
ছবি: প্রতীকী। সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে
ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার চা বাগানগুলোর সাত মাইলের মধ্যে ত্রিপুরার সীমানায় যাতে এধরণের সভা সমাবেশ না ঘটতে পারে সেজন্য ত্রিপুরার রাজ প্রশাসনকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্ৰহণের কথা বলে ব্রিটিশ প্রশাসন। সরকারি বিচার ব্যবস্থা বয়কটের উদ্দেশ্যে কৈলাসহরে ধর্মসভা স্হাপিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্ৰামবাসীরা যাতে বিচার ব্যবস্থার দ্বারস্থ না হয়েও এর মাধ্যমে নিজেদের বিবাদ নিষ্পত্তি করতে পারেন। ত্রিপুরার রাজ প্রশাসন অবশ্য ধর্মসভার কার্যকলাপ শেষপর্যন্ত বন্ধ করে দেয়।
এদিকে ত্রিপুরায় বিপ্লবীদের তৎপরতা সম্পর্কে আরও একটি ঘটনা হচ্ছে রাজপ্রাসাদের অস্ত্রাগার থেকে গুলি সংগ্ৰহ। ১৯২২ সালে আগরতলার রাজপ্রাসাদের অস্ত্রাগার থেকে চট্টগ্রামের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযোগী অনন্ত সিংহ বহু সংখ্যক পিস্তলের গুলি সংগ্ৰহ করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেন আগরতলার উমেশলাল সিংহ-সহ কয়েকজন স্হানীয় যুবক।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৭: বিপ্লবীদের প্রতি রাজার গোপন সহানুভূতি ভালো চোখে দেখত না ইংরেজরা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৩: বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় বিঘ্নসৃষ্টিকারী দেবরাজ ইন্দ্র ও মেনকার কাহিনি কি আধুনিক যুগের সঙ্গে সাযুজ্যময়?
আগরতলায় অনুশীলন সমিতির যে শাখা স্হাপিত হয় তার দায়িত্বে ছিলেন উপেন্দ্র চন্দ্র লস্কর,কুঞ্জেশ্বর দেববর্মা প্রমুখ। শচীন্দ্রলাল সিংহ, প্রফুল্লকুমার বসু, কুমার শচীন দেববর্মণের বড় ভাই প্রশান্তকুমার দেববর্মণ, বীরেন দত্ত, ধীরেন্দ্র দত্ত, দেবপ্রসাদ সেনগুপ্ত প্রমুখ সমিতির সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ বাংলা থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে আসা বিপ্লবীদের ত্রিপুরায় আশ্রয় দান সহ গোপন যোগাযোগের সহায়তা করাই ছিল ত্রিপুরায় এই সমিতির প্রধান কাজ। অনুশীলন সমিতির তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে সদস্যদের কয়েকজনকে বন্দি করা হয়। অনন্ত দেববর্মা,অনন্ত দে,প্রভাত দেববর্মা, সুশীল কুমার দেববর্মা প্রমুখ কারাগারে আটক থাকেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৩: তত্ত্বতালাশ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল
১৯২৮ সালে ত্রিপুরায় জন্ম নেয় ভ্রাতৃসংঘ।শরীর চর্চা ও সংস্কৃতি চর্চার নামে এটি গঠিত হলেও মূলত ভ্রাতৃসংঘ ছিল ত্রিপুরায় বিপ্লবীদের প্রধান আখড়া। যুগান্তর পার্টির ভাবাদর্শে গঠিত ভ্রাতৃসংঘের শাখা ছড়িয়ে পড়েছিল রাজ্যের সর্বত্র। প্রকাশ্যে সমাজসেবা মূলক কাজ করলেও গোপনে ছিল তাদের বিপ্লবী তৎপরতা। দূরবর্তী এলাকায় তাদের আগ্নেয়াস্ত্রের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। এমনকি, রাজপ্রাসাদের অস্ত্রাগার থেকে সংঘের সদস্যরা সেদিন অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্ৰহ করেছিল।ভ্রাতৃসংঘের তৎপরতা রোধে রাজ সরকার থেকে নানা আদেশ জারি সহ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা গ্ৰহণ করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৮: লক্ষ্মী প্যাঁচা
এদিকে ত্রিপুরায় স্বদেশী তৎপরতার প্রভাবের পাশাপাশি কালক্রমে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেও গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটতে থাকে। শুরু হতে থাকে রাজনৈতিক তৎপরতা। রাজ সরকার থেকে অবশ্য তখন এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। ১৯৪২ সালের আগষ্ট মাসে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ত্রিপুরায়। এই আন্দোলন বন্ধের জন্য ভারত সরকার যে আদেশ জারি করেছিল ত্রিপুরাতেও রাজসরকার থেকে অনুরূপ আদেশ জারি করা হয়। যাইহোক, সেদিন এই আন্দোলনের প্রতি রাজা বা রাজপ্রশাসনের ভূমিকা যাই থাক না কেন, রাজ্যের প্রজাবৃন্দ যে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং কেউ কেউ স্বদেশী তৎপরতার সঙ্গে সরাসরি যুক্তও ছিলেন তার নানা তথ্য ছড়িয়ে আছে সেদিনের ইতিহাসে।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-১১: ভাগ্যের ফেরে হাস্যকর ‘লাখ টাকা’
ব্রিটিশ বাংলার লাগোয়া পার্বত্য ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকা সেদিনকার অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে আছে। এপ্রসঙ্গে কৈলাসহরের কথাও উল্লেখ করা যায়। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন সিলেট সীমান্তের ত্রিপুরার এই জনপদটিতে সেদিন স্বাধীনতা আন্দোলনের ছোঁয়া লেগেছিল। ১৯২৭-২৮ সালের কোনও এক সময় কৈলাসহরের মনুভ্যালি চা বাগানে আত্মগোপন করেছিলেন বিখ্যাত বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত। পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন সীমান্ত সংলগ্ন এই চা বাগানটিতে।বিখ্যাত অলিন্দ যুদ্ধের তিন নায়ক বিনয়-বাদল-দীনেশের কথা কে না জানে! কিন্তু এদের মধ্যে দীনেশ যে কিছু দিনের জন্য হলেও কৈলাসহরের মনুভ্যালিতে আত্মগোপন করে ছিলেন তা অনেকেরই অজানা। মনুভ্যালিতে থাকার সময়ে দীনেশের বিপ্লবী তৎপরতা সম্পর্কে অবশ্য কিছু জানা যায়নি। এই চা বাগানটিতে তাঁর এক নিকট আত্মীয় কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রেই দীনেশ এখানে পালিয়ে এসেছিলেন। এমন হতে পারে যে, রাজা শাসিত ত্রিপুরায় ব্রিটিশ পুলিশের ভয় নেই, আবার অদূরেই ব্রিটিশ বাংলা, বিপ্লবী কর্মকান্ডের সঙ্গে যোগাযোগেরও সুবিধা। সেজন্যই দীনেশ আত্মগোপনে চলে এসেছিলেন মনুভ্যালি চা বাগানে। শুধু মনুভ্যালি নয়, কৈলাসহরের আরও একটি চা বাগান কালীশাসনও বিপ্লবী তৎপরতার সাক্ষী হয়ে আছে। একদা কৈলাসহরে অনুশীলন সমিতির তৎপরতার কেন্দ্রভূমি ছিল কালীশাসন চা বাগান। কালীশাসনে কিছু দিন আত্মগোপন করে ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী শরৎচন্দ্র চৌধুরী। তখন তিনি এই চা বাগান থেকেই অনুশীলন সমিতির কাজকর্ম পরিচালনা করতেন।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















