রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) বাসায় বাচ্চাসহ বাংলার শকুন। (ডানদিকে) ভাগাড়ে এক দল বাংলার শকুন। ছবি: সংগৃহীত।

“শকুনের নজর সবসময় ভাগাড়ের দিকে”—নামে বাংলায় একটা প্রবাদ অনেকের মুখে যখন তখন শোনা গেলেও শকুন আজ আর সুন্দরবনবাসীর নজরে তেমন পড়ে না। সুন্দরবনের বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ের কাছে শকুন হল বইয়ের লেখা, ছবি আর বড়দের কাছে শোনা গল্প-গাথা। অথচ এইতো সেদিন আমার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে অর্থাৎ ৪০-৪৫ বছর আগেও সুন্দরবনের জনবসতি এলাকার সীমানায় নদী বা খালের ধারে থাকা ভাগাড় বা অন্য কোথাও মৃত জীবজন্তুকে ঘিরে গৃধ্র-সমাবেশ দেখা যেত। দেখা যেত মৃত জীব জন্তুর মাংসের ভাগ নিয়ে গৃধ্র-সারমেয় লড়াই। আর আকাশে দেখা দু’ডানা প্রসারিত করে অনেক উপরে চক্কর দিতে থাকা অগণিত গৃধ্র-গৃধিনী। কিন্তু সেসব আজ সুন্দরবনের অধিকাংশ মানুষের কাছে অতীত। সুন্দরবন অঞ্চলে শকুনরা বিলুপ্তির প্রহর গুনছে।

কোনও ব্যক্তিকে শকুন বললে নিশ্চয়ই এটা গালাগালি বলে রেগে যাবেন। যদিও শকুনের মতো উপকারী পাখি খুব কমই আছে। কাকের মতো এরা হল ঝাড়ুদার পাখি। মৃত জীবজন্তুর মাংস হাড় সবই এদের অন্ত্রে হজম হয়ে যায়। তাই মরা জীবজন্তুর মাংস, হাড় খেয়ে এরা পরিবেশ কলুষমুক্ত রাখে। প্রকৃতই এরা পরিবেশ বন্ধু। শকুন হল চিল, বাজ, ঈগল ইত্যাদির মতো শিকারি পাখি। যদিও শকুন মূলত মৃতদেহ ভক্ষণকারী পাখি তবে কখনও কখনও অর্ধমৃত বা ছোট জীবিত প্রাণীও ভক্ষণ করে থাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশে যেসব শকুন দেখা যায় তাদের বলে প্রাচ্যের শকুন বা ‘Old world vultures’। অবশ্য এশিয়ার অন্যান্য এলাকা, ইউরোপ এবং আফ্রিকাতেও যেসব শকুন দেখা যায় তারা এই ‘Old world vultures’-দের মধ্যেই পড়ে। ভারতে এদের মধ্যে আটটি প্রজাতির শকুন পাওয়া যায়। তবে সুন্দরবনসহ প্রায় গোটা ভারতবর্ষে যে শকুন পাওয়া যায় তা হল সাদা পিঠওয়ালা শকুন বা বেঙ্গল ভালচার (Bengal vulture)। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Gyps bengalensis’। যদিও বললাম যে ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায় কিন্তু বর্তমানে এই প্রজাতিটি ভারতে অবলুপ্তির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
বাংলার শকুন বা সাদা পিঠওয়ালা শকুনদের আকার পৃথিবীর নানা শকুনের মধ্যে মোটামুটি মাঝারি ধরণের। এরা লম্বায় হয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৭ ইঞ্চি, আর ডানা মেললে চওড়ায় হয় ৬.৩ ফুট থেকে ৮.৫ ফুট। পূর্ণবয়স্ক বাংলার শকুনের ওজন ৩.৫ কেজি থেকে ৭.৫ কেজি হতে পারে। অন্যান্য শকুনের জাতের মতো বাংলার শকুনেরও মাথা ও গলায় কোনও পালক থাকে না। তবে ঘাড়ের কাছে সাদা পালকের একটা বন্ধনী থাকে। দেখলে মনে হবে যেন সাদা রঙের কলার। ডানা মেললে দেখা যায় ডানার নিচের দিকের রঙও সাদা। যদিও দুই ডানা, পিঠ ও লেজের রং গাঢ় বাদামি বা কালচে বাদামি। মাথার উপরে গোলাপি আভাযুক্ত চুলের মতো খুব সরু সরু কিছু পালক থাকে। চঞ্চু বেশ বলিষ্ঠ ও মোটাসোটা, বিশেষ করে উপরের চঞ্চুর আগা সামনের দিকে বাঁকা ও তীক্ষ্ণ। এমন চঞ্চু মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার পক্ষে উপযুক্ত। চঞ্চুর রং রূপোলি হলেও উপরের চঞ্চুর গোড়ায় অবস্থিত সিরির রঙ কালো। অপরিণত বাংলার শকুনদের রং অনেক গাঢ় অর্থাৎ কালো।

যেখানে মনুষ্যবসতি রয়েছে তার আশেপাশেই শকুনরা বাসা বাঁধে। আর সাধারণত অনেক শকুনকে এক জায়গায় বাসা বাঁধতে দেখা যায়। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা তথা বিশিষ্ট পক্ষীপ্রেমী অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম লিখেছেন যে তিনি একটা জায়গাতেই শতাধিক বাংলার শকুনের বাসা দেখেছিলেন। যদিও আমি তালগাছে ওদের বাসা দেখেছি তবে বড় বড় বট, অশ্বত্থ, অর্জুন, নিম, শিরিশ ইত্যাদি গাছে ওরা এই দলবদ্ধ বাসা বানায়। আর সেই গাছের শাখায় ও নিচে প্রচুর মল পড়ে জায়গাটা সাদা হয়ে যায়। এরা শুকনো কাঠিকুটি দিয়ে বাসা বানালেও বাসার উপরে থাকে সবুজ পাতার আস্তরণ।

বাসাগুলো দেখতে ঠিক যেন বড় সাইজের লম্বাটে একটা ঝুড়ি। বাসা লম্বায় হয় প্রায় ৩ ফুট ৩ ইঞ্চি, চওড়ায় ১ ফুট ৪ ইঞ্চি আর গভীরতা হয় ৫.৯ ইঞ্চি। এরা মাটি থেকে গড়ে ৮৭.৭ ফুট উঁচুতে বাসা বাঁধে। বাসা বাঁধার মূল উদ্যোগী পুরুষ শকুন। স্ত্রী শকুন সাধারণত একবারে একটাই ডিম পাড়ে। সাদা রঙের ডিমের ওপর নীলচে সবুজ রঙের ছিট দেখা যায়। এরা সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে বাসা বানালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জানুয়ারি হল এদের প্রজনন মাস। স্ত্রী শকুন ৩০ থেকে ৩৫ দিন ডিমে তা দেওয়ার পর ধূসর রঙের নরম পালকযুক্ত বাচ্চা বেরিয়ে আসে। যদি কোনও কারণে ডিম নষ্ট হয়ে যায় তাহলে স্ত্রী শকুন পুরো বাসাটাকেই নষ্ট করে দেয়। যাইহোক বাচ্চা জন্মানোর পর বাবা ও মা শকুন ছোট ছোট মাংসের টুকরো এনে বাচ্চাকে খাওয়ায়। প্রায় তিন মাস এইভাবে বাচ্চারা বাবা-মায়ের কাছে পালিত হয়। বাংলার শকুন প্রায় ১০-১২ বছর বাঁচে।

আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১২: দাঁড়কাক

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৬: বরুণজাতক: অলস মস্তিষ্কের গল্প

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

আমার গ্রামের বাড়ির সামনেই ছিল একটি প্রাচীন ভাগাড়। আর তাই আমার বাড়ির সংলগ্ন আকাশে বহু উঁচুতে প্রতিদিন শকুনদের চক্রাকারে চক্কর কাটতে আজন্ম দেখেছি। বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যেত এক বিস্তৃত সুগভীর খাল। যা অতীতে নদী ছিল বলেই শুনেছি। আর সেই নদী হল দোয়ানি নদী। যাই হোক ওই খালের দক্ষিণ পাড়ে ছিল প্রাচীন এক শ্মশান, আর উত্তর পাড়ে ছিল ভাগাড়। শ্মশানের পাশেই ছিল বড় বড় গাছ। শকুনগুলো সেই গাছে বসে বিশ্রাম নিত খাওয়ার পরে বা মাঝে। যেহেতু সেই সময় সমস্ত বাড়িতেই গোরু পোষা হত তাই কিছুদিন অন্তর ভাগাড়ে মৃত গোরু ফেলা হত। এমনও হয়েছে যে এক একদিন দুটি বা তিনটি মৃত গোরু ফেলা হয়েছে। মৃত গোরু ফেলার সাথে সাথে দেখতাম গ্রামের গনেশ মুচি আরও দু’তিনজন সহকারীকে নিয়ে চলে আসত চামড়া কেটে নেওয়ার জন্য। ততক্ষণে কুকুর ও শকুনের দল হাজির হয়ে যেত। তাদের লাঠি দিয়ে তাড়া করত গনেশ মুচির সঙ্গী-সাথীরা। তারপর গনেশ মুচি চামড়া কেটে নিয়ে চলে গেলেই কুকুর আর শকুনদের চিৎকারে কান পাতা দায় হত। হাজির হয়ে যেত কাকরাও।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

ওই ভাগাড়ে শকুন, কুকুর আর কাকদের মধ্যে বিষমপ্রজাতি জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা চাক্ষুষ করেছি আশৈশব। তারপর ধীরে ধীরে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসাদ পৌঁছোতে লাগল। চাষের জন্য পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যবহার শুরু হল। ফলে বলদ গোরু পোষার গুরুত্ব গেল কমে। তারপর প্যাকেটজাত দুধ সহজলভ্য হয়ে গেল গ্রামের হাটবাজারেও। ফলে দুধের জন্য গাভী পালন করার গুরুত্ব গেল কমে। বেশিরভাগ সময়ে শকুনের বাসা দেখতাম তাল গাছে। আমাদের বাড়িতে অনেকগুলো তালগাছ ছিল আর সেই সব তালগাছে দেখতাম শকুনের বাসা। পুরুষ তালগাছগুলোতে গুড়ের জন্য রস দেওয়া হত। আবার তালশাঁস ও পাকা তালের জন্য স্ত্রী তালগাছেরও চাহিদা ছিল। তালগাছের কাঠ দিয়ে কড়ি-বর্গা ও পুকুর ঘাট তৈরি করা হত। কিন্তু তাল এবং তাল গুড়ের চাহিদা ক্রমশ কমে গেল। মাটির বাড়ির পরিবর্তে সুন্দরবনের গ্রামাঞ্চলে পাকা বাড়ির সংখ্যা বাড়তে লাগল। পুকুরঘাটগুলোও হতে লাগল পাকা। ফলে তালগাছের চাহিদা গেল পুরোপুরি কমে। ছোটবেলায় দেখেছি পাকাতালের আঁটি জমির আলে বা পুকুরপাড়ে পুঁতে দেওয়া হত তালগাছ তৈরি করার জন্য। কিন্তু তালগাছের চাহিদা না থাকায় তালগাছ তৈরি করা তো দূর বড় তালগাছগুলিও কেটে ফেলা হতে লাগল। এইভাবে সুন্দরবনের গ্রামে গঞ্জে দিন দিন তালগাছ কমতে লাগল। শুধু তালগাছ নয়, বট, অশ্বত্থ, শিরিশ, অর্জুন – আজকাল এইসব গাছের কোনও অর্থকরী গুরুত্ব না থাকায় কেউ লাগায় না, আর জন্মালেও কেটে ফেলে দেয়। স্বাভাবিকভাবে এই কারণে শকুনের বাসাও কমে গেছে। খাদ্যাভাব ও বাসস্থানের অভাব সুন্দরবন অঞ্চল থেকে শকুনকে প্রায় বিলুপ্ত করে দিয়েছে। আমি নিজে গত দু দশকে একটি শকুনও উড়তে দেখিনি।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) বাংলার শকুনের বাসা। (ডানদিকে) মৃত পশুর মাংস ভক্ষণরত বাংলার শকুন। ছবি: সংগৃহীত।

তবে কেবল সুন্দরবন অঞ্চলে নয় সারা ভারত জুড়েই শকুনের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমেছে। ১৯৯৯ সালে বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি (BNHS) সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে যে রাজস্থানের কেওলাদেও জাতীয় উদ্যানে ১০ বছরে সাদা পিঠওয়ালা শকুনের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। সমীক্ষায় প্রকাশ, দিল্লি আগ্রা ভরতপুর এলাকার মধ্যে যেখানে ১৯৯০ সালে এই শকুনের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার, ১৯৯৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৫০টি। ১৯৯৯-এর সুপার সাইক্লোনের পর উড়িষ্যাতে আর একটাও সাদা পিঠওয়ালা শকুন দেখা যায়নি। ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির মতে সারা ভারতে শকুনের সংখ্যা কমেছে ৯০ শতাংশ। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে সাদা পিঠওয়ালা শকুনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০টি যার মধ্যে কলকাতার আশেপাশে ছিল মাত্র ৭০টি। বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির গবেষকদের অভিমত, একটি ভাইরাসঘটিত রোগে শকুনের ব্যাপক অবলুপ্তি ঘটেছে। এই ভাইরাসের আবির্ভাব হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে। আর ছোঁয়াচে হওয়ায় এই ভাইরাস শকুনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। রোগের নাম দেওয়া হয়েছে নতশির লক্ষণ (Drooping head syndrome)। এই রোগে শকুনের গলার পেশি ও স্নায়ু শিথিল হয়ে যায় ফলে মাথা নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। শকুন তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারায় এবং অবশেষে মারা যায়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

কিছু পাখি বিশেষজ্ঞ ডাইক্লোফেনাক ও কিটোফেন নামে দুটি ওষুধ শকুনের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই দুটি ওষুধ গবাদি পশুর জ্বর ও অন্যান্য কয়েকটি রোগে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গবাদি পশু মারা গেলে তার মাংসে থেকে যায় ওই প্রতিষেধক ওষুধ। আর সেই গবাদি পশুর মাংস খেলে শকুনের দেহে চলে আসে ওইসব ওষুধ। এইভাবে শকুনের দেহে ওইসব ওষুধের পরিমাণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। দেখা গিয়েছে শকুনের দেহে অতি সামান্য পরিমাণ এইসব ওষুধ বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া করে। এতে শকুন মারা যায় কিংবা প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, এমনকি ডিমের থেকে বাচ্চার জন্ম হয় না।

অবশ্য আর এক দল বিজ্ঞানীর মতে, সাদা পিঠওয়ালা শকুনদের স্বাভাবিক বিশ্রামের ভঙ্গি হল মাথা নোয়ানো। সুতরাং ভাইরাসঘটিত রোগ নয় বরং খাদ্যে বিষক্রিয়া শকুনের গণবিলুপ্তির অন্যতম কারণ। কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার দূষিত পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি শকুনের প্রজননক্ষমতাকে বিঘ্নিত করেছে। আবার মৃত শকুনের অটোপসি পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে ওইসব শকুন পক্ষি-বাত কিংবা বৃক্কের সমস্যায় ভুগছিল। পাখিদের ক্ষেত্রে সাধারণত জলাভাবে বৃক্কের সমস্যা হয়। কিন্তু শকুনদের জলাভাব হয়েছে এমনটা প্রমাণিত হয়নি। আর তাই শকুনের ব্যাপক বিলুপ্তির প্রকৃত কারণ এখনও রহস্যাবৃত।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

তবে বহুদিন ধরেই চোরাশিকারীরা বিষপ্রয়োগ করে জঙ্গলে হাতি, গন্ডার, বাঘ, হরিণ প্রভৃতি প্রাণী হত্যা করে তাদের শিং, দাঁত, চামড়া ইত্যাদি সংগ্রহ করে। আর সেই সব প্রাণীর বিষাক্ত মাংস খেয়ে মারা পড়ে বা অসুস্থ হয় বেচারা শকুনরা। বন্দুকের গুলিতে মৃত পশুর মাংস খেয়েও শকুনরা সিসাঘটিত বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। আমার ধারণা, শকুনের ব্যাপক অবলুপ্তির পেছনে একটা বা দুটো কারণ নয়, রয়েছে একাধিক কারণ। আর তাই কেবল সুন্দরবনেই নয়, দেশের প্রায় সব জায়গাতেই শকুনের অস্তিত্ব বিপন্ন। “শকুন” কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন—
“মাঠ থেকে মাঠে-মাঠে—সমস্ত দুপুর ভ’রে এশিয়ার আকাশে-আকাশে
শকুনেরা চরিতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁটি বস্তি; নিস্তব্ধ প্রান্তর
শকুনের; যেখানে মাঠের দৃঢ় নীরবতা দাঁড়ায়েছে আকাশের পাশে।
আরেক আকাশ যেন—সেইখানে শকুনেরা একবার নামে পরস্পর
কঠিন মেঘের থেকে;”
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) গাছে বসে একদল বাংলার শকুন। (ডানদিকে) উড়ন্ত বাংলার শকুন। ছবি: সংগৃহীত।

কিন্তু এখনকার চিত্র হল, কঠিন মেঘের থেকে নিস্তব্ধ প্রান্তরে এখন শকুনের নেমে আসা দেখতে পাওয়া যায় কদাচিৎ। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর যত মৃত জীবজন্তুদের মাংস খেয়ে পৃথিবীকে আমাদের বাসযোগ্য করে রাখে “প্রকৃতির বন্ধু” শকুনরাই। সেই শকুনরাই যদি হারিয়ে যায় শুধু সুন্দরবন নয়, পৃথিবীটা আর আমাদের বাসযোগ্য থাকবে তো? —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content