শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

সুন্দরবনে চিতলের দল। ছবি : সংগৃহীত।

সুন্দরবন নামটা শুনলেই যে দুটি প্রাণীর ছবি মানসচক্ষে সবার আগে ভেসে ওঠে সেগুলি হল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আর খাঁড়ির কুমির। জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ। আর বাঘের কথা বললেই সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে হরিণের কথা। কারণ সুন্দরবনে বাঘেদের খাবারের প্রধান উৎস হল হরিণ। বাঘ সব থেকে বেশি পছন্দ করে হরিণের মাংস। হয়তো বাঘের রসনায় হরিণের মাংস খুব সুস্বাদু। তবে হরিণ বললে সঠিক বলা হল না কারণ পৃথিবী জুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির হরিণ। সুন্দরবনে কেবল একটি প্রজাতির হরিণই পাওয়া যায়। সেটি হল চিতল হরিণ। ইংরেজিতে ‘Spotted deer’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Axis axis’।
চিতল হরিণ ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে বন্যপ্রাণীদের মধ্যে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। সুন্দরবন ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন বনাঞ্চলে ওদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ভারত বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ভুটানে প্রচুর পরিমাণে চিতল হরিণ দেখা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশই হল চিতল হরিণের মাতৃভূমি। যদিও পরবর্তীকালে এখান থেকে ভিন্ন ভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে ওদের সংখ্যা বৃদ্ধি করানো হয়েছে। তেমন কয়েকটি দেশ হল অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া এবং হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ। প্রধানত সমতল এবং মালভূমি ও অল্প উচ্চতা বিশিষ্ট পাহাড়ি এলাকা হল চিতল হরিণদের বিচরণস্থল। বেশি উচ্চতায় এদের দেখা যায় না।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৮: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বানর

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৮: সুজাতজাতক—তবু অনন্ত জাগে

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা

তাই হিমালয়ের উঁচু পার্বত্য এলাকায় চিতল হরিণ অনুপস্থিত। উন্মুক্ত তৃণভূমি, আধা চিরহরিৎ অরণ্য কিংবা পর্ণমোচী অরণ্য হল চিতল হরিণদের আবাসস্থল। তবে সুন্দরবনের লবণাক্ত ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে বসবাসের জন্য এরা চমৎকারভাবে অভিযোজিত হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে চিতল হরিণদের সাঁতারের দক্ষতা অন্য সব অঞ্চলের চিতল হরিণদের থেকে অনেক বেশি। স্রোতের বিপক্ষে এরা দুর্দান্ত সাঁতার দিতে পারে। এদের দলবদ্ধ হয়ে নদী বা খাঁড়ি পেরিয়ে প্রায়শই এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে সাঁতরে যেতে দেখা যায়। মুল স্থলভাগের চিতল হরিণদের থেকে সুন্দরবনের চিতল হরিণদের চেহারাও অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৭: জরাসন্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মত ও তাঁর নামের মাহাত্ম্য

বাংলায় চিতল নামটা এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘চিত্রল’ থেকে। সংস্কৃতে চিত্রল মানে হল চিত্রিত বা ছিটযুক্ত। সংস্কৃত চিত্রল থেকেই ‘চিতা’ নামটাও এসেছে। চিতল হরিণদের পিঠের দিকের রং সোনালি হলুদ বা তামাটে হলুদ। আর তার ওপরে রয়েছে স্পষ্ট সাদা রঙের ছোপ, অনেকটা বুটিক প্রিন্ট শাড়ির মতো। তবে পেট, পাছার নিচের দিক, গলার নিচে, পায়ের ভেতরের দিক, কানের ভেতরের দিক এবং লেজের তলার দিকের রঙ পুরোপুরি সাদা। আর শিরদাঁড়া বরাবর রয়েছে একটা লম্বা কালো ডোরা দাগ। এদের চোখের সামনের দিকে এক ধরনের বহিঃক্ষরা গ্রন্থি রয়েছে যাকে ইংরেজিতে বলা হয় প্রিঅরবিটাল গ্ল্যান্ড। এই গ্ল্যান্ড আমাদের চোখে অশ্রুগ্রন্থির মতো, তবে এ থেকে অশ্রুনির্গত হয় না। পরিবর্তে নির্গত হয় ফেরোমন নামক উদ্বায়ী হরমোন এবং কিছু রাসায়নিক পদার্থ। ফেরোমন এবং এই রাসায়নিক নিজেদের গোষ্ঠীর এবং ভিন্ন গোষ্ঠীর হরিণদের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদানকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত পদার্থ ওরা গাছের গায়ে ঘষে দেয়। সেই রাসায়নিকের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। আর তা থেকে ওরা নিজেদের গোষ্ঠীর সদস্যদের যেমন বুঝতে পারে তেমনই ভিন্নগোষ্ঠীও বুঝতে পারে। এই রাসায়নিক বিপদ সংকেত হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গ্রন্থিটা বাইরে থেকে খালি চোখে দেখে বোঝা যায়, যেন চোখের গোড়ায় ছোট্ট একটা লম্বাটে গভীর ক্ষত। পুরুষ চিতলের এই প্রিঅরবিটাল গ্ল্যান্ড স্ত্রীদের থেকে কিছুটা বড় হয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) চিতলের দলের নদী পার। (ডানদিকে) বাচ্চাদের নিয়ে চিতল পরিবার। ছবি : সংগৃহীত।

স্ত্রী চিতল হরিণদের থেকে পুরুষ চেহারায় বেশ কিছুটা বড় হয়। পুরুষের গড় ওজন যেখানে হয় ৩০ থেকে ৭৫ কেজি সেখানে স্ত্রী চিতল হরিণের ওজন হয় গড়ে ২৫ থেকে ৪৫ কেজি। কোনও কোনও পুরুষ চিতলের ওজন ১১০ কেজি পর্যন্ত হতেও দেখা গিয়েছে। পুরুষের উচ্চতা গড়ে ৯০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার আর স্ত্রীর উচ্চতা ৬৫ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার। চেহারায় বড় হওয়া ছাড়াও পুরুষদের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমটি হল শিং। পুরুষ চিতল হরিণের দুটি শিং দু’বার বিভক্ত হয়ে তিনটি শাখাবিশিষ্ট হয়। স্ত্রী চিতল হরিণের কিন্তু কোনও শিং নেই। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি হল পরিণত পুরুষ চিতল হরিণের মুখে গাঢ় কালো দাগ দেখা যায় যা স্ত্রী চিতল হরিণের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।

সুন্দরবনের জঙ্গলের মধ্যে যেখানে অনেকটা জায়গায় কোনও ম্যানগ্রোভ নেই, কেবল ঘাস বা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ রয়েছে সেখানে এদের দলবদ্ধ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এক একটা দলে ১০-৩০ টি চিতল হরিণ থাকতে পারে। সেই দলে সাধারণত একটি পরিণত পুরুষ চিতল যে দলনেতা, একাধিক স্ত্রী ও শিশু এবং অপরিণত পুরুষ চিতলরা থাকে। অবশ্য দল বড় হলে তাতে একের বেশি পরিণত পুরুষ থাকতে পারে। শুধু ঘাস বা গুল্ম থেকে নয়, বৃক্ষ জাতীয় ম্যানগ্রোভের ঝুলে পড়া ডাল থেকে এদের প্রায়শই পেছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে গাছের পাতা খেতে দেখা যায়।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২১: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৩ : শহরের ইতিকথা

নদী ও খাঁড়ির তীরবর্তী কর্দমাক্ত অঞ্চলেও ওদের দলবদ্ধ হয়ে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। স্রোতে ভেসে আসা গাছের পাতা ও ফল খেতে এদের দেখা যায়। এরা পাতা ছাড়াও গাছের ফল এবং নরম বাকল খেতে পছন্দ করে। সচরাচর সকাল ও বিকেলে এরা খাবার খেতে বেরোয়। বাকি সময়টা বিশ্রামে কাটায়। অনেক সময় দেখা যায় পুরুষ চিতল হরিণ নিজের খসে যাওয়া শিং-এর আবরণ খাচ্ছে। শিং-এর পুরানো আবরণ খসে গিয়ে নতুন আবরণ গজানো হরিণদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শিং-এর আবরণে বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে যা চিতল হরিণের পুষ্টির জন্য খুব প্রয়োজনীয়। তাই ওরা শিং-এর আবরণ খেয়ে নেয়। সত্যি কোনও কিছুই ফেলনা নয়! সুন্দরবনের বানরদের সাথে চিতল হরিণের অসাধারণ বোঝাপড়া বানরদের নিয়ে আলোচনার সময় উল্লেখ করেছি।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯২: কৈলাসচন্দ্র সিংহ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

স্ত্রী চিতল হরিণ বছরের যে কোনও সময়েই বাচ্চার জন্ম দিতে পারে, তবে শীতকালে প্রজনন হার বেশি। এদের গর্ভাবস্থায় স্থায়ী হয় ৭-৮ মাস এবং একবারে একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। এরা সাধারণত ৮-১৪ বছর বাঁচে। সুন্দরবনে চিতল হরিণের প্রধান খাদক হল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। তবে সুন্দরবনে চিতল হরিণের সংখ্যা বাঘের তুলনায় যথেষ্ট বেশি থাকায় চিতল ও বাঘের মধ্যে বাস্তুতান্ত্রিক খাদ্য-খাদক সম্পর্ক যথেষ্ট শক্তিশালী। সুন্দরবনে জঙ্গল হাসিল করে জনবসতি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চিতল হরিণ তার বাসস্থান হারানোর জন্য সমস্যায় পড়েছিল। তার ওপর একসময় মাংসের জন্য বিপুল পরিমাণে হরিণ শিকার করা হত।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) ম্যানগ্রোভের পাতার নাগাল পাওয়ার প্রয়াসে চিতল। (ডানদিকে) সুন্দরবনে স্ত্রী চিতল। ছবি : সংগৃহীত।

আমার ছোটবেলায় মাঝেমাঝেই আমাদের বাড়িতে কেউ কেউ এসে খবর দিত যে অমুক দিন হরিণের মাংস পাওয়া যাবে। যদি নিতে চাই তবে আগে থেকে বুকিং করতে হবে। আমার বাবাকে কোনওদিনই চিতল হরিণের মাংস কিনতে দেখিনি। ফলে এর স্বাদ কেমন তা আমার অজানা। তবে শুনেছি, চিতলের মাংস নাকি সুস্বাদু হলেও খুব শক্ত। পরবর্তীকালে সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে লাগু হওয়ায় চিতল হরিণের চোরাশিকারীরা আর তেমন সুবিধা করতে পারছে না। ফলে চিতলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আবার লোথিয়ান, হ্যালিডে ইত্যাদি দ্বীপে বাঘ না থাকলেও চিতল হরিণ রয়েছে। খাদক না থাকায় ওদের অপরিমিত সংখ্যা বেড়েছে। তাই বাঘের জন্য সুন্দরবনে খাবারের অভাব নেই। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য এটা অত্যন্ত সুখবর।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content