। ততক্ষণে আমি কোনওরকমে ওঁকে সোফাটার কাছে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কোনওরকম সার ছিল না। আমিও নার্সিংহোমে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সকলে বারণ করল। বলল প্রয়োজন নেই, ওঁরাই সব সামলে নেবেন। আমি তো জোর করতে পারি না, সে অধিকার আমার নেই। তাই রয়ে গেলাম। ঘণ্টা দুয়েক আগে ওঁর এক ছাত্র আমাকে ফোন করে জানালো খবরটা। ভাবলাম যাই হোক না কেন, যত দূরেই থাকুন না কেন, আপনি তো ওঁর সন্তান, তাই না জানিয়ে পারলাম না।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

কিন্তু আপনি নার্সিংহোমে না গিয়ে এখানে এলেন যে আগে?’ ‘নার্সিংহোমে মা গিয়েছেন। চার ঘণ্টার আগে তো বডি পাওয়া যাবে না।’ এটুকু বলে স্পন্দিতার মুখের দিকে তাকালো আকাশ। দেখল কেমন একটা ফ্যালফ্যালে চোখে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে সে। আকাশ জানতে চাইল, ‘আপনি কী করবেন এবার?’ ‘অ্যাঁ?’ চমকে তাকালো স্পন্দিতা আকাশের দিকে। কেমন একটা ঘোরলাগা ভাব। আকাশ আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি এবার বাড়ি ফিরে যাবেন?’ ম্লান হাসল স্পন্দিতা। ‘সে পথ কবেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’ ‘তাহলে?’ রীতিমতো দুশ্চিন্তা প্রকাশ পেল আকাশের গলায়। ‘জানি না। তবে এখানে থাকব না, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। যাঁর জন্য এখানে থাকা, তিনিই যখন নেই, তখন…’

কথাটা শেষ করে না স্পন্দিতা। একটু থেমে আবার বলে, ‘আমাকে শুধু একটা মাস সময় দেবেন? এরমধ্যে একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করে নিতে পারব।’ ‘কোথায় যাবেন?’ জানতে চায় আকাশ। ‘আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি আর একা নেই। যে আসছে তাকে একটা অনিশ্চিত জীবনে এনে ফেলবেন?’ মাথা নীচু করে বসে থাকে স্পন্দিতা। কী বলবে! বলার কী-ই বা আছে! এমন সময় ফোন বেজে উঠল আকাশের। ‘হ্যাঁ মা, বলো। ও আচ্ছা। ঠিক আছে, আমি এখুনি আসছি।’ ফোন ছেড়ে স্পন্দিতার দিকে সরাসরি তাকালো আকাশ। বললো, ‘মা জানালেন আর আধ ঘন্টার মধ্যে বডি ডিসচার্জ করবে। আমি আপনাকে জানিয়ে দেবো, আপনি সরাসরি শ্মশানে চলে আসবেন।’ ‘আমি যাব!’ ভীষণ অবাক হয়ে জানতে চায় স্পন্দিতা। অল্প হাসে আকাশ। ‘যাঁর জন্য নিজের গোটা জীবনটা জলাঞ্জলি দিলেন, তাঁকে শেষ দেখাটুকু দেখবেন না!’

একটু থেমে আকাশ এও বলে, ‘যে আসছে, তার কথাটাও একটু ভেবে দেখবেন। কী পরিচয় দেবেন তার? আপনি এখনও অত কেউকেটা হয়ে যাননি যে পিতৃপরিচয় ছাড়াই বড় করবেন সন্তানকে। কী পরিচয় দেবেন ওর?’ আকাশের গলায় বুঝি কিঞ্চিত ব্যঙ্গ মিশেছিল। ভবিষ্যতে সমাজের কাছ থেকে এমন অনেক ব্যঙ্গের কশাঘাত খেতে হবে জানে স্পন্দিতা। কিন্তু সেই মুহূর্তে আকাশের কথার ঝাঁঝটা বড্ড আঘাত করল ওকে। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। আকাশ কিন্তু নরম হল না। ঝাঁঝের সুরেই বলল, ‘দেখুন, কাঁদবেন পরে। একটা শিশুকে অসম্মানের জগতে এনে ফেলার কোনও অধিকার আপনার নেই।’ ‘কিন্তু কী করব বলুন তো আমি?’ কাঁদতে কাঁদতেই বলল স্পন্দিতা। ‘আপনি কী করবেন, সেটা আমি কী করে বলব! তবে আমি যেটুকু করতে পারি সেটাই জানিয়ে যাই আপনাকে। এরপর আপনার ইচ্ছা।’ এটুকু বলে আকাশ সোজা তাকালো স্পন্দিতার দিকে। স্পন্দিতা নির্বাক। ‘আপনি চাইলে আপনার আর আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দায়িত্ব আমি নিতে রাজি। যাই হোক না কেন, আমার আর ওর শরীরে তো একই রক্ত বইছে। এবার আপনি ভাবুন।’ খুব দ্রুত কথাগুলো বলে বেরিয়ে গেল আকাশ। স্পন্দিতা বসে পড়ল সোফায়। নিজের কানকেই বিশ্বাস হল না ওর। যা শুনলো, তা কি সত্যি! এও কি সম্ভব!
* শম্পা দত্ত (Sampa Dutta), শিক্ষিকা, সঞ্চালিকা ও বাচিক শিল্পী।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content