কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : সংগৃহীত।

একঝলকে

ছবি : ভ্রান্তিবিলাস

ছবির নায়িকা : সাবিত্রী ও সন্ধ্যা

দ্বৈত ভূমিকায় উত্তম কুমার অভিনীত চরিত্রের নাম : চিরঞ্জিত ও চিরঞ্জীব

পরিচালনা : মানু সেন

প্রেক্ষাগৃহ : রূপবাণী, অরুণা ও ভারতী

মুক্তির তারিখ : ৩১.০৫.১৯৬৩

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাস্যরসাত্মক ছবির মধ্যে ‘ভ্রান্তিবিলাস’ একটি কালজয়ী সৃষ্টি। উত্তম কুমার অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি বাংলা সিনেমায় কমেডির এক অনন্য নিদর্শন। শেক্সপিযয়ের বিখ্যাত নাটক ‘The Comedy of Errors’ অবলম্বনে নির্মিত এ ছবি প্রথমে বিদ্যাসাগরের হাতে তারপর পরিচালক মানু সেন-র তত্ত্বাবধানে বিধায়ক ভট্টাচার্য ও উত্তম কুমারের হাতে পূর্ণতা পেয়েছে।

বাংলা সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের সঙ্গে এ কাহিনিকে মানিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে এটি আজও সমানভাবে উপভোগ্য। চলচ্চিত্রটি কেবল হাসির খোরাক নয়; এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক ব্যঙ্গ, পারিবারিক সম্পর্ক, মানব-মনস্তত্ত্ব এবং ভাগ্যের অদ্ভুত পরিহাসের এক চমৎকার উপস্থাপনা। উত্তম কুমারের অসাধারণ দ্বৈত অভিনয় এই ছবিকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
ছবির মূল কাহিনি দুই জোড়া যমজ ভাইকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। জন্মের পর দুর্ঘটনাবশত দুই ভাই এবং তাদের দুই ভৃত্য আলাদা হয়ে যায়। বহু বছর পরে তারা একই শহরে এসে উপস্থিত হলে চেহারার অবিকল মিলের কারণে একের পর এক ভুল বোঝাবুঝি, বিভ্রান্তি এবং হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কেউ ভুল ব্যক্তিকে স্বামী বলে মনে করে, কেউ বন্ধুকে চিনতে পারে না, কেউ আবার ঋণ দাবি করে বসে। এই ভুল পরিচয়ের জটিলতা থেকেই ছবির হাস্যরস সৃষ্টি হয়। শেষপর্যন্ত সমস্ত রহস্যের সমাধান হলে বিচ্ছিন্ন পরিবার একত্রিত হয় এবং সুখের সমাপ্তি ঘটে।

‘ভ্রান্তিবিলাস’-এর মূল বিষয় হল পরিচয়ের বিভ্রান্তি। কিন্তু এর মধ্যেই পরিচালক মানবজীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন—
যেমন ভাগ্যের অদ্ভুত খেলার সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্বের সাথে সামাজিক সম্পর্কের ভঙ্গুরতা, ভুল বোঝাবুঝির কারণে সৃষ্ট সংকট ও বুদ্ধিদীপ্ত রসোজ্ঞ সমাপ্তি। চলচ্চিত্রটি দেখায়, অনেক সময় মানুষ বাহ্যিক চেহারা দেখে বিচার করে এবং প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

মুভি রিভিউ: আজও অর্ধাঙ্গিনী: ভালোবাসার পরেও যে সম্পর্ক বেঁচে থাকে

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৬ : আলোচনার টেবিলে

এবার আসি উত্তম কুমারের অভিনয় প্রসঙ্গে। এই ছবির প্রাণ হল উত্তম কুমারের অভিনয়। তিনি একই ছবিতে দুটি পৃথক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। দুটি চরিত্রের মুখ একই হলেও ব্যক্তিত্ব, আচরণ, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং শরীরী ভাষার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য সৃষ্টি করে তিনি অভিনয়ের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

একজন চরিত্র শান্ত, মার্জিত ও সংযত; অন্যজন কিছুটা প্রাণবন্ত, অস্থির এবং পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। দর্শক কখনও বিভ্রান্ত হন না—কারণ উত্তম কুমার অভিনয়ের মাধ্যমে দুই চরিত্রকে আলাদা সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশেষ করে বিভ্রান্তির দৃশ্যগুলিতে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি, বিস্ময়, অস্বস্তি এবং হাস্যরস সৃষ্টির ক্ষমতা অসাধারণ। কোথাও অভিনয় অতিরঞ্জিত নয়; বরং স্বাভাবিকতার মধ্যেই হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণেই ‘ভ্রান্তিবিলাস’ উত্তম কুমারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কমেডি অভিনয়ের নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৬৮: রামায়ণে পরস্ত্রীহরণের সিদ্ধান্তে বীরত্বের প্রকাশ নেই, আছে অনেক মৃত্যুর আবাহনবার্তা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৩: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৩

পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পীদের অভিনয়ও ফেলে দেবার মতো নয়। চলচ্চিত্রের অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকে নিজেদের চরিত্রে প্রাণ সঞ্চার করেছেন। বিশেষত পার্শ্বচরিত্রগুলির অভিনয় ছবির হাস্যরসকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। নারী চরিত্রগুলির স্বাভাবিক অভিনয়, সন্দেহ, অভিমান, ভালোবাসা এবং বিস্ময়ের প্রকাশ ছবিকে বাস্তবধর্মী করে তুলেছে।

ছবিটির পরিচালনাও কালজয়ী উপাধি লাভ করেছে। পরিচালকের অন্যতম কৃতিত্ব হল একটি জটিল কাহিনিকে অত্যন্ত সহজ ও উপভোগ্যভাবে উপস্থাপন করা। ভুল পরিচয়ের গল্পে সামান্য অসতর্কতা থাকলেই দর্শক বিভ্রান্ত হতে পারতেন। কিন্তু পরিচালক দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি ঘটনাকে সাজিয়েছেন। কৌতুকের পাশাপাশি আবেগ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নাটকীয়তার মধ্যে সুষম ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে। কোথাও অশালীন বা কৃত্রিম হাস্যরসের আশ্রয় নেওয়া হয়নি।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : সংগৃহীত।

ছবিটির মূল প্রাণ হল চিত্রনাট্য। চিত্রনাট্য এই ছবির অন্যতম প্রধান শক্তি। প্রতিটি দৃশ্য পরবর্তী ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। ঘটনাপ্রবাহ এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে দর্শকের আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। সংলাপগুলি বুদ্ধিদীপ্ত, প্রাণবন্ত এবং রসবোধে পরিপূর্ণ। ভুল পরিচয়জনিত বিভ্রান্তি সংলাপের মাধ্যমেই আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

হাস্যরসের বৈশিষ্ট্যও দেখার মতো। ‘ভ্রান্তিবিলাস’-এর হাস্যরস কখনও অশালীন নয়। এটি পরিস্থিতিনির্ভর (Situational Comedy)। হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে— ভুল পরিচয় থেকে আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে তথা সংলাপের চাতুর্যে ও চরিত্রের মানসিক প্রতিক্রিয়ায়। সমভাবে দায়ী সামাজিক পরিস্থিতির ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা। এই কারণেই ছবির হাস্যরস আজও আধুনিক দর্শকের কাছে সমান উপভোগ্য। এরপর আসি ছবির সংগীতবিষয়ে। চলচ্চিত্রের গান ও আবহসংগীত কাহিনির সঙ্গে সুন্দরভাবে মানানসই। গানগুলি গল্পের গতিকে ব্যাহত না করে আবেগকে সমৃদ্ধ করেছে।
আরও পড়ুন:

রথযাত্রা

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…

আবহসংগীত উত্তেজনা, বিভ্রান্তি এবং হাস্যরসকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। চিত্রগ্রহণ অত্যন্ত সুন্দর ও পরিকল্পিত। একই অভিনেতাকে দুটি চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করার জন্য ক্যামেরার ব্যবহার বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। দৃশ্য বিন্যাস, আলোকসজ্জা এবং সম্পাদনার সমন্বয়ে দ্বৈত চরিত্রের দৃশ্যগুলি বাস্তব বলে মনে হয়। অন্যদিকে সম্পাদনাও অত্যন্ত নিখুঁত। কাহিনির গতি কোথাও শ্লথ হয় না। দৃশ্যান্তর স্বাভাবিক এবং দ্বৈত চরিত্রের উপস্থিতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে।

ছবিটির সামাজিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘ভ্রান্তিবিলাস’ শুধুমাত্র একটি কমেডি চলচ্চিত্র নয়; এর মধ্যে গভীর সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। চলচ্চিত্রটি আমাদের শেখায় বাহ্যিক চেহারা দেখে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। ভুল বোঝাবুঝি অনেক বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। পারিবারিক সম্পর্ক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত-সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

ভাগ্যের খেলায় মানুষের জীবন অনেক সময় অপ্রত্যাশিত দিকে মোড় নেয়। ছবিটির সাহিত্যিক মূল্য আলোচনা করা উচিত। এই চলচ্চিত্র বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের একটি সফল সংযোগ রচনা করেছে। শেক্সপিয়রের নাটকের মূল কাঠামো বজায় রেখেও এটিকে সম্পূর্ণ বাঙালি পরিবেশে রূপান্তর করা হয়েছে।

বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক মূল্যবোধকে যুক্ত করে ছবিটি স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করেছে। চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ যে সময়ে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ছিল না, সেই সময়ে একই অভিনেতাকে দ্বৈত চরিত্রে উপস্থাপন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ।

ক্যামেরা, সম্পাদনা, আলোকসজ্জা এবং অভিনয়ের সমন্বয়ে এই সীমাবদ্ধতা সফলভাবে অতিক্রম করা হয়েছে। সুতরাং উত্তম কুমারের অসাধারণ দ্বৈত অভিনয়, পরিচ্ছন্ন পারিবারিক হাস্যরস, চমৎকার চিত্রনাট্য, স্মরণীয় সংলাপ, বিশ্বসাহিত্যের সফল রূপান্তর, পারিবারিকভাবে উপভোগ, করার মতো নির্মাণশৈলী, সময়কে অতিক্রম করা বিনোদনমূলক আবেদন প্রভৃতির মিলিত ফলে ‘ভ্রান্তিবিলাস’ আজও জনপ্রিয়।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : সংগৃহীত।

এরপর আসি ছবিটির সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে। বর্তমান যুগের দ্রুতগতির চলচ্চিত্রের তুলনায় ছবির গতি কিছুটা ধীর বলে মনে হতে পারে। এছাড়া নাট্যধর্মী সংলাপ এবং দীর্ঘ দৃশ্য আধুনিক দর্শকের কাছে কিছুটা ভিন্ন অনুভূত হতে পারে। তবে এগুলি ছবির শিল্পমূল্যকে কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ করে না।

‘ভ্রান্তিবিলাস’ বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য সম্পদ। এটি শুধু একটি হাস্যরসাত্মক ছবি নয়; বরং অভিনয়, চিত্রনাট্য, পরিচালনা এবং সাহিত্যরূপান্তরের এক অসাধারণ উদাহরণ। উত্তম কুমার তাঁর দ্বৈত চরিত্রে এমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন যা আজও অভিনয়শিল্পীদের কাছে শিক্ষণীয়।

এই চলচ্চিত্র প্রমাণ করে যে সুস্থ ও রুচিশীল কৌতুক কখনও পুরোনো হয় না। ভুল পরিচয়ের সহজ গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবি মানবিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সম্পর্ক, বিশ্বাস এবং সত্যের জয়ের এক কালজয়ী শিল্পরূপ। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘ভ্রান্তিবিলাস’ তাই কেবল একটি জনপ্রিয় সিনেমা নয়, বরং অভিনয়শিল্প, সাহিত্যরূপান্তর এবং চলচ্চিত্রনির্মাণের এক উজ্জ্বল মাইলফলক।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content