বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রোটেনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ তখন সবে পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। নোবেল না পেলেও পাওয়ার পটভূমি রচিত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ সে সময় গিয়েছিলেন লন্ডনে। প্রকাশিত হয় ‘গীতাঞ্জলি’-র ইংরেজি সংস্করণ। প্রকাশমাত্রই প্রশংসার জোয়ার বয়ে যায়। পাঠকমহলে বিপুল সাড়া পড়ে। মুগ্ধতা জানিয়ে কবিকে অনেকেই চিঠি লেখেন। চিঠি লেখেন যুক্তিবাদী রাসেল। ইংল্যান্ডের নামি পত্রিকা ‘টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট’-এ প্রকাশিত হয় প্রশংসিত আলোচনা। ছত্রে ছত্রে প্রশংসা, মুগ্ধতা। কবির পরম হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু রোটেনস্টাইনকে খুশি করেছিল এই উচ্ছ্বাসময় প্রশংসিত আলোচনা। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় কবি হিসেবে তখনই ওদেশে পাঠকের নজর কেড়েছিলেন। পরম বন্ধু রোটেনস্টাইন মনেপ্রাণে চাইছিলেন, তাঁদের দেশে রবীন্দ্রনাথের সমাদর আরও বাড়ুক। রবীন্দ্রনাথকে তিনি লিখেওছিলেন, ‘অন্য আলোচকরা এর থেকে বুঝতে পারবেন, একটি যোগ্য গ্রন্থকে কীভাবে সম্মান জানাতে হয়।’
হ্যাঁ তাঁরা বুঝেছিলেন। ওদেশে সারস্বতসমাজে রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি-সমাদর দিনে দিনে বাড়তে থাকে। মেলে অভ্যর্থনা-সংবর্ধনা। এজাতীয় সভায় কোথাও কোথাও ভোজন-আয়োজনও থাকত। রবীন্দ্রনাথের কাছে সেসব ছিল অত্যাচারের মতো। ঠাকুরবাড়ির অনেকেরই অর্শ ছিল। এই রোগ রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। মাঝেমধ্যেই খুব কষ্ট পেতেন। ইংল্যান্ডে এসে পুরনো ব্যাধি চাগাড় দিয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের মধ্যে সুরেন্দ্রনাথকে খুব স্নেহ করতেন। তিনিও লন্ডনে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য সুরেন্দ্রনাথ খুব তৎপরও হয়ে উঠেছিলেন। বিদেশে ভালো ডাক্তারের সন্ধান কে দিতে পারেন! কেন বন্ধু রোটেনস্টাইন! রোটেনস্টাইনই ব্যবস্থা করলেন ডাক্তার দেখানোর। ডাঃ পালার্ডের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় কবিকে। দীর্ঘদিনের পুরোনো অসুখ। ওষুধে সারার নয়। অস্ত্রোপচার ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৬: রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের মশারিও গুঁজে দিতেন

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৫: কিশোরীর মেঘবেলা

আকাশ এখনও মেঘলা/৪০

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৯: ‘বেতারে দু-খানা গান গাইলাম, পারিশ্রমিক পেলাম দশ টাকা’

রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে যে অপারেশনে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, তা নয়। কষ্ট তো উত্তরোত্তর বাড়বে—একথা ভেবে নিরুপায় হয়েই শেষে অপারেশন করাতে রাজি হয়েছিলেন কবি। ওদেশ থেকে ছোটোকন্যা মীরাকে প্রায়ই চিঠি লিখতেন তিনি। মীরার বৈবাহিকজীবন সুখের ছিল না। সমস্যাবহুল সে জীবন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অশেষ উদ্বিগ্নতা ছিল। সে সময় মীরাকে লেখা এক চিঠিতে কবি বিদেশের মাটিতে নিজের বিবিধ সাফল্যের কথা জানিয়ে শেষে লিখেছিলেন নিজের অসুস্থতার কথা। সে চিঠির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যেতে পারে, ‘আমার ডাকঘর নাটকের তর্জমাটা এখানকার স্টেজে অভিনয় হবে। তার রিহার্সালটা আমাকে দেখে দিতে হবে। তারপরে আবার আর এক উৎপাত আছে-ডাক্তাররা আমার অর্শের জন্য অস্ত্রচিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছে।খুব সম্ভব আগামী সোমবারে Operation হবে। তাহলে তারপরে অন্তত তিন সপ্তাহ আমাকে Nursing Home-এ পড়ে থাকতে হবে। এ কয়দিন আমার কোনো চিঠিপত্র পাবিনে। সেইজন্যে তার আগে এই চিঠি লিখে রাখচি।’
কলকাতায় বৃষ্টি

সন্তোষকুমার মজুমদার।

১৯১৩ সালের ২৯ শে জুন লন্ডনের নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পরের দিন পালার্ডই অপারেশন করেছিলেন। দেহে সূচ ফোটানো নিয়ে বরাবরই রবীন্দ্রনাথের ভয়ভীতি। ফলে অপারেশন নিয়ে ভয়ভীতি তো থাকবেই। ছিলও। বিদেশে অপারেশনের খরচ কবিকে ভাবিয়ে তুলেছিল। ভেবেছিলেন বিস্তার খরচ হবে। সামাল দেওয়া দায় হয়ে উঠবে। বাস্তবে কিন্তু তা হয়নি। তখনো রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাননি। তা সত্ত্বেও এই বিদেশের মাটিতে নানাভাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। স্বীকৃতি দিয়েই বোধহয় চিকিৎসক অধিক অর্থের দাবি করেননি, যেটুকু না নিলে কবির সম্মানহানি হয়, সেটুকুই নিয়েছেন।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৩: সুন্দরবনের পাখি: বাটান

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১২ : স্বপ্নের নায়ক, নায়কের স্বপ্ন

আশ্রম-শিক্ষক অজিতকুমার চক্রবর্তীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এক চিঠি থেকে জানা যায়, ‘এদেশে ভাল ডাক্তার দিয়ে এ সমস্ত রোগের অপারেশন করাতেই হাজার দেড় হাজার টাকা খরচ হয় তাই আমি ইতস্তত করছিলুম। আমার দ্বিধা দেখে রোটেনস্টাইন সুরেনকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে হাজির—তাঁরা তাঁকে কি বোঝালেন জানি নে-তিনি বললেন আচ্ছা দেখা যাক রোগের অবস্থাটা কি, তার পরে সেই বুঝে দক্ষিণার ব্যবস্থা। আমার রোগ পরীক্ষা করে তিনি বললেন আমি ১৫ গিনি নেব এবং যিনি ক্লোরোফর্ম দেবেন তাকে ৩ গিনি দিতে হবে—এই বলে আমাদের মুখের দিকে এমনভাবে তাকালেন যে যদি অসুবিধা বোধ করি তিনি আরো ৫ গিনি কমিয়ে দেবেন।’
কলকাতায় বৃষ্টি

অজিতকুমার চক্রবর্তী।

ডাক্তারের বাড়ির কাছের এক নার্সিংহোমে রবীন্দ্রনাথকে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রিয়জনকে ছেড়ে এইভাবে নার্সিংহোমে কে আর থাকতে চান! রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল, ‘আমার আত্মীয়বন্ধুগণ আমাকে বিসর্জন দিয়ে চলে গেলেন।’

পরের দিন সকালের দিকে রবীন্দ্রনাথের অপারেশন হয়। দীর্ঘদিন ধরে লালিত রোগ যে যথেষ্ট ছড়িয়েছিল, জটিল হয়ে উঠেছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রবীন্দ্রনাথও উল্লিখিত চিঠিতে জানিয়েছেন, ‘রোগের ব্যাপ্তি বহুদূর পর্যন্ত ছিল, সেইজন্যে কাটাকুটির পরিমাণ সামান্য ছিল না।’

ফলে ডাক্তারবাবুকে রোজ একবার করে, কোনও কোনও দিন দু-বার করে আসতে হত রোগীর কাছে। নিজের হাতে পরম যত্নে ড্রেসিং করতেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ স্নেহভাজন অজিতকে চিঠিটি লিখেছিলেন রোগশয্যা থেকে। সে চিঠিতে ব্যক্ত করেছিলেন তাঁর আশঙ্কার কথা, ন’দিন নার্সিংহোমে পার করার পরও কবির মনে হয়েছিল আরও সপ্তাহ দুয়েক নিশ্চয়ই থাকতে হবে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৫: মহর্ষি নারদের প্রশ্নচ্ছলে উপদেশগুলি যেন রাজনীতির পাঠ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৭: জীবনখাতার প্রতি পাতায়

অপারেশন-জটিলতা দেখা দেওয়ায় অনেক বেশি পরিচর্যা, নিয়মিত ড্রেসিং ও চূড়ান্ত রকমের সর্তকতা অবলম্বন করতে হলেও ডাক্তারবাবু বাড়তি অর্থ দাবি করেননি। রবীন্দ্রনাথকে অভিভূত করেছিল এই সাহেব-ডাক্তারের ঔদার্য। অনুভব করেছেন, যে যৎসামান্য অর্থ তিনি দাবি করেছিলেন, সেটুকু না নিলে কবির পক্ষে মর্যাদাজনক হবে না, ‘সম্মানহানিকর’ মনে হতে পারে।
কলকাতায় বৃষ্টি

মীরা দেবী।

নার্সিংহোমে থাকার দিনগুলি রবীন্দ্রনাথের কাছে খুব সুখকর ছিল না। বাইরের লোকজন দেখতে আসুক, চাইতেন না কবি। বড়ই বিমর্ষভাবে কেটেছিল রোগশয্যার দিনগুলি। দুই সপ্তাহ নার্সিংহোমে থাকার পর ডাক্তারের নির্দেশে আরও এক সপ্তাহ থাকতে হয়। ছোট একটি ঘরে একা-একা থাকা, কারই বা তা ভালো লাগতে পারে! ঘরে দুটি ছোট জানলা ছিল। সেই জানলা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আকাশ দেখতেন। দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে, যাদের তিনি চেনেন না, তারা যেমন ইচ্ছে তেমনভাবে তাঁর শরীরটা নাড়াচাড়া করছে; এটা ছিল কবির কাছে বড়োই অস্বস্তিকর।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৮: দুর্গম গিরি কান্তার ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে

সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে তিনি লিখেছিলেন সে কথা,’মনে হচ্ছে আমি যেন একটি ছোট্ট জগতে জন্মগ্রহণ করেছি-আমার তিপান্ন বছর বয়স ঘাড়ে করে নিয়েই শিশু হয়ে জন্মেছি—শিশুর মতোই বিছানায় পড়ে আছি, শিশুর মতোই ব্যবহার, তিন সপ্তাহ পূর্বে আমি যাদের একেবারেই জানতুম না তারাই আমাকে যেমন ইচ্ছা তেমনি নাড়াচাড়া করছে—এতকালের সমস্ত অভ্যাস এবং নিয়ম একেবারে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে বসে আছি—এ যেন একটা অবাস্তব স্বপ্নলোক।’
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ নার্সিংহোমে ছিলেন টানা তিন সপ্তাহ। বিছানায় শুয়ে লিখতেন প্রিয়জনকে চিঠি। কখনো বা কবিতা। ‘রোগশয্যা সুখশয্যা নয় এবং আরোগ্যের প্রণালী অত্যন্ত যন্ত্রণাজনক’ ছিল। রোগমুক্ত হবেন, এই ভরসায় সবই তিনি সহ্য করেছেন। তিন সপ্তাহ পর নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পেয়েছেন বটে তবে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ তাঁর পিছু ছাড়েনি। রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছে, এই সুস্থতা সাময়িক। সব কথা তো আর সবাইকে বলা যায় না। কন্যাকে নিশ্চয়ই বলা যায়। মীরাকে আতঙ্কিত ও আশঙ্কিত কবি লিখেছেন, ‘অজ্ঞান অবস্থায় কাটাকাটি করেছিল সেটা টের পাইনি—কিন্তু সজ্ঞান অবস্থায় যখন উপদ্রব তখন বড় অসহ্য বোধ হয়। যাই হোক্ বোধ হচ্চে ত অর্শের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া গেল। চিরকালের মত কিনা তা নিশ্চয় বলা যায় না। কেননা অপারেশনের পরেও কারো কারো আবার হয়।’

* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content