
ছবি: প্রতীকী।
ত্রিপুরার মাণিক্য যুগের ইতিহাসের এক চমকপ্রদ ঘটনা হচ্ছে ত্রিপুরা রাজদরবারে আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ। আর সেইসব গুপ্তচরের মাধ্যমে আহোম দূতেরা ত্রিপুরার প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের নানা গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। ত্রিপুরার রাজার বৈমাত্রেয় ভাই কি ভাবে রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করেছিলেন সে সবের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে আহোম দূতের বর্ণনায়। সেই সঙ্গে অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে ত্রিপুরার রাজধানী কেমন ছিল, রাজ্যের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি, সুরক্ষা ব্যবস্থা সব লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন আহোম দূতেরা।
অষ্টাদশ শতকের শুরুতে আহোম রাজা স্বর্গদেব রুদ্র সিংহ ত্রিপুরায় দু’জন দূত পাঠিয়েছিলেন। মোগলদের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার অঙ্গ হিসেবেই আহোম রাজা ত্রিপুরায় সেদিন দুই দূত পাঠিয়েছিলেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পর তখন মোগল সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে। দ্রুত পতনের দিকে এগিয়ে চলেছে মোগল সাম্রাজ্য। এ রকম এক অনুকূল পরিস্থিতিতে আহোম রাজা হয়তো মোগলদের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আর এ জন্য তিনি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোকে সঙ্গী হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প পর্ব-১১২ : ইতিহাস-ঐতিহ্যে উজ্জ্বল কৈলাসহর

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৭: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: ঘরচিতি

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা
১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন আহোম রাজা স্বর্গদেব রুদ্র সিংহ। আহোম রাজাদের মধ্যে তাঁকে শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি সামাজিক সংস্কার, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি রূপায়ন সহ বাণিজ্য ক্ষেত্রেও উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন। সিংহাসনে আরোহণের আগে নরহত্যা, রাজার সমাধিতে জীবিত মানুষ পুঁতে রাখা ইত্যাদি অমানবিক প্রথারও অবসান ঘটিয়েছিলেন তিনি। ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন-সহ সাংস্কৃতিক আদান প্রদানেও উদ্যোগী ছিলেন এই রাজা। এমনকি পাশাপাশি রাজ্য সমূহকে সঙ্গে নিয়ে মোগলদের পরাজিত করে এক সুদৃঢ় হিন্দু রাজ্য গঠনেও চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৯: ইরাবতীর ডায়েরি থেকে/১

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত
পূর্ব ভারতকে মোগল শৃঙ্খল মুক্ত করার উদ্যোগের জন্য আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘পূর্ব ভারতের শিবাজি’। যাইহোক, মোগলদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিভিন্ন রাজ্যের রাজা ও জমিদার বর্গের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। এই কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবেই ১৭০৯ থেকে ১৭১৫ সালের মধ্যে তিনবার আসামের দুই রাজদূত ত্রিপুরা সফরে এসেছিলেন। এই দুই আহোম রাজদূত রত্ন কন্দলী শর্মা ও অর্জুন দাস বৈরাগী ত্রিপুরা সফর করে যাবার প্রায় এক দশক পর ‘ত্রিপুরা দেশর কথার লেখা’ নামে তারা রচনা করেন ত্রিপুরার তৎকালীন ইতিহাস। ত্রিপুরায় দ্বিতীয় রত্ন মাণিক্য, মহেন্দ্র মাণিক্য এবং দ্বিতীয় ধর্ম মাণিক্যের রাজত্বকালে তাদের এই সফর ছিল।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট
আহোম রাজার দূত প্রেরণের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য যাই থাক না কেন, আহোম রাজদূতদ্বয়ের ভ্রমণ বিবরণী কিন্তু আমাদের সামনে তুলে ধরেছে নানা অজানা তথ্য।আহোম রাজদূতেরা রাজার কাছে পেশ করার জন্য তাদের যে ভ্রমণ বিবরণী লিপিবদ্ধ করেছিলেন তার উপর ভিত্তি করেই ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে অসমীয়া ভাষায় তারা ত্রিপুরা দেশের কথা লিখেছিলেন। লন্ডনের বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত ছিল সেই পাণ্ডুলিপি।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ
অসমের সুবিখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. সূর্য কুমার ভুঁইয়া লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত সাঁচি পাতায় লেখা এই পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ড.ভূঞার সম্পাদনায় ‘ত্রিপুরা বুরঞ্জী’ নামে তা প্রকাশিত হয়। এদিকে লণ্ডনের মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ত্রিপুরার বিশিষ্ট বিদ্যোৎসাহী ত্রিপুরচন্দ্র সেন মাইক্রো ফিল্মের মাধ্যমে সেখান থেকে পাণ্ডুলিপি আনিয়ে বাংলায় অনুবাদ করে ১৯৬৫ সালে প্রকাশ করেছিলেন ‘ত্রিপুর দেশের কথা’। আবার ২০১২ খ্রিস্টাব্দে অসম সাহিত্য সভার উদ্যোগে ‘ত্রিপুরা বুরঞ্জী’র বাংলা অনুবাদ ‘ত্রিপুরা দেশের কথা’ নামে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন ড. মুক্তি চৌধুরী।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।/i>


















