কাকোলূকীযম্
বহু দৃষ্টান্ত দিয়ে অবশেষে বৃদ্ধমন্ত্রী স্থিরজীবী শেষে বললেন, সুতরাং এই পরিস্থিতিতে দ্বৈধীভাবকেই আশ্রয় করা উচিত। মানে, শত্রুর ক্ষমতা ভালোভাবে বুঝে নিয়ে সামনাসামনি শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেখিয়ে মনে মনে সবসময় তার ক্ষতি করবার চেষ্টা করতে হবে। সোজাকথায় মুখে এক কিন্তু কাজে আরেক রকম হতে হবে। তাই নিজের স্থান এই বৃক্ষদুর্গকে ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং শত্রুকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে মূল থেকে তাকে উচ্ছেদ করতে হবে। হে রাজন্! যদি উলূকরাজ অরিমর্দনের দুর্বলতা কোথায় আপনি জানতে পারেন, তাহলে সহজেই গিয়ে তাকে বিনষ্ট করে দিতে পারতেন।
বায়সরাজ মেঘবর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হে তাত! দুর্ভাগ্য হল এইটাই যে সেই দুষ্ট উলূকরাজ অরিমর্দন কোথায় থাকে আমরা সেই ঠিকানা এখনও জানি না। তাহলে কোথা থেকে তার দুর্বলতার খোঁজ পাবো?
বৃদ্ধ স্থিরজীবী তখন শান্ত স্বরে বললেন, ওহে বত্স! কেবল তার বাসস্থানই নয়, কোথায় কোথায় তার দুর্বলতা আছে সেটাও খুব সহজেই গুপ্তচরের মাধ্যমে খুঁজে বের করবো। শাস্ত্রে বলে—
গাবো গন্ধেন পশ্যন্তি বেদৈঃ পশ্যন্তি বৈ দ্বিজাঃ।
চারৈঃ পশ্যন্তি রাজনশ্চক্ষুভ্যামিতরে জনঃ।। (কাকোলূকীযম্, ৬৬)
গো প্রভৃতি মনুষ্যেতর প্রাণীরা সকলে ঘ্রাণের মাধ্যমে দেখেন। যে কোনো দ্রব্যের গন্ধ শুঁকে তারা সেই জিনিষটাকে বুঝতে চেষ্টা করেন। কারণ ঘ্রাণশক্তিই হল তাদের দর্শনেন্দ্রিয়ের সমান শক্তিশালী। তেমনই বেদজ্ঞানী দ্বিজগণ সব জিনিষই জ্ঞানচক্ষুতেই দেখেন। যেকোনও দ্রব্যের বাহ্যিক সত্ত্বায় তাঁরা মজেন না; বরং সেই দ্রব্যের স্বরূপকে তাঁরা অনুসন্ধান করেন বেদজ্ঞানের আলোকে। তেমনই বিশাল প্রাসাদে বসবাসকারী রাজারা তাঁর রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপর নজরদারী করেন গুপ্তচরেদের মাধ্যমে। কিন্তু অন্যান্য লোকেরা সকলেই দেখে চর্মচক্ষুর দ্বারা। সত্যি বলতে যে রাজা স্বয়ং গুপ্তচরের দ্বারা নিজের পক্ষের লোকেদের এবং বিশেষ করে শত্রুপক্ষের তীর্থ বা রাজপুরুষদের গতিবিধির দিকে নজর রাখেন, তাদের প্রতিটা পদক্ষেপ সম্পর্কে জানেন—সে রাজার কখনও কোনও সংকট আসে না।
মেঘবর্ণ বললেন, হে তাত! এই “তীর্থ”রা আসলে কারা?— “কানি তীর্থান্যুচ্যন্তে?” তাদের সংখ্যাই বা কতো? আর এই গুপ্তচরেদের কথা যে বললেন তারাই বা কারা? দয়া করে আপনি সবিস্তারে বলুন— “তত্সর্বং নিবেদ্যতাম্।”
পাঠকদের খেয়াল করতে বলবো ঠিক কেমন ভাবে পঞ্চতন্ত্রকার শিশু রাজপুত্রদের কাছে গুপ্তচর সম্পর্কে গল্পের মাধ্যমে একটি সম্যক্ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই বৃদ্ধ স্থিরজীবী আসলে পঞ্চতন্ত্রকার স্বয়ং যিনি তাঁর শিষ্যদের এখন রাজ্য পরিচালনার অপরিহার্য অংশ গুপ্তচরদের সম্পর্কে বলবেন।
স্থিরজীবী বললেন, রাজনীতিতে “তীর্থ” শব্দটি আসলে একটি পারিভাষিক শব্দ। মহাভারতের সভাপর্বের (৫/৩৮) কাহিনি থেকে জানা যায় যে যুধিষ্ঠিরের নবনির্মিত ইন্দ্রপ্রস্থসভায় এসে দেবর্ষি নারদ জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—
ক্বচিদষ্টাদশান্যেষু স্বক্ষে দশ পঞ্চ চ।
ত্রিভিস্ত্রিভিরবিজ্ঞাতৈর্বেত্সি তীর্থানি চারকৈঃ।। (ঐ, ৬৮)
আপনার শত্রুরাজ্যের আঠেরোটি এবং নিজের রাজ্যের পনেরোটি তীর্থের উপর আপনার তিন-তিনটি করে চরেরা ঠিক করে নজর রাখছে তো? তাদের প্রত্যেকের খবর আপনার ঠিকমতন জানা আছে তো? এখানে “তীর্থ” বলতে টীকাকার নীলকণ্ঠ প্রায় মহামতি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বয়ানই প্রায় উদ্ধৃত করেছেন।
“তীর্থ” শব্দের অর্থ নির্দেশ করতে গিয়ে পঞ্চতন্ত্রকার বলেছেন, “তীর্থশব্দেনাযুক্তকর্মাভিধীযতে” – রাজার আপদ বিপদে যাঁরা রাজাকে বিপদ্ মুক্ত করেন সেই মন্ত্রী প্রভৃতিরাই হলেন “তীর্থ”। এই তীর্থরা হলেন প্রত্যেকেই রাজপুরুষ। এঁদেরকে মহামাত্র বা মহামাত্যও বলা হয়। এই তীর্থরাই যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে শত্রুরাজার সঙ্গে মিলিত হয়ে যান তাহলে তাঁরাই তখন তাঁদের স্বামী বা বিজিগীষু রাজার বিনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ান এবং সেই শত্রুরাজাই তখন শ্রেষ্ঠ রাজপদ লাভ করেন। পরপক্ষে বা শত্রুরাজার পক্ষে এই তীর্থরা হলেন, [০১] মন্ত্রী, [০২] পুরোহিত, [০৩] সেনাপতি, [০৪] যুবরাজ, [০৫] দৌবারিক, [০৬] অন্তর্বেশিক (অন্তঃপুরের রক্ষায় নিযুক্ত পুরুষ), [০৭] প্রশাস্তা (কারাগারের প্রধান প্রশাসক), [০৮] সমাহর্তা (রাজকর সংগ্রহিতাদের প্রধান পুরুষ), [০৯] সন্নিধাতা (রাজভাণ্ডারে সঞ্চয়যোগ্য বস্তুর সংগ্রাহক), [১০] প্রদেষ্টা (ফৌজিদারি বিচারের প্রধান বিচারক), [১১] সংবাদ প্রতিবেদক (প্রজাদেরকে রাজার কোনো বার্তা বা প্রজার কোনো সংবাদ যিনি রাজাকে নিবেদন করেন), [১২] সাধনাধক্ষ বা সেনাধ্যক্ষ (কোথাও কোথাও এই প্রসঙ্গে নগরাধ্যক্ষ শব্দটিরও ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়), [১৩] গজাধ্যক্ষ, [১৪] কোশাধ্যক্ষ (বা ধনাধ্যক্ষ), [১৫] দুর্গপাল, [১৬] করপাল (বা রাজস্বের রক্ষক), [১৭] সীমাপাল (রাজ্যের সীমারক্ষক), এবং [১৮] প্রোত্কটভৃত্য বা প্রিয়ভৃত্য (অর্থাৎ সে সমস্ত দক্ষকর্মচারী যাঁরা রাজার অনেক গোপনীয় ও স্পর্শকাতর কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রোত্কটভৃত্য শ্রেণির ভৃত্যগণ যেমন বিপজ্জনক তথ্যের অধিকারী, তেমনি তাঁদের প্রতি অগাধ আস্থা ও কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা হত। তাঁদের কাজের স্বরূপ অনেকটা আজকের দিনে রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট, গোয়েন্দা প্রধান, বা ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার-এর মত। এই সকল তীর্থদের যদি ভেদ করা যায় অর্থাৎ বিজিগীষু রাজা যদি এঁদেরকে কোনো ভাবে নিজপক্ষে নিয়ে আসতে পারেন তাহলে শত্রুরাজাকে সহজেই জয় করে নিতে পারেন।
আর বিজিগীষু রাজার নিজপক্ষের তীর্থরা হলেন, [০১] দেবী (বা রাজমহিষী), [০২] জননী (অর্থাৎ রাজমাতা বা রাজার বিমাতা), [০৩] কঞ্চুকী (অন্তঃপুরে অবস্থানকারী বৃদ্ধব্রাহ্মণ), [০৪] মালী, [০৫] শয্যা পালক (অর্থাৎ যিনি রাজার শয্যা রচনা করেন), [০৬] স্পর্শাধ্যক্ষ (বা গুপ্তচর বিভাগের প্রধান), [০৭] সাংবত্সরিক বা জ্যোতিষী, যিনি ভবিষ্যৎ গণনা করেন, [০৮] চিকিত্সক, [০৯] জলবাহক, [১০] তাম্বুলবাহক (যিনি রাজার পানদানী নিয়ে রাজার সঙ্গে সঙ্গে চলেন), [১১] আচার্য, [১২] অঙ্গরক্ষক, [১৩] স্থানচিন্তক বা নিবাসাধ্যক্ষ (অর্থাৎ রাজপ্রাসাদের সমস্ত ব্যবস্থা দেখেন এবং কর্মচারীদের পরিচালনা করেন), [১৪] ছত্রধর (অর্থাৎ যিনি রোদবৃষ্টি থেকে বাঁচাতে রাজার মাথায় ছাতা ধরেন) এবং [১৫] বেশ্যা প্রভৃতি বিলাসিনীরা। এরা যদি শত্রুরাজার সঙ্গে মিলে বিজিগীষুরাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাহলে বিজিগীষুরাজার পতনের পাশাপাশি প্রাণসংশয়েরও আশঙ্কা দেখা যায়। এমনকি এরা বিজিগীষু রাজার স্বপক্ষীয় অন্যান্য লোকেদেরও বিজিগীষু রাজার বিপক্ষে সহজেই চালনা করতে পারে।
পরের দেশে অর্থাৎ শত্রুর রাষ্ট্রে আঠেরো জায়গায় এবং নিজের দেশেও পনেরো জায়গায় চর লাগিয়ে রাখা ছাড়াও আরও বেশ কিছু জায়গায় চর নিয়োগ করতে বলেছেন মহাভারতকার। আদিপর্বে এক জায়গায় বলা হয়েছে (১১১.৬৩-৬৫) – উদ্যান, বেড়ানোর জায়গা, মন্দির, পানশালা, রাজপথ, চৌমাথার মোড়, তীর্থস্থান, যাগযজ্ঞের স্থান, খনি, পার্বত্য অঞ্চল, বন, নদী ছাড়াও বাজার-হাটের মতন জায়গা যেখানে অনেক মানুষ মিলিত হন কিংবা পণ্ডিতদের বিদ্যা-বিতণ্ডার সভাতে যেখানে অনেক মানুষের সমাবেশ হয় সেই সমস্ত জায়গাতেই চর নিয়োগ করতে বলা হয়েছে মহাভারতে। শান্তিপর্বেও (৬৯.১১-১৩) একস্থানে বলা হয়েছে, যেকোনও কাজ করার আগে চরের মাধ্যমে তা যাচাই করে নিলে রাজার সবচেয়ে বেশি সুবিধা হয়। কাকে দিয়ে কি কাজ করলে সুবিধা হবে সে খবরও রাজাকে চরেদের মাধ্যমেই সংগ্রহ করবার কথা বলা হয়েছে।
এখানেও চরনিযুক্তির জায়গাগুলো সম্বন্ধে বলতে গিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দোকানপাটের জায়গা, পণ্ডিতদের সমাগম, মুনিঋষিদের আশ্রম, জনবহুল দেশ, পানাগার, নদীর ঘাট ইত্যাদি সমস্ত জায়গাকেই। অর্থশাস্ত্রে শত্রুরাষ্ট্রের তীর্থদের মধ্যে পঞ্চতন্ত্রকারের তালিকা ছাড়াও কৌটিল্য [০১] পৌরব্যবহারিক (পৌর আইন প্রয়োগকর্তা), [০২] কার্মান্তিক (খনি বা কারখানার প্রধান পর্যবেক্ষক), [০৩] মন্ত্রিপরিষদের অধ্যক্ষ (অমাত্যপরিষদের অধ্যক্ষ), [০৪] দণ্ডপাল (সেনারক্ষার অধিপতি), [০৫] আটবিক (অটবীপাল বা জঙ্গলরক্ষায় নিযুক্ত আধিকারিক)-কেও নিযুক্ত করেছেন। সোজা ভাষায় বললে বলতে হয় যেকোনো জায়গা, যেখান থেকে রাজা তার প্রয়োজনীয় সংবাদ পেতে পারেন, সেই সমস্ত জায়গাতেই চর নিযুক্ত করাটা রাজার অন্যতম নীতির মধ্যে পড়ে। কারণ, চরেরা যেমন নিজ রাজার শুভার্থী হয়ে সর্বদা জনমত যাচাই করেন, তেমনই পররাষ্ট্রে গিয়ে শত্রুকে আঘাত করা, এমনকী তাকে মেরে ফেলার ব্যাপারেও যদি কোনো পরিকল্পনা রাজা করে থাকেন, তবে সেটাও কার্যকর করে এই সমস্ত চরেরাই। মহাভারতে খুব স্পষ্টভাষায় বলা হয়েছে –
চারৈর্বিদিত্বা শত্রূংশ্চ যে রাজ্ঞামন্তরৈষিণঃ।
তানাপ্তৈঃ পুরুষৈর্দূরাদ্ ঘাতযেথা নরাধিপঃ।। (মহাভারত, আশ্রমবাসিকপর্ব ৫.৩৮)
এই চরদের প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা অর্থশাস্ত্রে পাওয়া যায়। পঞ্চতন্ত্রকার বলেছেন, বিজিগীষু রাজার উচিত নিজের পক্ষে থাকা চিকিত্সক, জ্যোতিষী এবং গুরুকে গুপ্তচরে কাজে নিযুক্ত করা। এছাড়াও সাপুড়ে কিংবা পাগলের ছদ্মবেশধারী লোকেও শত্রুর সব খবর বের করে আনতে পারে বলে তাদেরকেও গুপ্তচরের কাযে নিযুক্ত করা যেতে পারে। যেহেতু বৈদ্য বা জ্যোতিষীরা বৃত্তির জন্য সর্বত্র ঘুরে বেড়ান এবং সাপুড়ে বা পাগলদেরও যেহেতু লোকে বেশি সন্দেহ করে না তাই এদেরকে শত্রুরাজ্যে গুপ্তচরবৃত্তিতে ঢুকিয়ে দেওয়া সোজা।—চলবে।
* পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি (Panchatantra politics diplomacy): ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (Anindya Bandyopadhyay) সংস্কৃতের অধ্যাপক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com