মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

সেবার বোধিসত্ত্ব হিমালয়ে মহিষরূপে জন্ম নিয়েছেন। ক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তিনি বিশালবপু ও প্রবল পরাক্রমী হয়ে উঠলেন। গায়ে তার হাজার হাতির বল। শৈশবে, বাল্যে যা সম্ভব ছিল না, তা এখন অনায়াস হল। তিনি বিনা বাধায় পর্বতকন্দরে, অরণ্যের গভীরতর প্রদেশে, দুর্গম নানা অজ্ঞেয়স্থানে বিচরণ করতে লাগলেন নিয়মিত। এমনই একটি স্থানে তখন তিনি অবস্থান করছেন। নিত্য-বিচরণের শেষে এক মনোরম বৃক্ষের তলে তিনি বিশ্রাম নিতেন। সেই বৃক্ষে এক বৃক্ষদেবতা বাস করতেন। একটি বানর-ও সেই গাছে থাকতো।
বোধিসত্ত্বরূপী মহিষ যখন বৃক্ষতলে বিশ্রাম নিতেন, তখন বানরটি নিচে নেমে আসতো। তারপর যা শুরু হতো তাকে বাঁদরামি বলে। মহিষটির পিঠে চেপে মলমূত্র ত্যাগ করে, শৃঙ্গ ধরে ঝুলে ঝুলে, লেজ ধরে দুলে দুলে কেলি করতো। ধূর্ত মর্কটের এমন উপদ্রব মহিষটি সহ্য করতো, কোনও বিরক্তি না দেখিয়েই। দুষ্ট বানর এই নীরবতার প্রশ্রয়ে বারবার এই নীতিহীন কাজ করতে থাকল।

এই গল্পটি আসলে রাজনৈতিক, যার অঙ্গে অঙ্গে সমাজ, নীতি, অন্যায় ও ধর্মবোধ ঝিলিক দেয়। আচ্ছা, যে সয় সে-ই রয় তো? না সইলে তো বিনষ্টি। আবার অন্যায় যে সহ্য করে সেও তো ঘৃণ্য। তাহলে? জগৎ তো অবিমিশ্র সুখে ভরা নয়, মাঝে মাঝে কাঁটার বিষ, দহনের জ্বালা। কিন্তু তা বলে সবটুকুই তোমার মনের মতো হবে? নাও তো হতে পারে। না হলে? যে সয় সে রয়। কিন্তু ন্যায়-অন্যায়ের বোধ আর সীমা বড় আপেক্ষিক। যা তোমার কাছে অন্যায়, অন্যের কাছে তা-ই বড় সুখের। কিন্তু যাকে উত্তম-মধ্যম-প্রথম সকলেই অন্যায় মানবে, তা যে সয় কেন সয়? কখনও ভয়ে, কখনও লজ্জায়, কখনও প্রশ্রয়ে, কখনও ঔদার্যে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৩: ডায়মন্ড হারবার, গৌরীর হারিয়ে যাবার দিন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪১: যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে কেন কৃষ্ণের অনুমোদন প্রয়োজন?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৪: কবি-কন্যার প্রিয় বান্ধবী

এই গল্পে শেষেরটাই ঘটেছিল। বোধিসত্ত্ব স্বভাবজ ক্ষান্তি, মৈত্রী, দয়ায় বানরের কেলি, মর্কটের দুর্বৃত্তি নীরবে সহ্য করতেন তাঁর মহত্ হৃদয়বত্তায়। কিন্তু দুষ্কর্মকারী একে দুর্বলতা ভেবে মাথায় চড়ে বসে। মর্কটটিও তেমনটাই বুঝি ভেবেছিল ওই বিপুলকায় মহিষটিকে দেখেও। অন্যায় যে করে তার হিতাহিতজ্ঞান লোপ পায় হয়তো।

একদিন বৃক্ষদেবতা আর থাকতে না পেরে নেমে এসে বললেন—
—“তুমি এই দুঃশীল বানরটির নিত্য অবমাননা সহ্য করো কেন? তাকে নিষেধ করতে পারো না কেন? এই মর্কটটি কি তোমার ধ্যেয় দেবতা? দুটি পদাঘাতে একে বিদেয় করছো না কেন? জেনো, নিষেধ না করলে মূর্খের উত্পীড়ন বাড়তেই থাকে।”
—“হে দেব! আমি যদি উত্পীড়কের তত্ত্বানুসন্ধান না করে, তার বলাবল জাতি-গোত্র বিবেচনা না করে তার উত্পীড়নের প্রতিরোধ করি তাহলে আমার অভিপ্রায় ব্যর্থ হতেও পারে।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৮ : কুহক

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৮: আকাশ এখনও মেঘলা

এখানেই এই ছোট্ট গল্পের নেপথ্যে বহমান কূটনীতি ও রাজনীতির তত্ত্ব, শত্রুর শক্তি, সামর্থ্য ও দুর্বলতা বুঝে তাকে অভ্রান্ত আঘাতে উত্পাটিত করার সত্যটি আছে। সামাজিক নীতি ও মানবীয় বোধের পাশেও দুষ্টের সহন-দমনের বিপরীতে নীরব নিস্পৃহতার নেপথ্যেও যে রণনীতি থাকে, তা যে নিতান্ত আবেগনির্ভর কোনও বিমূঢ়তা নয়, তা বোঝা যায় বৈকী। দেখা যাক বোধিসত্ত্ব আর কী বললেন। তিনি মর্কটের অন্তর্বৃত্তিটুকু নিঃশেষে উপলব্ধি করেছিলেন।

“এই মর্কটটি অন্য মহিষকেও আমার মতোই মনে করে তাকে উত্পীড়ন করতে যাবে। এমন করতে করতে যেদিন কোনও উগ্রপ্রকৃতির মহিষের সঙ্গে এমন অনাচার করতে যাবে, সেদিন-ই পাবে হাতে হাতে ফল। সেদিন এর অত্যাচারের সমুচিত অভ্রান্ত প্রতিক্রিয়া ঘটবে, আমার দুঃখ-ও দূর হবে। কিন্তু দেখুন, হে দেব! আমি একে বধ না করলে প্রাণিহত্যার দায়েও লিপ্ত হবো না। কিন্তু এই দুর্বৃত্তের অবসান অন্যের হাতে হবেই, আমি পরিত্রাণ পাবো, কিন্তু হত্যার অধর্ম-ও স্পর্শ করবে না।”
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

দশভুজা, সরস্বতীর লীলাকমল, পর্ব-৪৬: ঠাকুরবাড়ির লক্ষ্মী মেয়ে

এই হল সাপ মরলেও লাঠি না ভাঙার কৌশল, তত্ত্ব। শত্রুর নিধনে, পররাষ্ট্রতত্ত্বে সকলসময় প্রত্যক্ষ সংঘাতের পরিবর্তে পরোক্ষ কূটনীতি ফলদায়ী। কিন্তু কূটনীতি বা রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যখন ন্যায়-অন্যায়মুখী জীবধর্ম ও মানবধর্মের কর্তব্যাকর্তব্য যুক্ত হয়, তখন অহিংসাধর্ম ও বিপুল অন্যায়, দুর্বৃত্তির অবসান ও সহিংসতার দ্বৈরথে অবলম্বনীয় মধ্যপন্থা কিংবা প্রযুক্ত কূটনীতি অথবা ন্যায়ধর্ম… একটি দীর্ঘ প্রতর্কের পটভূমি বিস্তৃত হতে থাকে। জাতকমালার এই কাহিনিটিতে দেখা যায় দুষ্প্রবৃত্তি ও দুষ্কৃতকারীর অন্যায়ের অবসান ঘটে, পরাজয় ঘটে। ঘটে সহিংস রক্তক্ষয়ে অথবা অন্য পথে। কিন্তু তার থেকেও মহত্তর হল উপলব্ধি ও ন্যায়ধর্মের ভূমিকা। কাহিনির মহিষটি জগত্তারণ নয়, তাই অশুভবিনাশের মতো কোনও বিপুল আদর্শের ভার তার ওপর ন্যস্ত নয়। বরং তার আদর্শের অভিমুখ বাস্তবানুগ সুনীতির উপলব্ধিতে ও প্রতিষ্ঠার দিগ্দর্শনে। সেখানে তার জীবনবোধ অভ্রান্ত, সেখানে দুর্বৃত্তির বিনাশ অবশ্যম্ভাবী, সেখানে কূটনীতি ও রণনীতির পাশেও ব্যক্তিগত ন্যায়-অন্যায়ের বোধটি জেগে থাকে। এই নীতিবোধটিই বর্তমান কাহিনির উপজীব্য। কিন্তু শেষে কী হল?
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩১: সুন্দরবনের এক অনন্য প্রাণীসম্পদ গাড়োল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৬: সেফ শেলটার

এর কয়েকদিন পরেই মহিষরূপী বোধিসত্ত্ব অন্যত্র চলে গেলেন। তাঁর স্থানে এক চণ্ডপ্রকৃতির মহিষ এসে উপস্থিত হল। সেই পার্বত্য স্থান। সেই বৃক্ষমূল। বানর নেমে এল। সে বস্তুতই চিনতে পারেনি আগন্তুক মহিষটিকে। তার হৃদয়ে সত্যস্বরূপ উদ্ভাসিত নয়, অজ্ঞানে আচ্ছন্ন হৃদয়ে সত্যাসত্যের ভেদ থাকে না। তাই মর্কটটি নতুন মহিষটিকেও তার অনাচারের লক্ষ্যীভূত করল। এবার চণ্ডমহিষ ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে সবেগে মর্কটকে আছড়ে ভূপতিত করল, শৃঙ্গের আঘাতে বিদীর্ণ করে দিল তার বুক, পদাঘাতে বিচূর্ণ হয়ে গেল মূর্খ বানরের দেহ।—চলবে।

* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content