
ছবি : প্রতীকী। সংগ্রহীত।
ইন্দ্রপ্রস্থনগরে রাজসূয়যজ্ঞের আসরে আমন্ত্রিত রাজাদের মধ্যে অন্যতম চেদিরাজ শিশুপাল, কৌরবপিতামহ ভীষ্মের নিন্দায় মুখর হয়েছেন। কারণ হল, চেদিরাজের উগ্র কৃষ্ণবিরাগ। ভীষ্মের অনুরোধে যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজক, রাজা যুধিষ্ঠির, কৃষ্ণকে অর্ঘ্য দান করেছেন। কৃষ্ণের সম্মাননাপ্রদানে শিশুপালের ঘোর আপত্তি। কৃষ্ণনিন্দুক শিশুপালের আক্রমণের লক্ষ্য হলেন প্রবীণতম কৌরবপ্রধান ভীষ্ম। ভীষ্মের অতীত টেনে এনে,তাঁকে বাক্যবাণে জর্জরিত করলেন শিশুপাল। মাননীয় ভীষ্মের যত যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, সেগুলির অপব্যাখ্যা করে তাঁকে হেনস্থা করত তিনি দ্বিধা বোধ করলেন না। এইবারে চেদিরাজ শিশুপালের নিন্দার অভিমুখ কৃষ্ণের দিকে। তিনি জরাসন্ধবধবৃত্তান্তের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন। অত্যাচারী রাজা জরাসন্ধের,হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ। মল্লযুদ্ধে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম এই গর্বিত অত্যাচারী নির্মম শাসককে বধ করেছিলেন। শিশুপাল, এই হত্যার নিন্দা শুরু করলেন। তিনি, মহাবলশালী রাজা জরাসন্ধকে বহুপ্রশংসাযোগ্য ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন। শিশুপালের মতে, জরাসন্ধ কৃষ্ণকে দাস মনে করে যুদ্ধ করতে আমন্ত্রণ জানাননি। যোঽনেন যুদ্ধং নেয়েষ দাসোঽয়মিতি সংযুগে। শিশুপালের মনে প্রশ্ন, কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীম জরাসন্ধবধবিষয়ে যা করেছেন সেটা কি আদৌ সঙ্গত বলে মনে করা হয়? ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে কৃষ্ণ অদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে জরাসন্ধের প্রভাবপ্রতিপত্তি দেখেছিল। ধর্মাত্মা জরাসন্ধ ব্রাহ্মণদের মঙ্গলকামী ছিলেন। তাই তিনি প্রথমেই সেই দুর্বৃত্তের (কৃষ্ণ) চরণে অর্ঘ্যদান করেছিলেন। জরাসন্ধ কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুনকে (প্রদত্ত সম্মানাদি), ভুজ্যতামিতি গ্রহণ করুন বললেও কৃষ্ণ সেই প্রস্তাবের অন্যথা করেছিলেন। অতএব ভীষ্মর প্রতি শিশুপালের প্রশ্ন — যদ্যেয়ং জগতঃ কর্ত্তা যথৈনং মূর্খ! মন্যসে। কস্মান্ন ব্রাহ্মণং সম্যগাত্মানমবগচ্ছতি।। রে মূর্খ, যদি তাকে (কৃষ্ণকে) জগতের কর্তা মনে কর, তাহলে সে নিজেকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ মনে করে না কেন? শিশুপাল ভীষ্মকে দোষারোপ করলেন। এটাই আশ্চর্যের যে, ভীষ্ম, এই পাণ্ডবদের সৎপথ হতে দূরে টেনে নিয়ে গেছেন তথাপি পাণ্ডবরা সেটাই সঠিক বলে মনে করেন। শিশুপাল যেন উপহাসের সুরে বললেন, এটাও বিস্ময়কর নয়, কারণ তোমার মতো স্ত্রীলোকের সমান ধর্মবিশিষ্ট (পুরুষের বিপরীতবুদ্ধি) এবং বৃদ্ধ,তুমি, (তাঁদের)সব বিষয়ের উপদেষ্টা হয়েছ। অথবা নৈতদাশ্চর্য্যং যেষাং ত্বমসি ভারত!।। স্ত্রীসধর্ম্মা চ বৃদ্ধশ্চ সর্ব্বার্থানাং প্রদর্শকঃ।। শিশুপালের সেই কর্কশ ও রূঢ়বর্ণযুক্ত বক্তব্য শুনে, বলিশ্রেষ্ঠ মহাপরাক্রমশালী ভীমসেন ক্রুদ্ধ হলেন। অতিরিক্ত ক্রোধে, তাঁর স্বভাবতই আয়ত ও দীর্ঘ চোখদুটির প্রান্ত তাম্রবর্ণ হয়ে পদ্মতুল্য রক্তিম হল।
সমবেত রাজারা ভীমের কপালের তিনটি রেখাঙ্কিত ভ্রূকুটিকে ত্রিকূটপর্বতস্থিতা তিনটি ধারায় প্রবাহিত ত্রিপথগা গঙ্গাতুল্য দেখলেন। তাঁরা দেখলেন, ক্রোধে দাঁত দিয়ে দংশনরত ভীমের মুখটি যেন যুগাবসানে সব প্রাণীদের ভক্ষণোদ্যত মহাকালরূপে প্রতীয়মান। ভীমসেন বেগে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে ধরে ফেললেন ভীষ্ম, কার্ত্তিককে যেমন মহাবাহু মহাদেব টেনে নিয়ে যান, সেইরকম। গুরুজন ভীষ্ম নানাকথায় তাঁকেনিষেধ করায়, ভীমের ক্রোধ প্রশমিত হল। বর্ষাশেষে মহাসমুদ্রের বেলাভূমির মতো ভীষ্মের কথা অগ্রাহ্য করতে পারলেন না শত্রুঘাতী ভীম। ভীম ক্রুদ্ধ হলেও শিশুপাল কিন্তু নিজের পৌরুষবিষয়ে আস্থাশীল, তিনি একটুও ভয়ে কেঁপে উঠলেন না। ক্রুদ্ধ সিংহের মতো শত্রুহন্তা শিশুপাল, তাঁর প্রতি বেগে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত ভীমকে হরিণসমান নগণ্য মনে করলেন। চেদিরাজ, পরাক্রমশালী ভীমকে রাগত দেখে, হাসতে হাসতে বললেন, ভীষ্ম, ভীমকে মুক্ত কর। সমবেত রাজারা দেখুন, আমার প্রভাবে সে পতঙ্গের মতো কেমন নিঃশেষে দগ্ধ হয়। মুঞ্চৈনং ভীষ্ম! পশ্যন্তু সর্ব্ব এব নরাধিপাঃ। মৎপ্রভাববিনির্দগ্ধং পতঙ্গমিব বহ্নিনা।।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস, পর্ব-৮৭ : আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৫: আইসিইউ কেবিন নং ২০৪

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

বিনায়ক : বিশ্বকর্মা
চেদিপতি শিশুপালের কথা শুনে, বুদ্ধিমানদের মধ্যে অন্যতম, কৌরবশ্রেষ্ঠ ভীষ্ম, ভীমকে বললেন, চেদিরাজকুলে জাত, ত্রিনয়ন ও চতুর্ভুজ ইনি (শিশুপাল) গাধার তুল্য বিকৃত স্বরে ডেকে উঠে আবার স্বাভাবিক শব্দ করেছিল। তখন তার পিতামাতা ও স্বজনবর্গ সেই বিকৃতি দেখে, ভীত হলেন এবং তাকে ত্যাগ করবেন মনস্থ করলেন। তখন সমবেত অমাত্য, পুরোহিতের উপস্থিতিতে চিন্তাকুল সস্ত্রীক রাজার উদ্দেশে অশরীরি দৈবাদেশ উচ্চারিত হল — হে রাজন্, আপনার এই নবজাতক পুত্রটি কান্তিমান ও মহাবলশালী। সেই জন্যে ভয় পাবেন না। সন্দেহহীনভাবে শিশুটিকে পালন করুন। এষ তে নৃপতে! পুত্রঃ শ্রীমান্ জাতো মহাবলঃ। তস্মাদস্মান্ন ভেতব্যমব্যগ্রঃ পাহি বৈ শিশুম্।। রাজাকে আরও আশ্বস্ত করল সেই বাণী, (পুত্রত্যাগজনিত কারণে) চেদিরাজ পুত্রমৃত্যুর কারণ নন,সন্তানের মৃত্যুর সময় হয়নি। যাঁর অস্ত্রাঘাতে এর মৃত্যু হবে সে জন্ম নিয়েছে। ন চৈবৈতস্য মৃত্যুস্ত্বং ন কালঃ প্রত্যুপস্থিতঃ। যশ্চ শস্ত্রেণ হন্তাঽস্য স চোৎপন্নো নরাধিপ।। অন্তর্হিতপ্রায় উচ্চারিত বাণীশেষে,পুত্রস্নেহে আকুল জননী পুত্রের জীবনদায়িনী অদৃশ্য বাণীকে প্রণাম জানিয়ে আবার অনুরোধ করলেন, আপনি কোনও মহান দেবতা বা অন্য যে কেউ হন, আমি শুনতে ইচ্ছুক, যথাযথভাবে বলুন, কে আমার পুত্রের মৃত্যুর কারণ হবেন? যাথাতথ্যেন ভগবান্ দেবো বা যদি বেতরঃ। শ্রোতুমিচ্ছামি পুত্রস্য কোঽস্য মৃত্যুর্ভবিষ্যতি।। আবার অন্তর্হিতা ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষিত হল, পাঁচটি মুণ্ডযুক্ত সাপের মুণ্ড যেমন স্খলিত হয় তেমনই যিনি কোলে ধারণ করা মাত্র এর অতিরিক্ত বাহুদুটি মাটিতে খসে পড়বে। যাঁকে দেখে এই বালকের তৃতীয় নয়নটিও লোপ পাবে, তিনিই হবেন এর মৃত্যুর কারণ। যস্যোৎসঙ্গে গৃহীতস্য ভুজাবভ্যধিকাবুভৌ। পতিষ্যতঃ ক্ষিতিতলে পঞ্চশীর্ষাবিবোরগৌ।। তৃতীয়মেতদ্বালস্য ললাটস্থঞ্চ লোচনম্। নিমজ্জিষ্যতি যং দৃষ্ট্বা সোঽস্য মৃত্যুর্ভবিষ্যতি।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৫: কৃষ্ণবিরোধিতার প্রসঙ্গে ভীষ্মের বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও কে স্মরণীয়? শিশুপাল? না ভীষ্ম?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
ভীষ্ম আরও বিশদে শিশুপালের জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন, শিশুটির অদ্ভুত বিবরণানুযায়ী, চারটি বাহু ও তিনটি নয়ন আছে শুনে, দর্শনেচ্ছু পৃথিবীর সমস্ত রাজারা উপস্থিত হলেন। সেই রাজা (চেদিপতি) তাঁদের যথোচিত সম্মানিত করে, এক এক করে রাজাদের কোলে পুত্রকে দিলেন। এইভাবে যথাক্রমে আলাদা আলাদাভাবে, হাজার হাজার রাজার কোলে ভাল করে বসেও কোন চিহ্ন (তৃতীয় লোচন এবং অতিরিক্ত বাহুদুটির বিচ্যুতির লক্ষণ) পাওয়া গেল না। দ্বারকানগরীতে মহাবল সঙ্কর্ষণ বলরাম এবং জনার্দন কৃষ্ণ এই বৃত্তান্ত শুনে সেই চেদিরাজ্যের রাজপুরীতে উপস্থিত হলেন। যথানিয়মে দুই যদুবংশীয় বলরাম ও কৃষ্ণ, শ্রেষ্ঠত্ব-অনুসারে প্রথমে রাজাকে তার পরে, তাঁদের পিতার ভগিনী রাজপত্নীকে অভিবাদন করে, কুশলসংবাদ ও আরোগ্যবিষয়ে প্রশ্ন করলেন। অতঃপর দুজনে আসন গ্রহণ করলেন। রাজমহিষী অতীব প্রীতিবশত দুই বীরকে সমাদর করে, দামোদর কৃষ্ণের কোলে দিলেন পুত্রকে। কোলে দেওয়ামাত্র শিশুটির অতিরিক্ত বাহুদুটি বিচ্যুত হল,কপালের নয়নটি উধাও হল। সেই দৃশ্য দেখে,ব্যথিত রাজ্ঞী ভয়ে কৃষ্ণের বর ভিক্ষা করলেন। তদ্ দৃষ্ট্বা ব্যথিতা ত্রস্তা বরং কৃষ্ণমযাচত। দদস্ব মে বরং কৃষ্ণ! ভয়ার্ত্তায়া মহাভুজ!।। ত্বং হ্যার্ত্তানাং সমাশ্বাসো ভীতানামভয়প্রদঃ। হে মহাবাহু কৃষ্ণ, তুমি এই ভয়ার্তাকে বর দাও। তুমি যে আর্তের আশ্বাস,ভীতদের অভয়দাতা। যদুনন্দন কৃষ্ণ প্রত্যুত্তরে ধর্মজ্ঞা রানিকে অভয় দান করলেন। তিনি জানালেন তাঁর থেকে রাজমহিষীর কোনও ভয় নেই। কৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন, কি বর চাই? পিতার ভগিনীর জন্য আর কি করবেন তিনি? দদানি কং বরং কিংবা করবাণি পিতৃষ্বসঃ। কৃষ্ণ জানালেন সাধ্যানুযায়ী বা সাধ্যাতীত হোক, তিনি রানির কথানুযায়ী কাজ করবেন। যাদবকন্যা চেদিরাজমহিষী বললেন, মহাবল যাদবশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ যেন মায়ের জন্যে শিশুপালের অপরাধগুলি ক্ষমা করেন। শিশুপালস্যাপরাধান্ ক্ষমেথাস্ত্বং মহাবল!। মৎকৃতে যদুশার্দ্দূল! বিদ্ধ্যেনং মে বরং প্রভো! হে প্রভু, এটাই আমার প্রার্থিত বর বলে জানবে। কৃষ্ণ বললেন, ওগো, পিতার ভগিনী, আপনার পুত্র বধযোগ্য হলেও আমি এর শত অপরাধ ক্ষমা করব। আপনি শোক করবেন না। অপরাধশতং ক্ষাম্যং ময়া হ্যস্য পিতৃষ্বসঃ!। পুত্রস্য তে বধার্হস্য মা ত্বং শোকে মনঃ কৃথাঃ।। পিতামহ ভীষ্ম ভীমকে আশ্বস্ত করলেন, এবমেষ নৃপঃ পাপঃ শিশুপালঃ সুমন্দধীঃ। ত্বং সমাহ্বয়তে বীর ! গোবিন্দবরদর্পিতঃ।। হে বীর, চেদিরাজ শিশুপালের বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তাই এই পাপী, কৃষ্ণের বরে গর্বিত হয়ে তোমাকে সমরাহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪
চেদিপতি শিশুপাল, রাজসূয়যজ্ঞের আসরে ভীষ্মের কৃষ্ণপ্রীতির নিন্দা করে তাঁর কঠোর সমালোচনা করে চলেছেন। কারণ কৃষ্ণের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাশীল ভীষ্মের পরামর্শে রাজা যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে অর্ঘ্যদান করেছেন। কৃষ্ণের এই সম্মানপ্রাপ্তিতে ক্রুদ্ধ হয়েছেন চেদিপতি শিশুপাল। যজ্ঞানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত প্রকাশ্য সভায়, মাননীয় বিখ্যাত রাজবৃন্দের উপস্থিতিতে, শিশুপাল একের পর এক ভীষ্মকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করতে লাগলেন। ভীষ্ম প্রবীণতম কুরুপ্রধান। তিনি সম্মানীয়,তাঁর মহত্ত্বমণ্ডিত উদারতাময় আত্মত্যাগের জন্য তিনি প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। এমন একজন মহানের প্রতি বিষোদ্গার, তাঁর নিকটজনদের কি সহ্য হয়? স্বভাবতই ভীম তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে উদ্যত হয়েছেন। তখন ভীষ্মের অনুরোধে ভীম ক্রোধ সংবরণ করলেন। স্বৈরাচারী রাজা জরাসন্ধের বধপ্রসঙ্গে কৃষ্ণের বিরূপ সমালোচনা করলেন শিশুপাল। শিশুপাল জানালেন,জরাসন্ধ বহুগুণের আধার। তাই জরাসন্ধ শিশুপালের সমাদরের পাত্র।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি
শিশুপালের এই নিন্দিত অপাত্রের প্রতি ভালবাসা, তাঁর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সন্দিহান করে তোলে। একটি বিবাদসূত্রে সত্যের অপলাপ, কাহিনির অপব্যাখ্যার প্রবণতা সেটি বোধ হয় চিরন্তন। শিশুপাল জানিয়েছেন কৃষ্ণ ছদ্মব্রাহ্মণবেশে, যথাযথ প্রবেশদ্বার দিয়ে জরাসন্ধের ভবনে প্রবেশ করেননি। বুদ্ধিমান জরাসন্ধ তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সাহায্যে কৃষ্ণ ও তাঁর সঙ্গী দুই পাণ্ডবের ছদ্মবেশ বুঝতে পেরেছিলেন। কৃষ্ণ জরাসন্ধকে তাঁর জ্ঞানঋদ্ধ ব্যাখ্যায় ছদ্মবেশধারণ এবং অদ্বার দিয়ে প্রবেশের যথাযথ তাৎপর্য বুঝিয়ে বলেছেন। কৃষ্ণ, জরাসন্ধের প্রাসাদে প্রবেশের উদ্দেশ্যও অকপটে জরাসন্ধকে জানিয়েছিলেন। জরাসন্ধ স্বেচ্ছায় ভীমের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই শিশুপালের কৃষ্ণসমালোচনায় মিথ্যা তথ্যের বাহুল্য ছিল। দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। একটি সদর্থক চিন্তা বা পদক্ষেপের নঞর্থক ব্যাখ্যা, দুর্জনের স্বভাবজাত। রাজসূয়যজ্ঞের বিখ্যাত মিলনমেলাটি নিমেষে পরিণত হল কদর্য পাঁকে ভরা একটি আবর্জনার স্থল যেখানে স্মৃতির সরণী বেয়ে শুধু দুরভিসন্ধিমূলক চিন্তার আনাগোনা, যেখানে নিন্দার পঙ্কিল আবর্তে ডুবে যায় শুভবোধ, নৈতিকতা, মহত্ত্বের সম্মানবোধ, ঔদার্য। সত্যের অপলাপ, মানুষের বিশ্বস্ততায় সন্দেহ সৃষ্টি করে।

ছবি : প্রতীকী। সংগ্রহীত।
কৃষ্ণ শিশুপালের মায়ের অনুরোধে, কথা দিয়েছিলেন যে, তিনি শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমা করবেন, একশ সংখ্যা কেন? একশত একটি পূর্ণ জীবনবৃত্তের প্রতীক। মানুষের জীবনের সীমাবদ্ধতা ওই একশততে। একশ সংখ্যা অসীম নয়। একশটি অপরাধের একটি মাত্রা বেঁধে দিয়েছেন কৃষ্ণ। ক্ষমার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। সহনশীলতার একটি মাত্রা নির্ধারণ করেছেন কৃষ্ণ। অপরিসীম কোনও কিছুই সঠিক নয়, এ যেন তারই ইঙ্গিত। একশতর লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করলেই অনিবার্য বিপদ। কৃষ্ণের ইঙ্গিতে এই সতর্কবার্তা যেন প্রচ্ছন্ন রয়েছে। এই কথা বোধ হয় জনজীবনের অবাধ অপ্রীতিকর আচরণের বিরুদ্ধে, সংযত হওয়ার পরিসীমানির্দেশ, যার প্রভাব জনমানসে চিরস্থায়ী রয়েছে আজও।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















