
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে।
হ্যাডলির সঙ্গে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ত্রিশ বছরে তিনবার বিয়ে করেন হেমিংওয়ে। সবসময়ই বিয়েগুলো ভেঙে যাবার পর পূর্ববর্তী স্ত্রীদের সন্মন্ধে তাঁর সেন্টিমেন্টাল সব মন্তব্য পাওয়া যায়। প্রথম বিয়ে ভাঙার গল্পটি এক নীতিকথার আঙ্গিকে লিখেছেন তার স্মৃতিকথা ‘A Movable Feast’ এ। এক অবিবাহিতা বান্ধবী বিবাহিতর সংসারে ঢুকে কিভাবে অন্যের স্বামীকে ছিনিয়ে নেন। নিজেকে সর্বতোভাবে নির্দোষ প্রমান করার জন্য দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন সন্মন্ধে এমনটি লেখা।
অন্য এক জায়গায় আবার তাঁর প্রথম স্ত্রী হ্যাডলির প্রশংসা করেছেন, দোষী করেছেন পলিনকে। যেমনটি হ্যাডলিকে করেছিলেন সন্তান সম্ভবা জেনে। পলিন তাকে হ্যাডলির মতো ভালো বন্ধুর থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। আবার স্বীকার করেছেন যে, তাঁর খুব টাকার দরকার আর হ্যাডলির কাছে এত টাকা নেই। তাই পলিনকে বিয়ে করেছেন। অবশ্য নিজেকে ও দোষ দিতে ছাড়েন নি। অকুণ্ঠ ভাবে স্বীকার করেছেন যে, হ্যাডলির সবরকমের, বিশেষত আর্থিক সহায়তা ছাড়া তার সেই সময়ের কোনও বই প্রকাশিত হতো না। হ্যাডলির এতো গুণ থাকা সত্বেও তাদের বিয়ে ভেঙে যায় শুধু হেমিংওয়ে র নিজের জন্য, কারন, “I am a son of a bitch”.
অন্য এক জায়গায় আবার তাঁর প্রথম স্ত্রী হ্যাডলির প্রশংসা করেছেন, দোষী করেছেন পলিনকে। যেমনটি হ্যাডলিকে করেছিলেন সন্তান সম্ভবা জেনে। পলিন তাকে হ্যাডলির মতো ভালো বন্ধুর থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। আবার স্বীকার করেছেন যে, তাঁর খুব টাকার দরকার আর হ্যাডলির কাছে এত টাকা নেই। তাই পলিনকে বিয়ে করেছেন। অবশ্য নিজেকে ও দোষ দিতে ছাড়েন নি। অকুণ্ঠ ভাবে স্বীকার করেছেন যে, হ্যাডলির সবরকমের, বিশেষত আর্থিক সহায়তা ছাড়া তার সেই সময়ের কোনও বই প্রকাশিত হতো না। হ্যাডলির এতো গুণ থাকা সত্বেও তাদের বিয়ে ভেঙে যায় শুধু হেমিংওয়ে র নিজের জন্য, কারন, “I am a son of a bitch”.
হ্যাডলির মতোই তাঁর বন্ধু পলিন ছিলেন হেমিংওয়ের চেয়ে বড়। কট্টর রোমান ক্যাথলিক। সুন্দরী, সাহসী ও ধনী। পলিন হেমিংওয়েকে ক্যাথলিক ধর্মান্তরিত করান। ১৯২৭ থেকে ১৯৪০, তাঁদের বিবাহিত জীবনে হেমিংওয়ে ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী ছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ের ব্যর্থতার জন্য হেমিংওয়ে ক্যাথলিক ধর্মকে দায়ী করেন—ধর্মের স্বামী স্ত্রীর যৌন স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধকে। এছাড়া আরো দোষ দিয়েছেন পলিনকে। তাঁর টাকাপয়সা ইত্যাদি নাকি হেমিংওয়ের মস্তিষ্ককে আরামপ্রিয় ও অলস করে তুলছিল। আরও আছে। হ্যাডলির থেকে তাকে আলাদা করানোর দোষ।আসলে ইতিমধ্যে আরেক মহিলার প্রেমে পড়েছেন হেমিংওয়ে। তাই এসব বাহানা। পলিন ও হেমিংওয়ের দুটি পুত্র সন্তান হয়েছিল।
পলিন এর সঙ্গে বিচ্ছেদের আগে থেকেই প্রেম চলছিল যাঁর সঙ্গে তিনি একজন লেখিকা, এক ফরাসি মারকুইস (জমিদার গোত্রীয়) এর স্ত্রী। মার্থা গেলহর্ন। যুদ্ধক্ষেত্রে দুজনে খবর সংগ্রহের কাজ করতে গিয়ে ঘনিষ্ঠ হন। মার্থা ছিলেন রুজভেল্টের বন্ধু। স্পেন এর যুদ্ধ নিয়ে রিপোর্ট লিখতে মার্থা ও হেমিংওয়ে ছ মাসের এক ট্যুরে বেরোন। বেকার নামে এক লেখক এর থেকে জানা যায় যে মার্থা ও হেমিংওয়ে প্যারিসের হোটেলে ক্রিসমাস পালন করছেন, হঠাৎ সেখানে হাজির পলিন। বিয়ে বাঁচানোর জন্য তিনি মরিয়া। প্রচণ্ড ঝগড়া হেমিংওয়ের সঙ্গে। এমনকি হোটেলের ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দেবার ভয়ও দেখান পলিন। পলিনের এমন চূড়ান্ত ব্যবহারে হেমিংওয়ের মন টলে উঠলো। মনে অনুশোচনা হলো। সর্বোপরি পলিন ছিলেন হেমিংওয়ের নব প্রকাশিত বইয়ের এক চমৎকার সমালোচক। দুঃখ করে হেমিংওয়ে এক বন্ধুকে লিখলেন, ‘পলিন এখন আর আমার নতুন বইয়ের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না’।
পলিন এর সঙ্গে বিচ্ছেদের আগে থেকেই প্রেম চলছিল যাঁর সঙ্গে তিনি একজন লেখিকা, এক ফরাসি মারকুইস (জমিদার গোত্রীয়) এর স্ত্রী। মার্থা গেলহর্ন। যুদ্ধক্ষেত্রে দুজনে খবর সংগ্রহের কাজ করতে গিয়ে ঘনিষ্ঠ হন। মার্থা ছিলেন রুজভেল্টের বন্ধু। স্পেন এর যুদ্ধ নিয়ে রিপোর্ট লিখতে মার্থা ও হেমিংওয়ে ছ মাসের এক ট্যুরে বেরোন। বেকার নামে এক লেখক এর থেকে জানা যায় যে মার্থা ও হেমিংওয়ে প্যারিসের হোটেলে ক্রিসমাস পালন করছেন, হঠাৎ সেখানে হাজির পলিন। বিয়ে বাঁচানোর জন্য তিনি মরিয়া। প্রচণ্ড ঝগড়া হেমিংওয়ের সঙ্গে। এমনকি হোটেলের ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দেবার ভয়ও দেখান পলিন। পলিনের এমন চূড়ান্ত ব্যবহারে হেমিংওয়ের মন টলে উঠলো। মনে অনুশোচনা হলো। সর্বোপরি পলিন ছিলেন হেমিংওয়ের নব প্রকাশিত বইয়ের এক চমৎকার সমালোচক। দুঃখ করে হেমিংওয়ে এক বন্ধুকে লিখলেন, ‘পলিন এখন আর আমার নতুন বইয়ের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না’।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৭: পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যাঁর জীবনের আকাশে কখনও শত্রুতার মেঘ জমেনি

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৬: একাকিত্বের অন্ধকূপ: হেমিংওয়ে ও চার স্ত্রী
মার্থা কিন্তু হ্যাডলি বা পলিনের মত অনুগত স্ত্রী নয়। তাঁর নিজস্ব জগৎ আছে। তিনি যুদ্ধের সাংবাদিকতা করতেন। সেটি তাঁর কাছে হেমিংওয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪০ এ তাঁদের বিয়ের ঠিক পরে পরেই তিনি চিনের যুদ্ধে চলে যান। হেমিংওয়ে মার্থার অনুপস্থিতিতে প্রচণ্ড একাকিত্বে ভোগেন সেই সময়। এর পরবর্তী বছরগুলোতেও মার্থার সাংবাদিকতার জীবন হেমিংওয়ের বিবাহিত জীবনের এক প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ালো। সাংবাদিকতার জীবনে তাঁরা ছিলেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই এ বিবাহিত জীবনের ইতি হল। এলেন আরেকজন। মেরি ওযালস। প্রতিবারের মতো এবারেও মেরির সঙ্গে সম্পর্কেরই ফাঁকে গড়ে উঠেছিল।
আরও পড়ুন:

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৫: এ কেমন রঙ্গ জাদু, এ কেমন রঙ্গ…/৩

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১২: প্রশাসক রামচন্দ্রের সাফল্য কী আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে সফল প্রশাসকদের আলোর দিশা হতে পারে?
গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়ে থাকার সময় মার্থা হেমিংওয়েকে দেখাশুনা বন্ধ করে দেন। এ সময় তার সেবা শুশ্রূষা করেন মেরি ওয়ালস, এক ছোটখাটো সুন্দরী সাংবাদিক। মেরির স্বামীও ছিলেন সাংবাদিক। ১৯৪৬ এ মেরিকে বিয়ে করেন হেমিংওয়ে। আগের তিনজন স্ত্রী নানাভাবে হেমিংওয়ের উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে ধরা পড়েছেন। কিন্তু মেরি সেভাবে তার লেখা চরিত্রে ধরা পড়েননি। তবে তার কবিতায় মেরিকে তার একাকীত্ব থেকে সারিয়ে তোলার কৃতিত্ব দিয়েছেন।
Coming small-voiced and lovely
To the hand and eye
To bring your heart back that was gone
To cure all loneliness.
To the hand and eye
To bring your heart back that was gone
To cure all loneliness.
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৭: শ্রীমার কথায় ‘ঠাকুরের দয়া পেয়েচ বলেই এখানে এসেচ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৫: সর্বত্র বরফ, কোত্থাও কেউ নেই, একেবারে গা ছমছম করা পরিবেশ
হেমিংওয়ে তার তিন পুত্রকে ছেড়ে এলেও এক কন্যাসন্তানের জন্য আগ্রহী ছিলেন। মেরির সন্তানসম্ভাবনা হয়েও যখন শেষ পর্যন্ত সেটি নষ্ট হয়ে তার জীবন সংশয় হয়, হেমিংওয়ে তাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে তোলেন। লেখক জীবনের সবচেয়ে খ্যাতি ও উন্নতির সময়, নোবেল প্রাইজ-এর সময় মেরি ছিলেন তার সঙ্গে। আবার হেমিংওয়ের চরম হতাশার সময়, তাঁর যখন মানসিক চিকিৎসা হত, বৈদ্যুতিক শক দেয়া হতো, এ সব সময়ও মেরিই থেকেছেন পাশে। সর্বোপরি হেমিংওয়ের সুইসাইডকে দুর্ঘটনা বলে গোপন করার ব্যর্থ চেষ্টাও করেছেন। বলেছেন বন্দুকের নল পরিষ্কার করিয়ে গিয়ে গুলি লেগে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৭: পাতি সরালি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৪: ঠাট্টা করলে যে বুঝতে পারত, ঠিক সময়ে হাসতে পারত
হেমিংওয়ের মহিলাদের প্রতি এমন বৈচিত্রময় সম্পর্কের কারণ শৈশবের মাতৃস্নেহের ঘাটতি। মায়ের সান্নিধ্য, তাঁর ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা সবই পরবর্তীতে তাঁর অবচেতন মন খুঁজে বেরিয়েছে। এক বিরূপ মনোভাব, তার সঙ্গে নির্ভরতার ইচ্ছে, ভালোবাসার দুর্বলতা, এ সবের সংমিশ্রণ প্রতিফলিত হয়েছে প্রতিটা সম্পর্কে। আবার এর থেকে পালিয়ে যাবার জন্য তার খেলাধুলো, মাছধরা এসবের এক বৃহৎ জগতে ও আশ্রয় খুঁজছিলেন। তাঁর বিখ্যাত শেষ বই, ‘The old Man and the Sea’ তে রাখেননি কোনও মেয়ে চরিত্র। খেলাধুলা ও যুদ্ধের জগৎ তাঁকে আকৃষ্ট করেছে কারণ সেখানে তাঁর পৌরুষের, তাঁর শৌর্য্য, বীর্যের প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পেয়েছেন, আর মুক্তি পেয়েছেন মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্কের উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ থেকে।—শেষ।
* ড. দুর্গা ঘোষাল (Durga Ghoshal), প্রাক্তন অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, গভর্নমেন্ট কলেজ।


















