
ছবি: প্রতীকী।
কাকোলূকীযম্
চিরঞ্জীবী বললেন, হে দেব! এ পরিস্থিতিতে সন্ধি-বিগ্রহ প্রভৃতি কূটনীতির ছ’টি উপায়ের মধ্যে আমার মনে হয় ‘সংশ্রয়’ অবলম্বন করাই শ্রেয়। অন্য শক্তিশালী ও পরাক্রমী রাজার কাছে আশ্রয় নেওয়াকেই কূটনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘সংশ্রয়’। কারণ, অত্যন্ত তেজস্বী এবং পরাক্রমী হলেও সহায়হীন একলা ব্যক্তি শত্রুরাজার প্রবল প্রতিরোধের সামনে কিই বা করতে পারে? অর্থাৎ বায়ুহীন স্থানে জ্বলন্ত অগ্নি যেমন নিজের থেকেই নিভে যায়, তেমনই যথেষ্ট তেজস্বী হলেও সহায়হীন হলে পরাক্রমী ব্যক্তির তেজও নিস্তেজ হয়ে যায়। মানুষের একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা, বিশেষত স্বজাতীয়দের সঙ্গে মিলেমিশে থাকাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চাল যেমন ভুসির থেকে আলাদা হলে অঙ্কুরিত হতে পারে না, তেমনই সজাতীয় লোকেদের থেকে আলাদা হলে মানুষ নিজেও উন্নতি করতে পারে না।

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৫: গেমপ্ল্যান
একটা ব্যবসায়ী পরিবারে কিন্তু সজাতীয়রা এইভাবে পাশাপাশি একসঙ্গে থেকে একে অপরকে সাহায্য করে। অন্যের উন্নতিতে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে তার ক্ষতি না করে, তাকে অবলম্বন করে গোটা পরিবারটা কিন্তু উন্নতি করবার চেষ্টা করে। তাই কোথাও না গিয়ে এখানেই অন্য পরাক্রমশালী কোনও ব্যক্তির সহায়তা নেওয়াটা শ্রেয়, যে এই বিপদ থেকে আমাদের ত্রাণ করতে পারবে। যদি আপনি নিজের এই স্থান ছেড়ে অন্যত্র কোথাও চলে যান, তাহলে কেবল আপনার অনুরোধে কেউ আপনাকে সহায়তা করতে এখানে আসবে না। পণ্ডিতেরা বলেন—
স এব দীপনাশায কৃশে কস্যাস্তি সৌহৃদম্।। (কাকোলূকীযম্, ৪৫)

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
তবে শক্তিশালী শ্রেষ্ঠলোকের আশ্রয় বা সমর্থন যদি পাওয়া যায় তাহলে তো আর কোনও কথাই নেই। এই রকম মানুষের সমর্থন সকলেরই উন্নতির সাধন হয়। জড়-প্রকৃতিতেও সেই একই নিয়ম দেখা যায়, ঠিক যেমন পদ্মপাতাতে পড়া জলবিন্দুগুলিও সেখানে মুক্তোর মতন শোভা পায়। ফলে উপযুক্ত শক্তিশালী রাজার আশ্রয় না নিলে আপাতত এই বিপদ থেকে প্রতিকারের কোনও সম্ভাবনা নেই। সুতরাং আমার মতে সংশ্রয়ই হল এখন একমাত্র উপায়। এইভাবে চিরঞ্জীবী ‘সংশ্রয়’-এর পক্ষে মত দিলেন।

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?
বৃদ্ধমন্ত্রী দীর্ঘজীবী বললেন, বত্স! এই সকল মন্ত্রীরাই রাজনীতিশাস্ত্র মন্থন করেই তোমাকে যথার্থ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রত্যেকটি পরামর্শই যুক্তিযুক্ত এবং এই সময়ের জন্য যথার্থ। কিন্তু এই সময়টা হচ্ছে দ্বৈধীভাবের নীতি গ্রহণের সময়। শাস্ত্রে বলে—
দ্বৈধীভাবং সমাশ্রিত্য নৈব শত্রো বলীযসি।। (ঐ, ৬১)
অর্থাৎ শত্রু যদি বলবান হয় তাহলে নীতিজ্ঞ পুরুষের উচিত সেই শত্রুকে বিশ্বাস না করে তার সঙ্গে দ্বৈধীভাব বজায় রাখে চলা। অর্থাৎ ছলনার আশ্রয় নিয়ে শত্রুর সঙ্গে বাইরে বন্ধুত্ব দেখিয়ে সব সময় তাকে কিভাবে শেষ করা যায়, সেই চিন্তা মাথায় রাখা উচিত এবং সেই অনুসারেই প্রয়োজন মতন সন্ধি এবং প্রয়োজন মতন যুদ্ধের পথে হাঁটা কর্তব্য। তাই শত্রুকে কখনো বিশ্বাস না করে, বরং শত্রুর কাছে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিপন্ন করে, সুযোগ বুঝে তাকে সমূলে বিনষ্ট করে দেওয়াটাই বুদ্ধিমান পুরুষের কাজ। রাজনীতিশাস্ত্র বলে, নীতিনিপুণ রাজার তাঁর বিনাশযোগ্য শত্রুকে একবার হলেও বাড়াবাড়ি করবার সুযোগ দেওয়া উচিত। কারণ গুড় খাইয়ে কফের বৃদ্ধি ঘটালেও সহজেই যেমন তাকে নষ্ট করে দেওয়া যায়, তেমনই বিজিগীষু রাজার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে শত্রু যদি বাড়াবাড়িও করে, তাকেও কিন্তু সহজেই তখন নষ্ট করে দেওয়া যায়। তাছাড়া এ সংসারে যে পুরুষ স্ত্রী, পুত্র, দুষ্টবন্ধু এবং বিশেষ করে বেশ্যাদের সঙ্গে সরলসিধা ব্যবহার করে সে পুরুষ বেশি দিন বেঁচে থাকে না।

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২৩: বন্ধু হে আমার…

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু
অনেক সময়ে রাজার সপত্নীরাও রাজাকে বিষ বা অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে। রাজার অঙ্কশায়িনী বেশ্যার মাধ্যমে বিষকন্যা প্রয়োগ করেও রাজাকে হত্যা করা হতো। সে কারণেই রাজাকে তাঁর স্ত্রী, পুত্র, দুষ্ট আত্মীয়-বন্ধু এবং বেশ্যার সঙ্গে সরলসোজা ভাবে না মিশতে বলা হয়েছে। তাই কূটনীতিশাস্ত্র বলে— দেবতা, ব্রাহ্মণ, গুরু এবং নিজের জন্যে কোনো কাজ করবার ক্ষেত্রে একেবারে অকপটচিত্তে ফাঁকি না দিয়ে দ্বিধাহীন মনে করা উচিত। কিন্তু অন্যান্য মানুষের জন্য কোনো কাজ করতে গেলে সবসময় মনের মধ্যে দ্বৈধীভাব রাখা উচিত। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে মনের মধ্যে সংশয় রেখে কি করলে কি হতে পারে বা কি কাজের কি সুফল বা কুফল— এইসব কার্যকারণ চিন্তা করে কাজ করা উচিত। তবে ঈশ্বরের উপাসক শুদ্ধচিত্ত যতিদের সঙ্গে সবসময় নিষ্কপট আচরণ করলেও স্ত্রীব্যসনে আসক্ত কোনো পুরুষ এবং বিশেষতঃ রাজাদের সঙ্গে কখনই সরল শুদ্ধ মনে কথাবার্তা বলা বা আচার-ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ রাজনীতি কখন সরলপথে চলে না— সে হল বক্রপন্থা।—চলবে।


















