
ছবি: প্রতীকী।
কাকোলূকীযম্
যেভাবে একজন অভিজ্ঞলোক ঘাটে নেমে গভীর জলের মধ্যেও তল খুঁজে পান তেমনই ভাবে গুপ্তচরেরাও মন্ত্রী-প্রভৃতি আঠেরো প্রকার তীর্থদের মধ্যে নিজের একটা জায়গা করে নিয়ে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে শত্রুরাজার কাজকর্ম সম্পর্কে খবর জোগাড় করে আনতে পারেন।
বৃদ্ধমন্ত্রী স্থিরজীবীর কথা শুনে মেঘবর্ণ বললেন, হে তাত! দয়া করে বলবেন আমাদের এই কাক-সমাজের সঙ্গে উলূক-সমাজের এইরকম প্রাণঘাতী শত্রুতার কারণ কী?
বৃদ্ধমন্ত্রী মেঘবর্ণ তখন বলতে শুরু করলেন, ওহে বত্স! শোনো তবে—
০১: কাক আর পেঁচাদের শত্রুতার কথা
কোনও একসময় হাঁস, টিয়া, বক, কোকিল, চাতক, পেঁচা, ময়ূর, পায়রা, মুরগি প্রভৃতি সকল পাখিরা একত্রিত হয়ে শোকাকুল চিত্তে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে শুরু করল। তাদের বক্তব্য হল, আমাদের রাজা তো বিনতার পুত্র বৈনতেয় গরুড় আর সে নারায়ণের এমনই ভক্ত যে সারাটা সময় তাঁর সেবাতেই জীবন উত্সর্গ করে রেখেছেন। আমাদের কোনও খোঁজ-খবরই তিনি নেন না। উনি কেবল নামেই আমাদের রাজা। বিপদের সময় কোনো কাজেই তাকে পাওয়া যায় না, এমনকি এই যে আমরা রোজ রোজ শিকারীর জালে আটকে পড়ছি, কই আমাদের রক্ষা করতে তিনি তো কখনও এগিয়ে আসেন না। তাই এইরকম নামমাত্র রাজাকে দিয়ে হবেটা কী?— “তৎ কিং তেন বৃথাস্বামিনা যো লুব্ধকপাশৈঃ নিত্যং নিবধ্যমানানাং ন রক্ষাং বিধত্তে?”
লোকে বলে, শত্রুর ভয়ে সব সময় নিপীড়িত এবং ভীত হয়ে থাকা নিজের প্রজাদের যে রাজা রক্ষা করেন না সে আসলে সাক্ষাৎ যম, কেবল রাজা সেজে আছে মাত্র। রাজার কাজ হলো তাঁর প্রজাদেরকে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া বা বিপদের সময় তাদের সঠিক পথেচালনা করা। কিন্তু একজন রাজা যদি তাঁর সেই প্রাথমিক কাজটুকুকেই উপেক্ষা করেন তাহলে ঝড়ের সময় সমুদ্রতরঙ্গের মধ্যে নাবিকহীন নৌকা যেমন দিশাহারা হয়ে যায় এবং পরিশেষে অগাধজলে ডুবে যায় রাজাহীন প্রজাদেরও ঠিক তেমনই অবস্থা হয়।শাস্ত্রে বলা হয়েছে—
ষডিমান্ পুরুষো জহ্যাদ্ভিন্নাং নাবমিবার্ণবে।
অপ্রবক্তারমাচার্যমনধীযানমৃত্বিজম্।।
অরিক্ষিতারং রাজানং ভার্যাঞ্চাপ্রিযবাদিনীম্।
গ্রামকামঞ্চ গোপালং বনকামঞ্চ নাপিতম্।। (কাকোলূকীযম্ ৭৩-৭৪)

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮১: সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য চালাতে গেলে নিজের লোকেদের পিছনেও চর নিয়োগ করতে হয়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৩: জলপিপি
[০১] ভালো পড়াতে পারেন না এমন আচার্য। এই রকম আচার্যের কাছে পড়া মানে কেবল সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়; [০২] প্রত্যেকদিন নিজের অধীতবিদ্যাচর্চা করেন না এমন স্বাধ্যায়হীন ঋত্বিক্। চর্চার অভাবে যেকোনও বিদ্যাই বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে যে ঋত্বিক তাঁর অধীতবিদ্যা চর্চা করেন না তিনি ক্রমশ কর্মকাণ্ডের প্রক্রিয়া ভুলে যেতে থাকেন। ফলে তাঁর মতো স্বাধ্যায়হীন ঋত্বিককে যজ্ঞপ্রক্রিয়ার ভার দিলে যজ্ঞীয়কর্মে অঙ্গহানির সম্ভাবনা ঘটতে পারে যার ফলে যজমানের হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়; তেমনই [০৩] যে রাজা তাঁর প্রজদের রক্ষা করে না; [০৪] যে পত্নী কটূভাষিণী—তাঁর পতিকে যে সবসময় তীব্রভাষায় সমালোচনা করে; [০৫] গ্রাম বা লোকালয়ে থাকতে ইচ্ছুক গোয়ালা এবং [০৬] বনে থাকতে ইচ্ছুক নাপিত। নাপিতের প্রয়োজন লোকালয়, কারণ যেখানে লোক থাকে সেখানেই সে পরামানিকের কাজ করতে পারে। তেমনই ভাবে লোকালয়ে আবার গোচারণ করানো যায় না। তার জন্য চাই নির্জন স্থান বনভূমি। তাই লোকালয়ে থাকতে ইচ্ছুক গোপালক রাখাল বা লোকালয় ছেড়ে বনে পালাতে ইচ্ছুক নাপিতকে দিয়ে কোনও কাজ হয় না। তাদেরকে ত্যাগ করাই শ্রেয়। সুতরাং সবদিক থেকে বিচার করে অন্য কাউকে পাখীদের রাজা বানানোই ঠিক হবে।

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৭: মহাভারতের বিচিত্র সব গল্পকথায় রয়েছে মানবজীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ ও দ্বন্দ্বময়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৯: আশ্রমের ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজলে কুইনাইন খাওয়ানো হত
তারপর দেশের নানা প্রান্তের নানা নদীর থেকে আনা হল ঘড়া ঘড়াপবিত্র জল। অষ্টোত্তর মূলিকা মানে একশো আট জড়িবুটি সংগ্রহ করে সিংহাসন প্রতিষ্ঠা করে সেখানে সাত-দ্বীপ, সাত-সমুদ্র এবং সাত-পর্বতমালা-সহ পৃথিবীমণ্ডলের একটি সুন্দর ছবি এঁকে সেখানে বিছিয়ে দেওয়া হলোপ্রশস্ত ব্যাঘ্র। তারপর চারিদিক সুসজ্জিত করা হলোজলপূর্ণ সুবর্ণ কলসে। তেলের প্রদীপজ্বলে উঠলো, বাজনা বাজলো। দর্পণের সঙ্গে আরও না না মাঙ্গলিক দ্রব্যের সমাহারে দেবভূমির মতো সেজে উঠল বনের প্রান্ত। ব্রাহ্মণের মুখ থেকে উচ্চারিত হল বেদমন্ত্রের ধ্বনি। চারণরা স্তুতিগান করতে লাগলো আর গান গেয়ে যুবতীরাও নৃত্য শুরু করল। প্রধান মহিষী কৃকালিকার সঙ্গে উলূক যখন সিংহাসনে বসবার উদ্যোগ করছেন ঠিক সেই সময়েই কোথা থেকে একটা কাক এসে উপস্থিত হল। সে এসে এইসব দেখে চিন্তা করল, এই সব পাখিরা একসঙ্গে মিলে এখানে করছেটা কী? কোনও উত্সবের আয়োজন করা হল নাকি?

বিধানে বেদ-আয়ুর্বেদ, ফেসিয়াল প্যারালাইসিস বা বেলস পলসি রোগের প্রতিকারে আয়ুর্বেদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৯: নীল হ্রদের পারে, নীল আকাশের নিচে লাল রঙের হেলিকপ্টার অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল
এইসব দেখে কাক তখন সেই পাখীদের কাছে গিয়ে বলল, মহাশয় বলতে পারেন সকল পাখিরা কেন এখানে মিলিত হয়েছে? আর এখানে এখন কোনও উত্সবের আয়োজন চলছে?
পাখিরা বললে, হে ভদ্র! পাখিদের কোনও রাজা নেই। তাই পাখিরা আমরা সকলে মিলে এই প্রাজ্ঞ পেঁচাটিকে রাজপদে নিযুক্ত করবো বলে স্থির করেছি। আপনি যথার্থ সময়ে এসেছেন, তাই আপনারও যদি কোনো পরামর্শ দেওয়ার থাকে বলতে পারেন।
সেই কাকটি তখন খুব হেসে বলল, আমার মনে হয় না আপনাদের এই সিদ্ধান্তটা খুব একটা ঠিক হচ্ছে। কারণ, ময়ূর, হাঁস, কোকিল, চক্রবাক, সারস ইত্যাদি এতো সব প্রধান-প্রধান পাখিরা থাকতে দিনের বেলায় চোখে দেখতে পায় না এই রকম ভয়ানক মুখযুক্ত পেঁচাকে রাজপদে অভিষিক্ত করার কোনও মানেই হয় না। তাই আপনাদের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমার সম্মতি নেই। কারণ স্বাভাবিক অবস্থাতেই এর নাক বেঁকা, চোখ কোটরে ঢোকা, মুখটাও কঠোর। দেখলেই মনে হয় রেগে আছেন। সুতরাং যদি এ সত্যিই রাগে তাহলে কেমন ভয়ানক দর্শন হবেন ভেবে দেখুন।

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২: “জনৈক গণশত্রুর জবানবন্দি”



















