
ছবি: প্রতীকী।
‘গয়না’ এই শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই খুব পরিচিত। গয়না বা অলঙ্কারের ব্যবহার মানুষ বহু কাল ধরে করে আসছে। চোখ ধাঁধানো সোনা রুপো হিরের গয়না রয়েছে যেমন অনেক দামি, তেমনি অনেক কম খরচেও অনেক সুন্দর সুন্দর পাওয়া যায়। অসমীয়া সমাজে মেখলা চাদরের সঙ্গে মহিলারা গয়ানা পরেন। এই সব গয়নার নকশা আমাদের পরিচিত গয়না থেকে অনেকটাই আলাদা হয়। অসমীয়া গলার মালা এবং কানের দুল ঢোল, পেপার মতো ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের আকারের ছোট ছোট প্রতীকী কারুকার্য দেখতে পাওয়া যায়। এই গয়না মূলত সোনা-রূপা দিয়েই তৈরি করা হয়।
এই সব গয়নার এক নিজস্ব গঠনশৈলী রয়েছে। তার কারুকার্যও বেশ অন্য রকম। অসমীয়া জাতির বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অলঙ্কার পরার প্রচলন রয়েছে। অসমীয়া সমাজে প্রচলিত গয়নাগুলির নকশায় ফুল, পাখি কিংবা প্রাণীর ছবি ফুটে উঠে। এই গয়না এখানকার সামাজিক পরিচয় এবং ঐতিহ্য বহন করে। একসময় বরপেটায় তৈরি সোনা ব্যবহৃত পোশাক যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। তবে এই ধরনের পোশাক রাজপরিবারেই ব্যবহৃত হত।
আরও পড়ুন:

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৫১: বানভাসি অসম

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০২: কণ্ঠী ঘুঘু
অসমীয়া মালা বা হারে পদ্মফুল, মাছ, ময়ূরের আকৃতির আসাধারণ লকেট দেখা যায়। উল্লেখ্য, আহোম রাজারা যথেষ্ট শৌখিন এবং রুচিসম্পন্ন ছিলেন। অলঙ্কারের প্রতিও তাদের আগ্রহ ছিল। জুনবিবির দুলের অনেক চাহিদা রয়েছে। এই জুন শব্দটির অর্থ ‘চাঁদ’। বিশেষ করে বিহু কিংবা বিবাহ বা সামাজিক কোনও অনুষ্ঠানে এই জুনবিবির দুল পরিধান করে মহিলারা নিজেদের সমাজ সংকৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করেন। এই গয়নার সামনে সোনা ও রুবি এবং পিছনে এনামেলের আবরণ রয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৮: কবির ভালোবাসা, কবির জন্য ভালোবাসা
আরও একটি আকর্ষণীয় এবং বহুল ব্যবহৃত গয়না হচ্ছে গেজেরা নেকলেস। এই গলার হারটিতে ফুল এবং জ্যামিতি এক অদ্ভুদ সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। আর এক ধরনের গলার মালা এবং কানের দুলের সেট রয়েছে, যা রত্ন পাথর দিয়ে সাজানো থাকে। একে ডুগডুগি বলে। জাপি ডিজাইনের দুল খুব বড় বড় হয়। এই দুল ব্রঞ্চ দিয়ে তৈরি হয়। এতে মাছের নকশা বেশি দেখা যায়। থুরিয়া এক ধরনের কানের দুল। গোলাকার সোনার খোঁপা, যার মধ্যখানে একটি আকর্ষণীয় রঙিন পাথর থাকে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮১: সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য চালাতে গেলে নিজের লোকেদের পিছনেও চর নিয়োগ করতে হয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী-পুরুষেরা থুরিয়া দুল কানে পরেন। কিংকিনি নামক হারে ফুলের নকশা দেখা যায়। অসমের এই নিজস্ব শৈলীর গয়নাগুলিতে উজ্জ্বল লাল, দামি পাথর, রুবি বা মিনা ব্যবহার করা হয়। সোনার গয়নার উপর সবুজ, লাল বা কালো পাথরের কারুকার্যের জন্য এই সব গয়না খুবই রঙিন এবং জীবন্ত হয়ে উঠে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১: খাওয়াব আজব খাওয়া

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০১: মা সারদার মায়িকবন্ধন ত্যাগ
গল পাতা এক ধরনের চোকার যা গলায় লেগে থাকে। বিবাহ বা কোনও অনুষ্ঠানবাড়িতে মহিলারা এই গালপাতা পরিধান করেন। ঢোল বিরি, কেরুমনি ইত্যাদি অসমীয়া গয়না মধ্যে উল্লেখযোগ্য নকশা। গলার কানের সঙ্গে সঙ্গে হাতের গয়নারও গুরুত্ব রয়েছে অনেক। হাতের একটি গয়নার নাম গামখারু। সোনা বা রুপা দিয়ে তৈরি একটি বড় আকারের বালার নাম গাঁখারু। এটি অসমীয়া গয়নার মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। গামখারু জোড়া হিসেবে দুই হাতেই পরতে হয়। বিয়ের কনের হাতে কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় এই গামখারু ছাড়া মহিলাদের সাজ সম্পূর্ণ হয় না। এই বড় আকৃতির হাতের চুড়িটি একটি গিঁট দিয়ে খোলা হয়। এক সময় আসমীয়া পুরুষরা এই রুপোর গামখারু পরতেন।

ছবি: প্রতীকী।
অসমের হাতির দাঁতের তৈরি গয়নাও বহু মূল্যবান, দুষ্প্রাপ্যও বটে। সোনা রুপোর পাশাপাশি হাতির দাঁতের তৈরি গয়না কিংবা বাঁশ দিয়ে তৈরি গয়নার চাহিদা এবং নিজস্বতা দেখতে পাওয়া যায় এ অঞ্চলে। সুন্দর গয়নায় সেজে উঠে আসমীয়া নারী-পুরুষরা।—চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।


















