
তাঁকে নিয়ে কোনও দিন কিছু লিখবো, তেমন ধৃষ্টতা মনেও স্থান দিইনি। সামনের ২০২৬-এর ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর ১০০ বছর পূর্ণ হবে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ লাগাতার পাঁচ বছরের ব্যর্থতার পর ১৯৫২ থেকে ১৯৮০—এই ২৫ বছরের উত্থান তারপর আজ ৪৫ বছর কাটল। ব্যর্থতা তো প্রচারের আলো পায় না, মানুষ চেনেন না। তাই সাংবাদিক, সমালোচকও ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না। সাফল্য ছুঁলে তারপর প্রচারের সার্চলাইট নিয়ে সেই লোকজনই পড়ি কি মরি করে পিছন পিছন ছুটতে থাকেন যাঁরা একসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। যুগে যুগে কালেকালে এটাই হয়ে আসছে, ভবিষ্যতেও তাই হবে।
মোটামুটি ১৯৫১ থেকে আজ ২০২৫ প্রায় ৭৫ বছর ধরে কলম আর কম্পিউটারের কিবোর্ড তাঁর কথা লিখে যাচ্ছে, কোটি কোটি শব্দ লেখা হয়ে গিয়েছে। এরপর নতুন কী?
ভেবে দেখলাম আছে। এমন কিছু যেটা আমি দেখেছি। ছবির নাম ইমনকল্যাণ। শান্তিময় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালক। বড়মামাকে বহুবার বলবার পর সেদিনই প্রথমবার (দুর্ভাগ্যবশত সেটাই শেষ) উত্তমকুমারের শুটিং দেখতে গিয়েছি। আমার বড়মামা অমিয়কুমার বসু, ইমনকল্যাণ ছবির সহকারী পরিচালক। আজকের ভাষায় এডি (AD)।
ভেবে দেখলাম আছে। এমন কিছু যেটা আমি দেখেছি। ছবির নাম ইমনকল্যাণ। শান্তিময় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালক। বড়মামাকে বহুবার বলবার পর সেদিনই প্রথমবার (দুর্ভাগ্যবশত সেটাই শেষ) উত্তমকুমারের শুটিং দেখতে গিয়েছি। আমার বড়মামা অমিয়কুমার বসু, ইমনকল্যাণ ছবির সহকারী পরিচালক। আজকের ভাষায় এডি (AD)।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-২৭: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৫: রবীন্দ্রনাথের বিয়ের রাতে মারা গিয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির জামাই

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?
বড়মামা মূলত পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের সহকারী ছিলেন। তাই ‘ধন্যি মেয়ে’ থেকে ‘অগ্নীশ্বর’-এর নানান গল্প শুনেছি। বড়মামা অবিবাহিত। ডাকনাম ‘কালো’। তখন যেমন হতো আর কি! ইন্ডাস্ট্রিতে ‘কালোবাবু’ বা ‘কালোদা’ নামেই পরিচিত। শুধু পর্দায় যখন নামটা যেত সহকারী পরিচালনা ‘অমিয়কুমার বসু’। আমি চোখ বড় বড় করে দেখতাম। কিন্তু এমনিতে বাড়িতে টালিগঞ্জের কোনও কথা বলতেন না। মামার বাড়িতে ছুটির দিনের বিকেলবেলায় আমার মেজমামার বন্ধুরা, ননীমামা, সুবিমলমামা, ডলার মামা আসতেন। তাঁরা যে আমার নিজের মামা নন সেটা কখনও মাথাতেই আসেনি। বেশ একটা জমজমাট আড্ডা হতো। তাঁদের চাপাচাপিতেই টুকরো টুকরো নানান কথা বলতেন বড়মামা, আর আমি সেসব চোখ গোল গোল করে গিলতাম।

বড়মামা সিগারেট খেতেন না। সেটের মধ্যে উত্তমকুমার তাঁর দামি ঘড়ি ৫৫৫-এর প্যাকেট বড়মামার হাতের ধরিয়ে দিতেন। অগ্নীশ্বর ছবিতে প্রথমদিকে যে বাংলো দেখানো হয়েছিল সেই বাড়ির খুব সুন্দর সাজানোবাগান, মানুষের ভিড়ের চাপে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। উত্তমকুমার নিজে বাড়ির মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছিলেন। মালিক বলেছিলেন, এটাই তাঁর জীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৬: আমরা আসলে কাকে পুজো করছি? ঈশ্বরকে, নাকি রক্তমাখা অভ্যাসকে?
বয়স্ক ডাঃ অগ্নীশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মেকআপে একটা ধবধবে সাদাচুলের উইগ ব্যবহার করা হয়েছিল। মেকআপ টেস্টের সময় উত্তমকুমার সম্ভবত আপত্তি জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন স্বাভাবিক লাগছে না!
—দেখেছেন এমন কাউকে?
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় হেসে বলেছিলেন—
—হ্যাঁ, কালোবাবুর বাবার মাথায় অবিকল এরকমই সাদা চুল। ওঁর কাছে ছবি দেখেছি! আর উনিও ডাক্তার…।
উত্তমকুমার হেসে ফেলেছিলেন। বয়স্ক অগ্নীশ্বর মুখোপাধ্যায়কে পর্দায় কেমন লেগেছিল সেটা সবাই জানেন।
—দেখেছেন এমন কাউকে?
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় হেসে বলেছিলেন—
—হ্যাঁ, কালোবাবুর বাবার মাথায় অবিকল এরকমই সাদা চুল। ওঁর কাছে ছবি দেখেছি! আর উনিও ডাক্তার…।
উত্তমকুমার হেসে ফেলেছিলেন। বয়স্ক অগ্নীশ্বর মুখোপাধ্যায়কে পর্দায় কেমন লেগেছিল সেটা সবাই জানেন।

আমার মামার বাড়ির দাদু ডাক্তার অক্ষয়কুমার বসুও এক বিশিষ্ট চরিত্র। হাতে টানা রিকশায় করে সকালে ও সন্ধ্যায় বেলেঘাটার দুটি ডিসপেন্সারিতে যেতেন। অত্যন্ত সফল ডাক্তার হওয়া সত্বেও নিজের বাড়ি করে যেতে পারেননি, গাড়ি তো দূর অস্ত! সাহিত্যের চরিত্রের মতোই গরিব মানুষের কাছ থেকে তো ভিজিট নিতেনই না, বরং তাদের ওষুধ কেনার পয়সা দিয়ে দিতেন! এমন চরিত্র সেকালে অনেক ছিল বলেই ডাক্তার বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) অগ্নীশ্বর লিখেছিলেন।
আরও পড়ুন:

নিঃসঙ্গ মহানায়ক

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা
এরপর মহেশতলার সারেঙ্গাবাদ স্কুলের মাঠের সৃজনী’র বার্ষিক অনুষ্ঠানে সাজোসাজো রব। সে-সময়ের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় ক্লাবের পুরোধা। বড়দিনে ২৪ আর ২৫ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠান হতো। কলকাতার সমস্ত নামী শিল্পীরা আসতেন। এর আগে একবার আসার কথা ছিল কিন্তু তিনি আসেননি। সে-বার জোর গুজব উত্তমকুমার আসছেন। মঞ্চে গান করছেন ভূপেন হাজারিকা। পরপর জমজমাট গানের মাঝে ছোট্ট কাগজের স্লিপ এলো, শিল্পী পরের গানে অনুষ্ঠান শেষ করে মঞ্চ ছাড়লেন।

মঞ্চে এলেন সেই সময়ের নামী অনুষ্ঠান সংযোজক বোম্বের একসময়ের চিত্রপরিচালক অজয় বিশ্বাস, ঘোষণা করলেন। দর্শকঠাসা অনুষ্ঠানে হুল্লোড় শুরু হল। তিনি এলেন। সাদা ধুতি-কাজকরা পাঞ্জাবি। টকটকে লাল রঙের শাল বাঁ কাঁধের উপর থেকে আড়াআড়ি নেওয়া! চোখে সেই ডিম্বাকার আকৃতির আইকনিক চশমা। মাল্যদান সম্বর্ধনার পর দু’চারটি কথা।
—“এখানে এর আগে একবার আসার কথা ছিল, আসতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করবেন। আজও হয়তো আসা হতো না। কিন্তু সুব্রতবাবুকে না বলা খুব কঠিন। আমি আমার বাড়িতে একটি বিবাহের অনুষ্ঠান ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য এখানে এসেছি। আপনারা সকলে ভালো থাকবেন! নমস্কার।”
—“এখানে এর আগে একবার আসার কথা ছিল, আসতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করবেন। আজও হয়তো আসা হতো না। কিন্তু সুব্রতবাবুকে না বলা খুব কঠিন। আমি আমার বাড়িতে একটি বিবাহের অনুষ্ঠান ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য এখানে এসেছি। আপনারা সকলে ভালো থাকবেন! নমস্কার।”
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭১: পুষ্পধনু
কাট টু। ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়ো (খুব সম্ভবত) ১৯৭৯। ছবির নাম ইমণকল্যাণ। উত্তমকুমার, মহুয়া রায়চৌধুরী, সুপ্রিয়া চৌধুরী, দীপঙ্কর দে অভিনয় করেছেন। সে-দিন শুটিংয়ে উত্তমকুমার এবং সুপ্রিয়া দেবী ছিলেন! বারবার লোডশেডিং হয়ে যাচ্ছিল। লোডশেডিংয়ের কারণে পাওয়া বিরতিতে বড়মামার কল্যাণে একটু আগে সামনে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে একটা প্রণাম করার সুযোগ পেয়েছি। কেউ একজন এসে বলেছিলেন, মেকআপ রুমে গিয়ে বিশ্রাম করতে। তখনই শুনেছিলাম সেই কথাটা—
—“বিশ্রামের জন্য নয়, পরিশ্রমের জন্যে টাকা দেন প্রযোজক’’
—“বিশ্রামের জন্য নয়, পরিশ্রমের জন্যে টাকা দেন প্রযোজক’’

কৈশোর কাটিয়ে এসে যখন উত্তম-সৌমিত্র নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে লড়াই হতো বোধহয় একটু স্বতন্ত্র হবার জন্যই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতাম! নিতান্ত নির্বোধ ছিলাম। তাই বুঝতাম না এঁরা একএকজন একএকটি প্রতিষ্ঠান। নেহাৎ বোকারাই তুলনা টেনে তর্ক-বিতর্ক করে আর নিজেরাই আনন্দ পায়।
কাঠফাটা রোদে টালিগঞ্জের টিনের শেডের গুমোট গরম। সেটের হাজার হাজার ওয়াট আলোয় বা খোলা মাঠে নদীর ধারে হাজার হাজার জোড়া চোখের সামনে কোনও একটি বিশেষ চরিত্র হয়ে আলো, লেন্সের গন্ডি সংলাপ, আবেগের মাপ, দৃশ্যের কন্টিনিউইটি ও নির্দেশকের দাবি মেনে বিশেষ বিশেষ চরিত্রে বা বছরের পর বছর একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শককে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সিনেমা হলে টেনে আনার ক্ষমতা যাঁদের আছে, তাঁদের কারোরই তুলনা হয় না। তাঁরা অতুলনীয় তাঁরা সর্বোত্তম! তাই মৃত্যুর ৪৫ বছর পরেও তাঁদের মানুষ মনে রাখেন। চিরকাল রাখবেন।
কাঠফাটা রোদে টালিগঞ্জের টিনের শেডের গুমোট গরম। সেটের হাজার হাজার ওয়াট আলোয় বা খোলা মাঠে নদীর ধারে হাজার হাজার জোড়া চোখের সামনে কোনও একটি বিশেষ চরিত্র হয়ে আলো, লেন্সের গন্ডি সংলাপ, আবেগের মাপ, দৃশ্যের কন্টিনিউইটি ও নির্দেশকের দাবি মেনে বিশেষ বিশেষ চরিত্রে বা বছরের পর বছর একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শককে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সিনেমা হলে টেনে আনার ক্ষমতা যাঁদের আছে, তাঁদের কারোরই তুলনা হয় না। তাঁরা অতুলনীয় তাঁরা সর্বোত্তম! তাই মৃত্যুর ৪৫ বছর পরেও তাঁদের মানুষ মনে রাখেন। চিরকাল রাখবেন।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। উপন্যাস লেখার আগে জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১ম খণ্ড)’। এখন লিখছেন বসুন্ধরা এবং…এর ৩য় খণ্ড।


















