শুক্রবার ১৯ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
‘ভগ্ন হৃদয়’-এর মাধ্যমে কবির সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের যোগাযোগের সূচনা হলেও ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত হয় ‘রাজর্ষি’র ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহের তাগিদে প্রেরিত চিঠির মাধ্যমেই। ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ ও জৈষ্ঠ-এই দুই সংখ্যার ‘বালক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘মুকুট’ গল্প। আষাঢ় সংখ্যা থেকে শুরু হয় ‘রাজর্ষি’র প্রকাশ। উল্লেখ করা যায় যে, ‘মুকুট’ হচ্ছে ত্রিপুরার রাজা অমর মাণিক্যের (১৫৭৭-৮৫ খ্রিস্টাব্দ) সময়কালের ঘটনা এবং ‘রাজর্ষি’ হচ্ছে গোবিন্দ মাণিক্যের (১৬৬১-৭৩ খ্রিস্টাব্দ) সময়কালের।
‘বালক’-এ ধারাবাহিক প্রকাশের পর এবং বই আকারে ‘রাজর্ষি’ প্রকাশের আগে রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার তদানীন্তন মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের কাছে গোবিন্দ মাণিক্যের রাজত্বকালীন ঐতিহাসিক উপাদান চেয়ে একটি পত্র পাঠান। এটিই হচ্ছে ত্রিপুরার রাজপরিবারের কাছে কবির প্রথম পত্র। ১২৯৩ বঙ্গাব্দের ২৩ বৈশাখ কবি বীরচন্দ্রকে লেখেন—”… মহারাজ বোধ করি শুনিয়া থাকিবেন যে, আমি ত্রিপুরা রাজবংশের ইতিহাস অবলম্বন করিয়া ‘রাজর্ষি’ নামক একটি উপন্যাস লিখিতেছি। কিন্তু তাহাতে ইতিহাস রক্ষা করিতে পারি নাই। তাহার কারণ ইতিহাস পাই নাই। এ জন্য আপনাদের কাছে মার্জনা প্রার্থনা বিহিত বিবেচনা করিতেছি। এখন যদিও অনেক বিলম্ব হইয়াছে, তথাপি মহারাজ যদি গোবিন্দ মাণিক্য ও তাঁহার ভ্রাতার রাজত্ব সময়ের সবিশেষ ইতিহাস আমাকে প্রেরণ করিতে অনুমতি করেন, তবে আমি যথাসাধ্য পরিবর্তন করিতে চেষ্টা করিব।…”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৯: রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা, অনুক্ত কৈলাসচন্দ্র

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১৬: ডেসডিমোনার রুমাল / ১৫

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৯ : চারুলতা: নাচে মুক্তি? নাচে বন্ধ?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৪: ছোট নখরযুক্ত ভোঁদড়

এই পত্রের উত্তরে বীরচন্দ্র কবিকে ১৮ জৈষ্ঠ লেখেন—”‘মুকুট’ ও ‘রাজর্ষি’ নামক দুইটি প্রবন্ধই আমি পাঠ করিয়া দেখিয়াছি। ঐতিহাসিক ঘটনা সম্বন্ধে যে যে স্খলন হইয়াছে, তাহা সংশোধন করা আপনার বিশেষ কষ্টসাধ্য হইবে না।… রাজরত্নাকরে গোবিন্দ মাণিক্যের ও তাঁহার ভ্রাতা ছত্র মাণিক্যের চরিত যে রূপ বর্ণিত আছে, তাহা নকল করান হইয়াছে, সত্বর ছাপান যাইতে পারে কি না উদ্যোগ করিতেছি, মুদ্রাঙ্কন শেষ হইলে আপনার নিকট পাঠান যাইবে…।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৬: পরবাস প্রস্তুতি (দুই)

‘বালক’ পত্রিকায় ১২৯২ বঙ্গাব্দে আষাঢ় থেকে মাঘ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে ২৬টি অধ্যায় প্রকাশিত হয় ‘রাজর্ষি’র।তারপর ১২৯৩ বঙ্গাব্দে তা বই আকারে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, ‘এ আমার স্বপ্নলব্ধ গল্প’। ‘রাজর্ষি’ প্রসঙ্গে কবি ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছেন—”… দুই এক সংখ্যা ‘বালক’ বাহির হইবার পর একবার দুই-একদিনের জন্য দেওঘরে রাজনারায়ণবাবুকে দেখিতে যাই। কলিকাতায় ফিরিবার সময় রাত্রের গাড়িতে ভিড় ছিল, ভালো করিয়া ঘুম হইতেছিল না-ঠিক চোখের উপর আলো জ্বলিতেছিল। মনে করিলাম, ঘুম যখন হইবেই না তখন এই সুযোগে বালকের জন্য একটি গল্প ভাবিয়া রাখি। গল্প ভাবিবার ব্যর্থ চেষ্টার টানে গল্প আসিল না, ঘুম আসিয়া পড়িল। স্বপ্ন দেখিলাম, কোন এক মন্দিরের সিঁড়ির উপর বলির রক্তচিহ্ণ দেখিয়াএকটি বালিকা অত্যন্ত করুণ ব্যাকুলতার সঙ্গে তাহার বাপকে জিজ্ঞাসা করিতেছে,’বাবা, এ কী! এ যে রক্ত!’ বালিকার এই কাতরতায় তাহার বাপ অন্তরে ব্যথিত হইয়া অথচ বাহিরে রাগের ভান করিয়া কোনো মতে তার প্রশ্নটাকে চাপা দিতে চেষ্টা করিতেছে-জাগিয়া উঠিয়াই মনে হইল, এটি আমার স্বপ্ন-লব্ধ গল্প। এমন স্বপ্নে পাওয়া গল্প এবং অন্য লেখা আমার আরো আছে। এই স্বপ্নটির সঙ্গে ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দ মাণিক্যের পুরাবৃত্ত মিশাইয়া ‘রাজর্ষি’ গল্প মাসে মাসে লিখিতে লিখিতে ‘বালকে’ বাহির করিতে লাগিলাম।…”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

মানবিক মূল্যবোধের উপন্যাস ‘রাজর্ষি’কে ত্রিপুরার ঐতিহাসিক উপাদানে পুষ্ট করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মহারাজ বীরচন্দ্রের কাছে সে জন্য তিনি গোবিন্দ মাণিক্যের রাজত্বকালীন ঐতিহাসিক বিবরণ চেয়েছিলেন। ‘রাজর্ষি’ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন ‘বিসর্জন’ নাটক। আবার ত্রিপুরার রাজা অমর মাণিক্যের রাজত্বকালের ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মুকুট’ গল্প, নাট্যরূপও দিয়েছেন তার। অমর মাণিক্য ত্রিপুরার ইতিহাসে এক বীর নৃপতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। কিন্তু আরাকানের মগদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় একটি মুকুট ঘিরে রাজপুত্রদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শেষপর্যন্ত অমর মাণিক্যের রাজত্বের সর্বনাশ ডেকে আনে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত

যাইহোক, রবীন্দ্র সাহিত্যে ত্রিপুরার এই অবস্থান নিঃসন্দেহে ঔজ্জ্বল্য দান করেছে ত্রিপুরাকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথম দিকের গল্প-উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণ-সহ পটভূমি বাছতে কেন ত্রিপুরার দিকে দৃষ্টি দিলেন অর্থাৎ ত্রিপুরা কেন তাঁকে আকৃষ্ট করল সেটা এক প্রশ্ন। স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে ত্রিপুরা ছাড়া অন্য কোনও এলাকার ঐতিহাসিক উপাদানও তো সেই সময় রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করতে পারত! ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কারণেই সম্ভবত ত্রিপুরা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। হয়তো ‘ভগ্ন হৃদয়’ কাব্যগ্ৰন্থের জন্য ত্রিপুরার রাজার অভিনন্দন কবিকে ত্রিপুরা বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাই একটি স্বপ্নলব্ধ গল্পকে ত্রিপুরার ঐতিহাসিক উপাদানে পুষ্ট করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রাজাকে এ জন্য পত্র দিয়েছিলেন তিনি।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content