
ছবি: প্রতীকী।
“মহাপুরুষের জন্মতিথির দিন স্মৃতিচারণ, ধ্যান ও প্রার্থনাতে আমাদের যত বেশি মন দেওয়া উচিত, তত বেশি উচিত হবে বাহ্য বিক্ষেপ বর্জন করা। ওই দিনগুলি যেন কেবল বাহ্য উৎসব ও সামাজিক আহ্লাদের দিন না হয়ে দাঁড়ায়। ওই দিনকে নিজে অন্তরতম আত্মায় প্রবেশের দিনও হতে হবে, যেখানে আমারা তাঁদের সংস্পর্শে আসতে পারি, যদি তাঁদের চেতনাস্তরে পৌঁছাবার সামর্থ্য আমাদের থাকে।”
বিশেষ দিনগুলিতে যদি মনকে শান্ত করে সেই মহাপুরুষের লীলা, কর্ম বা জীবন প্রণালীর চিন্তায় জড়িয়ে মন ভরিয়ে ফেলা যায়, তবে শান্তি আনন্দে ভরে ওঠে। মনুষ্য জীবনের চরম প্রাপ্তি তৎগত হয়ে থাকা। স্মরণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের সমার্থক রূপ রেখা তৈরি হয়। নতুন আলোকপথে জীবাত্মার গমন হয়ে থাকে। মৃত্যু কোনও জীবনের শেষ নয়, পরন্তু এই শরীরের শেষ বিন্দু। জীবন অনন্ত অভিজ্ঞতার ও সংস্কারের সাক্ষী। জীবাত্মার উত্তরণের নতুন সুযোগ।
আরও পড়ুন:

অনন্ত এক পথ পরিক্রমা, পর্ব-৮০: আধ্যাত্মিক জীবন গঠনের মূল কথা— সত্যের ধারণা ও পালন

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে
পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে, মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্বে উত্তরণ। অনুধ্যানের মাধ্যমে উত্তরণের পথ খুঁজে পায়। জগৎ সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে আবার স্থুল থেকে সূক্ষ্মে পর্যবসিত হয়। শক্তির পরিক্রমা। শক্তি অক্ষয়, চির শাশ্বত। আধ্যাত্মিকতার ক্ষুধা মাধ্যমে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। খাদ্য যেমন শারীরিক ক্ষুধা কে ক্ষনিকের জন্য নিবৃত্তি করে, পুনরায় খাদ্য গ্রহণে প্রবৃত্ত করে, তেমনি মনে আধ্যাত্মিক ক্ষুধা ঈশ্বর লাভে সাহায্য করে, যতক্ষণ না পূর্ণ নিবৃত্তি হয়।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৬: শান্তিনিকেতনে কবির প্রথম জন্মোৎসব

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৯: বসন্ত-বৌরি
মহাপুরুষের ধ্যান-ধারণা দ্বারা আমরা আধ্যাত্মিক ক্ষুধা বাড়াতে পারি। তাঁরা আজও বর্তমান, চৈতন্য ও শাশ্বত প্রকাশের দ্বারা। যারা অপকট, আন্তরিক ভাবে তাদের চেতনার স্তরেকে উন্নীত করে সেই সব মহাপুরুষের ধ্যান ও ধারণা করার সমর্থ্য লাভ করে, তারা তাঁদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারবে। শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, শংকর, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ সেই সকল মহাপুরুষ, যাঁদের ধ্যান-ধারণায় মানুষ ভগবান হয়ে ওঠে। শুধু দরকার সেই শক্তিকে পরিচালিত করার মতো সুপরিবাহী মন।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৮: মা সারদার জন্মতিথিতে তাঁর অপূর্ব অমানবীয় রূপ ফুটে উঠল

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৭: আলাস্কায় এমন অপরূপ দৃশ্যও দেখা যায়, যেখানে পাহাড়-সমুদ্র-হিমবাহ একসঙ্গে বিরাজমান
আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা মানুষের সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যশীলতা বাড়িয়ে গোঁড়ামি থেকে দূরে নিয়ে যায়। অনভিজ্ঞতার ফলে কোনও মতবাদকে অন্ধের মতো আঁকড়ে ধরে আর হতাশার অতলে তলিয়ে যায়, মনের গভীরে থাকা সংশয়কে জয় করতে পারে না। প্রকৃত আধ্যাত্মিক ব্যক্তি ধৈর্যশীল ও অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। অপ্রীতিকর ও প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়ে যে নিজের ধৈর্য হারায় না। যে প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাধক, সে বিচারহীন মানসিকতার দ্বারা অন্যের সম্বন্ধে ভুল ধারণা উৎপাদন করে না। মানসিক দৃঢ়তার অভাবে সে যেমন নিজের সাধন ভজন থেকে দূরে যায়, তেমন অস্থিরতা তার জীবনকে অনবরত প্রতিকূলতার মধ্যে নিয়ে যায়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৮: রক্তে ভেজা মাটিতে গড়ে ওঠে সত্যিকার প্রাপ্তি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৪: জীবনের নশ্বরতা ও আত্মানুসন্ধান বিষয়ে রামের উপলব্ধি যেন এক চিরন্তন সত্যের উন্মোচন
সংস্কার ও কর্ম সর্বদাই যে দায়ী হতে পারে তা নয়। সে কারণে সর্বদা স্বচ্ছ থাকা উচিত। অকারণে মানসিক সন্তুলনকে নষ্ট করে কর্মের চাহিদা উৎপাদন করার প্রয়োজন নাই। কর্ম আমাদের লক্ষ্য নয়। কিন্তু কর্মের মাধ্যমে নির্মল ও নিঃস্পৃহ হওয়ায় আমাদের লক্ষ্য। কেউ যদি মনে করে সর্বদা কর্মের অনুকূল বাতাবরণ সব সময় পাবে সে ভুল, কর্মকে অনুকূল করে বাতাবরণ শান্ত রাখায় হবে ধৈর্যশীল মনের পরিচায়ক।—চলবে।
* অনন্ত এক পথ পরিক্রমা (Ananta Ek Patha Parikrama) : স্বামী তত্ত্বাতীতানন্দ (Swami Tattwatitananda), সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মিশন, ফিজি (Fiji)।


















