কলকাতায় বৃষ্টি

সলিল চৌধুরী।

ব্যক্তিগতভাবে মাত্র দু’বার তাঁর মতো খ্যাতিমান স্রষ্টার কাছাকাছি পৌঁছনোর সৌভাগ্য ঘটেছিল। একবার তাঁর বেহালা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটের সাউন্ড স্টুডিয়োতে। আমার চিত্রনাট্যে তৈরি হওয়া একটি টেলিফিল্মের গান এবং আবহ রেকর্ডিয়ে। এই পুজোয় ‘সময় আপডেটস’-এ সাক্ষাৎকারভিত্তিক একটি লেখাতে সে প্রসঙ্গে লিখেছিলাম। আর দ্বিতীয়বার কলকাতার উডল্যান্ড হসপিটালে। তখন আমার বাবাও সেখানে ভর্তি রয়েছেন আইসিসিইউতে। সেই ফ্লোরেরই অন্য অংশের আইটিইউতে ভর্তি রয়েছেন সলিল চৌধুরী। দু’জনেই জীবন-মৃত্যুর সীমানায় পা ফেলে ফেলে চলেছেন। একপ্রান্তে প্রিয় আত্মীয়স্বজন অন্যপ্রান্তে আত্মার অমরত্ব! বাবা সব ছেড়ে ওপারে চলে গেলেন ৯ অগাস্ট ১৯৯৫। আর সলিলবাবু চলে গেলেন পরের মাসে ৫ সেপ্টেম্বর। কিন্তু আজ উনিশে নভেম্বর ২০২৫-এ তাঁর ১০০ বছরের জন্মদিন। তবে দুঃখ নয়, আজ হাসির কথাই বলব। তাঁর জবানীতেই বলবো। গঙ্গাজলেই গঙ্গাপুজো।
সে সময় কসবায় বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন। তাঁর ‘রিকশাওয়ালা’ গল্প থেকে বিমল রায়ের ‘দো বিঘা জমিন’ তৈরি হয়ে গিয়েছে। ১৯৫৩-র সম্ভবত শেষের দিক। স্মৃতিচারণে সলিল চৌধুরী লিখছেন—
“…সেজো মামার কাছেই আমি গাড়ি চালানো শিখি। তখন আমার ছিল একটা নাক চ্যাপ্টা বেললিলা ফিয়াট (Bellila Fiat)। সেজোমামাই পছন্দ করে কিনিয়ে দিয়েছিলেন। সেজমামা বলতেন, ‘গাড়ি চালাবার সময় মনে রাখবে সামনে থেকে আসা সব গাড়িই তোমাকে ধাক্কা মারতে আসছে। আর যত লোক রাস্তা দিয়ে চলছে, সবাই তোমার গাড়ির তলায় পড়ে আত্মহত্যা করতে চাইছে। তাহলেই আর অ্যাক্সিডেন্ট হবে না।”
আরও পড়ুন:

অন্তরালের তারা: ম্যান্ডোলিন শিল্পী সরোজ বড়ুয়া/৩: সলিলদা নিজে কখনও বাজান না কিন্তু এটা ব্যতিক্রম : সরোজ বড়ুয়া

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৭: কেমন আছেন সুনীতি, নদীর নরম ছেড়ে সমুদ্রের নুনে!

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৮: পার্ক স্ট্রিট থেকে মহর্ষি ফিরে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়

হ্যালো বাবু! পর্ব-১০৭: ডেসডিমোনার রুমাল/৬

সুরকার লিখেছেন—
“সত্যিই এই থিয়োরি আমার ভীষণ কাজে লেগেছে। বহু অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। ওই ফিয়াটটা ছিল দারুণ গাড়ি! একটানা বড়জোর ২০০ গজ গিয়েই হাঁপিয়ে পড়তো, থেমে যেত। ধাক্কা মেরে স্টার্ট না করলে আর তিনি চলতেন না। আমাদের কসবার বাড়িতে যে সব বন্ধুরা যেমন দ্বিজেন, শ্যামল, নির্মল, সতীনাথ প্রমুখরা আসতেন তাঁদের আমি লিফট দেবো বলে গাড়ি চড়াতাম। আর অনিবার্যভাবে তাদের গাড়ি ঠেলতে হতো। শেষ পর্যন্ত এমন হল যে, দূর থেকে আমার গাড়ি আসছে দেখলেই ওঁরা ছুটে পালাতেন। লিফট নেবার ভয়ে।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র,পর্ব-৭২ : গলি থেকে রাজপথ

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৫: সুন্দরবনের পাখি: বিলের বালুবাটান

এই গাড়ি নিয়ে অনেক মজার কথা লিখেছেন। লিখেছেন তার অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে হর্নের কথা। সেই হর্ন শুনে নাকি রাস্তার লোকজন ভাবতো পিছনে এসে কেউ নাক ঝাড়ছেন। একবার এক বন্ধু নাকি তাঁর বিয়ের জন্য গাড়িটা ধার চেয়েছিলেন। সলিল চৌধুরী বহুবার নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনও লাভ হলো না। এদিকে সেই গাড়ির চক্করে পড়ে বন্ধুর বিয়েটাই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। গাড়ি ফেরত দিতে এসে বন্ধু দু-চার কথা শুনিয়ে গেল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮২: ত্রিপুরা : উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রত্নভূমি ঊনকোটি

সলিল চৌধুরী বলছেন—
“… সেজো মামাকে বললুম, ‘যত টাকা লাগে গাড়িটা সারিয়ে দিন। আমার ইজ্জত পাংচার হয়ে যাচ্ছে!
সেজোমামা বললেন, ‘বাবা তুমি গাড়ি কিনেছে দু’ হাজারে কিন্তু সারাতে লাগবে তিন হাজার। তার চেয়ে তিন হাজারে ওই বিউটি জুয়েলার্স কিনতে চাইছে ওদের বেচে দাও!”


“তাই করা হল। রোজই ভাবি ওই বিউটি জুয়েলার্স-এর মালিক আমাকে রাস্তায় একলা পেলেই ঠ্যাঙাবে। ওকে ঠকিয়েছে বলে। কিন্তু আশ্চর্য! ভদ্রলোক একদিন ডেকে গাড়িটার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে আমাকে চা টোস্ট খাইয়ে দিলেন।”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪১: কারুর কেউ নই-কো আমি…

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৫: একদিকে জল, অন্যদিকে পাহাড় সিউয়ার্ডের রাস্তা যেন স্বর্গদ্বার!

কিংবদন্তি সুরকার লিখছেন—
“পরে সেজো মামা বললেন:
কি ভুলই করেছি! জানিস তো গাড়িটার কোনও ডিফেক্টই ছিল না। শুধু ‘কাট আউটটা’ বদলি করেই গাড়িটা এখন দারুণ চলছে।’
শুনলাম সেই গাড়ি একটু রংচং করে ৫০০০ টাকায় বিউটি জুয়েলার্স বেচে দিচ্ছে এবং প্রথম প্রেফারেন্স নাকি আমার! বুঝুন বেনে কাকে বলে?
দো বিঘা জমিনের পরে বোম্বে থেকে কলকাতায় ফিরে আবার আমি তখন বেকার। গাড়ি বেচার তিন হাজার টাকা কবে ফুটকড়াই হয়ে গেছে। কোথায় পাবো পাঁচ হাজার টাকা, কিন্তু বিউটি জুয়েলার্সকে বললাম, ‘পুরনো গাড়ি আর নয়। ডিসগাস্টেড! কিনি তো এবার নতুন গাড়ি কিনব!’
তার পরেই বিমলদার টেলিগ্রাম এলো ‘বিরাজ বহু’ ছবির মিউজিক করার জন্য। সেই আমার পাকাপাকি কলকাতা ছাড়া ১৯৫৫ সালে।” ….
কলকাতায় বৃষ্টি

রেকর্ডিয়ের আগে রিহার্সালের সময় সলিল চৌধুরীর বাঁদিকে আমি। ডানদিকে জনৈক সঙ্গীতশিল্পী। ১৯৮৮ সাল।

সেই নবজাগরণের যুগে এই বাংলায় এবং ভারতবর্ষে এমন অনেক বিরলপ্রতিভা জন্মেছিলেন যাঁদের কর্মকাণ্ড আজকের দিনের মতো যোগাযোগ মাধ্যমের সুযোগ থাকলে অচিরেই আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে যেত আলোচিত হতো। সেই তালিকায় বোধহয় একেবারে সামনের সারিতে থাকা মানুষটি হলেন সুরকার গীতিকার লেখক কবি কাহিনিকার নাট্যকার সলিল চৌধুরী! তাঁকে শতবর্ষে শতসহস্র প্রণাম!!

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content