
হেলে সাপের ডাগর চোখ। ছবি : সংগৃহীত।
আজ ১৬৯তম পর্ব। ভাবছিলাম যে সাপ নিয়ে লিখব সেই ভাবনা পাল্টে গেল দুপুরের পর। সাইকেলে বাজার থেকে ফিরছিলাম দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ। বাড়িতে ঢোকার ঠিক আগে আমাদের গলিতে হঠাৎ করেই সাইকেলের সামনে এসে পড়ল একটা লিকলিকে সাপ। আমার সাইকেলের গতিবেগ ছিল একটু বেশি। হঠাৎ করে সাপটি সামনে চলে আসায় ওকে বাঁচাতে দু’হাতে জোরে ব্রেক চাপলাম। কোনওমতে সাপটিকে সাইকেল চাপা দেওয়া থেকে রক্ষা করলাম। দেখলাম সাপটা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে আরও গতিবেগ বাড়িয়ে বামদিকে আগাছা ভরা জলা জায়গাটার মধ্যে লুকিয়ে গেল। সাপটা আমার ভীষণ চেনা। ছোটবেলা থেকে প্রায়শই রাস্তাঘাটে, ঝোপেঝাড়ে দেখতে পাই। সাপটি হল হেলে সাপ।
সুন্দরবন অঞ্চলে হেলে সাপকে অনেকে মেটে সাপ বলে। আবার কোথাও কোথাও বলে হলহলিয়া। কোথাওবা হড়হড়িয়া। ইংরেজিতে এদের নাম ‘Buff Striped Keel Back’। এদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রং, ডোরা দাগ আর কালো ছোপের জন্য এই নাম। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Amphiesma stolatum’। ভেজা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় এরা থাকতে পছন্দ করে। সেই কারণে নিচু ঘাস জমি, ধান চাষের জমি বা আগাছা ভরা জলাভূমি এদের পছন্দের জায়গা। যদিও শীতকাল বাদে সারা বছর কমবেশি দেখা যায় তবে বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: ঘরচিতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯০: ইরাবতীর ডায়েরি থেকে/২

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৫৬: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা
এই সময় জোড়া জোড়া হেলে সাপ দলবেঁধে ঘোরে। শীতকালে এরা সাধারণত শীতঘুমে যায়। প্রচণ্ড ভীতু স্বভাবের সাপ। ভয় পেলে ঝোপঝাড়, ঘাস-পাতা বা আবর্জনা স্তূপের ভিতরে দ্রুত লুকিয়ে পড়ে। অনেকে বলেন এরা গ্রীষ্মঘুমেও যায়। তখন নাকি এরা ভেজা জায়গায় অনেক হেলে সাপ জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে। আমি অবশ্য এমন দৃশ্য দেখিনি বরং গ্রীষ্মকালেও মাঠে-ঘাটে, পুকুর পাড়ে হেলে সাপকে ঘুরতে দেখেছি।

হেলে সাপ। ছবি : সংগৃহীত।
হেলে সাপ ছোট আকারের সাপ। লম্বায় হয় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার। কখনও কখনও ৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। স্ত্রী হেলে সাপের দৈর্ঘ্য পুরুষের থেকে সামান্য বেশি। দেহের গড়ন একেবারে স্লিম, অর্থাৎ সরু লিকলিকে। লেজটা বেশ সরু ও লম্বা। দেহের মোট দৈর্ঘ্যের এক চতুর্থাংশ হল লেজ। আমার দৃষ্টিতে হেলে সাপের রূপ খুব সুন্দর। দেহের রং অলিভ সবুজ বা হলদে বাদামি। ঘাড়ের দুপাশ থেকে লেজ পর্যন্ত দুটো সরু উজ্জ্বল হলুদ বা ধূসর বর্ণের ডোরা দাগ হেলে সাপের রূপলাবণ্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দুটো ডোরা দাগের মধ্যবর্তী স্থানে পিঠের উপর রয়েছে কালো বা বাদামি রঙের বেশ বড় ছোপ ছোপ দাগ। আবার ওই দুটো ডোরা দাগের দুপাশে অর্থাৎ পেট বরাবর রয়েছে অনুরূপ কালো বা বাদামি ছোপ।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত
এই অদ্ভুত সুন্দর নকশা ঘাড় থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও লেজের দিকে এই নকশা ক্রমশ অস্পষ্ট। পেটের দিকের রং সাদা। মাথার ওপরে পাথরের বা টালির মতো আঁশগুলোর প্রান্তভাগ কালো। উপরের চোয়াল ও নিচের চোয়ালের রং ক্রিম-সাদা বা ফ্যাকাশে হলুদ। দুটো আঁশের মধ্যবর্তী ত্বকের রং নীলচে ধূসর বা উজ্জ্বল লাল রঙের হয়। এই রঙটা এমনিতে বোঝা যায় না কিন্তু যখন শরীরকে ফোলায় তখন দুটো আঁশের মাঝখান থেকে এই রং বোঝা যায়। তখন হেলে সাপের রূপের পরিবর্তন ঘটে। এইভাবে শত্রুকে এরা ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। এদের চোখ দুটো খুব ডাগর ডাগর। এটাও এদের সৌন্দর্যের একটা অঙ্গ।

হেলে সাপের ব্যাঙ শিকার। ছবি : সংগৃহীত।
আগেই বলেছি, এরা অত্যন্ত ভীতু, শান্ত ও নিরীহ স্বভাবের সাপ। সম্পূর্ণ নির্বিষ সাপ। রেগে গিয়ে বা ভয় পেয়ে হেলে সাপ কামড়ে দিয়েছে এমন কথা কখনও শুনিনি। ছোটবেলায় অনেকবার খেলার ছলে এদের লেজে ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। এদের প্রধান খাদ্য হল ছোট আকারের সোনাব্যাঙ, কুনোব্যাঙ, টিকটিকি, কেঁচো, মাছ ও নানা পোকামাকড়। ব্যাঙের পিছন পিছন তাড়া করে যেতে অনেকবারই দেখেছি। বেশ মজার সেই দৃশ্য। এরা সাধারণত রাতে খাবারের সন্ধানে বেরোয় না। যত ঘোরাঘুরি দিনের বেলায়। স্থলবাসী সাপ হলেও ভয় পেলে কখনও কখনও জলে নেমে লুকিয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট
হেলে সাপের প্রজনন ঋতু হল এপ্রিল-মে মাস, অর্থাৎ বর্ষার ঠিক আগে। এই সময় এদের ঘাড়ের কাছের রং প্রায় লাল হয়ে যায়। এই সময় স্ত্রী হেলে সাপ এক প্রকারের রাসায়নিক নিঃসরণ করে আর সেই রাসায়নিক অনুসরণ করে পুরুষ হেলে সাপ স্ত্রী সাপের কাছে পৌঁছে যায়। কখনও কখনও একটা স্ত্রী হেলে সাপের জন্য একাধিক পুরুষ নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

শারদীয়া স্পেশাল : সুদূর অতীতে উঃপূর্বাঞ্চলে দুর্গাপুজো
এরা ভেজা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় নরম মাটির মধ্যে কিংবা পচা লতাপাতার মধ্যে স্ত্রী হেলে সাপ ডিম পাড়ে। এক একবারে ৪ থেকে ১৬ টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো সাদা, লম্বাটে এবং প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। দেড় থেকে দুমাস পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরোয়। এই সময় স্ত্রী হেলে সাপ ডিমের কাছেপিঠে থেকে ডিম পাহারা দেয়। সদ্য ডিম ফুটে বেরোনো হেলের বাচ্চা ৯-১৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। জন্মের পর বাচ্চারা ছোট পোকামাকড়, ব্যাঙাচি ও ব্যাঙ খায়।

হেলে সাপ কুন্ডলী পাকিয়ে। ছবি : সংগৃহীত।
সুন্দরবন অঞ্চলে অত্যন্ত সহজলভ্য এই সাপ তেমন কোনও বিপদে রয়েছে বলে জানা নেই। প্রকৃতির সুন্দর এই প্রাণীটিকে তার স্বাভাবিক বাসস্থান ও খাদ্যের জোগান অটুট রেখে প্রকৃতিতে টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















