
ছবি : প্রতীকী।
কাকোলূকীযম্
ইঁদুর থেকে ঋষির কৃপায় মানুষ হওয়া সেই পরম রূপবতী কন্যার বিয়ের বয়স হয়েছে। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য মেয়ের জন্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ পাত্রের সন্ধান করতে চাইলেন। মহর্ষি প্রথমে আকাশের অধিপতি, পরম তেজস্বী বিবস্বান সূর্যকে আহ্বান করলেন। বৈদিক মন্ত্রের মহিমাময় প্রভাবে আকাশ আলো করে স্বয়ং সূর্যদেব মর্ত্যে আবির্ভূত হলেন। ঋষিকে প্রণাম জানিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, “ভগবন্! কিমহাম্ আহূতঃ? — হে দেব! আমাকে কী কারণে আহ্বান করেছেন?”
মুনি সগর্বে নিজের পালিত কন্যাকে দেখিয়ে বললেন, “এই আমার রূপবতী কন্যা! যদি এর আপনাকে পছন্দ হয়, তবে আপনি একে বিবাহ করুন।”
মহর্ষি তখন মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “হে পুত্রি! এই ত্রিলোকের অন্ধকার দূরকারী, ভাস্বরকর্তা ভগবান ভানুকে কি তোমার জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ?”
কন্যা তখন সূর্যের প্রখর তেজের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। মুচকি হেসে বাবাকে বলল, “হে তাত! ইনি বড্ড বেশি উত্তপ্ত আর ভয়ংকর দাহিকা শক্তিসম্পন্ন। অতি দাহকাত্মকোঽযম্, ন অহমেনম্ অভিলষামি — আমি কিছুতেই এঁকে বিবাহ করতে পারব না। তস্মাৎ অন্যঃ প্রকৃষ্টতরঃ কশ্চিৎ আহূযতাম্ — আপনি বরং এর চেয়েও উৎকৃষ্ট, বরণীয় কোনও পাত্রকে আহ্বান করুন।”
মুনি সগর্বে নিজের পালিত কন্যাকে দেখিয়ে বললেন, “এই আমার রূপবতী কন্যা! যদি এর আপনাকে পছন্দ হয়, তবে আপনি একে বিবাহ করুন।”
মহর্ষি তখন মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “হে পুত্রি! এই ত্রিলোকের অন্ধকার দূরকারী, ভাস্বরকর্তা ভগবান ভানুকে কি তোমার জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ?”
কন্যা তখন সূর্যের প্রখর তেজের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। মুচকি হেসে বাবাকে বলল, “হে তাত! ইনি বড্ড বেশি উত্তপ্ত আর ভয়ংকর দাহিকা শক্তিসম্পন্ন। অতি দাহকাত্মকোঽযম্, ন অহমেনম্ অভিলষামি — আমি কিছুতেই এঁকে বিবাহ করতে পারব না। তস্মাৎ অন্যঃ প্রকৃষ্টতরঃ কশ্চিৎ আহূযতাম্ — আপনি বরং এর চেয়েও উৎকৃষ্ট, বরণীয় কোনও পাত্রকে আহ্বান করুন।”
মেয়ের কথা শুনে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য একটু বিপাকে পড়লেন। তিনি ভগবান ভাস্করকে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে দেব! এই সংসারে আপনার চেয়েও বলবান আর কে আছে?”
সূর্যদেব স্মিত হেসে উত্তর দিলেন, “অস্তি মত্তোঽপি অধিকো মেঘঃ — আমার চেয়েও শক্তিশালী হল মেঘ। কারণ আমি যতই শক্তিশালী হই না কেন, মেঘ এসে যখন আমাকে আচ্ছন্ন করে দেয়, তখন আমি সম্পূর্ণ অদৃশ্য আর অসহায় হয়ে পড়ি।”
সূর্যের পরামর্শ শুনে মুনিদেব তৎক্ষণাৎ মেঘকে আহ্বান করলেন। জলদগম্ভীর মন্দ্রস্বরে মেঘ এসে হাজির হতেই মুনি মেয়েকে বললেন, “পুত্রি! তবে কি এই মেঘের হস্তেই তোমাকে সম্প্রদান করব? — অস্মৈ বা ত্বাং প্রযচ্ছামি?”
কন্যা মেঘের কালো রূপের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে বলল, “ইনি একে তো কুচকুচে কৃষ্ণবর্ণ, তার ওপর বড্ড জডাত্মা (অলস ও ধীর)! ইনি আমার চপল মনকে কী করে বুঝবেন? তার চেয়ে বরং অন্য কোনও প্রধান পুরুষকে ডাকুন।”
মহর্ষি এবার করজোড়ে মেঘকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভো ভো মেঘ! ত্বত্তোঽপি অধিকোঽস্থি কশ্চিৎ? — হে মেঘরাজ! আপনার থেকেও শ্রেষ্ঠ অপর কেউ আছেন কি?”
মেঘ সবিনয়ে উত্তর দিল, “হে ভগবন্! আমার চেয়েও শক্তিশালী হলেন পবনদেব। বায়ুর তীব্র আঘাতে আমি নিমেষের মধ্যে সহস্র খণ্ডে বিভক্ত হয়ে দিকবিদিক ছুটে বেড়াতে বাধ্য হই।”
মেঘের কথা শুনে মুনি এবার বায়ুদেবতাকে আহ্বান করলেন এবং কন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন, “পুত্রি! এই পবনদেব কি তোমার পছন্দ? — কিম্ এষ বায়ুস্তে বিবাহায উত্তমঃ?”
মুনি-কন্যা এবারও মাথা নেড়ে বলল, “হে পিতা! ইনি যে বড্ড বেশি অস্থির আর চঞ্চল — অতিচপলোঽযম্ । সারাক্ষণ শুধু একদিক থেকে অন্যদিকের বনে ছুটে বেড়ান। এঁনার থেকেও অধিক স্থির ও বলবান কাউকে আপনি আহ্বান করুন।”
অসহায় মুনি তখন বায়ুদেবতাকে হাতজোড় করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে দেব! আপনার থেকেও বলবান কেউ কি আছেন এই সংসারে?”
সূর্যদেব স্মিত হেসে উত্তর দিলেন, “অস্তি মত্তোঽপি অধিকো মেঘঃ — আমার চেয়েও শক্তিশালী হল মেঘ। কারণ আমি যতই শক্তিশালী হই না কেন, মেঘ এসে যখন আমাকে আচ্ছন্ন করে দেয়, তখন আমি সম্পূর্ণ অদৃশ্য আর অসহায় হয়ে পড়ি।”
সূর্যের পরামর্শ শুনে মুনিদেব তৎক্ষণাৎ মেঘকে আহ্বান করলেন। জলদগম্ভীর মন্দ্রস্বরে মেঘ এসে হাজির হতেই মুনি মেয়েকে বললেন, “পুত্রি! তবে কি এই মেঘের হস্তেই তোমাকে সম্প্রদান করব? — অস্মৈ বা ত্বাং প্রযচ্ছামি?”
কন্যা মেঘের কালো রূপের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে বলল, “ইনি একে তো কুচকুচে কৃষ্ণবর্ণ, তার ওপর বড্ড জডাত্মা (অলস ও ধীর)! ইনি আমার চপল মনকে কী করে বুঝবেন? তার চেয়ে বরং অন্য কোনও প্রধান পুরুষকে ডাকুন।”
মহর্ষি এবার করজোড়ে মেঘকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভো ভো মেঘ! ত্বত্তোঽপি অধিকোঽস্থি কশ্চিৎ? — হে মেঘরাজ! আপনার থেকেও শ্রেষ্ঠ অপর কেউ আছেন কি?”
মেঘ সবিনয়ে উত্তর দিল, “হে ভগবন্! আমার চেয়েও শক্তিশালী হলেন পবনদেব। বায়ুর তীব্র আঘাতে আমি নিমেষের মধ্যে সহস্র খণ্ডে বিভক্ত হয়ে দিকবিদিক ছুটে বেড়াতে বাধ্য হই।”
মেঘের কথা শুনে মুনি এবার বায়ুদেবতাকে আহ্বান করলেন এবং কন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন, “পুত্রি! এই পবনদেব কি তোমার পছন্দ? — কিম্ এষ বায়ুস্তে বিবাহায উত্তমঃ?”
মুনি-কন্যা এবারও মাথা নেড়ে বলল, “হে পিতা! ইনি যে বড্ড বেশি অস্থির আর চঞ্চল — অতিচপলোঽযম্ । সারাক্ষণ শুধু একদিক থেকে অন্যদিকের বনে ছুটে বেড়ান। এঁনার থেকেও অধিক স্থির ও বলবান কাউকে আপনি আহ্বান করুন।”
অসহায় মুনি তখন বায়ুদেবতাকে হাতজোড় করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে দেব! আপনার থেকেও বলবান কেউ কি আছেন এই সংসারে?”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৪: “যোগ্য পাত্র ছাড়া কন্যাদান নয়”— শাস্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে কন্যার সম্মতির জয়

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৪ : শেষ অঙ্ক

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬০ : কাকজাতক — ভেবে দেখ মন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬৪: ভাবি প্রশাসক রামের প্রশিক্ষণের সূচনা—রাক্ষস খরের সঙ্গে সংঘাত
পবনদেব হেসে বললেন, “মত্তোঽপি অধিকোঽস্তি পর্বতঃ — পর্বত হলেন আমার থেকেও বলবান। তিনি এতটাই অটল যে, আমার মতো তীব্র ঝড়কেও তিনি অনায়াসে রোধ করে দেন। তাঁর বিশাল শরীরের সামনে এসে আমাকে হার মানতে হয় — যেন স্তম্ভস্য বলবানপি অহং ধ্রিযে।” কন্যার মুখের দিকে চেয়ে মুনি তখন হিমালয়ের মতো এক বিশাল পর্বতরাজকে আহ্বান করলেন এবং মেয়েকে তার পছন্দের কথা জিজ্ঞাসা করলেন।
কিন্তু মুনি-কন্যা এবারও বিমর্ষ মুখে বলল, “হে তাত! ইনি প্রকৃতিগতভাবেই অত্যন্ত কঠিন, পাথুরে আর স্থবির। তৎ অন্যস্য দেহি মাম্ — আপনি দয়াকরে আমাকে অপর কারও হস্তে প্রদান করুন।”
ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে মুনি পর্বতরাজকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে পর্বতরাজ! আপনার থেকেও শ্রেষ্ঠ কি কেউ আছেন এই সৃষ্টিতে?”
পর্বতরাজ তখন হেসে উঠে বললেন, “আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ আর শক্তিশালী হল ক্ষুদ্র মূষিকেরা (ইঁদুর)। আমি যতই কঠিন আর বিশাল হই না কেন, তারা আমার শরীরকে অনায়াসে কেটেকুটে ভিতরে গর্ত বানিয়ে রাজত্ব করে বেড়ায়!”
কিন্তু মুনি-কন্যা এবারও বিমর্ষ মুখে বলল, “হে তাত! ইনি প্রকৃতিগতভাবেই অত্যন্ত কঠিন, পাথুরে আর স্থবির। তৎ অন্যস্য দেহি মাম্ — আপনি দয়াকরে আমাকে অপর কারও হস্তে প্রদান করুন।”
ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে মুনি পর্বতরাজকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে পর্বতরাজ! আপনার থেকেও শ্রেষ্ঠ কি কেউ আছেন এই সৃষ্টিতে?”
পর্বতরাজ তখন হেসে উঠে বললেন, “আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ আর শক্তিশালী হল ক্ষুদ্র মূষিকেরা (ইঁদুর)। আমি যতই কঠিন আর বিশাল হই না কেন, তারা আমার শরীরকে অনায়াসে কেটেকুটে ভিতরে গর্ত বানিয়ে রাজত্ব করে বেড়ায়!”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭২ : শুধু হাসি-খেলা?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৬: কাঠবিড়ালি
পর্বতরাজের মুখে এই পরম সত্য শুনে মুনির চোখ খুলে গেল। তিনি কালবিলম্ব না করে এক মূষিকরাজকে সেখানে আহ্বান করলেন। সুদর্শন ও চটপটে মূষিকরাজকে এনে মেয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে পুত্রি! তবে কি এই মূষিকরাজের হস্তেই তোমাকে প্রদান করি? কিম্ এষ প্রতিভাতি তে মূষিকরাজঃ? — এই মূষিকরাজকে কি তোমার মনের মতো পছন্দ হয়েছে?”
ব্যস! সেই ক্ষুদ্র ইঁদুরকে দেখামাত্রই কন্যার শরীরের রোমকূপ আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল! তার মনের ভিতর সুপ্ত থাকা আদিম স্বভাব জেগে উঠল। সে পুলকিত হয়ে মনে মনে ভাবল, “ইনিই তো আমার স্বজাতি!”
সে মহানন্দে পিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “হে পিতা! আপনি দয়া করে আপনার তপস্যার প্রভাবে আমাকে পুনরায় একটি ছোট্ট ইঁদুর-কন্যা করে দিন, যাতে আমি নিজের স্বজাতিবিহিত গৃহধর্মকে পরম সুখে অনুসরণ করতে পারি!”
মেয়ের মনের আসল আকুলতা বুঝতে পেরে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর দীর্ঘ তপস্যার প্রভাবে সেই রূপবতী কন্যাকে পুনরায় একটি ছোট্ট ইঁদুরে পরিণত করলেন এবং পরম সানন্দে মূষিকরাজের হাতে তুলে দিলেন।
ব্যস! সেই ক্ষুদ্র ইঁদুরকে দেখামাত্রই কন্যার শরীরের রোমকূপ আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল! তার মনের ভিতর সুপ্ত থাকা আদিম স্বভাব জেগে উঠল। সে পুলকিত হয়ে মনে মনে ভাবল, “ইনিই তো আমার স্বজাতি!”
সে মহানন্দে পিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “হে পিতা! আপনি দয়া করে আপনার তপস্যার প্রভাবে আমাকে পুনরায় একটি ছোট্ট ইঁদুর-কন্যা করে দিন, যাতে আমি নিজের স্বজাতিবিহিত গৃহধর্মকে পরম সুখে অনুসরণ করতে পারি!”
মেয়ের মনের আসল আকুলতা বুঝতে পেরে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর দীর্ঘ তপস্যার প্রভাবে সেই রূপবতী কন্যাকে পুনরায় একটি ছোট্ট ইঁদুরে পরিণত করলেন এবং পরম সানন্দে মূষিকরাজের হাতে তুলে দিলেন।
|| ১৩শ কাহিনি সমাপ্ত ||
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০২ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
ইঁদুর-কন্যার এই অদ্ভুত ও চমকপ্রদ উপাখ্যানটি শেষ করে রাজনীতিকুশল মন্ত্রী রক্তাক্ষ একটু থামলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ, জ্বলজ্বলে চোখ দুটি স্থিরজীবীর চোখের ওপর নিবদ্ধ করে ঠোঁটের কোণে এক টুকরো শ্লেষমাখা ক্রুর হাসি ফুটিয়ে তুললেন।
তারপর সরাসরি আবার স্থিরজীবীকে বিদ্ধ করে রক্তাক্ষ বলে উঠলেন—
“হে ভদ্র! ঠিক এই কারণেই আমি এতক্ষণ ধরে এই গল্পটি আপনাদের শোনাচ্ছিলাম। একটু ভেবে দেখুন, সেই ইঁদুর-কন্যাটি মহাপ্রতাপশালী সূর্য, গম্ভীর মেঘ, গতিময় বায়ু কিংবা অটল পর্বতের মতো সৃষ্টির সবচেয়ে বরণীয় ও শক্তিশালী পাত্রদের রূপৈশ্বর্য আর ক্ষমতা ছেড়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জাতের এক অতি সাধারণ ইঁদুরকেই স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিল! কেন জানেন? কারণ, নিজের লোক, নিজের জাতিগত বিশ্বাস কিংবা নিজের মজ্জাগত সংস্কৃতিকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা কোনও জীব বা মানুষের পক্ষেই মোটেও সোজা কাজ নয়!”
পাঠককে বলবো গল্পটিকে খেয়াল করবেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ রূপকথা বা ছোটদের খামখেয়ালি ইঁদুর-কন্যার বিয়ের গল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর আড়ালে পঞ্চতন্ত্রকার বিষ্ণুশর্মা আসলে মানব মনস্তত্ত্বের এমন এক গভীর ও অমোঘ তত্ত্বকে লুকিয়ে রেখেছেন, যা ভারতীয় রাজনীতি-কূটনীতির জ্ঞান পরম্পরাকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। গল্প অনুযায়ী, ইঁদুর-কন্যাটিকে মুনি তাঁর তপোবলে পরম সুন্দরী মানুষে রূপান্তর করেছিলেন, তাকে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তির (সূর্য, মেঘ, বায়ু, পর্বত) মুখোমুখি করেছিলেন। কিন্তু তার ভিতরের ‘ইঁদুর-স্বভাব’ বা ‘DNA’ ছিল সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত। এর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মানেটা হলো—কোনও ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র, তার জন্মগত আনুগত্য এবং তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে কোনও বাহ্যিক সুযোগ-সুবিধা বা কৃত্রিম রূপান্তর দিয়ে বদলে ফেলা যায় না। পাশ্চাত্যের সমাজবিজ্ঞানের দর্পণে তাকালে আমরা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়োঁ (Pierre Bourdieu)-র বিখ্যাত ‘হ্যাবিটাস’ (Habitus) তত্ত্বের চমৎকার প্রতিফলন দেখতে পাই। বুর্দিয়োঁ তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তির প্রাথমিক সামাজিকীকরণ, তার জন্মগত পরিবেশ এবং মজ্জাগত সংস্কার মানুষের মনে ও শরীরে এমন এক স্থায়ী মানসিক ও শারীরিক কাঠামো তৈরি করে, যা পরবর্তী জীবনে তার কৃত্রিম বা আরোপিত সামাজিক উত্তরণের (Social Mobility) পরেও অবচেতনভাবে অক্ষুণ্ণ থাকে। ইঁদুর-কন্যাটিকে মুনি তাঁর তপোবলে যতই অলঙ্কারে ও মনুষ্যত্বে রূপান্তর করুন না কেন, তার অবচেতন মনের ‘হ্যাবিটাস’ ছিল এক সাধারণ ইঁদুরেরই!
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের (International Relations) ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তববাদ (Political Realism)—যার মূল ভিত্তি থুসিডাইডিস, ম্যাকিয়াভেলি কিংবা হ্যান্স মর্গেনথাউ (Hans Morgenthau)-এর তত্ত্বে নিহিত—তা স্পষ্ট ভাষায় বলে যে, মানুষের সহজাত চরিত্র ও রাষ্ট্রের আচরণ মূলত স্বার্থপরতা, ভয় এবং ক্ষমতার লোভ দ্বারা চালিত হয়, যা কোনোদিন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
তারপর সরাসরি আবার স্থিরজীবীকে বিদ্ধ করে রক্তাক্ষ বলে উঠলেন—
“হে ভদ্র! ঠিক এই কারণেই আমি এতক্ষণ ধরে এই গল্পটি আপনাদের শোনাচ্ছিলাম। একটু ভেবে দেখুন, সেই ইঁদুর-কন্যাটি মহাপ্রতাপশালী সূর্য, গম্ভীর মেঘ, গতিময় বায়ু কিংবা অটল পর্বতের মতো সৃষ্টির সবচেয়ে বরণীয় ও শক্তিশালী পাত্রদের রূপৈশ্বর্য আর ক্ষমতা ছেড়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জাতের এক অতি সাধারণ ইঁদুরকেই স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিল! কেন জানেন? কারণ, নিজের লোক, নিজের জাতিগত বিশ্বাস কিংবা নিজের মজ্জাগত সংস্কৃতিকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা কোনও জীব বা মানুষের পক্ষেই মোটেও সোজা কাজ নয়!”
পাঠককে বলবো গল্পটিকে খেয়াল করবেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ রূপকথা বা ছোটদের খামখেয়ালি ইঁদুর-কন্যার বিয়ের গল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর আড়ালে পঞ্চতন্ত্রকার বিষ্ণুশর্মা আসলে মানব মনস্তত্ত্বের এমন এক গভীর ও অমোঘ তত্ত্বকে লুকিয়ে রেখেছেন, যা ভারতীয় রাজনীতি-কূটনীতির জ্ঞান পরম্পরাকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। গল্প অনুযায়ী, ইঁদুর-কন্যাটিকে মুনি তাঁর তপোবলে পরম সুন্দরী মানুষে রূপান্তর করেছিলেন, তাকে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তির (সূর্য, মেঘ, বায়ু, পর্বত) মুখোমুখি করেছিলেন। কিন্তু তার ভিতরের ‘ইঁদুর-স্বভাব’ বা ‘DNA’ ছিল সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত। এর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মানেটা হলো—কোনও ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র, তার জন্মগত আনুগত্য এবং তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে কোনও বাহ্যিক সুযোগ-সুবিধা বা কৃত্রিম রূপান্তর দিয়ে বদলে ফেলা যায় না। পাশ্চাত্যের সমাজবিজ্ঞানের দর্পণে তাকালে আমরা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়োঁ (Pierre Bourdieu)-র বিখ্যাত ‘হ্যাবিটাস’ (Habitus) তত্ত্বের চমৎকার প্রতিফলন দেখতে পাই। বুর্দিয়োঁ তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তির প্রাথমিক সামাজিকীকরণ, তার জন্মগত পরিবেশ এবং মজ্জাগত সংস্কার মানুষের মনে ও শরীরে এমন এক স্থায়ী মানসিক ও শারীরিক কাঠামো তৈরি করে, যা পরবর্তী জীবনে তার কৃত্রিম বা আরোপিত সামাজিক উত্তরণের (Social Mobility) পরেও অবচেতনভাবে অক্ষুণ্ণ থাকে। ইঁদুর-কন্যাটিকে মুনি তাঁর তপোবলে যতই অলঙ্কারে ও মনুষ্যত্বে রূপান্তর করুন না কেন, তার অবচেতন মনের ‘হ্যাবিটাস’ ছিল এক সাধারণ ইঁদুরেরই!
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের (International Relations) ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তববাদ (Political Realism)—যার মূল ভিত্তি থুসিডাইডিস, ম্যাকিয়াভেলি কিংবা হ্যান্স মর্গেনথাউ (Hans Morgenthau)-এর তত্ত্বে নিহিত—তা স্পষ্ট ভাষায় বলে যে, মানুষের সহজাত চরিত্র ও রাষ্ট্রের আচরণ মূলত স্বার্থপরতা, ভয় এবং ক্ষমতার লোভ দ্বারা চালিত হয়, যা কোনোদিন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১৩৯: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২০
রাষ্ট্রগুলো বিশ্বরাজনীতির আন্তর্জাতিক মঞ্চে বা বহুপাক্ষিক চুক্তির টেবিলে সততা ও আদর্শের যত বড় বড় মুখোশই পরুক না কেন, সংকটকালে তাদের মূল আচরণ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’ (Core National Interest) সবসময় তার আদিম ও নগ্ন রূপেই প্রকাশ পায়। কাকমন্ত্রী রক্তাক্ষের বিশ্বাস স্থিরজীবীও এর ব্যতিক্রম হবে না কখনই। ইতিহাসের পাতায় তাকালে এর ভুরিভুরি উদাহরণ মিলবে। যেমন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে এক জোট হয়েছিল (ঠিক যেমন ধূর্ত স্থিরজীবী আজ পেঁচাদের দলে নাম লিখিয়েছে)। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হতেই দুই দেশের নিজস্ব মতাদর্শ ও ‘স্বজাতি-স্বভাব’ (Capitalism vs Communism) আবার স্বরূপে সামনে চলে আসে এবং বিশ্বজুড়ে ‘শীতল যুদ্ধ’ বা Cold-War সূচনা হয়। অর্থাৎ, সাময়িক কৌশলগত অবস্থান কখনও কোনও সত্তার স্থায়ী চরিত্রকে ঢেকে রাখতে পারে না। ঠিক যেমন, বহু শক্তিশালী পুরুষকে পতি হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পরেও, ইঁদুর-কন্যাটি শেষ পর্যন্ত নিজের আদিম স্বভাব অনুযায়ী এক মূষিকরাজকেই তার স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিল।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra : politics & diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।


















