
পরিচালক অনীক দত্ত। ছবি: সংগৃহীত।
না। কোনওভাবেই পরিচয় ছিল না। আমার খুব পরিচিত মানুষজনের সূত্রে দূর থেকে মানুষটিকে চিনতাম। বাংলা ছবির দর্শক হিসেবে এই পরিচালকের প্রতি একটা অন্যরকম শ্রদ্ধা ছিল। অনীক দত্ত আকণ্ঠ সত্যজিতে নিমজ্জিত ছিলেন। তাই যখনই সুযোগ এসেছে সেই আসমুদ্র-হিমাচল চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কিন্তু সেটা কখনোই অনুকরণ বা অনুসরণ মনে হয়নি। প্রিজমে আলো পড়লে যেরকম বিচ্ছুরণ হয় অনেকটা সেই রকম।
লেখার আগে একটু গুগুল ঘাঁটছিলাম। সেখানে দেখলাম ২০০৯ সালে তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি যদুবাবুর নাতনি সম্ভবত রাজনৈতিক কারণে মুক্তি পায়নি। সত্যাসত্য জানিনা। কারণ গুগল-এর ঘুলিয়ে দেওয়ার বদনাম আছে। যাই হোক ‘অনীক’ নামের আভিধানিক অর্থ সৈনিক। তাই বিজ্ঞাপনের জগতে থেকেও তাঁর ছবি তৈরির লড়াই জারি ছিল। তারও তিন বছর পর, ২০১২ সালে এলো ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। প্রেমের রকমফের, নায়ক ২.০, হারমোনিয়াম ২.০ এসবের মধ্যে এই ছবি দেখে আমরা নড়েচড়ে বসলাম। এরপর তিনি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস আশ্চর্য প্রদীপ নিয়ে ছবি করলেন। এই কাহিনির বিষয়ে বিশেষ উৎসাহ ছিল। কারণ, এই উপন্যাসটি নিয়ে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ শ্রদ্ধেয় পরিচালক রাজা দাশগুপ্ত, এর অনেক আগে ছবি করার কথা ভেবেছিলেন। অনীক দত্তের তৃতীয় ছবি মেঘনাদবধ রহস্য। ঝকঝকে থ্রিলার। এরপর ভবিষ্যতের ভূত, এই তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক প্রহসন নিয়ে এক সময়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। তারপর একেবারে অন্যধারার গল্প। রমাপদ চৌধুরীর ছাদ অবলম্বনে বরুণবাবুর বন্ধু । তাঁর স্বভাবসিদ্ধ শ্লেষ ও ব্যাঙ্গাত্মক সংলাপ থেকে একেবারে বদল ঘটালেন ছবির বিষয় নির্বাচন, পরিবেশন এবং উপস্থাপনায়। আর তারপর সম্ভবত এ পর্যন্ত তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ নিবেদন অপরাজিত। অনবদ্য অসাধারণ এক চিত্রকাহিনি। পাঠভবনের ছাত্র তাই হয়তো সত্যজিৎ রায়ের প্রতি এতটা শ্রদ্ধা ছিল। যত কাণ্ড কলকাতাতেই তার শেষ ছবিতে সে নিদর্শন রয়েছে। সেখানে তোপসের মগজাস্ত্র চলেছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৭১: আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৬১: আধুনিক ক্ষমতাদখলের লড়াই ও রাজসূয়যজ্ঞের প্রেক্ষিতে যুদ্ধজয় ও অধিকারপ্রতিষ্ঠার মধ্যে সাযুজ্য কোথায়?

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৭ : হাঙরের পেটে মুক্তো
এই তো গত ২২ মে ছিল তাঁর জন্মদিন। আর আজ ২৭ মে। আজই পরিচালকের পরিচিত নানাজনের সাক্ষাৎকারে শুনছিলাম তিনি নতুন ছবির কথা ভেবেছিলেন। সেটা শুনে আরও খারাপ লাগছে। হয়তো অপরাজিতকেও ছাপিয়ে যেতেন তাঁর নতুন ছবিতে। সে ছবি আর হল না…
তাঁর ছবি দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ব্রিক্স, ফিল্মফেয়ার (ইস্ট) ও বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছেন। অপরাজিত ছবিটি মেকআপ ও প্রোডাকশন ডিজাইন বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু জীবদ্দশায় পরিচালক বা চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাঁর মতো বিশিষ্ট চিত্রপরিচালকের ভাগ্যে জাতীয়সম্মান জোটেনি। এটা তাঁর নয়, আমাদের দুর্ভাগ্য।
তাঁর ছবি দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ব্রিক্স, ফিল্মফেয়ার (ইস্ট) ও বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছেন। অপরাজিত ছবিটি মেকআপ ও প্রোডাকশন ডিজাইন বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু জীবদ্দশায় পরিচালক বা চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাঁর মতো বিশিষ্ট চিত্রপরিচালকের ভাগ্যে জাতীয়সম্মান জোটেনি। এটা তাঁর নয়, আমাদের দুর্ভাগ্য।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯০ : দুই ভাই

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫১: ইরাবতী ডলফিন
আমার এক প্রিয় অভিনেতা শ্রদ্ধেয় দুলাল লাহিড়ী অনীকবাবুর যত কাণ্ড কলকাতাতেই ছবিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন। এই লেখার তাগিদেই দুলালদাকে ফোন করেছিলাম। শুটিংয়ের মধ্যে ছিলেন তাই ফোনে কথা হয়নি। খানিক পরেই দুলালদা তাঁর ইংরিজিতে লেখা প্রতিক্রিয়াতে জানিয়েছিলেন এ ধরণের বিশিষ্ট মেধার এক পরিচালককে এভাবে হারিয়ে ফেলে তিনি শোকস্তব্ধ। বাকরুদ্ধ। তারপর দুলালদা পাঠালেন এক ডিজিটাল মাধ্যমে তাঁর সাক্ষাৎকার। সেখানে দুলালদা যত কাণ্ড… ছবিতে তাঁর স্মৃতিতে লালন করা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন। দুলালদা প্রণাম করতে উদ্যত হতে অনীকবাবু দুলালদার দুহাত ধরে বাধা দিয়ে বলেছিলেন,- একী করছেন? আমি অনেক ছোট!
বর্ষীয়ান অভিনেতা দুলালদা বলেছিলেন—
—আপনি এজে হয়ত ছোটো, ইমেজে অনেক বড়।
বর্ষীয়ান অভিনেতা দুলালদা বলেছিলেন—
—আপনি এজে হয়ত ছোটো, ইমেজে অনেক বড়।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৮: শ্যালক-জাতক—অচিনপাখি

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
অনীক দত্ত তাঁর ছবির মতোই স্পষ্টবক্তা। নিজের ইমেজ নিয়ে কোনো তোয়াক্কা ছিলো না। কথাবার্তায় সাক্ষাৎকারে কখনো গা বাঁচিয়ে চলা বা রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কোনো চেষ্টা করেননি। তোষামোদ করেননি। লবি করেননি। লিয়াঁজো করেননি। করার কোনও প্রয়োজনও ছিল না। মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে চলচ্চিত্র জগতের দুই বয়সের দুজন শিক্ষিত স্বতন্ত্র স্পষ্টবক্তা মানুষ চলে গেলেন। অনীক দত্ত আর রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়—এই দু’জনের কাছেই দর্শক হিসেবে আমাদের অনেক অনেক কিছু পাওয়া বাকি থেকে গেল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
আমার পরিচিতদের কাছ থেকে আরো শুনেছি যে অনীকবাবু ছিলেন খুবই মুডি মানুষ। বোধহয় চট করে রেগেও যেতেন। এই ধরনের মানুষদের ভিতরটা খুব সাদা হয়। স্বচ্ছ। যতটা চট করে রেগে যান ততটাই চট করে দুঃখ পেয়ে যান। শারীরিক অসুস্থতার কথা শুনেছিলাম। শুনেছিলাম সিওপিডি’র সমস্যা ছিল। সে তো আজকাল জনবহুল শহরে বহু মানুষেরই সমস্যা। জানি না ঠিক কী হয়েছিল? পুলিশ তদন্ত করে দেখবেন। যদি স্বইচ্ছায় নিজেকে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে তাহলে বলবো সেই মুহূর্তে ভয়ানক অভিমান হয়তো হয়েছিল। খুব রাগ হয়েছিল। হয়তো এক মুহূর্ত আর বাঁচতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু মুহূর্তের জন্যেও একবারও আমাদের কথা মনে হয়নি? আমরা যারা বাংলাছবির দর্শক। ঋতুপর্ণ ঘোষের অকালপ্রয়াণের পর আপনার মত এমন একজন পরিচালককে পেয়েছিলাম, গুনেমানে যাঁর ছবিতে নিজস্বতা ও সযত্ন স্বাক্ষর জ্বলজ্বল করত। নিছক সংখ্যায় বাড়াতে ট্রেসিংপেপারে ছবি ছাপাকে ঘৃণা করতেন আপনি। আত্মার শুনেছি দুঃখ নেই কষ্ট নেই মান-অভিমান কিছুই নেই। হাওয়ায় ভেসে ভেসে ভালো থাকবেন অনীকবাবু।
এই মুহূর্তে কোন ছবি নিয়ে ভাবছিলেন জানা হয়নি। তবে রাজনৈতিক প্রহসন ওঁর খুব পছন্দের বিষয়। তাই আগামী ছবির নাম হয়তো হতেই পারতো—’হাওয়া-মোরগ’।
এই মুহূর্তে কোন ছবি নিয়ে ভাবছিলেন জানা হয়নি। তবে রাজনৈতিক প্রহসন ওঁর খুব পছন্দের বিষয়। তাই আগামী ছবির নাম হয়তো হতেই পারতো—’হাওয়া-মোরগ’।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















