রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

বিশ্বকর্মা পুজো। ছবি: সংগৃহীত।

ঠাকুর-দেবতারা আমাদের ঘরের লোক। কেউকেটা হলে বিষ্ণু, নচেৎ বিষ্টু। বিশ্বকর্মা আর কার্ত্তিককে নিয়েও এমন চলে। দুজনেই আসলে নাকি এক, পড়াশোনা করে পাশ দিলে বিশ্বকর্মা। আর উনিশটিবার ঘায়েল হয়ে থামলে কার্ত্তিক। অথবা কাত্তিক। সে যাই হোক, আজ বিশ্বকর্মার পুজো। কনভয়ের আগে যেমন এসকর্ট, তেমনই শারদোৎসবের আগে বিশ্বকর্মা। এখন গণেশজির পুজোও বেশ ‘রেস’ দিচ্ছে, তবে পুজোর গন্ধ বিশ্বকর্মার হাতির পিঠে, হাতের ঘুড়ি চড়ে আসে নিয়মিত।
বিশ্বকর্মা বঙ্গভূমিতে দিব্যি সুপুরুষ নায়ক। জিম, যোগা করা লৌহকঠিন পেটানো সুঠাম চেহারা, শালপ্রাংশুমহাভুজ তিনি। ফেলুদা, শার্লকের মতো বয়স তাঁর বাড়ে না। পলিতকেশ পাকামাথা বৃ্দ্ধ তিনি নন, যুবাপুরুষ। পুরনো কলকাতার বাবুসদৃশ মুখে টিকালো নাকের নিচে সরু গোঁফ, গায়ে বর্ম, অনেকটাই চোখ বুজে ভরসা করা যায় এমন হাতাহীন গেঞ্জি যেন, ভ্যাপসা গরমে পাড়ার বিশুদাদের জাতীয় পোষাক তো ওটাই।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩১: মহর্ষি চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে মৃত্যু

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩২: প্রেম নামে বন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৫: পূর্বোত্তরে আন্তরাজ্য সীমা বিবাদ

বিশ্বকর্মা এলিট নন। এই নন-এলিট দেবতা স্বয়ং যেন সাব-অল্টার্ণ থিওরি হয়ে মণ্ডপে দাঁড়িয়ে থাকেন, হাতির গায়ে হেলান দিয়ে। হাতে হাতুড়ি, ছেনি, ঘুড়ি। যাবতীয় যন্ত্রপাতির মধ্যে তাঁর বাস। সে বাস হোক, কিংবা লরি, বৃহত্ শিল্প অথবা ক্ষুদ্র শিল্প, সাইকেল, অটো, বাইক, রিক্সা, টোটো, ভ্যান, ভ্যানো সর্বত্র আলো জ্বালেন দেব বিশ্বকর্মা। সেই কবে আলোর দেবতা সূর্যদেবের অতিরিক্ত তেজ ভ্রমিযন্ত্রে কেটে ছেঁটে বেশ বডিকেয়ার-স্পা-পেডিকিওর-ম্যানিকিওর-গ্রুমিং করে জামাইরাজাকে সমাজে প্রেসেন্টেবল করে দিয়েছিলেন। বিশ্বকর্মা আমাদের সূয্যিমামার শ্বশুরমশাই, সে-সব গল্প পুরাণের বইতে আছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩০: অলৌকিকতার আবরণে লৌকিক-অনুভবের পরশ

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের যাবতীয় ঘরবাড়ি-স্থাপত্য-হার্ডওয়্যার-সফটওয়্যারের প্রাণ এবং প্রমাণপুরুষ বিশ্বকর্মা, আমাদের বিশুদা। প্রতি পাড়ায় পাড়ায় এমন একজন সব্যসাচী থাকেনই, ওয়ান-স্টপ-সলিউশন। গাড়ি খারাপ? ফিউজ উড়েছে? পাম্পে জল উঠছে না? পলেস্তারা খসে যাচ্ছে? এসিতে গরম হাওয়া? গিজারে ঠান্ডা জল? ফ্যান ঘুরছে না? চাকা ঘুরেই চলেছে? বিশুদারা হাজির হয়ে যান নিমেষেই। কলুর ঘানি থেকে এআই (AI), সর্বত্র তিনি।

চণ্ডীর প্রেস থেকে জুতোর ট্যানারি, এমনকী সেলাইয়ের সূঁচটা পর্যন্ত তাঁর ইঙ্গিত ছাড়া নড়ে না হে। হুঁ হুঁ বাবা! আলপিন থেকে ইন্দ্রপ্রস্থ, ইন্দ্রের বজ্র থেকে বজ্রসেনের বজরা সবেতেই তিনি, স—ব জানে ওঁর পিছনের ওই এলিফ্যাণ্ট ঐরাবত। মানুষ আর যন্ত্রের ব্যবধান কমছে। মজার ব্যাপার হল, যন্ত্র মানুষ হচ্ছে, অযান্ত্রিক মানুষ দায়িত্ব নিয়ে কোন্ যন্তর-মন্তরে অ-মানুষ, না-মানুষ, যন্ত্রবৎ হয়েছে। এমন কৃতকর্মা মনুপুত্রদের বঙ্গভূমিতে ব্যাজস্তুতিতে “যন্তর” বলেও বটে! ভবিষ্যতে বিশ্বকর্মার দায়িত্ব বাড়বে, যন্ত্র, রোবট এসবের পাশাপাশি মানুষের শরীরের আর মাথার নাটবল্টুও রীতিমতো অয়েলিং করতে হবে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৭: আবাবিল

তবুও বিশ্বকর্মার ডিপার্টমেন্ট নিয়ে সমস্যা নেই তা নয়। নরলোকে যেমন সমস্যাটা ঠিক কার দায়িত্বে; জলের না দমকলের, এ থানার না ও থানার, বুকের না মাথার নাকি পেটের, জলপুলিশের নাকি ডাঙার এসব নিয়ে জোর চাপান-উতোর তেমনই স্বর্গেও আছে। এই যেমন ধরুন, অক্ষর-শব্দ ছাপার সময়ে বিশ্বকর্মা, ছাপা হয়ে গেলে সরস্বতী। সেখানে আবার গণেশেরও কিছুটা দখল। কিন্তু কতটা? এখন আবার গণেশ আর বিশ্বকর্মাও পাশাপাশি, কাছাকাছি। মানে, সুর বেরোলে সরস্বতী, না বেরোলে, বেসুর কিংবা অসুর হলে বিশ্বকর্মা, এরকম একটা ভাগাভাগি করা যায় বটে, তবে সেটাই সব নয়। তবে হ্যাঁ, বিশ্বকর্মার একটা অসুর-সংযোগ আছে বটে। তথাকথিত আর্য দেবতা যাঁরা, তাঁদের মতো তো তিনি নন।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করা লোকজন কবেই আর এলিট, আর্য, “ভদ্দরলোক” হল? তাই ইন্দ্রবিরোধী ত্বষ্টা, বৃত্র কিংবা ময়দানব এদের সঙ্গেই বিশ্বকর্মার ওঠাবসা। কিন্তু তিনি যদি হাতুড়ি না ধরেন তাহলে এই জগতের কী যে হতো! সেই হযবরলতে সুকুমারমতি হিজি-বিজ্-বিজ্ বলেছিল, “একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল অবিমৃষ্যকারিতা, তার ছাতার নাম ছিল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু—কিন্তু যেই তার বাড়ির নাম দিয়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে।” বিশ্বকর্মা এমন অবিমৃষ্যকারী নন, তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বেই জগতে সেতু, প্রাসাদ, মিনার, টাওয়ার, বাঁধ দিব্যি বন্যা-ভূমিকম্প-জলোচ্ছ্বাস আর মানুষের বিপুল উত্পাত সহ্য করে দাঁড়িয়ে আছে। তাই তিনি পরমকল্যাণবর আর কী! সিম্পল!
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

এখনও সারা বছর নগরে-বন্দরে-জনপদে তাঁর সশব্দ দানবীয় পদসঞ্চারে সৃষ্টিসুখের উল্লাস আর পুজোর ক’দিন মোড়ে মোড়ে মণ্ডপে মুখোমুখি বসিবার থুড়ি, দাঁড়ানোর সময়। তিন চারদিন ঠায় দাঁড়িয়ে খিচুড়ি-ফ্রাইডরাইস, পেয়ারা, শশা থেকে চিকেন কষা, উদ্দাম নাচ, দুমদাম সুর থেকে সুরা — সবটাই দেখে আশীর্বাদ বিলিয়ে দধিকর্মা সেরে বিশ্বকর্মা জলপথে স্বর্গে যাবেন, প্রতিবছর যেমন যান। তারপর রাত নামে, ডিজে থামে। নতুন কনসেপ্ট, দারুণ আইডিয়া, আরেকটু সুখ, অনেকটা শান্তি বুঝি পৃথিবীর সব ইঁট-কাঠের পাঁজরে, পাথরের বুকে ফুল হয়ে ফুটতে চায়।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content