রাজার পর সাধারণত রাজপুত্রই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হন। কিন্তু মাঝে মাঝে এর ব্যতিক্রমও ঘটে। আর এই ব্যতিক্রমী ঘটনার সূত্রেই একদিন ত্রিপুরা যাকে হারিয়েছিল পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে উঠেছেন দেশবন্দিত সুরকার।
১৮৬২ সালের আগস্ট। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মৃত্যু ঘটল পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ত্রিপুরার রাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের। মৃত্যুর দুদিন পরে ত্রিপুরার রাজ সরকারের বিভিন্ন কার্যালয়ে পৌঁছে গেল এক ‘রোবকারী’। তাতে পক্ষাঘাতে পীড়িত মহারাজা তাঁর ভাই বীরচন্দ্র ঠাকুরকে ‘যুবরাজ’ এবং প্রথম পুত্র ব্রজেন্দ্র চন্দ্র ঠাকুরকে ‘বড়ঠাকুর’ ও দ্বিতীয় পুত্র নবদ্বীপ চন্দ্র ঠাকুরকে ‘বড়কর্তা’ পদে নিয়োগ করেছেন। এবার এই ‘রোবকারী’ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হল রাজধানী আগরতলায়। কেউ বললেন এটি জাল। আবার কেউ বললেন সঠিক, মৃত্যুর আগেরদিন রাজা স্বহস্তে রোবকারীতে স্বাক্ষর করেছেন!
যাইহোক, বীরচন্দ্রের সিংহাসনে আরোহণের পথ নিষ্কণ্টক ছিল না। রাজার অন্য ভাইরা এর বিরুদ্ধে মামলা মোকদ্দমা করলেন ইংরেজ আদালতে। মামলার নিষ্পত্তি ঘটল দীর্ঘদিন পর। জয়ী হলেন বীরচন্দ্র। শক্তপোক্ত হয়ে বসলেন সিংহাসনে। কিন্তু এরমধ্যে ঈশানচন্দ্রের প্রথম পুত্র ব্রজেন্দ্র চন্দ্রের মৃত্যু ঘটেছে।সাবালক হয়ে উঠেছেন দ্বিতীয় পুত্র নবদ্বীপ চন্দ্র। কথা ছিল মামলায় জয়ী হলে বীরচন্দ্র যুবরাজ করবেন নবদ্বীপ চন্দ্রকে। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হল না। ফলে আবার মামলা মোকদ্দমা। এবার সিংহাসনে আসীন রাজার বিরুদ্ধে মামলা করলেন রাজার ভ্রাতুষ্পুত্র নবদ্বীপ চন্দ্র। কিন্তু তাতেও জয়ী হলেন বীরচন্দ্র।
অবশেষে রাজধানী আগরতলা ত্যাগ করে নবদ্বীপ চন্দ্র তাঁর মাকে নিয়ে চলে গেলেন কুমিল্লায়। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কৈলাস চন্দ্র সিংহ তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’-এ লিখেছেন, “প্রায় এক বৎসর তিনমাস কাল নানা প্রকার যন্ত্রণা ও কষ্ট ভোগ করিয়া কুমার নবদ্বীপ চন্দ্র ১২৮১ ত্রিপরাব্দের (১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ) আষাঢ় মাসের প্রথম ভাগে স্বীয় মাতাকে লইয়া দীন হীনের বেশে কুমিল্লায় উপস্হিত হইলেন।” উল্লেখ করা যায় যে, কুমিল্লা ছিল তখন ত্রিপুরার রাজার চাকলা রোশনাবাদের জমিদারীর সদর। নবদ্বীপ চন্দ্র এবার পাকাপাকি ভাবে কুমিল্লাতেই বসবাস করতে থাকেন। ঊর্ধ্বতন ইংরেজ আধিকারিকের হস্তক্ষেপে মহারাজা বীরচন্দ্র অবশ্য নবদ্বীপ চন্দ্রের জন্য মাসিক ৫২৫ টাকা বৃত্তি মঞ্জুর করেছিলেন। এই নবদ্বীপ চন্দ্রের পুত্রই হলেন ভারত বিখ্যাত এস ডি বর্মণ, ত্রিপুরায় যার পরিচিতি শচীনকর্তা।
জীবনের শেষ পর্বে নবদ্বীপ চন্দ্র ডাক পেলেন আগরতলা থেকে। তখন ১৯০৯ সাল। ত্রিপুরার রাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য। এক ঘোষণায় তিনি নবদ্বীপ চন্দ্রকে রাজমন্ত্রী করে নিয়ে এলেন আগরতলাতে। পুত্র শচীনের শৈশব, কৈশোর কেটেছে কুমিল্লাতেই। প্রথম থেকেই তিনি সঙ্গীত পাগল। তাঁকে কাছে টানে উদাস বাউলের সুর আর নদী নালার মাঝি মাল্লারের গান।
পরবর্তীকালে শচীন দেববর্মণ তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন, “…মার্গ সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে আমার মন গ্ৰাম্য সঙ্গীতের দিকে ঝুঁকে গেল। …আমাদের বাড়িতে বাউল, ভাটিয়ালি গাইয়ে, গাজন-গান ও কালীনাচের গাইয়ে, ফকির বোষ্টম দূরের গ্ৰাম থেকে সর্বদাই আসত। তাদের গানে আমি অভিভূত হয়ে যেতাম।…” — চলবে
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com