সোমবার ১৬ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
গত সপ্তাহে চম্পারণ ক্যাম্প ঘুরে চলে এসেছে শংকর। ব্রজেন স্যারকে আর ছাড়েনি। তিলজলা বস্তির একটা প্রায় পরিত্যক্ত টিনের ঘর কোনওরকমে পরিচ্ছন্ন করে স্যারকে রেখেছে। আফজল জোগাড় করে এনেছে একটা নড়বড়ে চৌকি আর উই ধরা টেবিল। পানু জানিয়েছে, চেয়ারের খোঁজ চলছে। যেখানে পাবে তুলে আনবে। এর বেশি কি বা বন্দোবস্ত করতে পারে ওরা!

তবে আজকে শংকরের খুব ব্যস্ততা। ডিএল রায় স্ট্রিটের বাড়িতে চটপট ব্রেকফাস্ট সেরে, ব্রেকফাস্ট আবার কি সেই একঘেয়ে রুটি আর সুজি খেয়ে নিয়ে দ্রুত হাতে গুছিয়ে নিচ্ছে নিজের ঝোলা ব্যাগটা। একখানা কাচা ধুতি-পাঞ্জাবি, একটা হাওয়াই শার্ট, দু’ চারটে তুলি, খান কয়েক রং আর বাঁশিটা। কমরেড বদ্যি বিশ্বাসের চিঠিতে কিছু পথনির্দেশ আছে। চিঠি ডাকে আসেনি। এসেছে লোক মারফত। নবীনের কাছে খবর ছিল। স্টেশনে গিয়ে নিয়ে এসেছে।
আজকে শংকর একটু চিন্তিত উত্তেজিত। ভালোই কাজের চাপ। প্রথমে যাবে তিলজলা ক্যাম্প। নবীনকে সবার আগে সঙ্গী করা দরকার। আফজাল রসিক পানু নবীন আর সে নিজে এই পাঁচ মাথায় মিলে কিছু প্ল্যান করে নেবে। তারপর বেরোতে হবে কমরেডের নির্দেশ বুঝে। দিন দুয়েকের মধ্যে। ফলে, আজ রাতেও ডায়মন্ড হারবারে ফেরা হবে না। এক সপ্তাহ যেতেই পারেনি মায়ের কাছে। বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে বাবাতুতো ভাইদের বাড়ি। মুশকিল হলো ডায়মন্ডহারবার থেকে রেগুলার কলকাতায় কাজ সামলাতে আসা বিরাট ফ্যাশাদ। ঘন চুলে চিরুনি বুলিয়ে রেডি হয়ে নিচ্ছে শংকর। ছায়া দেখে পিছনে তাকালো। নবীন এসেছে।
—নবীন আয়, পত্রখান আনছস তো?
—হ। নবীন গম্ভীর।
তিলজলায় সন্ধ্যা সাতটায় মিটিং, কথাখান মাথায় আছে?
—হইব না।
—কী? কী হইব না? ধমকে ওঠে শংকর।
—আমার অন্য কাম পড়ছে।
—তোর আবার কী কাম? বাউন্ডুলের লাখান চইড়্যা বেড়াস।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৪ : চম্পারণ-বেতিয়া এবং অভিযাত্রী শংকর

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫১: জরাসন্ধ কাহিনির আধুনিকতা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৬: ব্রিটিশ বাংলার বিপ্লবীরা অনেক সময় পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতেন ত্রিপুরায়

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৭ : ঘুঘুর ফাঁদ

শংকর রীতিমত বিরক্ত। খেয়াল করেছে ইদানিং নবীন ক্রমশ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। কেমন একটা ধরাশায়ী গোছের চোখ মুখ। দল বদলানোর হুঁশিয়ারি নয়তো! হাই কমান্ড প্রশিক্ষণের ক্লাসে বলেছিলেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো সংবাদ থাকলে কর্তৃপক্ষকে আগে জানাতে। ভ্রুকুটি করে শংকর একদৃষ্টিতে জরিপ করে নবীনকে। নবীনের উস্কোখুস্কো চুল। ময়লা ধুতি। লোমশ চওড়া উদলা বুকে আড়াআড়ি করে পেঁচিয়ে জড়ানো একটা গামছা। মাথা নত করে নবীন দাঁড়িয়ে আছে শক্তমুখে। শংকরের এতদিনের ছায়া সঙ্গী। শংকরের বুকের ভিতরটায় কেমন হু হু বাতাস ওঠে। ঠান্ডা মাথায় ডাকে, আয়তো নবীন.. আমার কাছে বস।
নবীন বসে।
—কি বা হইছে ক। ক্যান যাইতে চাস না, নির্ভয়ে ক’ দেহি।
—আমার আর ই’ সব ভালো লাগেনা সেই দা।
—কী কইলি তুই?
—হ সেই দা, উৎসাহ পাই না। কিছুর মধ্যে কিছু নাই কাজকামের কুনো দিশা নাই। ক্যাবল গোপন সভার ডাক।
মাথা জ্বলে উঠল শংকরের। একই সঙ্গে চড়ল গলা—
—তুই কি বোঝোস রে শুয়ার এক লাইন পড়তে লিখতে পারস না। তার উপর কোনওঁ কিস্যু জাইনবার প্রয়াস নাই, কমিউনিস্ট পার্টির অরিজিন, তার উদ্দেশ্য ,তার পরিকল্পনা বোঝো কিছু? আগে বুঝবি, তবে তো কামের বন্টন!
আরও পড়ুন:

দোলি হ্যায়!

সংসার ভেঙে… চলে গেলেন শঙ্কর

নবীর নির্বাক, উদাস। শংকর কড়া গলায় নির্দেশ দেয়—
—ইউ মাস্ট গো। ত’রে যাইতেই হইবো পার্টি রেজিস্টার ‘এ নাম লেখনের সময় মনে ছিল না.. তুই তো অলরেডি রেকর্ডেড মেম্বার। নাম থাইকলে কাম করতেই হইবো। নয়তো ত’রে লইয়া আমরা অন্যরকম ভাবনা চিন্তা করুম।
নবীন মাথা নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁটছে। অসহায় চেহারাটা দেখে আবারও কাতর হল শংকর। নরম গলায় বলে,
—যা তো পাগলা, উঠ, দুই কাপ চা বানায়্যা আন, খাইয়্যা দুই ভাইয়ে রওনা দিই।
—চা অহনই আনতাছি দাদা, তয় আমার একখান দাবি আইজকের লিগা তোমারে মাইনতেই হইবো।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ

শংকর বলে—ক।
—আজ আমি কুথাও যাইতে পারুম না।
—আইচ্ছা বান্দর ত.. ক্যান যাইবি না স্পষ্ট কইরা ক সামান্য মৌন থেকে ভীতু গলায় নবীন বলে,
—সেইদা আইজ আমারে ডাইমন্ড হাইরবার যাইতেই হইবো। শিয়ালদা থিক্যা কিছু বাজার হাট কইরা রাত্তিরের মইধ্যে মায়ের হাতে দিতেই হইব। ও বাড়িতে কুনো বাজার নাই। সক্কলে কী যে অসুবিধায় পড়সে, বিশ্বাস যাও সেই দা।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে শংকর। লজ্জাও পেয়েছে খুব। মায়ের কথা ভেবে মধ্যে মধ্যে মন খারাপ কি ওর হয় না? খুব হয়। একটু কিছু ভেবে সহমত হলো সে।
—বুঝি নবীন। তুই ঠিক কইছস। শোন, আমি হলাম স্পষ্ট কথার মানুষ। তরে কিন্তু পার্টির কাজে লাগবই। আইজ যাচ্ছিস যা, এর পর থিকা কোনো অজুহাত জানি না শুনি।
নবীনের গলায় পুরনো উৎসাহ ফিরে এসেছে। এক গাল হেসে বলে—
—দু’ মিনিট খাড়াও দাদা, আমি এহনি চা কইরা আনছি এক ছুইট্টা।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content