শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


ছবি: প্রতীকী।

আমাদের বাংলার রান্নার ইতিহাস নিয়ে কিংবা তার ঐতিহ্য নিয়ে আমরা প্রায়শই চর্চা করি। স্বাস্থ্য সচেতন রান্না থেকে শুরু করে কম সময়ে রান্না প্রভৃতি বিষয় নিয়ে মুদ্রণ মাধ্যম থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিন মাধ্যম সবাই মশগুল থাকে। রান্নার বই লেখার প্রচলন তো আছেই। কিন্তু রান্না করার জন্য হাতা-খুন্তির পাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয় রান্না করার জ্বালানি, তা নিয়ে খুব একটা চর্চা হয় না।

অতীতে নয়, এখনও মহিলারা কাঠ, কয়লা প্রভৃতি ব্যবহার করেন রান্না করার জন্য। কিছু বাড়িতে রান্নার জন্য এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার হতে দেখা যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক হিটার বা ইন্ডাকশন ওভেনও ব্যবহার হয়। এখনও অনেকে বলেন, কাঠ কয়লার উনুনের রান্নার কি দারুণ স্বাদ ছিল! রান্নাতে কাঠ কয়লা পোড়ার গন্ধ যুক্ত করার প্রক্রিয়াও দেখা যায়। অর্থাৎ আমরা রান্নার জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত করেছি স্বাদকে। কিন্তু যুক্ত করতে চাইনি পরিবেশ দূষণের মতো বিষয়কে আর মহিলারা যাঁরা রান্না করেন, তাঁরা এই ধরনের জ্বালানির ব্যবহারের ফলে তাঁদের স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি হয় সে সব বিষয়ে খুব বেশি আলোচনা হতে দেখি না।

এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমি বোঝাতে চাইছি, নারীরা কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করবেন সেই বিষয়টি কীভাবে নির্ধারিত হয় আমাদের সমাজে। কারণ রান্না করা, ঘর সামাল দেওয়া নারীদের জীবনের একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগের লেখায় বলেছিলাম, চায়ের দেশের মেয়েদের কথা। তাদের সামাজিক জীবনের কথা তুলে ধরেছিলাম। সেই জীবনের একটি বড় অংশ কাটে রান্না করতে করতে। রান্নার কথা আমি আলাদা করে বলিনি কারণ আমাদের সামাজিক পরিসরে আদিবাসী মানুষের বন-মোরগের ঝোল বা অন্য রান্না গুরুত্ব পেয়েছে বা বাণিজ্যিক পন্য হয়েছে। কিন্তু রান্নার জ্বালানি নিয়ে মেয়েদের কোনও ভাবনা আছে কিনা, সেই বিষয়টিকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি।
আমি যখন বিনি-মিনিদের বাড়িতে পৌঁছেছিলাম, তখন দেখলাম দুপুরের রান্না শেষ হয়ে গিয়েছে। রান্নাঘর বলে সেরকম কিছু নেই। তিনটে ইট রেখে কাঠ দিয়ে রান্না হয়েছে। সেই টুকু চিহ্নই পড়ে আছে। আমি শহুরে মানুষ। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম, গ্যাস নেই? উত্তর এল, নেই। আমি আরও ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলাম সরকারি প্রকল্পে গ্যাস পাননি কেন? এ বার জবাব পেলাম, এরা কেউ গ্যাস ব্যবহার করতে চায় না। কারণ, গ্যাস ব্যবহার করা কঠিন! আমি নাছোড়বান্দা। ফের জিজ্ঞেস করলাম শিখিয়ে দিলেই ঠিক পারা যায়। কোনও সমস্যা নেই। খুব সহজ ব্যবহার। সময় বাঁচে। আমাকে অবাক করে দিয়ে শীর্ণকায়া বিনি-মিনি জানালেন, কাঠ দিয়েই ভালো রান্না হয়। কোনও বিপদের ঝুঁকি থাকে না। রাস্তার উল্টো দিকের বাড়িতে বিকেলের রান্না চলছে দ্রুত গতিতে। কারণ জিজ্ঞেস করতে জানতে পারলাম, হাতির এবং চিতা বাঘের উপদ্রপ রাতের দিকে বাড়ে। তাই তাঁরা দ্রুত খেয়ে দেড় তলার ঘরে আশ্রয় নেবে। রান্না ঘরে আমাদের মতো মডিউলার কিচেন নেই। বাসনপত্র নেই। আছে শুধু একটা উনুন। এই আদিমতা মেনে নিতাম দুর্গমতার বিষয় ভেবে, কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে ফিরে এসে আবার জ্বালানি নিয়ে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বুঝলাম গল্প একই। খুব বেশি পার্থক্য নেই। বাড়িতে গ্যাস হয়তো আছে কিন্তু গ্যাস ব্যবহার খুব সীমিত। কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাবেন, দাম বেশি। পরিবারে যদি তিন জন রোজগেরে হন, তখন একজন দায়িত্ব নেয় গ্যাস কিনে দেওয়ার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি হয় বাড়ির ছেলে। তখন ব্যবহার কিছুটা বাড়ে।
আরও পড়ুন:

বৈষম্যের বিরোধ-জবানি, পর্ব-৪৭: চায়ের দেশের বিনি-মিনির কথা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৫: সর্বত্র বরফ, কোত্থাও কেউ নেই, একেবারে গা ছমছম করা পরিবেশ

গ্যাসের সুবিধা যদি বলি, তা হল দ্রুত এবং ধোঁয়া মুক্ত রান্নার একটি সহজ উপায়। আমাদের কাজের দিদিরা বা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মানুষেরা সেই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না। তাঁরা জানিয়েছেন, কাঠ কয়লায় তাঁদের রান্না দ্রুত হয়। গ্যাসের রান্না অনেক ধীর গতির বিষয়।

এই ধরনের যুক্তি শুনে আমি নিজে একবার রান্না করার চেষ্টা করলাম। দেখলাম প্রক্রিয়াটি একটু জটিল। কিন্তু এর থেকেও যেটি বেশি চোখে পড়ার মতো, সেটি হল ধোঁয়া এবং দূষণের পরিমাণ। ভীষণভাবে ধোঁয়া হতে থাকে। সেই ধোঁয়াতে চোখ জ্বলতে থাকে। হাতে প্রচণ্ড তাপ লাগতে থাকে। খুবই বিপদজ্জনক। যে কোনও সময়ে আগুন লেগে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে। এই সম্ভবনা দেখে মনে হল, কত মেয়ে এ ভাবে আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছেন। অথবা শ্বশুরবাড়ির লোক ব্যবহার করেছেন এই আগুনকে বৌমাকে ভয় দেখাতে বা পুড়িয়ে মারতে। গ্যাসের ব্যবহার বাড়ার পরেও শ্বশুরবাড়িতে আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছেন এই বয়ানের হেরফের হয়নি। রাতেরবেলায় বাচ্চার দুধ গরম করতে গিয়ে আগুনে পুড়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৭: পাতি সরালি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১০: বনবাসী রামের নিরাসক্ত ভাবমূর্তির অন্তরালে, ভাবি রামরাজ্যের স্রষ্টা দক্ষ প্রশাসক রাম

ওই বয়ান লেখা আছে হাসপাতালের রেকর্ডেও। দোষের মধ্যে সহজে বলা যায় গ্যাস ব্যবহার করতে জানে না মেয়েরা। নব ঘুরিয়ে গ্যাস অন করতে হয়। এই পদ্ধতি মেয়েদের পক্ষে মনে রাখা কঠিন। মেয়েরা নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না বা চান না। মেয়েদের আলাদা রাখার এই প্রবণতা প্রাচীন এবং এখনও বর্তমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের মধ্যে চেতনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগে

মেয়েরা কী এই আগুনকে কখনও ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করেছেন? তথ্য পাই না। কিন্তু এমন তথ্যও পাই, এই কাঠ কয়লা দিয়ে লেখা পড়ার চেষ্টা করেছেন অনেক মেয়ে। প্রাচীন গুহাচিত্রতে এই কাঠ কয়লার ব্যবহার দেখা গিয়েছে সেই সময়ের সমাজচিত্র আঁকার কাজে। সময় এগিয়েছে কিন্তু এই কাঠ কয়লার ব্যবহারের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

কাঠ কয়লার উনুনে রান্না করলে বাসনপত্রে খুব কালি পড়ে। মেয়েরা উপায় বের করেছেন। মাটি লেপে দিয়ে ব্যবহার করেন। কিন্তু কেউ খেয়াল করে না এই কারণে অনেক বেশি সময় নিয়ে বাসন মাজতে হয় মেয়েদের। সময় ও জল দুই-ই বেশি লাগে। পরিশ্রম অনেক বেশি করতে হয়। আগেকার দিনে মা, দিদিদের কাছে শুনেছি, রান্নায় গুল-এর ব্যবহারের কথা। গুল-এ কয়লার গুঁড় দিয়ে হত। তারপর রোদে শুকাতে হত। এই কাজ করতে তাঁদের অনেক সময় ব্যয় করতে হত। মেয়েদের সময়ের দাম নেই। কারণ তাঁরা রোজগার করবেন না। তাঁরা বিজ্ঞানের গবেষণা করবে না। যাঁরা রান্নার কাজ করেন, তাঁদের কেউ বাধ্য করা হবে এভাবে জ্বালানির জন্য পরিশ্রম করার জন্য। এই কাজের দিদিদেরও শরীর বলে কিছু নেই। তাঁদেরও কোনও স্বাধীনতা নেই নিজের কাজের থেকে সময় বাঁচিয়ে কিছু অন্য কাজ করার।
আরও পড়ুন:

আকাশ এখনও মেঘলা/১৪

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৪: ‘মহেশ্বরের অনন্ত ধৈর্য’

আমাদের দেশে মেয়েদের স্বাধীনতা নেই এই রকম পরিশ্রমের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। কেউ ভাবেন না তাঁর রান্নার জ্বালানি দূষণমুক্ত হলে তাঁর সময় বাঁচত। চোখ বাঁচত। তাঁর হাঁপানির মতো রোগ হতো না। তাঁর জামাকাপড় ধোঁয়া গন্ধময় হতো না। সেই সময়ে সে অন্য কোনও কাজ করতে বা শিখতে পারতেন। তাঁর শরীর অনেক ভালো থাকত। লেখাটি এই পর্যন্ত পড়ে অনেকেই বলবেন, মেয়েরা এখন স্মার্টফোন ঘাঁটতে ব্যস্ত থাকেন। তাঁরা বাড়ির কোনও কাজ করতে চান না। অথচ কেউ দেখে না তাঁদের কাজের সুবিধার জন্য জলের কল নেই, চব্বিশ ঘণ্টা জল নেই, ভালো বাথরুম নেই, শোয়ার খাট নেই। সব কিছু নিজেকেই জোগাড় করে আনতে হবে। তাঁর শরীর খারাপ হতে পারে না। তাঁর রক্তাল্পতা থাকতে পারে না। রোগের উপশমের থেকে বিচার হবে সে কাজ করছে না কি করছে না।

পুরুষেরা নিজেরা হিসেব করে দেখেছেন অর্থ রোজগারের জন্য কাজের ছাড়া কতটা সময় তাঁরা বিনোদন, অবসর কাটানোর জন্য ব্যয় করেন? কীভাবে করেন বললে, দেখবেন তাঁরাও স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, আর নয় তো বাড়ির বাইরে বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। এই আড্ডা, আলোচনা করাকে ধরা হয় আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ধরনের সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াতে নারীদের কোনও ভূমিকা আছে কিনা, বহু মানুষই জানেন না। তাঁরা ধরে নিয়েছেন বা সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে শিখে নিয়েছেন যে, নারীদের সবচেয়ে বড় কাজ সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং তাকে মানুষ করা।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৯: সে এক স্বপ্নের ‘চাওয়া পাওয়া’

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৭: পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যাঁর জীবনের আকাশে কখনও শত্রুতার মেঘ জমেনি

সন্তানের জননী করে রাখলে নারী বাড়িতেই থাকবে। এই ভাবনা খুবই প্রাচীন এবং বাহির জগৎ এবং অন্তর মহলের জন্মদাতা ধারণা। এই কিছুদিন আগেও শুনলাম একজন পুরুষ তাঁর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক লোকানোর প্রচেষ্টায় ব্যবহার করেছেন এই অস্ত্র। এখানে প্রচেষ্টাটি হল স্ত্রী যাতে স্বামীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে বাড়ির বাইরে যেতে না পারেন সেই জন্য স্ত্রীকে সন্তানসম্ভবা করে দেওয়া। স্ত্রীর সন্তান জন্ম দিতে দিতে স্বামী বেরিয়ে গেলেন বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করে। ভাবলেন না এই সন্তান কীভাবে মানুষ হবে।

এখনও বহু মহিলা মনে করেন বিয়ের পর রোজগারের উদ্দেশ্যে বাড়ির বাইরে বেরোনো পুরুষের দুর্বলতার লক্ষণ। পুরুষ রোজগার করে নারীকে খাওয়াবেন আর নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার ধকল নেবেন। নারী সন্তানদের মানুষ করবেন। এই কর্ম বিভাজনের ব্যতিক্রম করতে ইচ্ছুক নন বহু নারী। তাই তাঁদের মধ্যে পয়সা থাকা পুরুষ অনেক বেশি গ্রহণীয়। আমাদের মতো দেশে নারী স্বাধীনতার মানে এখনও সুস্পষ্ট নয়। কোন জ্বালানি দিয়ে তাঁরা রান্না করবেন সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যখন হয় না বা গুরুত্ব পায় না তখন বুঝতে হবে আমাদের দেশে মেয়েদের মধ্যে এখনও নিজেদের শরীর, মন এবং ভালো থাকার বিষয়ে কোনও সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি।
—চলবে।
* বৈষম্যের বিরোধ-জবানি (Gender Discourse): নিবেদিতা বায়েন (Nibedita Bayen), অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, মৌলানা আজাদ কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content