বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

অভিনেতা তমাল রায়চৌধুরী প্রয়াত। ছবি: সংগৃহীত।

আজ সকালেও ভাবিনি দুপুরে বসে আমায় তমালদার স্মৃতিচারণা লিখতে হবে। কলকাতা থেকে ভৌগলিক দূরত্ব প্রায় ২০০০ কিলোমিটার হলেও নাট্যসূত্রে কলকাতার হাতে গোনা যে ক’জন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত গুণী, অভিনয়ের নিজস্বতায় এবং স্বধারায় অত্যুজ্জ্বল শ্রদ্ধেয় তমাল রায়চৌধুরী অন্যতম।

এই মানুষটির সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয় ঘটান আমার বাবা। টেলিভিশনে। বাবা খুব যে বেশি টিভি দেখতেন এমন নয়। কিন্তু টেলিসিরিয়াল বা সিনেমায় একেবারে তুড়ি মেরে অভিনয় করতে থাকা এই অভিনেতাকে আমার বাবার বড্ড পছন্দ ছিল। তমালদার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর একথা বলেওছি। তমালদা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেসে উঠে বলেছেন—
—আমাকে? এতো নামীদামি স্টার অভিনেতা থাকতে শেষমেশ আমি? উনি কারও সঙ্গে গন্ডগোল করে ফেলেননি তো?
বাবা তখন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছেন। তাই আমার খুব ইচ্ছে হলেও বাবার সঙ্গে তমালদার কথা বলিয়ে দিতে পারিনি।
আগে ধারাবাহিককে অভিনয়সূত্রে দু-একবার কথা হয়েছে। ফাল্গুনীদার (চট্টোপাধ্যায়) আমন্ত্রণে লোককৃষ্টির নাটক “ছুমন্তর” দেখতে এসেছিলেন তপন থিয়েটারে। তখন আবার আলাপ হল। ফাল্গুনীদা আর রুমকি বৌদির (চট্টোপাধ্যায়) অসামান্য অভিনয়ে সকলে মুগ্ধ। তমালদা উইংসের একধারে নিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললেন—
—বেড়ে লেখা হয়েছে। সুন্দর! জমজমাট!
তাঁর এই তিনটি কথায় অনেকটা সুচিন্তিত মতামত পেয়েছিলাম সেদিন।

অনেকটা দূরে থাকি। কম সময় নিয়ে কলকাতায় আসা হয়। আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও সিনেমা বা থিয়েটার জগতের এত শুভানুধ্যায়ী আছেন! তাদের সকলের সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছে হয়। পেরে উঠি না। তাই সকলের সঙ্গেই নিয়মিত টেলিফোনে যোগাযোগটা আছে। তমালদাকে বারবার বলেছিলাম যে আমার লেখা একটা নাটক করার জন্য।
—আপনার হাতে আমার লেখা একটা নাটক তৈরি হলে আপনার অভিনয়ে সে নাটক পূর্ণতা পেলে শুধু আমি নই, বোধহয় আমার পরলোকগত বাবাও খুব খুশি হবেন।
কথাটা তমালদাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। আমি কলকাতায় নেই, তাই তমালদার দলে আমার নাটক পড়ে শোনাতে গিয়েছিলেন স্বনামধন্য অভিনেতা দেবেশ রায়চৌধুরী। এ সমস্ত বিশিষ্ট মানুষজনের কাছে আমি নানাভাবে ঋণী।
আরও পড়ুন:

সংসার ভেঙে… চলে গেলেন শঙ্কর

দোলি হ্যায়!

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৭ : ঘুঘুর ফাঁদ

নাটক তমালদার ভীষণ পছন্দ হল। তৎক্ষণাৎ চিঠি দিয়ে আনুসাঙ্গিক ফর্মালিটিস সেরে ফেলে কাজ শুরু করলেন। নাটকের নাম ‘সেলফি ও 2BK’। দু’ কামরার দম-আটকানো নাগরিকজীবনে এতটুকু নিজস্বতার অবকাশ নেই। তাই সকলেই ক্রমশ স্বার্থের গণ্ডীতে আটকা পড়ছে। বিপত্নীক দাদু অ্যালঝাইমার্স রোগী। তিনি আর তাঁর এম এ পড়ুয়া নাতনীর অন্য এক নিজস্ব জগৎ। সেই দাদু মাঝে মাঝে অদ্ভুত কথা বলেন। বলেন—
—দিদিভাই আমার মনে হয় সেলফির গণ্ডীতে মানুষ বড়ো বেশি সেলফিশ হয়ে পড়ছে!
তমালদার ভীষণ পছন্দের চরিত্র। পরিচালনা ছাড়াও খুব স্বাভাবিকভাবে এই দাদুর ভূমিকায় অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৫: ত্রিপুরায় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব

তাঁর হাতে গড়া নাট্যদল ক্যালকাটা পারফরমারের শুরু ১৯৯১। বাদল সরকার রচিত প্রলাপ নাটক দিয়ে। ১৯৯২-এ ম্যলিয়ের রচিত নাটক ত্যর্তুফ ভীষণ জনপ্রিয় হল। ১৯৯৫। জন স্টেনবেক-এর লেখা দ্য মুন ইস ডাউন বাংলায় হল অস্তমুখী চাঁদ। ১৯৯৭ সালে রবীন্দ্রনাথের চিরকুমার সভা সম্ভবত ক্যালকাটা পারফরমারের সব থেকে মঞ্চসফল নাটক। প্রায় একশোর উপরে অভিনয় হয়েছে নাটকের। ২০০২-তে শেখর সমাদ্দার রচিত ভুলভুলাইয়া। ২০০৪ এ শেক্সপিয়ারের নাটক দ্য মার্চেন্ট ভেনিস বিশেষ সমাদর পেল। এই তিনটি বিদেশি নাটকের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তমালদা। এত গুণী একজন নাট্যকার যখন আমার লেখা নাটক পছন্দ করেন এবং একজন নাট্যকারের যোগ্যসম্মান দিয়েই সে নাটক শুরু করেন। তখন কৃতজ্ঞতায় মাথা নিচু হয়ে আসে।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

এবার চলচ্চিত্রভিনেতা তমাল রায়চৌধুরী। বোধহয় মঞ্চে বহু মানুষের চোখে চোখ রেখে দাপিয়ে অভিনয় করেছেন বলেই ক্যামেরাতেও সেই ‘ডোন্ট কেয়ার’ ক্যারিসমা বজায় রাখতে পেরেছিলেন। তাই ছবির নাম সিটি অফ জয় হোক বা দ্য নেমসেক। দহন, হীরের আঙটি। কিংবা চিরদিনই তুমি যে আমার , চ্যালেঞ্জ, আওয়ারা, বিন্দাস, আমাজন অভিযান। আশেপাশে তব্বু, ইরফান খান, দেব বা জিৎ যেই থাকুন নিজের চরিত্র নিয়ে তমালদা অপ্রতিরোধ্য।

পেসমেকার বসানোর পরে অভিনয় থেকে মোটামুটি অবসর নিয়েছিলেন। ‘সেলফি ও 2BK’ নাটকটি আর না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছিলেন কমসময়ের কম চরিত্রের ছোটনাটক দিতে। দিয়েছিলাম। কিন্তু শারীরিক কারণে আবার রিহার্সালের ধকল নিতে পারতেন না। বলতেন—
—আরও কিছুদিন দেখি!
মাঝে একদিন বললেন—
—একটা কাজ করলাম নড়াচড়া নেই। হাঁকডাক আছে। বিচারকের পার্ট।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫০: দণ্ডকারণ্যে শূর্পনখা—একটি নাটকীয় চমক ও দ্বৈতসত্তায় অনন্য রাম

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

নানান পারিপার্শ্বিক বা অর্থনৈতিক কারণে এখন আর দলে আগেকার সময়ের, নিয়মানুবর্তিতা থাকছে না তাই নতুন নাটক করা নিয়েও সন্দিহান হয়ে পড়তেন। তবে প্রায়ই টেলিফোনে লম্বা আড্ডা হোত। মজার গল্প হোত। প্রায়ই বলতেন ‘কবে আসছেন কলকাতা’, ‘এলে দেখা করবেন’। আফসোস রয়ে গেল। দেখা হল না।

গত নভেম্বরে চেতনার ৫৩ বছরের নাট্যোৎসবে এসেছিলাম। মূলত আমার নিজের লেখা মেঘে ঢাকা ঘটক দেখার তাগিদে। অনেক চেষ্টা করেও তমালদার সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না। ফোন করেছিলাম। বলেছিলাম —
—এবারটা হল না। পরেরবারে নিশ্চয়ই যাবো।

রোজকারের মতো আজ সকালেও হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ করেছিলাম। তমালদার ফোনে চট করে ব্লুটিক দেখা যায়। গত দু-তিনদিন দেখা যায়নি। বোধহয় ভেতরে ভেতরে শরীরটা ভালো ছিলনা। থিয়েটার জগতেরই আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সকাল ১০টা ১০ মিনিট। মেসেজ করলেন।
‘আজ ভোরে তমালদা নিঃশব্দে চলে গেলেন।’

মেসেজটা দেখেই চমকে উঠে ফোন করলাম। শুনলাম ঘুমের মধ্যেই গভীর ঘুমের দেশে চলে গেছেন তমাল রায়চৌধুরী। জানিনা। সূক্ষ্ম আত্মার বোধহয় কোনও পার্থিব চাহিদা থাকে না বলেই তাঁদের আশীর্বাদ চিরায়ত হয়। তাই বলি—
—ভালো থাকবেন তমালদা। প্রণাম নেবেন। আশীর্বাদ করবেন। যেন মন দিয়ে আরও ভালো কাজ করতে পারি।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘দুটি নভেলা’ ,‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content