কলকাতায় বৃষ্টি

পিলাক, ১০০০ বছরের পুরনো ত্রিপুরার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।

উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ তাঁর ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বেশ কিছু দেবদেবীর বিগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন যেসব শতাব্দীকাল আগেও ভুবন পাহাড়ে দেখতে পাওয়া যেত। তিনি কারুকার্যময় বহু প্রাচীন প্রস্তরখণ্ডের কথাও উল্লেখ করেছেন। শতাব্দীকাল আগেই গুহ লিখেছিলেন যে, ভুবন পাহাড়ে এমন অনেক কিছু রয়েছে যা সাধারণ মানুষের কাছে অজ্ঞাত। এই অঞ্চলের আবৃত ইতিহাস উন্মোচনে তিনি ভুবন পাহাড়ের প্রত্ন সম্পদ বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধানেও গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগেও সাধারণ মানুষের কাছে ভুবন পাহাড়ের কথা প্রায় অজ্ঞাত ছিল। পথও ছিল অগম্য। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে কাছাড়ের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (১৭৮০-১৮১৩ খ্রি:) সচিব জয় সিংহ একটি মন্দির নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে অনেক লোক লস্কর নিয়ে ভুবন পাহাড়ে যাত্রা করেছিলেন। এমন কথিত আছে যে,তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এতে নিবৃত্ত হন এবং সোনাইমুখের কাছে চন্দ্রগিরিতে শিবলিঙ্গ স্হাপন করে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করিয়ে দেন। যাইহোক, অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে ধীরে ধীরে ভুবন পাহাড়ের প্রতি সমতলবাসী পুণ্যার্থীদের আকর্ষণ বাড়তে থাকে।
বর্তমানে শিব চতুর্দশীর সময় ভুবনে বিরাট মেলা বসে। বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে মেলাতে। উল্লেখ করা যায় যে, অতীত কাল থেকেই ভুবন নাগা জনজাতিদের কাছেও এক পুণ্য ভূমি। এরকম কথিত আছে যে ভুবনের নানা দেবদেবীর বিগ্রহকে নাগা জনজাতিদের আদি পুরুষ বলে ভাবা হতো। পাহাড়ে একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গ পথ নিয়েও রয়েছে রহস্য। কারা সৃষ্টি করেছিল এই সুড়ঙ্গ পথ? নাকি প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট এই সুড়ঙ্গ? এমন কথাও প্রচারিত আছে যে, সুদূর অতীতে পার্বত্য অঞ্চলের জনজাতিরা বিপদে আশ্রয় নেয়ার জন্য এই সুড়ঙ্গ সৃষ্টি করেছিল।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪২: কুইক অ্যাকশন

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৯: ডেসডিমোনার রুমাল/৮

তবে শ্রীগুহ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, কাছাড়ে রাজত্বকালে ত্রিপুরার কোনো পরাক্রমশালী রাজা মুণি-ঋষি বা বৌদ্ধ যতীদের যোগ সাধনার জন্য এই সুড়ঙ্গ খনন করিয়েছিলেন। এই ভাবে কাছাড়ের ভুবন পাহাড়ের আলোচনাতেও বারবার উঠে আসে ত্রিপুরার প্রসঙ্গ। একদা ত্রিপুরার রাজাদের শাসনাধীন ছিল এই সব এলাকা। তাই এই অঞ্চলের ইতিহাস রচনায় ভুবন পাহাড়ের প্রত্ন সম্পদের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই সম্পদের বেশিরভাগই আজ ধ্বংস প্রাপ্ত।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

ত্রিপুরার পিলাক হচ্ছে উত্তর পূর্বাঞ্চলের এক উল্লেখযোগ্য প্রত্নভূমি। সেখানেও মাটির নিচে শুয়ে আছে অজানা ইতিহাস। একদা পিলাকে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অনুমান। অনেকে বলেছেন পিলাক একসময় বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব পুষ্ট ছিল। আবার তার শিল্প সামগ্রী ব্রাহ্মণ্য ধর্ম দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন বঙ্গদেশে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থানের প্রভাব পড়েছিল পিলাক অঞ্চলেও। দক্ষিণ ত্রিপুরার পিলাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বিগ্রহ, প্রাচীন যুগের ইঁট, পাচিলের ধ্বংসাবশেষ, মুদ্রা ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

১৯৮৫ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ পিলাকের শ্যামসুন্দর টিলায় খনন কার্য চালায়। সেখানে পাওয়া গিয়েছে পাথরে তৈরি অবলোকিতেশ্বর, মস্তকবিহীন বুদ্ধ, ব্রোঞ্জ নির্মিত বুদ্ধ ইত্যাদি বিগ্রহ। বুদ্ধ মূর্তির মতো পিলাকের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু দেবদেবীর বিগ্রহও পাওয়া গেছে। পূজাখলায় মাটির ঢিবি খনন করে পাওয়া গিয়েছে প্রাচীন দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ। আবিষ্কৃত হয়েছে দন্ডায়মান সূর্য মূর্তি, যা কিনা নবম শতাব্দীর বলে অনুমান করা হয়েছে। পিলাকের ঠাকুরানি টিলায় মাটির নীচ থেকে অনেক বিগ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সূর্য, মহিষাসুর মর্দ্দিনী, শিব। সেখানে পাওয়া গিয়েছে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষও। এরকম মনে করা হয় যে, সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকেই পিলাকের শিল্প সামগ্রী সৃষ্টি শুরু হয়েছিল। ধারণা করা হয়, সুপ্রাচীন কালে পিলাককে কেন্দ্র করে এক সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে উঠেছিল। সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ আরও বলেছেন যে, পিলাকের ভাস্কর্য সমূহের সৃষ্টির পিছনে রয়েছে বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীর বহু বছরের অবদান। সময়ে সময়ে তারা এসেছিল বাংলা, চট্টগ্রাম ও আরাকান থেকে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৯: শো-কেস শহর, উপসাগরীয় শিস এবং গোরার দিনরাত্রি

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

পিলাকের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব পোড়া মাটির ফলক আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলো গুপ্তোত্তর কালের শিল্প কীর্তির সাক্ষ্য বহন করছে বলেও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। পিলাক অঞ্চলে যেসব স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে সেসব সপ্তম-অষ্টম থেকে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল বলে মনে করা হয়। পিলাকের প্রত্ন সামগ্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের ময়নামতী বৌদ্ধ বিহারে প্রাপ্ত সামগ্রীর সাযুজ্য দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেছেন, ময়নামতীর মতো কোনও একসময়ে পিলাক অঞ্চলেও এক বৃহৎ বৌদ্ধ ধর্মকেন্দ্র ছিল।যাইহোক, বিগ্রহ সহ স্হাপত্যের নানা ধ্বংসাবশেষ যে এখনও পিলাক অঞ্চলে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। মাঝে মাঝে এমন আবিস্কারের খবরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পিলাক অঞ্চলে ইতিপূর্বে আবিষ্কৃত অনেক বিগ্রহ অনেকের বাড়িতেও পূজিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাপক অনুসন্ধান ও খনন কাজ চালালে এই অঞ্চলের ইতিহাস উন্মোচনের অনেক উপকরণ পাওয়া যেতে পারে।—চলবে।

* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content