
ছবির একটি দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত।
একঝলকে
ছবি : নিশীথে
পরিচালনা : অগ্রগামী
ছবির নায়িকা : সুপ্রিয়া চৌধুরী
উত্তম কুমার অভিনীত চরিত্রের নাম : দক্ষিণাচরণ
মুক্তির তারিখ : ০৮.০৩.১৯৬৩
প্রেক্ষাগৃহ : মিনার, বিজলী ও ছবিঘর
‘নিশীথে’ প্রেম, অপরাধবোধ ও মানবিক সংকটের এক সংবেদনশীল চলচ্চিত্র। উত্তম কুমার অভিনীত এক স্মরণীয় বাংলা ছবির সমালোচনামূলক পর্যালোচনা। বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগে মহানায়ক উত্তম কুমার একের পর এক বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়ক্ষমতার অসাধারণ পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি ছিল রোম্যান্টিক নায়কের ইমেজ, কিন্তু সেই পরিচয়ের বাইরেও তিনি বহু জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সেই ধরনের ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘নিশীথে’।
পরিচালক অগ্রগামী নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়; এটি মানুষের মনের অন্ধকার, অতীতের অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক গভীর অনুসন্ধান। ছবিটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়া এক মনস্তাত্ত্বিক নাটক, যেখানে প্রত্যেক চরিত্র নিজের অতীতের সঙ্গে লড়াই করে। কাহিনির প্রেক্ষাপট আলোচনা করলে দেখা যায়, ‘নিশীথে’ নামটির মধ্যেই এক ধরনের রহস্য ও বিষণ্ণতার ইঙ্গিত রয়েছে। নিশীথ অর্থ গভীর রাত্রি—যে সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি নিজের সঙ্গে একা হয়ে যায়। ছবির গল্পও অনেকটা সেই রাত্রির মতোই; বাইরে শান্ত, কিন্তু ভেতরে প্রবল অস্থিরতা।
পরিচালক অগ্রগামী নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়; এটি মানুষের মনের অন্ধকার, অতীতের অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক গভীর অনুসন্ধান। ছবিটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়া এক মনস্তাত্ত্বিক নাটক, যেখানে প্রত্যেক চরিত্র নিজের অতীতের সঙ্গে লড়াই করে। কাহিনির প্রেক্ষাপট আলোচনা করলে দেখা যায়, ‘নিশীথে’ নামটির মধ্যেই এক ধরনের রহস্য ও বিষণ্ণতার ইঙ্গিত রয়েছে। নিশীথ অর্থ গভীর রাত্রি—যে সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি নিজের সঙ্গে একা হয়ে যায়। ছবির গল্পও অনেকটা সেই রাত্রির মতোই; বাইরে শান্ত, কিন্তু ভেতরে প্রবল অস্থিরতা।
কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে এমন কিছু মানুষ, যাদের জীবন আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক হলেও অন্তরে তারা নানা গোপন ক্ষত বহন করে চলেছে। অতীতের একটি ঘটনা তাঁদের বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করে এবং ধীরে ধীরে সেই চাপা সত্য প্রকাশ পেতে শুরু করে। ছবিটি রহস্যনির্ভর নয়, কিন্তু এর কাহিনি এমনভাবে নির্মিত যে দর্শক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জানতে চান, চরিত্রগুলির জীবনে আসলে কী ঘটেছিল এবং তারা কেন এত অস্থির।
উত্তম কুমারের চরিত্র ও অভিনয় এ ছবিতে উত্তম কুমার এমন এক মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি বাহ্যিকভাবে স্থির ও সংযত হলেও ভেতরে গভীর যন্ত্রণায় ভুগছেন। উত্তম কুমারের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সংযম। তিনি কখনও অকারণে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটাতেন না। বরং চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং শরীরী ভাষার মাধ্যমে চরিত্রের মনের অবস্থাকে প্রকাশ করতেন।
উত্তম কুমারের চরিত্র ও অভিনয় এ ছবিতে উত্তম কুমার এমন এক মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি বাহ্যিকভাবে স্থির ও সংযত হলেও ভেতরে গভীর যন্ত্রণায় ভুগছেন। উত্তম কুমারের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সংযম। তিনি কখনও অকারণে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটাতেন না। বরং চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং শরীরী ভাষার মাধ্যমে চরিত্রের মনের অবস্থাকে প্রকাশ করতেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৭: ধেড়ে ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৪ :কালাদেও নয়?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক
‘নিশীথে’-তে সেই গুণটি পূর্ণমাত্রায় দেখা যায়। তাঁর চরিত্রটি ক্রমাগত অতীতের স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে দোল খেতে থাকে। এ মানসিক দ্বন্দ্বকে তিনি এত স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে দর্শক সহজেই চরিত্রটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। বিশেষত নীরব মুহূর্তগুলিতে তাঁর অভিনয় অসাধারণ। সংলাপ ছাড়াই তিনি চরিত্রটির যন্ত্রণা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন।
নায়িকা এবং সহ-অভিনেতাদের অবদানও ছবিটির অন্যতম সম্পদ। ছবির নায়িকা চরিত্রটি কাহিনির আবেগঘন দিককে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি কেবল প্রেমের প্রতীক নন; বরং মানবিক সহমর্মিতা এবং ক্ষমার এক প্রতিরূপ। নায়িকার সঙ্গে উত্তম কুমারের সম্পর্কের মধ্যে প্রচলিত বাংলা ছবির রোমান্টিক আবেগ থাকলেও সেটি কখনও গল্পের মূল বিষয় হয়ে ওঠে না। বরং তাঁদের সম্পর্ক চরিত্রগুলির মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
নায়িকা এবং সহ-অভিনেতাদের অবদানও ছবিটির অন্যতম সম্পদ। ছবির নায়িকা চরিত্রটি কাহিনির আবেগঘন দিককে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি কেবল প্রেমের প্রতীক নন; বরং মানবিক সহমর্মিতা এবং ক্ষমার এক প্রতিরূপ। নায়িকার সঙ্গে উত্তম কুমারের সম্পর্কের মধ্যে প্রচলিত বাংলা ছবির রোমান্টিক আবেগ থাকলেও সেটি কখনও গল্পের মূল বিষয় হয়ে ওঠে না। বরং তাঁদের সম্পর্ক চরিত্রগুলির মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ছবি : সংগৃহীত।
সহ-অভিনেতারাও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের চরিত্র কাহিনির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলা চলচ্চিত্রে প্রেম সাধারণত আনন্দ, মিলন ও আবেগের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু ‘নিশীথে’-তে প্রেমের উপস্থাপনা ভিন্ন। এখানে প্রেম মানে শুধু একে অপরকে পাওয়া নয়; বরং একজন মানুষের অতীত, দুর্বলতা এবং ভুলকে মেনে নেওয়া।
এ ছবিতে প্রেমের সঙ্গে ক্ষমা ও আত্মত্যাগের ধারণা জড়িয়ে আছে। ফলে সম্পর্কগুলি অনেক বেশি বাস্তব ও মানবিক মনে হয়। ছবিটির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ‘নিশীথে’-র সবচেয়ে বড় শক্তি এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। চলচ্চিত্রটি দেখায় যে মানুষ কখনও কখনও নিজের অতীত থেকে পালাতে চাইলেও সম্পূর্ণভাবে তা পারে না। স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং অনুশোচনা তাকে বারবার তাড়া করে বেড়ায়।
এ ছবিতে প্রেমের সঙ্গে ক্ষমা ও আত্মত্যাগের ধারণা জড়িয়ে আছে। ফলে সম্পর্কগুলি অনেক বেশি বাস্তব ও মানবিক মনে হয়। ছবিটির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ‘নিশীথে’-র সবচেয়ে বড় শক্তি এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। চলচ্চিত্রটি দেখায় যে মানুষ কখনও কখনও নিজের অতীত থেকে পালাতে চাইলেও সম্পূর্ণভাবে তা পারে না। স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং অনুশোচনা তাকে বারবার তাড়া করে বেড়ায়।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৯ : জলসাঘর—অস্তশিখর

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৬: রাক্ষস খরের নিধনের নিরিখে রামচন্দ্রের মূল্যায়ন
উত্তম কুমারের চরিত্রটি এই মানসিক অবস্থার প্রতীক। তিনি অতীতের একটি ঘটনার ভার বহন করে চলেছেন এবং সেই ভারই তাঁর বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করছে। ছবিটি প্রশ্ন তোলে—মানুষ কি সত্যিই নিজের ভুল থেকে মুক্ত হতে পারে? নাকি অতীতের ছায়া সবসময় তাকে অনুসরণ করে? এই প্রশ্নগুলিই ছবিকে সাধারণ পারিবারিক নাটকের বাইরে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে চিত্রনাট্যের শক্তিতেও ছবিটি অনন্য। ‘নিশীথে’-র চিত্রনাট্য অত্যন্ত সুগঠিত। গল্পটি ধীরে ধীরে এগোয় এবং প্রতিটি দৃশ্য চরিত্রগুলির মানসিক অবস্থাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। চিত্রনাট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সংযম। কোথাও অপ্রয়োজনীয় নাটকীয়তা নেই। ঘটনাগুলি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। ফলে দর্শক চরিত্রগুলির সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত হতে পারেন।
অন্যদিকে চিত্রনাট্যের শক্তিতেও ছবিটি অনন্য। ‘নিশীথে’-র চিত্রনাট্য অত্যন্ত সুগঠিত। গল্পটি ধীরে ধীরে এগোয় এবং প্রতিটি দৃশ্য চরিত্রগুলির মানসিক অবস্থাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। চিত্রনাট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সংযম। কোথাও অপ্রয়োজনীয় নাটকীয়তা নেই। ঘটনাগুলি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। ফলে দর্শক চরিত্রগুলির সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত হতে পারেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৩ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /২

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
অগ্রগামীর পরিচালনা এ ছবির অন্যতম প্রধান সম্পদ। তিনি জানতেন যে এই গল্পের আসল শক্তি চরিত্রগুলির মনের ভেতরে। তাই তিনি বাহ্যিক ঘটনার চেয়ে অভ্যন্তরীণ আবেগকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। পরিচালনার আরেকটি বড় গুণ হলো পরিবেশ নির্মাণ। পুরো ছবিজুড়ে এক ধরনের বিষণ্ণ অথচ কাব্যিক আবহ বিরাজ করে।
এই আবহই ছবির নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ষাটের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল এবং ‘নিশীথে’-তেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গানগুলি কাহিনির আবেগকে গভীর করেছে। সেগুলি কখনও গল্পের গতি থামিয়ে দেয় না; বরং চরিত্রগুলির অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। আবহসঙ্গীতও অত্যন্ত সংযত এবং কার্যকর। বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ ও আবেগঘন দৃশ্যগুলিতে সঙ্গীতের ব্যবহার প্রশংসনীয়।
এই আবহই ছবির নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ষাটের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল এবং ‘নিশীথে’-তেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গানগুলি কাহিনির আবেগকে গভীর করেছে। সেগুলি কখনও গল্পের গতি থামিয়ে দেয় না; বরং চরিত্রগুলির অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। আবহসঙ্গীতও অত্যন্ত সংযত এবং কার্যকর। বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ ও আবেগঘন দৃশ্যগুলিতে সঙ্গীতের ব্যবহার প্রশংসনীয়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭৭: আকাশ এখনও মেঘলা
এবার আসা যাক চিত্রগ্রহণ প্রসঙ্গে। সাদা-কালো চলচ্চিত্র হিসেবে ‘নিশীথে’-র দৃশ্যগ্রহণ অত্যন্ত নান্দনিক। আলো-ছায়ার ব্যবহার ছবির মনস্তাত্ত্বিক আবহকে আরও শক্তিশালী করেছে। অনেক দৃশ্যে ছায়ার ব্যবহার চরিত্রগুলির অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ক্লোজ-আপ শটগুলিতে উত্তম কুমারের মুখাভিনয় বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। চিত্রগ্রহণ ছবির আবেগকে গভীরতর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সামাজিক প্রেক্ষাপটে যদিও ছবির মূল বিষয় ব্যক্তিগত সংকট, তবুও এর মধ্যে সমকালীন সমাজের প্রতিফলন দেখা যায়। মানুষের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিগত দায়িত্ব—এই বিষয়গুলি ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ছবিটি দেখায় যে সমাজের চাপ অনেক সময় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
উত্তম কুমারের ক্যারিয়ারে ছবিটির গুরুত্ব অপরিসীম। উত্তম কুমারের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে বহু জনপ্রিয় ছবি রয়েছে। তবে ‘নিশীথে’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি তাঁর অভিনয়ের এক ভিন্ন দিক তুলে ধরে। এখানে তিনি শুধুমাত্র রোমান্টিক নায়ক নন; তিনি এক জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ। আসলে উত্তমবাবুর ব্যক্তি জীবনও সে সময় জটিল ঘূর্ণাবতে পাক খাচ্ছিল। চেনা মানুষ মুহূর্তের মধ্যে অচেনা হয়ে যাচ্ছিলেন। অত্যন্ত কাছের সম্পর্ক গুলো ধারাবাহিকভাবে ম্লান হতে হতে অনেক দূরত্বের সীমারেখায় পৌঁছে যাচ্ছিল। কাজেই ছবিটির যে আবেদন পরিচালক আশা করেছিলেন উত্তমবাবু তার দশ গুণ বেশি দিয়ে ছবিটিতে নতুন মান সংযোজন ঘটিয়েছিলেন।।
সামাজিক প্রেক্ষাপটে যদিও ছবির মূল বিষয় ব্যক্তিগত সংকট, তবুও এর মধ্যে সমকালীন সমাজের প্রতিফলন দেখা যায়। মানুষের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিগত দায়িত্ব—এই বিষয়গুলি ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ছবিটি দেখায় যে সমাজের চাপ অনেক সময় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
উত্তম কুমারের ক্যারিয়ারে ছবিটির গুরুত্ব অপরিসীম। উত্তম কুমারের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে বহু জনপ্রিয় ছবি রয়েছে। তবে ‘নিশীথে’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি তাঁর অভিনয়ের এক ভিন্ন দিক তুলে ধরে। এখানে তিনি শুধুমাত্র রোমান্টিক নায়ক নন; তিনি এক জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ। আসলে উত্তমবাবুর ব্যক্তি জীবনও সে সময় জটিল ঘূর্ণাবতে পাক খাচ্ছিল। চেনা মানুষ মুহূর্তের মধ্যে অচেনা হয়ে যাচ্ছিলেন। অত্যন্ত কাছের সম্পর্ক গুলো ধারাবাহিকভাবে ম্লান হতে হতে অনেক দূরত্বের সীমারেখায় পৌঁছে যাচ্ছিল। কাজেই ছবিটির যে আবেদন পরিচালক আশা করেছিলেন উত্তমবাবু তার দশ গুণ বেশি দিয়ে ছবিটিতে নতুন মান সংযোজন ঘটিয়েছিলেন।।

১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি।
এ ধরনের চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে যে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন ছিলেন। বর্তমান সময়ের দর্শকের কাছে ছবির গতি কিছুটা ধীর মনে হতে পারে। আজকের দ্রুত সম্পাদনা ও প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্রের তুলনায় ‘নিশীথে’ অনেক বেশি ধৈর্য দাবি করে। কিন্তু যাঁরা চরিত্রকেন্দ্রিক এবং মনস্তাত্ত্বিক চলচ্চিত্র পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে এটি অত্যন্ত মূল্যবান অভিজ্ঞতা। ছবিটির আবেগ, অভিনয় এবং মানবিকতা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ছবির কিছু অংশ আধুনিক দর্শকের কাছে দীর্ঘ মনে হতে পারে।
এছাড়া কয়েকটি সংলাপ বর্তমান সময়ের তুলনায় বেশি সাহিত্যধর্মী বলে মনে হতে পারে। তবে এগুলি ছবির নির্মাণকাল ও শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্য হিসেবেই দেখা উচিত। ‘”নিশীথে’ বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের এক সংবেদনশীল এবং গভীর মানবিক ছবি। এটি প্রেম, অপরাধবোধ, আত্মসমালোচনা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার গল্প। উত্তম কুমার তাঁর সংযত ও পরিণত অভিনয়ের মাধ্যমে ছবিটিকে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। চরিত্রটির মানসিক টানাপোড়েন তিনি এমন দক্ষতায় প্রকাশ করেছেন যে ছবিটি শেষ হওয়ার পরও তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে থেকে যায়।
অগ্রগামীর সংবেদনশীল পরিচালনা, সুন্দর চিত্রগ্রহণ, মার্জিত সঙ্গীত এবং শক্তিশালী চিত্রনাট্য ‘নিশীথে’-কে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় স্থান দিয়েছে। যাঁরা উত্তম কুমারের অভিনয়শক্তির প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করতে চান এবং সোনালি যুগের বাংলা চলচ্চিত্রের শিল্পমূল্য অনুধাবন করতে চান, তাঁদের জন্য ‘নিশীথে’ অবশ্যই দর্শনীয়। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা কেবল দেখা যায় না—অনুভব করা যায়।—চলবে।
এছাড়া কয়েকটি সংলাপ বর্তমান সময়ের তুলনায় বেশি সাহিত্যধর্মী বলে মনে হতে পারে। তবে এগুলি ছবির নির্মাণকাল ও শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্য হিসেবেই দেখা উচিত। ‘”নিশীথে’ বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের এক সংবেদনশীল এবং গভীর মানবিক ছবি। এটি প্রেম, অপরাধবোধ, আত্মসমালোচনা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার গল্প। উত্তম কুমার তাঁর সংযত ও পরিণত অভিনয়ের মাধ্যমে ছবিটিকে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। চরিত্রটির মানসিক টানাপোড়েন তিনি এমন দক্ষতায় প্রকাশ করেছেন যে ছবিটি শেষ হওয়ার পরও তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে থেকে যায়।
অগ্রগামীর সংবেদনশীল পরিচালনা, সুন্দর চিত্রগ্রহণ, মার্জিত সঙ্গীত এবং শক্তিশালী চিত্রনাট্য ‘নিশীথে’-কে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় স্থান দিয়েছে। যাঁরা উত্তম কুমারের অভিনয়শক্তির প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করতে চান এবং সোনালি যুগের বাংলা চলচ্চিত্রের শিল্পমূল্য অনুধাবন করতে চান, তাঁদের জন্য ‘নিশীথে’ অবশ্যই দর্শনীয়। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা কেবল দেখা যায় না—অনুভব করা যায়।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।


















