কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

দ্বীপী হল চিতাবাঘ। মেষশাবক ও নেকড়ের কথোপকথনে এই কাহিনিটি সুপরিচিত। বোধিসত্ত্ব এই গল্পের কোনও মুখ্য চরিত্র নন। তিনি দ্রষ্টা কেবল। মগধের এক ধনাঢ্যকুলে জন্ম নিয়ে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বৈরাগ্য অবলম্বন করেছেন। প্রব্রজ্যা নিয়ে হিমালয়ে বাস করেছেন। তারপর সেই বিজন হিমগিরি ত্যাগ করে অন্য কোনও গিরিপথের কাছে বাস করছেন দেহের প্রয়োজনীয় লবণ ও অম্লসেবনের জন্য। নির্মাণ করেছেন পর্ণশালা, বাস করছেন সেখানে। কাছেই পশুপালকরা ছাগ চরায়। এমন করেই কাটে দিন। এমন-ই একটি দিনের কথা।
সেদিন একটি চিতাবাঘ ছাগের পালের শেষে পড়ে যাওয়া এক ছাগীকে লক্ষ্য করল। মনে মনে প্রলুব্ধ হল সে। কী করতে হবে দ্রুত স্থির করল। চলে এল পর্বতসঙ্কটের সঙ্কীর্ণ দ্বারপথ রূদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার অভিপ্রায় ছাগীকে হত্যা করে খাবে। তার অভিপ্রায় পূর্ণ-ই হয়েছিল, তবুও এ কাহিনিতে কিছু বক্তব্য থেকে যায়।

ছাগী দেখল, এ যে মহাবিপদ। আজ মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু একটা উপায় অবলম্বন করা যায়। মিষ্টালাপে একে যদি বশে আনা যায়! তবে প্রাণটা হয়তো রক্ষা পায়! সে এগিয়ে এসে বলল “মামা! মা তোমার খবর নিতে পাঠাল। কেমন আছো বল, তোমার সুখেই আমাদের সুখ যে!”

চিতা বাঁকা হেসে ভাবল, বটে! এই ছাগীটার চালাকি দেখেছো! কিন্তু ও তো আর জানে না আমি কেমন ভয়ানক! তারপর মতলব এঁটে বলল— “তুই চার পায়ে আমার লেজ মাড়ালি কেন রে! এখন মামা ডাকলে ছাড় পাবি ভাবছিস? দাঁড়া তোর হচ্ছে।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

রথযাত্রা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৬ : আলোচনার টেবিলে

ছাগী বলল, “সে আবার কী কথা! আমাতে তোমাতে মুখোমুখি দেখা হল, এলাম তোমার সামনে দিয়ে, তাহলে তোমার লেজে পা পড়ল কীভাবে?”
“ওরে হতভাগী! এমন স্থান নেই যেখানে আমার লেজ পড়ে না। দেখ আমার লেজটা চোখ চেয়ে, কত বড়! পৃথিবীর সকল পাহাড় পর্বত জুড়ে এটা আছে, তুই সেটাই মাড়িয়ে দিলি তো? এবার দেখ কত ধানে কত চাল, যেমন কর্ম তেমন ফল পাবি এবার।”

ছাগী দেখল, এ মিষ্টি কথায় ভেজার পাত্র নয়, এখন সময় হয়েছে রুখে দাঁড়ানোর, শত্রুর সঙ্গে শত্রুতার।

সে বলল, “মা, বাবা, ভাই সকলেই আমাকে সাবধান করেছিল এই বলে যে, দুষ্টের লেজ অনেক বড়, তার আকার বিশাল। আমি তা দেখতেই এখানে উড়ে চলে এলাম, উড়ে এসেছি, তাই লেজ মাড়ালাম কী করে গো?”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৬৮: রামায়ণে পরস্ত্রীহরণের সিদ্ধান্তে বীরত্বের প্রকাশ নেই, আছে অনেক মৃত্যুর আবাহনবার্তা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৩: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৩

ছাগী ভেবেছিল, বাঘ তার এমন কথায় খানিক থমকাবে বুঝি। কিন্তু যা ভাবা হয় তা ঘটে না অনেক সময়। দুষ্টের ছলের অভাব ঘটে না।

বাঘ সদর্পে বলল, “জানি, জানি। সেসব আমার জানা আছে। তুই উড়ে এসেছিস তা তো আমার জানা, আর তখন তোকে দেখে ভয় পেয়ে বনের হরিণ যতো সব পালিয়েছে এদিক ওদিক। তুই আমার খাবার নষ্ট করেছি, এবার আমি তোকেই খাব।”
আরও পড়ুন:

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…

ছাগী যদি চলে ডালে ডালে, বাঘ চলে পাতায় পাতায়। ছাগীর মিথ্যাকে সেও ততোধিক মিথ্যায় বেঁধেছে। কিন্তু এ যুক্তি প্রতিযুক্তির আসর নয়। বরং, তর্কের আড়ালে ক্ষমতার আস্ফালনের রঙ্গভূমি। এ সেই জলঘোলা করার গল্প। তুমি যদি না করে থাকো, তবে তোমার ঊর্ধ্বতন চোদ্দপুরুষের কেউ না কেউ করেছে। মোট কথা, জল ঘোলা হয়েছে, তুমিও তার দায় নিতে বাধ্য, কারণ আমি চাইছি যে দায়টা তোমার হোক।

তাই চিতাবাঘের এমন যুক্তি খণ্ডনের উপায় আর থাকে না। ছাগী প্রাণভয়ে আর্তনাদ করে, প্রাণভিক্ষা চায়। কিন্তু চিতা তার লক্ষ্যে অবিচল থাকে। সে ছাগীর কাতর ক্রন্দনে কর্ণপাত না করে তার ঘাড় ভেঙে তাকে হত্যা করে উদরসাৎ করল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

এই কাহিনি জানায় যে, দুষ্টকে কখনোই আনুকূল্য বা মধুর বচনে তুষ্ট করা যায় না। স্বভাবদুষ্ট যে, সে তার প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবেই ছলে বলে কৌশলে। দুষ্ট যে, সে ন্যায় মানে না। মানে না কোনও সত্যধর্ম। তার নীতি একটাই — দুষ্কর্ম। তাই এ গল্পের মূল তত্ত্বটি হল এই যে, যে দুষ্টের স্বভাব অজ্ঞাত নয়, তার কাছে যথাসাধ্য পরাক্রম প্রদর্শন-ই কর্তব্য। তার ফল ইতি বা নেতি যা-ই হোক, পরিত্রাণের এই একটিই উপায়। যদি পরিত্রাণ আসে, তবে তা আসবে এই পথেই। ছাগী এই সংঘাতটিতে বিপন্ন হয়েছে। কিন্তু অনায়াসে সে শত্রুর কবলগ্রস্ত হয়নি। শত্রুর স্বরূপ যে তার অজ্ঞাত নয়, এবং শত্রুতাতেও সে ভীত, শঙ্কিত বা লজ্জিত নয় তা সে মৃত্যুর আগে বুঝিয়ে দিতে পেরেছে। দুষ্টের স্বরূপ চিনে ওঠা যেমন ধীমান মানুষের দায়িত্ব, তেমন-ই তার থেকে পরিত্রাণের উপায় রূপে তঞ্চকতার আশ্রয় না নিয়ে তাকে নিরাশঙ্ক মনে প্রতিরোধের দায়িত্বটিও তার। সহায়, অবলম্বন না-ই বা থাকল, হীনবল মানুষের আত্মশক্তি বিগত হলে তার প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকে না, তার পতন অনিবার্য হয়। এ কাহিনি সেই প্রতিরোধের শিক্ষা দেয় যা নিষ্ফল ব্যর্থ হলেও অন্যায় নয়। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content