
মা সারদা।
ঠাকুরের পরম ভক্ত বলরামবাবুর বাড়ির ছাদে বসে ধ্যান করতে করতে একদিন তিনি সমাধিস্থ হয়ে যান। পরে বাহ্যজ্ঞান ফিরে এলে বলেন, ‘দেখলুম, কোথায় চলে গেছি, সেখানে সকলে আমাকে কত আদরযত্ন কচ্চে। আমার যেন খুব সুন্দর রূপ হয়েচে। ঠাকুর রয়েচেন সেখানে, তাঁর পাশে আমাকে আদর করে বসালে। সে যে কী আনন্দ বলতে পারিনি। একটু হুঁশ হতে দেখি যে শরীরটা পড়ে আছে। তখন ভাবচি, কি করে এই বিশ্রী শরীরটার ভিতর ঢুকব? ওটাতে আবার ঢুকতে মোটেই ইচ্ছে হচ্ছিল না। অনেক পরে তবে ওটাতে ঢুকতে পাল্লুম ও দেহে হুঁশ এল।’
প্রসঙ্গত, ছোটবেলায় আমার মার মুখে অনেক দার্শনিক কথা ও গল্প শুনতাম। আমার মার কাছেই প্রথম জেনেছিলাম যে, এই জড় দেহপিণ্ড ছেড়ে যখন সময় হলে মনোময় কোষ নিয়ে জীবাত্মা বেরিয়ে যায়, তখন পিছন ফিরে সেই জীবাত্মা পড়ে থাকা জড়দেহকে দেখে নাক কুঁচকে ঘেন্নায় ভাবে, ইস্, এই বিশ্রী পিণ্ডের মধ্যে ছিলাম! ছোট থেকেই আমার মার মুখে মা সারদার জীবনের কথাও শুনতাম। নলিনবাবু একবার শ্রীমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মা, সব অবতারেই কি আপনি এসেচেন?’ শুনে শ্রীমা বলেন, ‘হ্যাঁ, বাবা’।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৯: মাংস জাতক— বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২১: মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন
শতবছর ভক্তহৃদয়ে বাস করে ঠাকুর আবার আসবেন, সঙ্গে শ্রীমাও আসবেন…এই হল ভবিষ্যৎবাণী। আশুতোষ রায় নামে এক ব্যক্তি কখনও কখনও দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের দর্শনে যেতেন। তিনি খর্বকায় ছিলেন বলে ঠাকুর তাকে ‘ঝুনো সরষে’ বলে ডাকতেন। ঠাকুর তার হাত তৌল করে বলেছিলেন, ‘তোর হবে, তবে একটু দেরিতে’। পরে তিনি শিলং এ সরকারী চাকরি পেয়েছিলেন। তার বাড়ির হরিসভায় আর অন্য ভক্তদের বাড়িতে ঠাকুরের ভক্তরা মিলিত হয়ে কথামৃতপাঠ ও সংকীর্তন করতেন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম যুক্ত হয়ে আশুতোষবাবুর অফিস ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে ভক্তরা প্রায় সকলেই ঢাকায় এলেন। তবে নিজেদের মধ্যে সেই আলোচনা, পাঠাদি একরকম বন্ধ হয়ে গেল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৫: গাঙচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?
তখন ঢাকায় মোহিনীবাবুর বাড়িতে রামকৃষ্ণ মিশনের উৎসবাদি হত আর ভক্তরা সেখানেই যোগদান করতেন। পরে পূর্ববঙ্গ ও আসাম বিচ্ছিন্ন হয়ে ঢাকার অফিস উঠে গেলে ওই ভক্তদের অনেকে রাঁচিতে বদলি হলেন। সেইসময়ও তারা নিজেদের মধ্যে আর আলোচনা করতেন না। এমন সময় একদিন গভীর রাতে রাঁচিতে কার যেন ডাক শুনে আশুবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি ‘ও ঝুনো সরষে’ ডাক শুনে চমকে উঠলেন। কারণ, ঠাকুর ছাড়া তার ওই নাম আর কেউ জানত না। সেদিন ছিল মাঘী পূর্ণিমার জ্যোৎস্নাময় রাত। দরজা খুলে দেখেন ঠাকুর রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে, তার পরণে গৈরিকবস্ত্র, পায়ে খড়ম, হাতে চিমটে।
ঠাকুর আশুবাবুকে বললেন, ‘এখানকার কিছু কথা হত। তা ঢাকায় না হয় দরকার ছিল না, এখানে ওটি বন্ধ কল্লে কেন?’ এই বলেই ঠাকুর অন্তর্ধান করলেন। পরে এই ঘটনা নিয়ে স্বামী অরূপানন্দের সঙ্গে মা সারদার কথা হয়। অরূপানন্দ মহারাজ বলেন, ‘খড়ম পায়ে, চিমটে হাতে কেন দেখলে? সন্ন্যাসীর বেশ’। শ্রীমা জানান যে, তিনি যে বাউল বেশে আসবেন বলেছেন। বাউল বেশ, গায়ে আলখাল্লা, মাথায় ঝুঁটি, এতখানি দাড়ি। বলেছেন যে, বর্ধমানের রাস্তায় দেশে যাব, পথের ধারে ছোট ছেলে বাহ্যে যাবে, হয়তো ভাঙা কড়ায় রান্না হবে, ভাঙা পাথরের বাসন হাতে, ঝুলি বগলে, যাচ্ছেন তো যাচ্ছেন। খাচ্ছেন তো খাচ্ছেন, কোনও দিক-বিদিকের খেয়ালই নেই। মহারাজ বলেন যে, বর্ধমানের রাস্তা কেন?’ শ্রীমা বলেন, ‘ওই দিকে দেশ’।
ঠাকুর আশুবাবুকে বললেন, ‘এখানকার কিছু কথা হত। তা ঢাকায় না হয় দরকার ছিল না, এখানে ওটি বন্ধ কল্লে কেন?’ এই বলেই ঠাকুর অন্তর্ধান করলেন। পরে এই ঘটনা নিয়ে স্বামী অরূপানন্দের সঙ্গে মা সারদার কথা হয়। অরূপানন্দ মহারাজ বলেন, ‘খড়ম পায়ে, চিমটে হাতে কেন দেখলে? সন্ন্যাসীর বেশ’। শ্রীমা জানান যে, তিনি যে বাউল বেশে আসবেন বলেছেন। বাউল বেশ, গায়ে আলখাল্লা, মাথায় ঝুঁটি, এতখানি দাড়ি। বলেছেন যে, বর্ধমানের রাস্তায় দেশে যাব, পথের ধারে ছোট ছেলে বাহ্যে যাবে, হয়তো ভাঙা কড়ায় রান্না হবে, ভাঙা পাথরের বাসন হাতে, ঝুলি বগলে, যাচ্ছেন তো যাচ্ছেন। খাচ্ছেন তো খাচ্ছেন, কোনও দিক-বিদিকের খেয়ালই নেই। মহারাজ বলেন যে, বর্ধমানের রাস্তা কেন?’ শ্রীমা বলেন, ‘ওই দিকে দেশ’।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা
মহারাজ জানতে চান, ‘তবে কি বাঙালী?’ শ্রীমা উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ, বাঙালী। তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুনে বল্লুম, ও কি গো, তোমার এ কি সাধ?’ তিনি হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার হাতে হুঁকো-কলকে থাকবে’। শ্রীমা বলেন, ‘যখন বৃন্দাবনে যাই, ছেলেরা সবাই রেল থেকে নেমে চলেচে, পেছনে আমরা। গোলাপ সকলকে জিনিস নামিয়ে দিচ্ছিল। আমার হাতে লাটুর হুঁকো-কলকে দিয়েচে, ওরা ফেলে গেছে। লক্ষ্মী বলচে, এই তোমার হুঁকো-কলকে ধরা হয়ে গেল। আমিও ঠাকুর, ঠাকুর, এই আমার হুঁকো-কলকে ধরা হয়ে গেল বলেই অমনি ফেলে দিয়েচি’।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২০: একেজি কলিং
শ্রীমা নিকুঞ্জদেবীকে একদিন বলেন, ‘ঠাকুর বলেছিলেন, তুমি আর লক্ষ্মী কে, আমি জানতে পেরেচি, তোমাদের বলব না। তোমার ধার শোধ করার জন্যে আমি বাউল হব আর তোমাকে সঙ্গে নেব’। তিনি আরও বলেন যে, লক্ষ্মী বলেছিল, আমাকে তামাক-কাটা কল্লেও আর আসচি না। ঠাকুর হেসে বললেন, ‘আমি যদি আসি তো থাকবি কোথা? প্রাণ টিকবে না। কলমীর দল, এক জায়গায় বসে টানলেই সব আসবে’। ঠাকুরের ভাইজির স্বামী নিরুদ্দেশ হওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে অনেক যাতনা সহ্য করেন। ঠাকুর তাকে খুব স্নেহ করতেন। এই বিষয়ে তারকনাথ রায়চৌধুরী শ্রীমাকে চিঠিতে লেখেন, ‘আমার জন্মভূমি শ্রীশ্রীঠাকুরের লীলাস্থান থেকে বহুদূরে। তাঁর লীলা দেখা আমার ভাগ্যে ঘটেনি। আমার সাধ, ঠাকুর যখন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আবার আসবেন, তখন যেন আমি তাঁর নরলীলা দেখতে পাই’। এর উত্তরে মা সারদা লিখেছিলেন, ‘তোমার বাসনা পূর্ণ হবে’।—চলবে।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।


















