কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগ্রহীত।

রাক্ষসরাজ রাবণ, রামের পত্নী সীতাকে অপহরণের জন্যে রাক্ষসী তাড়কার পুত্র মায়াবী মারীচের সাহায্য প্রার্থনা করল। দ্বিতীয়বার মারীচের সাহায্যপ্রার্থী হলেন রাবণ। মারীচ, একদা নবীন রামের শক্তিপ্রয়োগের ফল ভোগ করেছিল,সে রাক্ষসকে জানিয়েছে, রাক্ষসনিধনে নিয়োজিতপ্রাণ রামের অপ্রতিহত শক্তিমত্তার বিবরণ। মারীচের পরামর্শে রাবণ ফিরে গেলেন লঙ্কায়। ইতিমধ্যে রাক্ষসী শূর্পনখার প্ররোচনামূলক প্রলোভনে, রাক্ষসরাজ রাবণ, রামের সুন্দরী স্ত্রীকে অপহরণের সিদ্ধান্ত, কার্যে রূপান্তরিত করবার পরিকল্পনা নিয়ে উপস্থিত হল মারীচের কাছে। মারীচ, রাবণের প্রস্তাব শুনে, ভয়ে বিহ্বল হল। রাবণের প্রস্তাবিত সীতাহরণের পরিকল্পনার সম্পূর্ণ বর্ণনা শুনে, মহাতেজস্বী,বাক্য প্রয়োগে নিপুণ, মারীচ, রাক্ষসরাজ রাবণকে প্রত্যুত্তরে বলল, জগতে সর্বদাই প্রিয়ভাষী মানুষ সহজে পাওয়া যায়। একাধারে হিতসাধক অথচ অপ্রিয় কথার বক্তা এবং শ্রোতা, সহজলভ্য নয়। মারীচ রাবণের দুর্বলতা সম্বন্ধে সচেতন করে, বলল, রাবণের স্বভাব চঞ্চল, তিনি গুপ্তচর (খবরসংগ্রহ করবার জন্য) নিয়োগ করেননি। তাই, রাবণ মহাশৌর্যবান উন্নত গুণের অধিকারী, ইন্দ্র ও বরুণতুল্য রামকে, চিনতে পারেননি। যেন এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল মারীচ, সমস্ত রাক্ষসদের কল্যাণ হোক।রাম ক্রুদ্ধ হয়ে যেন সমস্ত পৃথিবী রাক্ষসশূন্য না করেন। জনককন্যা সীতার উদ্ভব যেন রাবণের জন্য প্রাণান্তকর না হয়। সীতা যেন ভয়ানক বিপত্তির কারণ না হয়। স্বেচ্ছাচারী, নিরঙ্কুশ রাবণকে প্রভুরূপে লাভ করে, রাক্ষস-সহ লঙ্কাপুরী যেন ধ্বংস না হয়। বিপদাশঙ্কায় ত্রস্ত, মারীচ, রাবণকে ভর্ৎসনা করল, আপনার মতো স্বেচ্ছাচারী, দুশ্চরিত্র, পাপমন্ত্রণাপ্রিয়, দুর্বুদ্ধি, রাজা, নিজেকে স্বজনদের এবং রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে থাকে। রাবণের তুলনায় রামের গুণাবলী বর্ণনা করল মারীচ — রাম, পিতার ত্যাজ্য পুত্র নয়, সে কখনও মর্যাদাহীনও নয়, সে লোভী তো নয়ই, নয় সে দুশ্চরিত্র, সে নীচ ক্ষত্রিয়ও নয়। কৌশল্যামায়ের আনন্দবৃদ্ধির উৎস সেই রাম, অধার্মিক ও গুণহীনও নয়। সব প্রাণীদের প্রতি তার স্বভাব নয় উগ্র বরং সমস্ত প্রাণীদের কল্যাণকামনায় নিবেদিতপ্রাণ এই রাম। ন চ পিত্রা পরিত্যক্ত নামর্য্যাদঃ কথঞ্চন। ন লুব্ধো ন চ দুঃশীলো ন চ ক্ষত্রিয়পাংসনঃ।। ন চ ধর্ম্মগুণৈর্হীনঃ কৌশল্যানন্দবর্দ্ধনঃ। ন চ তীক্ষ্ণো হি ভূতানাং সর্ব্বভূতহিতে রতঃ।। বিমাতা কৈকেয়ী পিতাকে প্রতারিত করেছেন দেখে, পিতাকে সত্যবাদী প্রমাণ করব ‘করিষ্যামি’ এই ইচ্ছায় সেই ধর্মপ্রাণ রাম, বনে নির্বাসিতের জীবন গ্রহণ করেছে।
কৈকেয়ী ও পিতা দশরথের প্রিয়কাজ রূপায়িত করতে সে রাজ্য ও উপভোগসামগ্রী ত্যাগ করেছে। রাবণকে রামের চারিত্রিক গুণগুলি বর্ণনা করল মারীচ — হে তাত, সেই রাম কর্কশস্বভাব নয়, অবিদ্বানও নয়, তার মিথ্যাচারের কথা শোনা যায় না, তার সম্বন্ধে আপনার এমন কথা শোভা পায় না। ন রামঃ কর্কশস্তাত নাবিদ্বান্ নাজিতেন্দ্রিয়ঃ। অনৃতং ন শ্রুতঞ্চৈব নেবং ত্বং বক্তুমর্হসি।। মারীচ আরও বিশদে রামের প্রশংসা করল, রাম মূর্ত্তিমান ধর্ম, সজ্জন, সত্য তার পরাক্রম।ইন্দ্র যেমন দেবতাদের রাজা, সেও সমস্ত লোকের রাজা। রাবণকে প্রশ্ন করল মারীচ — রাম নিজের তেজোবলে বিদেহনন্দিনীকে রক্ষা করছে। আপনি কেন বলপ্রয়োগ করে সূর্যকিরণ- অপহরণের মতো তাকে জোর করে বৃথা হরণ করতে চাইছেন? কথন্তু তস্য বৈদেহীন্তু রক্ষিতাং স্বেন তেজসা। ইচ্ছসি প্রসভং হর্ত্তুং প্রভামিব বিবস্বতঃ মারীচ রাবণকে রামের শক্তিসম্বন্ধে সচেতন করল, শর যার শিখা, ধনুক ও খড়্গ যার ইন্ধন, যুদ্ধে দুর্দ্ধর্ষ সেই দীপ্ত আগুন হল রাম। হঠাৎ সেই আগুনে প্রবেশ করা আপনার উচিত নয়। শরার্চ্চিষমনাধৃষ্যং চাপখড়্গেন্ধনং রণে। রামাগ্নিং সহসা দীপ্তং ন প্রবেষ্টুং ত্বমর্হসি।। রাবণের কাছে মারীচের অনুরোধ —রাজ্য, সুখ এবং নিজের প্রাণের মায়া পরিত্যাগ করে, উদ্যত ধনুক যার মুখমণ্ডল, শর যার তেজ, যুদ্ধে যে ক্রোধান্ধ, উগ্র এবং শত্রুসেনাবিনাশকারী, সেই যমতুল্য রামের কাছে রাবণের যাওয়া উচিত নয়। মারীচ জানাল, জনককন্যা সীতা যার পত্নী, অতুলনীয় তেজস্বী সেই রাম। রামের ধনুক আশ্রয় করে সীতা বনে বাস করছে। ন ত্বং সমর্থস্তাং হর্ত্তুং রামচাপাশ্রয়াং বনে। মারীচের সিদ্ধান্ত — রাবণ তাকে হরণ করতে পারবেন না। সীতা, সিংহের মতো উন্নতবক্ষা নরসিংহ রামের প্রাণের চেয়ে প্রিয়, চির-অনুগতা পত্নী। মারীচের বিশ্বাস —তেজস্বী রামের প্রিয়তমা, প্রদীপ্ত-অগ্নিশিখার মতো মিথিলারাজনন্দিনী, সুমধ্যমা, সুন্দরী,সীতাকে, রাবণ ধর্ষণ করতে পারবেন না। তাই মারীচ রাক্ষসরাজকে জানাল, এই বৃথা উদ্যমে কি হবে? যুদ্ধে, রাম, রাবণকে দেখামাত্র তার জীবননাশ হবে। জীবন, সুখ এবং অতি দুর্লভ রাজ্য যদি রাবণ দীর্ঘকাল ভোগ করতে ইচ্ছুক হন তাহলে রামের অপ্রিয় কাজ, তিনি যেন না করেন। বরং বিভীষণ প্রভৃতি মন্ত্রীদের পরামর্শ নিয়ে, নিজে স্থিরনিশ্চিত হয়ে, দোষগুণ ও বলাবল বিবেচনা করে, একাধারে নিজের এবং রামের সামর্থ্য সম্বন্ধে যথাযথভাবে জেনে নিয়ে,নিজের মঙ্গল চিন্তা করে, রাবণ, এই কাজে অগ্রণী হন। পরিশেষ মারীচ,তার সিদ্ধান্ত জানাল, অহন্তু মন্যে তব ন ক্ষমং রণে সমাগমং কোশলরাজসূনুনা। আমি মনে করি, কোশলরাজতনয়ের সঙ্গে সংঘাতে, তার সংস্পর্শে যাওয়াই উচিত নয়। এর পরে মারীচ আবার উত্তম ও যুক্তিযুক্ত ভাষণ শুরু করল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৫: কৃষ্ণবিরোধিতার প্রসঙ্গে ভীষ্মের বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও কে স্মরণীয়? শিশুপাল? না ভীষ্ম?

বিনায়ক : বিশ্বকর্মা

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫২: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

মারীচ রামের কৈশোরের বীরত্বকাহিনি বর্ণনা করল। সে বলল,কোন এক সময়ে, পর্বতের মতো বিশালাকৃতি মারীচ, হাজার পর্বতের সমান বল ধারণ করে, নিজের বীর্যবলে, পৃথিবী পরিভ্রমণ করছিল। মেঘবরণ মারীচের কানে উজ্জ্বল সোনার কুণ্ডল। মুকুটধারী রাক্ষস মারীচ, পরিঘ অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে লোকর মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে করতে, মুনিদের মাংস খেয়ে, দণ্ডকারণ্যে চরে বেড়াত। তখন ধর্মাত্মা মহামুনি বিশ্বামিত্র মারীচের জন্যে সন্ত্রস্ত হয়ে, স্বয়ং রাজা দশরথের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, অদ্য রক্ষতু মাং রামঃ পর্ব্বকালে সমাহিতঃ। মারীচান্মে ভয়ং ঘোরং সমুৎপন্নং নরেশ্বর।। হে নরেন্দ্র, মারীচের থেকে আমার মহাভয় হচ্ছে। আজ আমি যখন যজ্ঞ করব রাম তখন সতর্ক হয়ে আমায় রক্ষা করুক। ধর্মপ্রাণ রাজা দশরথ, অত্যন্ত সম্মানীয় মহামুনিকে প্রত্যুত্তরে বললেন, এই রাঘব রামের বয়স, বার বছরের কিছু কম। এর অস্ত্রশিক্ষাও হয়নি। সসৈন্যে আমি আপনার সঙ্গে যাব। ঊনদ্বাদশবর্ষোঽয়মকৃতাস্তশ্চ রাঘবঃ। কামন্তু মম তৎ সৈন্যং ময়া সহ গমিষ্যতি। মুনিশ্রেষ্ঠ বিশ্বামিত্রকে আশ্বস্ত করলেন, চতুরঙ্গ সেনাসহ তিনি স্বয়ং সেখানে যাবেন ও মুনির শত্রু রাক্ষসকে বধ করবেন। রাজা এই কথার, উত্তরে মুনি বললেন, রামান্নান্যদ্ বলং লোকে পর্য্যাপ্তং তস্য রক্ষসঃ। পৃথিবীতে রাম ছাড়া অন্য কোনও শক্তিই সেই রাক্ষসের পক্ষে যথেষ্ট নয়। মহামুনি জানেন, যুদ্ধে, রাজা দশরথ দেবতাদেরও রক্ষক। মুনি জানেন, রাজার কীর্তিকাহিনি ত্রিলোক জানে।রাজার আছে বিরাট সৈন্যবল। তারা এখানেই থাকুক। মহর্ষি বিশ্বামিত্রের স্থির বিশ্বাস — বালক হলেও মহাতেজস্বী রাম সেই রাক্ষসকে হেয় করতে সমর্থ। হে শত্রুদের উদ্বেগসৃষ্টকারী রাজা, রামকে নিয়েই আমি যাব। আপনার মঙ্গল হোক। কামমস্তি মহৎ সৈন্যং তিষ্ঠত্বিহ পরন্তপ। বালোঽপ্যেষ মহাতেজাঃ সমর্থস্তস্য নিগ্রহে।। গমিষ্যে রামমাদায় স্বস্তি তে২স্তু পরন্তপ।। এই বলে, বিশ্বামিত্র পরমানন্দে রামকে সঙ্গে নিয়ে নিজের আশ্রমে চলে গেলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

তখন, যজ্ঞে দীক্ষিত হলেন মহামুনি বিশ্বামিত্র। রাম ধনুক উদ্যত করে দণ্ডকারণ্যে উপস্থিত হলেন। রাম তখন অজাতব্যঞ্জন (বয়সোচিত দাড়ি, গোঁফ হয়নি), তিনি এক সুন্দর বালক। শ্যামবর্ণ, সুদর্শন, রাম একটি বসন ধারণ করে আছেন। ধনুর্দ্ধারী রামের মাথায় আছে একটি শিখা, গলায় সোনার মালা। নবোদিত শিশু চাঁদের মতো রাম, তাঁর দীপ্ত তেজে দণ্ডকারণ্য উজ্জ্বল করে দেখা দিলেন। সেই সময়ে,মারীচ তার অবস্থান বর্ণনা করল — প্রাপ্তবরের কারণে বলী, মেঘবরণ আমি তখন, প্রোজ্জ্বল সোনার কুণ্ডলে সেজে, দর্পভরে আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করলাম, ততোঽহং মেঘসঙ্কাশস্তপ্তকাঞ্চনকুণ্ডলঃ। বলী দত্তবরো দর্পাদাজগামাশ্রমান্তরম্।। হঠাৎ অস্ত্রপ্রয়োগোদ্যত সশস্ত্র মারীচকে প্রবেশ করতে দেখামাত্র উদ্বেগহীন রাম, ধনুকটি (শর যুক্ত করে) সাজালেন। মারীচ রামকে দেখে কি করল? তার বয়ান-অনুযায়ী — মোহবশত রামকে “এ যে ছেলেমানুষ” বলে অবজ্ঞাভরে বিশ্বামিত্রের সেই বেদির দিকে দ্রুতবেগে ছুটে গেলাম। অবজানন্নহং মোহাদ্ বালোঽয়মিতি রাঘবম্। বিশ্বামিত্রস্য তাং বেদিমভ্যধাবং কৃতত্বরঃ।। মারীচ, রামের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করল, তখন রাম, শত্রুদের ত্রাসসৃষ্টিকর,একটি সুতীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষেপ করল। যার আঘাতে আমি শতযোজনব্যাপী সমুদ্রে গিয়ে পড়লাম। তেনাহং তাড়িতঃ ক্ষিপ্তঃ সমুদ্রে শতযোজনে। মারীচ রামের সদিচ্ছা ব্যাখ্যা করল, ইচ্ছে করেই রাম মারীচকে প্রাণে না মেরে রক্ষা করল। রামের শরের বেগে পরাস্ত মারীচ, সংজ্ঞাহীন হয়ে গভীর সাগরজলে গিয়ে পড়ল। মারীচ জানাল, অনেকক্ষণ পরে চেতনা ফিরে পেয়ে সে লঙ্কায় আবার ফিরে গিয়েছিল। মারীচ মুক্ত হলেও তার সহায়করা, অক্লান্তকর্মী অস্ত্রবিদ্যাজ্ঞানহীন ছেলেমানুষ রামের কাছে পরাস্ত হল। মারীচ, রাবণকে নিষেধ করল, তাই আমি বারণ করা সত্ত্বেও যদি রামের সঙ্গে যুদ্ধ করেন তবে নিজের ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে এনে,দ্রুত ধ্বংস হবেন। তন্ময়া বার্য্যমাণস্তু যদি রামেণ বিগ্রহম্। করিষ্যস্যাপদং ঘোরাং ক্ষিপ্রং প্রাপ্য নশিষ্যসি।। রাবণের কাছে মারীচের মিনতি – রাবণ, খেলাধূলা ও রতিসম্ভোগে পারদর্শী ও সামাজিক উৎসবদর্শনে অভ্যস্ত রাক্ষসদের নিরর্থক কষ্ট ডেকে আনবেন। মারীচ যেন অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করল, হর্ম্যপ্রাসাদসম্বাধাং নানারত্নবিভূষিতাম্। দ্রক্ষ্যসি ত্বং পুরীং লঙ্কাং বিনষ্টাং মৈথিলীকৃতে।। আপনি, মিথিলারাজতনয়া সীতার কারণে সুন্দর বিশাল প্রাসাদে পূর্ণ, নানারত্নখচিত লঙ্কাপুরী, ধ্বংস হতে দেখবেন। সাপে পরিপূর্ণ হ্রদে বাসকারী মাছগুলির মতো পাপ না করেও পবিত্র মানুষ অপরের পাপে সংসর্গহেতু বিনষ্ট হন। মারীচ রাবণকে দোষারোপ করলেন, আপনার দোষে দিব্যচন্দনলিপ্ত দেহে, দিব্যালঙ্কারে বিভূষিত নিহত রাক্ষসদের ভূলুণ্ঠিত হতে দেখবেন। দিব্যচন্দনদিগ্ধাঙ্গান্ দিব্যালঙ্কারবিভূষিতান্। দ্রক্ষ্যস্যভিহতান্ ভূমৌ তব দোষাত্তু রাক্ষসান্।। রাবণের কাছে মারীচের মিনতি—রাবণ, খেলাধূলা ও রতিসম্ভোগে পারদর্শী ও সামাজিক উৎসবদর্শনে অভ্যস্ত রাক্ষসদের নিরর্থক কষ্ট ডেকে আনবেন।মারীচ যেন অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করল, হর্ম্যপ্রাসাদসম্বাধাং নানারত্নবিভূষিতাম্। দ্রক্ষ্যসি ত্বং পুরীং লঙ্কাং বিনষ্টাং মৈথিলীকৃতে।। আপনি, মিথিলারাজতনয়া সীতার কারণে সুন্দর বিশাল প্রাসাদে পূর্ণ, নানারত্নখচিত লঙ্কাপুরী, ধ্বংস হতে দেখবেন। সাপে পরিপূর্ণ হ্রদে বাসকারী মাছগুলির মতো পাপ না করেও পবিত্র মানুষ অপরের পাপে সংসর্গহেতু বিনষ্ট হন। মারীচ রাবণকে দোষারোপ করলেন, আপনার দোষে দিব্যচন্দনলিপ্ত দেহে, দিব্যালঙ্কারে বিভূষিত নিহত রাক্ষসদের ভূলুণ্ঠিত হতে দেখবেন। দিব্যচন্দনদিগ্ধাঙ্গান্ দিব্যালঙ্কারবিভূষিতান্। দ্রক্ষ্যস্যভিহতান্ ভূমৌ তব দোষাত্তু রাক্ষসান্।।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

রাবণের কাছে মারীচের মিনতি— রাবণ, খেলাধূলা ও রতিসম্ভোগে পারদর্শী ও সামাজিক উৎসবদর্শনে অভ্যস্ত রাক্ষসদের নিরর্থক কষ্ট ডেকে আনবেন। মারীচ যেন অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করল, হর্ম্যপ্রাসাদসম্বাধাং নানারত্নবিভূষিতাম্। দ্রক্ষ্যসি ত্বং পুরীং লঙ্কাং বিনষ্টাং মৈথিলীকৃতে।। আপনি, মিথিলারাজতনয়া সীতার কারণে সুন্দর বিশাল প্রাসাদে পূর্ণ, নানারত্নখচিত লঙ্কাপুরী, ধ্বংস হতে দেখবেন। সাপে পরিপূর্ণ হ্রদে বাসকারী মাছগুলির মতো পাপ না করেও, পবিত্র মানুষ অপরের পাপে সংসর্গহেতু বিনষ্ট হন। মারীচ রাবণকে দোষারোপ করলেন, আপনার দোষে দিব্যচন্দনলিপ্ত দেহে, দিব্যালঙ্কারে বিভূষিত নিহত রাক্ষসদের ভূলুণ্ঠিত হতে দেখবেন। দিব্যচন্দনদিগ্ধাঙ্গান্ দিব্যালঙ্কারবিভূষিতান্। দ্রক্ষ্যস্যভিহতান্ ভূমৌ তব দোষাত্তু রাক্ষসান্।। মারীচ মনে করে রাবণের আরও অনেক ধ্বংসের ছবি দেখা বাকি আছে। যেমন, রাবণ দেখবেন, নিহত রাক্ষসদের মধ্যে জীবিত আশ্রয়হীন রাক্ষসরা,স্ত্রীকে ত্যাগ করে বা সস্ত্রীক দিকে দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। রাবণ নিশ্চিতভাবে দেখবেন, শরজালে বিপর্যস্ত, অগ্নিশিখায় সমাচ্ছন্ন লঙ্কাপুরীর ভবনগুলি অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। মারীচের মতে, পরস্ত্রীকে ধর্ষণের তুলনায় মহাপাপ আর কিছুতে নেই। হে রাজন্, আপনার বিবাহিতা হাজার হাজার প্রমদা স্ত্রী আছেন। পরদারাভিমর্ষাত্তু নান্যৎ পাপতরং মহৎ। প্রমদানাং সহস্রাণি তব রাজন্ পরিগ্রহে।। তাই, মারীচের অনুরোধ — নিজের পত্নীতে বিশ্বস্ত থেকে, রাবণ, স্বরাক্ষসবংশ, সম্মান, সমৃদ্ধি, রাজ্য, নিজের অভীষ্ট জীবন, সুন্দরী স্ত্রীদের এবং মিত্রবর্গকে রক্ষা করুন। যদি আপনি চিরকাল এগুলি উপভোগ করতে ইচ্ছুক হন, তাহলে রামের বিরাগভাজন হয়ে কোনও কাজ করবেন না। ভব স্বদারনিরতঃ স্বকুলং রক্ষ রক্ষসাম্। মানং বৃদ্ধিঞ্চ রাজ্যঞ্চ জীবিতঞ্চেষ্টমাত্মনঃ।। কলত্রাণি চ সৌম্যানি মিত্রবর্গং তথৈব চ।যদিচ্ছসি চিরং ভোক্তুং মা কৃথা রামবিপ্রিয়ম্।। মারীচ রাক্ষসরাজ রাবণকে সতর্ক করলেন, মারীচের মতো শুভাকাঙ্খীর নিষেধ সত্ত্বেও যদি রাবণ জোর করে সীতাকে ধর্ষণ করেন, তবে রামের বাণে তাঁর শক্তি ক্ষয় হবে। নিহত রাবণ সবান্ধবে যমালয়ে যাবেন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৪: বুনো তেঁতুল, বাঘা ওল

রামের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ রাক্ষসরাজ রাবণ, ভগিনী শূর্পনখার প্ররোচনায় রামপত্নী সীতাকে অপহরণ করবার উদ্দেশ্য নিয়ে উপস্থিত হল মায়াবী রাক্ষস মারীচের কাছে। মারীচ, মায়াবলে যে কোনও রূপ ধারণ করতে পারে। তাই রাবণ তার সাহায্যপ্রার্থী হল। রাবণের পরিকল্পনা-অনুযায়ী মারীচ রূপার বিন্দুতে চিত্রিত সোনার হরিণের রূপ ধারণ করে সীতাকে মুগ্ধ করবে। সীতার অনুরোধে হরিণটিকে অপহরণের জন্য রাম ও লক্ষ্মণ হরিণটিকে অনুসরণ করে দূরে যাবেন যখন, তখন ছদ্মবেশী রাবণ সীতাকে অপহরণ করবেন। মারীচ ইতিমধ্যেই রাবণের অসদুদ্দেশ্য নাকচ করেছেন। এই প্রস্তাব নিয়ে প্রথমবার এসেছিলেন রাবণ। তখন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রামপত্নীকে অপহরণ করে রামের মনোবল ভেঙ্গে দেবেন। তখন হতোদ্যম রামকে সে পরাস্ত করবে। শূর্পনখা রাবণের কাছৈ সীতার অপরূপ সৌন্দর্য বর্ণনা করে সীতাকে অপহরণ এবং ধর্ষণ করতে রাবণকে প্ররোচিত করেছিল। তাড়কাপুত্র মারীচ রামের ক্ষমতা, শক্তি এবং গুণাগুণসম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবহিত। তাই ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে যেমন ভয় পায় তেমনই রামের সঙ্গে সংঘাতের নৈরাশ্যজনক পরিণামের বিবরণ তার স্মরণে এসেছিল। একজন শত্রু যখন প্রতিপক্ষের গুণকীর্তন করে তখন তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।রামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনাপ্রসঙ্গে রাবণ বলেছিলেন, রাম কেমন? পিত্রা নিরস্তঃ ক্রুদ্ধেন সভার্য্যং ক্ষীণজীবিতঃ। স হন্তা তস্য সৈন্যস্য রামঃ ক্ষত্রিয়পাংসনঃ।। অশীলঃ কর্কশস্তীক্ষ্ণো মূর্খো লুব্ধ২জিতেন্দ্রিয়ঃ।।ত্যক্তধর্ম্মাত্মা ভূতানামহিতে রতঃ।। রাম ক্রুদ্ধ পিতার ত্যাজ্যপুত্র। সস্ত্রীক বনে নির্বাসিত হয়েছে সে। সেই ক্ষত্রিয়কুলাঙ্গারের শক্তিক্ষয় হয়েছে। সে রাক্ষসসেনাদের হত্যাকারী। চরিত্র বলে তার কিছুই নেই। তার স্বভাব কর্কশ, উগ্র। সে মূর্খ, লোভী। তার ইন্দ্রিয়সংযম, ধর্মবোধ নেই। অধার্মিক রাম সর্বদাই প্রাণীদের অনিষ্টকারী।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগ্রহীত।

মারীচের বিবরণ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এতটা বৈষম্যময় পার্থক্য কেন? রাবণসম্বন্ধে মারীচের মূল্যায়ন — রাবণ স্বেচ্ছাচারী, দুশ্চরিত্র, দুর্বুদ্ধিপ্রসূত পাপমন্ত্রণায় যুক্ত একজন রাজা। তদ্বিধঃ কামবৃত্তো হি দুঃশীলঃ পাপমন্ত্রিতঃ।। এমন রাজা আত্মীয়পরিজন-সহ নিজের বিনাশের কারণ হন। যে কোনও ক্ষমতার শীর্ষে যিনি আছেন তার আচরণে স্বেচ্ছাচারিতার কোনও স্থান নেই,যেহেতু তিনি সাধারণের দৃষ্টিতে আদর্শস্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। মানুষ ও রাক্ষসদের ক্ষেত্রে বোধ হয় এক নিয়মই প্রযোজ্য, প্রাচীন ও আধুনিক উভয় যুগেও সেটাই কাঙ্খিত। একই কারণে রাজাচরিত্র নিষ্কলঙ্ক হওয়া আবশ্যক। সুমন্ত্রণা রাজার সাফল্যের মূল ভিত্তি। রাবণকে মন্ত্রণা দিয়েছে যারা, তাদের দুজনের মধ্যে একজন অকম্পন নামে এক রাক্ষস। সে সীতাহরণের দুরভিসন্ধির পরামর্শদাতা। দ্বিতীয় মন্ত্রণাদাত্রী রাবণের ভগিনী শূর্পনখা। নারীলোলুপ রাবণের কানে ধর্ষণের বিষমন্ত্র দিয়েছে শূর্পনখা। মন্ত্রণার উদ্দেশ্য শুভ হতে পারে যা গ্রহণযোগ্য। আবার অশুভবুদ্ধিপ্রাণিত মন্ত্রণা ধ্বংসাত্মক হতে পারে। দুটির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে গ্রহীতার বিবেচনা, বিবেকবোধ এবং বিচারশক্তির ওপরে। রাবণ দুর্বুদ্ধিমূলক পরামর্শ গ্রহণ করেছে। কারণ গ্রহীতার মনের আধারটি শক্তপোক্ত নয়, চারিত্রিক ভিত দুর্বল, নিজের দুষ্টবুদ্ধির সপক্ষে রাবণ সেগুলিকে গ্রহণ করে বাস্তবে রূপায়িত করতে উদ্যোগী হয়েছে। তার পারিপার্শ্বিকে উপস্থিত কোনও সুপরামর্শদাতা ছিলেন না এমন নয়। মারীচ রাবণকে উপদেশ দিয়েছে — স সর্ব্বৈঃ সচিবৈঃ সার্দ্ধং বিভীষণপুরস্কৃতৈঃ। মন্ত্রয়িত্বা সধর্ম্মিষ্ঠং কৃত্বা নিশ্চয়মাত্মনঃ।। বিভীষণকে সামনে রেখে মন্ত্রীদের সঙ্গে ধর্মসঙ্গত মন্ত্রণা করে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত। রাবণের নারীলোলুপ সত্তার, সীতাহরণের উদ্দেশ্য হয়েছে শুধু নারীসৌন্দর্য-উপভোগমাত্র। সীতাহরণের আগেই রাবণ নিজেকে ধর্ষক প্রমাণ করেছে। বস্তুত যে কোনও দুরূহ সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা ব্যক্তিবিশেষের মানসিকতার ওপরে নির্ভর করে অর্থাৎ তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবার, স্বজন, সমাজ, রাষ্ট্র। এমন কি দৃষ্টান্তমূলক ঘটনারূপে সেটি বিশ্বসাহিত্যেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে। রাবণের সীতাহরণের সিদ্ধান্ত তেমনই তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা, মহাকাব্যের কাহিনির পটপরিবর্তনের সূচনা এখানেই। রাবণ ও রামের সংঘাতের শুরু, একটি নাটকীয় পালাবদল, যার প্রভাবে আজও আচ্ছন্ন ভারতীয় জীবন। —চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content