মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

অসমের বরাক নদীর তীরে অবস্থিত ফুলেরতল। এর বিশেষত্ব হল, এই অঞ্চলটি এবং তার চারপাশের ছোট-বড় গ্রামগুলি যেমন প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধুত্ব করে আছে, তেমনি এখানে আছে ইতিহাসের ছোঁয়া। তেমনি এই ছোট্ট জনপদটিকে ঘিরে রয়েছে অনেকের জীবিকাও। বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে এর ভূমিকাও কিন্তু কম নয়। বরাক পাড়ের এই ছোট্ট শহরটির বাজারটিও বড় মজার। এখানে বাজার করতে গেলে বরাকের নিখুদ চেহারা দেখা যায়।
লক্ষীপুর মহকুমার এই ফুলেরতল-সহ আসেপাশের অঞ্চলগুলিকে কেন্দ্র করে রয়েছে বেশ কিছু মজার গল্প। এই এলাকার দিলখোশ চা বাগানের কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়। ভাইস রয় লর্ড কার্জনের ভাতিজি এই দিলখোশে চা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দিলখোশ বাগানের মেনেজারের স্ত্রী ছিলেন লর্ড কার্জনের ভাতিজি। লর্ড কার্জন ১৯০১ সালের ১৭ নভেম্বর কাছাড়ের লক্ষীপুর মহকুমার দিলখোশ চা বাগানে আসেন।
আরও পড়ুন:

অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৫৮: অসমের বিশেষ ধরনের ধান

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৫: কিশোরীর মেঘবেলা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯১: যারা সময়ের স্রোতে নত হতে জানে, তারাই টিকে যায়; যারা আগুনে ঝাঁপায়, তারাই পুড়ে মরে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৭: বিলেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অস্ত্রোপচার

ফুলেরতলে রয়েছে “হযরত পীর লঙ্গর শাহ বাবার মোকাম”। হিন্দু ও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই যায় এই মোকামে। বরাক নদীর ডান তীরে এক ছোট টিলার উপর ধ্যান করতেন “বাবা লঙ্গর শাহ”। গাছ-গাছালি ঘেরা এই মনোরম জায়গাটি আজও আধুনিকতা, কৃতিমতা থেকে অনেকে দূরে। বাবা লঙ্গর শাহ ছিলেন সুফি সাধক। তাঁর মধ্যে বেশ কিছু অলৌকিক ক্ষমতা লক্ষ করতেন স্থানীয় লোকজন। লাঙ্গর শাহ ঘুরে ঘুরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেন। কোথাও এক ভাবে থাকেননি। কাছাড় জেলায় তাঁর বেশ কয়েকটি মাজার আছে। এই ফুলেরতল থেকেও তিনি চলে যান মণিপুরের দিকে। শোনা যায়, সেখান থেকে গোলঘাট গিয়েছিলেন। গোলঘাটেই তাঁর তিরোধান ঘটে। ফুলেরতলের এবং আশেপাশের মানুষ আজও যান এই মাজারে মোমবাতি জ্বালাতে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৩: সুন্দরবনের পাখি: বাটান

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন

ফুলেরতল কিংবা লক্ষীপুরের প্রসঙ্গ উঠলে আনারস চাষের কথা না বললে চলে না। ফুলেরতলে চাষ হওয়া আনারসের স্বাদ অতুলনীয়। এখানে উৎপাদিত আনারস আকারে বড় হয়। এখানকার আনারস এখন সারা বিশ্বে আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে। এই অঞ্চলের মারকুলিন এবং জিরিঘাটের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিস্তীর্ণ টিলাতে আনারস চাষ হয়। এই আনারস ক্ষেত বড়ই নয়নাভিরাম। দূর থেকে দেখতে খুবই সুন্দর। প্রায় আট হাজারেরও বেশি পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে এই আনারস চাষের উপর।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৫: মহর্ষি নারদের প্রশ্নচ্ছলে উপদেশগুলি যেন রাজনীতির পাঠ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৮: আপৎকালীন পরিস্থিতি

কথিত, ১৯২০ সালে তত্কালী মিশন ফিল্ড সুপারিনটেনডেন্ট উত্তর পূর্ব ভারতের ইস্ট ইন্ডিয়া জেনারেল রেভান্ট আই কে ডহনুনা ত্রিপুরা রাজের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে ত্রিপুরার রাজা তাঁকে যথেষ্ট খাতিরদারি করেন এবং এই আনারস খেতে দেন। সেই আনারস খেয়ে তিনি মুগ্ধ হন। আর ফেরার সময় কিছু আনারসের চারা নিয়ে নিয়ে যান। তিনি প্রাথমিক ভাবে এই আনারসের চারা ফুলেরতল খ্রিস্টান মিশনের চারপাশে রোপন করেন। আর উৎপাদন এতই ফলপ্রসূ হয় যে, কালক্রমে বিশাল রূপ ধারণ করে। মূলত মার উপজাতির লোকেরাই এই আনারস চাষ করে থাকেন। তবে এখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও এই আনারস চাষের দিকে এগিয়ে আসছেন। লক্ষীপুর মহকুমার ভোলাপুঞ্জি, মরচাখাল, ডিফুছড়া, মলং ইত্যাদিতেও আনারসের ফসল শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৮: দুর্গম গিরি কান্তার ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে

লক্ষীপুরে বর্তমান সময়ে প্রতি বৃহস্পিতিবারে হাট বসে। সব্জি, ফল, মাছ, মাংস, কাপড় থেকে শুরু করে হাতের তৈরি নিখুদ বাঁশ বেতের ঘর সাজানোর জিনিস, মণিপুরী গয়না এবং আরও অনেক কিছুই পাওয়া যায়। কত লোকের জীবিকা নির্ভর করে এই বাজারটির উপর। পাহাড় থেকে দলে দলে নেমে আসেন সাধারণ মানুষ। কেউ বা কিছু বিক্রি করছে কেউ বা কিছু কিনছে। সেদিন রাস্তায় লোকের ভিড় থাকে। আর বেশ উন্নত মানের হস্তশিল্পের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায় এই বাজারে। আসলে বিভিন্ন গঞ্জ বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা, শৈলী এবং সামাজিক ও ঐতিহাসিক কিছু কাহিনি। সময়ের সঙ্গে সেই ইতিহাসও ধূসরিত হয়ে যায়, কিন্তু এই সব কিছু নিয়েই তো একটি জায়গা। অসমের বরাক ব্রহ্মপুত্র পাড়ে রয়েছে এমনি অনেক গল্প অনেক ইতিহাস, যা অসমকে করে তোলে অনন্য।—চলবে।

* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content