সোমবার ৯ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) ক্ষিতিমোহন সেন। (ডান দিকে) রবীন্দ্রনাথ ও নেপাল রায়।

ঠাকুর-পরিবারের এক ব্যতিক্রমী চরিত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ। দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র তিনি। রবীন্দ্রনাথের গান যিনি সযত্নে কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন, সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন, যাঁকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘গানের ভাণ্ডারী’ বলতেন, সেই দিনেন্দ্রনাথের পিতৃদেব তিনি। দ্বিপেন্দ্রনাথের ছিল বিলাস-বৈভবের জীবন। পানাসক্তি ছিল তাঁর। সুরাপানের গ্লাসেও এই বিলাস-বৈভব গোপন থাকেনি। শান্তিনিকেতনে থেকে অবনীন্দ্রনাথের কাছে ছবি আঁকা শিখেছিলেন শিল্পী মুকুল দে। তাঁর স্মৃতিকথায় আছে, দ্বিপেন্দ্রনাথের মদ খাওয়ার গ্লাস আসত বিলেত থেকে। খুবই দামি কাঁচের গ্লাস। এই গ্লাস ভাঙলে গ্লাসের তলাগুলো নিয়ে মুকুল দে লেন্স বানাতেন।

রবীন্দ্রনাথের থেকে তাঁর এই ভ্রাতুষ্পুত্র সামান্যই ছোট ছিলেন। অঙ্কের হিসেবে এক বছর দু-মাসের। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষারম্ভ যে স্কুলে, সেই স্কুলেই দ্বিপেন্দ্রনাথের বিদ্যালয়-জীবনের সূচনা। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও পড়েছেন নর্মাল স্কুলে। পড়েছেন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে এবং সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। মেট্রোপলিটনে পড়ার সময় নরেন্দ্রনাথ, মানে স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন তাঁর সহপাঠী। সেই সূত্রে নরেন্দ্রনাথ এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় করতে।
দ্বিপেন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠ দায়িত্বপরায়ণ। এক সময় তিনি ঠাকুর-পরিবারের জমিদারির হিসেবনিকেশ দেখতেন। মহর্ষির জ্যেষ্ঠ পৌত্র তিনি। তাঁকে মহর্ষি খুবই স্নেহ করতেন। শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন মহর্ষি। দ্বিপেন্দ্রনাথ ছিলেন অন্যতম ট্রাস্টি। মহর্ষি দ্বিপেন্দ্রনাথের জন্য পাঁচশো টাকা মাসোহারা বরাদ্দ করেছিলেন। পিতা দ্বিজেন্দ্রনাথ দিতেন আড়াইশো টাকা মাসোহারা। এছাড়াও ছিল জমিদারি-আয়। সেকালের বিচারে সেই টাকার অঙ্কটি খুব কম নয়। তাই দ্বিপেন্দ্রনাথের দৈনন্দিন জীবনে কখনও কখনও বিলাসিতার বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যেত। একটানা কুড়ি বছর তিনি শান্তিনিকেতনে বসবাস করেছেন। শান্তিনিকেতনেই তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তিনি প্রবল অসুস্থ, মরণাপন্ন। পুত্র দিনেন্দ্রনাথ কলকাতায়, ‘শারদোৎসব’ নাটকে অভিনয়ের জন্য। পিতার অসুস্থতার খবর শুনে দ্রুত তিনি চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। ঘোষিত সময়সূচি মেনে যথারীতি শারদোৎসব অভিনীত হয়। দিনেন্দ্রনাথের জন্য নির্ধারিত ‘ঠাকুরদাদা’র চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। একেবারে বিনা রিহার্সালে অভিনয় করছিলেন তিনি, অভিনয় দেখে দর্শকদের তা অবশ্য মনে হয়নি।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২০: রবীন্দ্রনাথ আশ্রমের একমাত্র তাঁকেই প্রণাম করতেন

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৪: ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ সাহিত্য সংস্কৃতির অকৃপণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন

দ্বিপেন্দ্রনাথ আক্রান্ত হয়েছিলেন হৃদরোগে। তখন তাঁর বয়স ষাট বছর। পিতৃদেব তখনো জীবিত। বৃদ্ধ দ্বিজেন্দ্রনাথের চোখের সামনে পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়েছিল। আশ্রম-বিদ্যালয়ের সঙ্গে দ্বিপেন্দ্রনাথের আত্মিক-বন্ধন স্থাপিত হয়েছিল। ছাত্রদের সঙ্গে, শিক্ষকদের সঙ্গে বড় প্রাণময় সম্পর্ক ছিল। আশ্রমের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। শুধু আশ্রমের মানুষজন নন, স্থানীয় যে কোনো মানুষ বিপদে পড়লেই ছুটে যেতেন তিনি। স্থানীয় সাধারণ মানুষ দ্বিপেন্দ্রনাথকে ভিতর থেকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। দ্বিপেন্দ্রনাথের মৃত্যু শান্তিনিকেতনে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৪: ভুবন চিল ও শঙ্খচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

আশ্রমের পরিবেশে,ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কে যে মাধুর্য, প্রাণময়তা, তা রক্ষা করার ক্ষেত্রে দ্বিপেন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। আশ্রম-বিদ্যালয়ে প্রথম-পর্বের ছাত্র ছিলেন সুধাকান্ত রায়চৌধুরী। আশ্রমের সঙ্গে ছাত্রজীবনে তৈরি হওয়া তাঁর সম্পর্ক কখনও বিঘ্নিত হয়নি। বলা যায়, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। পরবর্তীকালে আশ্রমের বেতনপ্রাপ্ত কর্মীও হয়েছিলেন। ছাত্রাবাস দেখাশোনা করতেন। সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর একটি লেখায় দ্বিপেন্দ্রনাথের প্রাণোচ্ছল-রূপের খণ্ডাংশ ধরা আছে। জানা যায়, কতখানি মজলিশি মানুষ ছিলেন। ছিলেন বন্ধুবৎসল ও মিশুকে। আশ্রমের খুঁটিনাটি খবর, বিভিন্ন সংবাদ মজলিশে বসে, চারপাশে আসন গ্রহণ করা আশ্রমবাসীদের থেকে অনায়াস দক্ষতায় সংগ্রহ করতেন। এই মজলিশে ছাত্র-শিক্ষকরাও যোগ দিতেন। কোনও অভিযোগ থাকলে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করতেন দ্বিপেন্দ্রনাথ।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) মুকুল দে। (ডান দিকে) দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

দ্বিপেন্দ্রনাথের চলায়, কথা বলায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভিন্নতর আভিজাত্য ছিল। এন্ডরুজ পিয়ারসন ঠাট্টা করেই তাঁকে বলতেন,’মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন’। উত্তরের বারান্দায় লম্বা কৌচে হেলান দিয়ে বসতেন তিনি। বসার পর ‘ফরাসি গড়গড়ায় সেকেলে কায়দায় টান’ দিয়ে বসত মজলিশি-আসর। দ্বিপেন্দ্রনাথের সহৃদয়তারও তুলনা হয় না। কেউ অসুস্থ হয়েছে খবর পেলে কখনও নিজে উপস্থিত হতেন, কখনও সহচর বালেশ্বরকে পাঠাতেন। রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর ফলমূল ও পথ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করতে ভুলতেন না। সুধাকান্ত রায়চৌধুরী এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘এমনি করিয়া তিনি সামাজিকতা রক্ষা করিতেন, অথচ সে দানের ভিতর, সেই সব কর্তব্যের ভিতর, ঘুণাক্ষরেও দরিদ্রের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ কিংবা কৃপাদৃষ্টি উঁকি দিত না। তিনি সেকালের প্রথায় এমন হৃদ্যতার সহিত সকলের সঙ্গে মিশিতেন…।’
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৩: পরেশের পরশপাথর

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

সরসতায় উজ্জ্বল, সরসতায় ভরপুর এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব দ্বিপেন্দ্রনাথ। আশ্রমের ছাত্ররা প্রায়শই তাঁর কাছে এসে রকমারি দাবি করত। বলত, তাদের ভোজ দিতে হবে, আবার কখনও বলত খেলাধুলার জন্য এটা-সেটা প্রয়োজন, তাই চাঁদা চাই, টাকা চাই।

শুনে তো দ্বিপেন্দ্রনাথ হইহই করে উঠতেন। বকাঝকা, হুংকার দিলেও তার মধ্যে স্নেহের স্পর্শ রয়ে যেত। হাঁকাহাঁকি করে বলতেন, ‘আর পারি না রবিকাকার কাছে নালিশ করতে হবে।’ দুই সহচর বালেশ্বর ও শ্যামকে তখুনি চিৎকার করে ডাকতেন। ডেকে বলতেন, নেপালবাবু, ক্ষিতিমোহনবাবু বা জগদানন্দ রায়কে ডাকার জন্য। কেন ডাকতে হবে এই শিক্ষকদের, ডাকতে হবে ‘দুষ্ট ছেলেদের শায়েস্তা’ করার জন্য। এইসব বলেই থামতেন না তিনি, রবীন্দ্রনাথের কাছে নালিশ করার কথা বলেও ছেলেদের ভয় দেখাতেন । বলতেন, ‘বেশি যদি বাড়াবাড়ি কর, রবিকাকাকে লিখে জানাব।’
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ

এসব শুনে ছেলেরা ভয় পেয়ে তখনকার মতো ছুটে পালাত। তলব পেয়ে মাস্টারমশায়রা এলে দ্বিপেন্দ্রনাথ রসিকতার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করতেন, ভালো হচ্ছে না মশায়, আমি কি এমন অপরাধ করেছি যে, আমাকে তাড়ানোর জন্য আপনাদের এরকম একটা বদ্ধপরিকর ব্যবস্থা?’

এটুকু বলেই থামতেন না, বলতেন, ‘রবিকাকাকে নিশ্চয়ই নালিশ করব, বলব এইসব ছাত্র লেলিয়ে দেওয়ার দল এইসব মাস্টারমশাশয়দের একটা কিছু শাস্তির ব্যবস্থা করতে।’

এমন কথা শোনার জন্য মাস্টারমশায়রা আসেননি। তাঁরা তো হতবাক। কী হয়েছে জানতে চাইলেন। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দ্বিপেন্দ্রনাথ বলতে শুরু করলেন, ‘সর্বনাশ, মহা সর্বনাশ! ছেলেরা দল বেঁধে এসে জেদ করে বললে—আপনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যান, এত অপমান কি সহ্য হয়; বলে কিনা সকলে, রান্নাঘরে আজ ভোজের আয়োজন করতে হবে। বলুন দেখি মশায়, এইরকম করে দফায় দফায় যদি আমাকে দিয়ে ভোজ আদায় করে; তাহলে আমি আশ্রমে টিকি কি করে?’
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) জগদানন্দ রায়। (ডান দিকে) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি: সংগৃহীত।

দ্বিপেন্দ্রনাথ আগত শিক্ষকদের জানালেন, কোনওরকমে শিক্ষকদের নাম করে ভয় দেখিয়ে ছাত্রদের তাড়িয়েছেন। তিনি জানেন আবার তারা আসবে। আরও বললেন, ছাত্রদের মধ্যে একজনের নাম কিরণ দাস। শিক্ষকদের বললেন, কিরণকে পাঠিয়ে দিতে। কেন পাঠাতে হবে, তারও ব্যাখ্যা দিলেন। বললেন, ‘পাঠিয়ে দিন আমার কাছে, ওর সঙ্গে পরামর্শ করা যাক। ভোজই যদি দিতে হয়, তাহলে ভালো ভোজই হোক; টাকাও দেব আর বদনামও নেব, তা হবে না। ওরা কি কি খেতে চায় জেনে, আমি নিজে সব ব্যবস্থা করব।’

এমনই দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন দ্বিপেন্দ্রনাথ। কেউ শান্তিনিকেতন-আশ্রমে গেলে আদরযত্ন করতেন, স্বীকৃতি দিতেন। আশ্রমের সকলেরই তাঁকে ঘিরে মুগ্ধতা ছিল। এই সজীব, সপ্রাণ মজলিশি-মানুষটি সম্পর্কে সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর মনে হয়েছিল, ‘তিনি ধনীর সেকেলে ‘দিলদরিয়া রূপের প্রতীক।’
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content