
ছবি : প্রতীকী।
নন্দগোপা-ই ভবিষ্যতের যশোদা, দেবগর্ভা দেবকী। ক্রমে ক্রমে তাঁদের দশটি করে কন্যা ও পুত্র জন্ম নিল। দেবগর্ভার পুত্রদের পালন করতে লাগলেন নন্দগোপা। নন্দগোপার কন্যারা লালিত হতে থাকল দেবগর্ভার কাছে। এই অতি গোপনীয় সত্য দুই মাতা ও দুই পিতা-ই জানলেন কেবল। আর কেউ এই রহস্যের বিন্দুমাত্র জানতেন না। ক্রমে কাল অতিবাহিত হতে থাকল তার নিজের বেগে। শিশুগুলি এখন পরিণত যুবক, যুবতী।
এই বেগবান সময়-ই সবথেকে বলবান। কালস্রোতের সামনে সকলই তুচ্ছ, খড়কুটো। এই দশটি শিশুপুত্র যুবক হল। প্রথম দু’জনের নাম বাসুদেব ও বলদেব। বাসুদেব জ্যেষ্ঠ। তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ পুত্রের নাম যথাক্রমে চন্দ্রদেব, সূর্যদেব, অগ্নিদেব, বরুণদেব। শেষ চারজন যথাক্রমে অর্জুন, প্রদ্যুম্ন, ঘটপণ্ডিত ও অঙ্কুর। আমাদের এই কাহিনিতে ক্রমে ক্রমে মুখ্য হয়ে উঠবেন জ্যেষ্ঠ বাসুদেব এবং ঘটপণ্ডিত।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৭ : ঘটজাতক/২ : তাঁর চরণধ্বনি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৫: কৃষ্ণবিরোধিতার প্রসঙ্গে ভীষ্মের বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও কে স্মরণীয়? শিশুপাল? না ভীষ্ম?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৫: শিয়রচাঁদা

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫১: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ৩১
সমাজ তাঁদের অন্ধকবিষ্ণুদাসের পুত্র বলেই জানতো। এই দশ ভাই “দাস দশভেয়ে” এই সমষ্টিনামে পরিচিত ছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এঁরা শৌর্য ও বীর্যে অতুলনীয় হলেন। তাঁরা বলিষ্ঠ হলেন। এবং হয়ে উঠলেন নিষ্ঠুর। সকলে এখন দস্যুবৃত্তি অবলম্বন করে সমাজের সকলের ত্রাস হয়ে উঠলেন।
সাধারণ মানুষ নির্যাতিত হতো তো বটেই, রাজার জন্য প্রেরিত উপঢৌকন পর্যন্ত তাঁরা লুঠ করতে বিন্দুমাত্র ভীত হতেন না। তাঁদের উপদ্রবে অতিষ্ঠ জনগণ বারংবার রাজার কাছে করুণাভিক্ষা করে—
“দোহাই রাজামশাই! দশভেয়েদের জ্বালায় তো আর বাঁচি না! দেশ তো ছারখার হয়ে গেল প্রভু!”
রাজা অন্ধকবিষ্ণুদাসকে ডাকিয়ে জানতে
চাইলেন —
“কী হে বিষ্ণুদাস! ছেলেদের দিয়ে লুঠ করাচ্ছো কেন? ওদের থামাও।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! দশভেয়েরা দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করলো না। আরও দু’তিন বার তারা এমনভাবে অভিযুক্ত হল।
রাজা তখন বেজায় চটে গিয়ে আবার অন্ধকবিষ্ণুকে ডাকলেন। এবার আরেকটু ভয় না দেখালে এরা আয়ত্তে আসবে না।
“শোনো। ভাল কথায় কাজ হবে না বুঝলাম। এবার তোমায় শূলে চাপাব। এসব দেখে চুপচাপ বসে থাকা চলে না।”
সাধারণ মানুষ নির্যাতিত হতো তো বটেই, রাজার জন্য প্রেরিত উপঢৌকন পর্যন্ত তাঁরা লুঠ করতে বিন্দুমাত্র ভীত হতেন না। তাঁদের উপদ্রবে অতিষ্ঠ জনগণ বারংবার রাজার কাছে করুণাভিক্ষা করে—
“দোহাই রাজামশাই! দশভেয়েদের জ্বালায় তো আর বাঁচি না! দেশ তো ছারখার হয়ে গেল প্রভু!”
রাজা অন্ধকবিষ্ণুদাসকে ডাকিয়ে জানতে
চাইলেন —
“কী হে বিষ্ণুদাস! ছেলেদের দিয়ে লুঠ করাচ্ছো কেন? ওদের থামাও।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! দশভেয়েরা দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করলো না। আরও দু’তিন বার তারা এমনভাবে অভিযুক্ত হল।
রাজা তখন বেজায় চটে গিয়ে আবার অন্ধকবিষ্ণুকে ডাকলেন। এবার আরেকটু ভয় না দেখালে এরা আয়ত্তে আসবে না।
“শোনো। ভাল কথায় কাজ হবে না বুঝলাম। এবার তোমায় শূলে চাপাব। এসব দেখে চুপচাপ বসে থাকা চলে না।”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৩: জোড়া আন্তোনিওর রহস্য

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
অন্ধকবিষ্ণুদাস দেখলেন মহাবিপদ। শিরে সংক্রান্তি যাকে বলে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম। যঃ পলায়তে সঃ জীবতি। পুরাণের নন্দ এমন ঝামেলায় পড়েননি হয়তো, তবে নন্দগোপার স্বামী অন্ধকবিষ্ণু বেজায় বিপদে পড়লেন।
পরে যিনি যদুকুলপতি হবেন, বৃষ্ণি, অন্ধক, যদু ইত্যাদি বহু শক্তিমান প্রাচীন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর প্রবাদপুরুষ কৃষ্ণের পূর্বরূপ বাসুদেব সহ আরও নয় ভাইয়ের পালকপিতা অন্ধকবিষ্ণু রাজার কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। সটান বলে দিলেন—
“মহারাজ! আমাকে রক্ষা করুন। এরা আমার ছেলে-ই নয়। উপসাগরের পুত্র এরা।”
পরে যিনি যদুকুলপতি হবেন, বৃষ্ণি, অন্ধক, যদু ইত্যাদি বহু শক্তিমান প্রাচীন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর প্রবাদপুরুষ কৃষ্ণের পূর্বরূপ বাসুদেব সহ আরও নয় ভাইয়ের পালকপিতা অন্ধকবিষ্ণু রাজার কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। সটান বলে দিলেন—
“মহারাজ! আমাকে রক্ষা করুন। এরা আমার ছেলে-ই নয়। উপসাগরের পুত্র এরা।”
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪
খানিক শ্লেষ-ও কি মেশানো ছিল তাঁর কথায়? উপসাগরের বৃত্তান্ত পাঠক জেনেছেন আগেই। রাজার কাছে সকল সত্য তিনি আদ্যন্ত প্রকাশ করলেন।
রাজার সঙ্গে চালাকি চলে না। সমাজে চোরের মায়ের দুর্নাম আছে। তস্করদের পিতার ডাক পড়ে যদি রাজার সভায় তবে তাঁর পাশে দাঁড়াবে কে? রাজদ্বার ইত্যাদি স্থানে যে থাকে সে-ই নাকি প্রকৃত বন্ধু। তাই বুঝি শাস্ত্রের উপদেশ মাথায় রেখে অন্ধকবিষ্ণু নিজের পাশেই নিজে দাঁড়ালেন। আগুন সম্মুখবর্তী যাকে পায় তাকেই গ্রাস করে। কিন্তু রাজরোষ বড়-ই বিভীষণ। সেই ক্রোধাগ্নি “সপশুদ্রব্যসঞ্চয়” সকল কিছুকেই নিমেষে ভস্মসাৎ করে দেয়।
বিষ্ণুদাসের কথা শুনে কংসের গায়ে কাঁটা দিল। এরা তাঁর ভাগিনেয়-ই বটে! ভাগ নয়, পুরোটাই নিয়ে নেবে এটাই তো বিধির বিধান ছিল। বহুদিনের চাপা পড়া একটা আগুন আজ যেন ছাইগাদা ঠেলে উঠে আসতে চাইছে। এবার কি “কংসমামা” হয়ে ওঠার ক্ষণ আসন্ন তবে? সত্যিই! কালের গতি বড় বিচিত্র!
রাজার সঙ্গে চালাকি চলে না। সমাজে চোরের মায়ের দুর্নাম আছে। তস্করদের পিতার ডাক পড়ে যদি রাজার সভায় তবে তাঁর পাশে দাঁড়াবে কে? রাজদ্বার ইত্যাদি স্থানে যে থাকে সে-ই নাকি প্রকৃত বন্ধু। তাই বুঝি শাস্ত্রের উপদেশ মাথায় রেখে অন্ধকবিষ্ণু নিজের পাশেই নিজে দাঁড়ালেন। আগুন সম্মুখবর্তী যাকে পায় তাকেই গ্রাস করে। কিন্তু রাজরোষ বড়-ই বিভীষণ। সেই ক্রোধাগ্নি “সপশুদ্রব্যসঞ্চয়” সকল কিছুকেই নিমেষে ভস্মসাৎ করে দেয়।
বিষ্ণুদাসের কথা শুনে কংসের গায়ে কাঁটা দিল। এরা তাঁর ভাগিনেয়-ই বটে! ভাগ নয়, পুরোটাই নিয়ে নেবে এটাই তো বিধির বিধান ছিল। বহুদিনের চাপা পড়া একটা আগুন আজ যেন ছাইগাদা ঠেলে উঠে আসতে চাইছে। এবার কি “কংসমামা” হয়ে ওঠার ক্ষণ আসন্ন তবে? সত্যিই! কালের গতি বড় বিচিত্র!
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?
ভীতচকিত রাজা অমাত্যদের ডেকে জানতে চাইলেন। কী উপায়ে ধরা যায় এই দশভাই দশভেয়েদের? অমাত্যরা সকলে মিলে একটা সুপরামর্শ দিলেন।
“মহারাজ! এই দুরাত্মার দলে সকলেই মল্লযোদ্ধা। আপনি এক কাজ করুন। নগরে একটা মল্লযুদ্ধের ঘোষণা করে দিন। এই স্পর্ধার প্রতিযোগিতায় এরা না এসে পারবে না। আর যুদ্ধমণ্ডলে আসলেই এদের ধরে আমরা নিহত করবো।”
ব্যস! এ আর এমন কী কঠিন কাজ!
তবে কি এখানেই দশভেয়েদের যাবতীয় ঔদ্ধত্য কিংবা দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের অবসান? জানবো আমরা, পরের পর্বটিতে।—চলবে।
“মহারাজ! এই দুরাত্মার দলে সকলেই মল্লযোদ্ধা। আপনি এক কাজ করুন। নগরে একটা মল্লযুদ্ধের ঘোষণা করে দিন। এই স্পর্ধার প্রতিযোগিতায় এরা না এসে পারবে না। আর যুদ্ধমণ্ডলে আসলেই এদের ধরে আমরা নিহত করবো।”
ব্যস! এ আর এমন কী কঠিন কাজ!
তবে কি এখানেই দশভেয়েদের যাবতীয় ঔদ্ধত্য কিংবা দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের অবসান? জানবো আমরা, পরের পর্বটিতে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

















