শনিবার ২১ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
টুলু হাজির হয়েছে পরের দিন একেবারে সাত সকালে। আগের রাতে নকুল পৌঁছেছে বাজার হাট করে। গোরা এসেছে দিন দু’য়েক হল। সুনীতির বাড়ি জমজমাট। যদিও আজ সকালে সব ফাঁকা হবে। গোরা আর নকুল ফিরবে কলকাতায়। গোরার বিয়ের যোগার যন্ত্র তাকে একাই সামলাতে হচ্ছে। তাই মাঝে মাঝেই ছুটে আসছে মায়ের কাছে। এটা ওটা পরামর্শের জন্য।
সকালের কাজ তখন তুঙ্গে। ভোরবেলা তরকারি কোটা হয়ে গিয়েছে খুকুর। সুনীতি ভাত নামিয়ে চাপিয়ে দিয়েছে মাছের ঝোল। পুঁই শাকের ডাঁটা চচ্চড়ি বসবে। আনাজ পাতি ধুয়ে আঁশ কড়াইয়ে খানিকটা ছাই দিয়ে একটু ছোবড়ার খোঁজ করতে বেরোচ্ছিল খুকু। প্রায় ধাক্কাই লাগছিল একটু হলে। ধাক্কা না লাগলেও ছোঁয়া তো লেগেইছে। সঙ্গে নিবিড় একটা ঘ্রাণ। আর সেই মন ভোলানো দৃষ্টি। নরম চাপা গলায় মৃদু উষ্মা প্রকাশ করেছে খুকু,
—এত্তদিন পরে স্মরণে আইল, তাও এই সাইত সকালে!
—সব সময় তো তোমার স্মৃতির মধ্যেই আছি।
—সরেন, বাইরে কাম আছে।
—সারাক্ষণ শুধু কাম আর কাম।
তারপর এক গাল হেসে খুকুর সঙ্গেই দু’ পা এগিয়েছে।
—কী কাজ আছে বল না, আমি একটু সাহায্য করি!
খুকুও হেসেছে ঝরঝরিয়ে।
—রক্ষা করেন, আলাদিনের মতন আইসা হাজির হইছেন এই যথেষ্ট।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২৫: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৬

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৫ : যে জন রহে মাঝখানে

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫২: রামের জীবনে জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মূলে রয়েছে—নারী

উঠোনে কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে সুনীতি উঁচু গলায় রান্নাঘর থেকে সাড়া নেন।
—কেডা রে খুকু?
টুলু এগিয়ে আসে।
— আমি মাসিমা।
সুনীতির মুখ আহ্লাদে ভরে যায়। মাথার ঘোমটা ঠিকঠাক টেনে উচ্ছ্বসিত বলেন—
—আইস বাবা আইস। বস। খুকু, খুকুরে টুলুরে মোড়া খান আইন্যা দে।
—এই তো আমি নিয়ে নিচ্ছি মাসিমা, আপনি কাজ করুন।
— না না বাবা, কাম আর কী। রাইন্না তো প্রায় শ্যাষ। খুকু তো সবই হাতে হাতে কইরা দিছে। আসলে আমার সেজ পোলা আইছে। একটু পরেই বাইড়াইবো।
বলতে গিয়ে কী যেন মনে করে মাথায় হাত সুনীতির।
—হায়রে, তোমার লগে তো গোরার আলাপই হয় নাই।
সুধা কিৎকিৎ খেলছিল উঠোনে। সুনীতি হাঁক দিয়ে গোরাকে আগে ডেকে দিতে বলেন। গামছা কাঁধে মাথায় তেল মাখতে মাখতে দৌড়ে আসে গোরা।
—কী হইল মা?
—এরে দ্যাহ গোরা, এত অপরূপ পোলা, কইছিলাম না! স্যানগুপ্ত পরিবার, আমাগো প্রতিবেশী।
গোরা আকাশ থেকে পড়েছে। কার্যকারণের সুতো মাপতে একটু সময় তো লাগবেই। যতই বুদ্ধিমান হোক! ইতস্তত করে নমস্কারের ভঙ্গিতে জড়ো করেছে হাত।
সলজ্জ মুখে টুলু প্রতি নমস্কার জানিয়েছে ‘মাসিমা কি যে বলেন’ বলতে বলতে।
খুকু চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছিল ফাঁকে। গরম চা আর পলতা পাতার মুচমুচে খান কয়েক বড়া এনে রাখলো সামনে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গঙ্গার শুশুক

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৪ : দেবী — ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন

গোরা চটপট স্নান সেরে এসে টুলুর সঙ্গে আলাপ করে জেনে নিচ্ছিল তার কর্ম সংক্রান্ত সব সংবাদ।
— বলেন কি বাবা! ফরেস্ট অফিসার আপনি! বিশাল চাকুরি। তাইলে তো বাড়িতে থাকাই হয় না?
—ঠিকই বলেছেন। থাকতেই পারি না বাড়িতে। এই কাল রাতেই এসেছি।
সুনীতির বুকে উথাল পাথাল। অন্তরালের গুরুদেবকে শত শত কোটি প্রণাম করছেন।
—হে গুরুদেব, কোন মাহেন্দ্র ক্ষণে তুমি উয়াদের মিলাইলা, অ্যমন ম্যালবন্ধনের উপায় করলা। বুঝি তো সবই। পরস্পরকে দুইজনার যে কতখানি মনে ধরছে!
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৭: রাজতন্ত্রের শাসন হলেও ত্রিপুরায় তখন ধীরে ধীরে গণচেতনার উন্মেষ ঘটছে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

গোরার দেরি হয়ে যাবে। আজ আর গল্প করা গেল না অধিকক্ষণ। আফশোসের শেষ নেই উভয়েরই। অল্প সময়েই দু’ জনের মধ্যে ভারি অন্তরঙ্গতা হয়েছে। পরস্পরের ঠিকানা দেওয়া নেওয়া হল। পত্রলাপের প্রতিশ্রুতি বিনিময়ও।
এরই মধ্যে গৌরীর হাত ধরে আদিনাথ ফিরেছেন প্রাতঃভ্রমণ সেরে। টুলু তাঁকে দেখেই উঠে এসে প্রণাম করলো। সুনীতি রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখে নিলেন স্বামী প্রসন্ন মুখ।

টুলু এবার উঠবে।
—চলি মাসিমা, আমার তো আবার পরশুদিন বেরোনো।
—কবে আবার আসবা বাবা?
—ছুটি তো নেই, নতুন চাকরি। আপনারা এখানেই থাকবেন তো?
—হ বাবা হ। আর কোথায় যাইব কও। যাইলে একমাত্তর আমার এই পোলার বিবাহে কইলকাতা যাইতে পারি। কবে নাগাদ কইতে পারি না। এখনও তারিখ ঠিক হয় নাই। তোমাগো নিমন্তন্ন থাকব। যদি তুমি পারো আইস বাবা সপরিবারে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫১: সুহনু-জাতক—সেয়ানে সেয়ানে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

—নিশ্চয়ই মাসিমা!
—তুমি তো পরশুদিন রওনা দিবা। তা কই তোমার মা যদি অনুমতি দ্যান আমাগো বাড়িতে কাল দুপুরে খাবা?
এককথায় সম্মতি জানাল টুলু।
—খাব খাব। মায়ের সম্মতির কী আছে, আমি এমনিতেই আসবো।
স্নেহে উদ্বেল সুনীতির অন্তর। হাসি আর ধরছে না মুখে।
—পোলাপানের কথা শুন একবার, তা কি হয়? মায়ের মত লইতেই হয় সর্ব বিষয়ে।
খুকু হাতে ছ্যাঁকা খেয়ে ঠিক এই সময়ে আর্তনাদ করে উঠেছে।
— মাগো হাত পুড়ছে।
—কী হল! কী হল!
সুনীতিকে পাশ কাটিয়ে রান্নাঘরের ভিতরে ঢুকে গেল টুলু। খুকুর দুধে-আলতা হাত দুটো পরম আদরে তুলে নিল নিজের মুঠোয়।
—কোথায় পুড়ল, কীভাবে হল?
সুনীতির স্মিত মুখের দিকে চেয়ে খুকু ঝটকায়। ছাড়িয়ে নিয়েছে হাত। ফিসফিসিয়ে দিয়েছে ধমক,
— সরেন, লজ্জা-শরম সব গিয়েছে আপনের।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content