
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
কেউ কেউ এমনটা মনে করেছেন যে, দেশের মুক্তি সংগ্রামের ক্ষেত্রে এটাই ছিল পার্বত্য ত্রিপুরার প্রথম ভূমিকা গ্রহণ।
সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে ত্রিপুরা আরও বেশি করে প্রভাবিত হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবীরা ১৯২২ সালের পর চট্টগ্রামে মিলিত হয়ে নতুন কর্মসূচি নেন। আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয় যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির কাজকর্ম। পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ বাংলার বিপ্লবীরা অনেক সময় পালিয়ে এসে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতেন। এই ভাবে ব্রিটিশ বিরোধী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল ত্রিপুরাও। বিপ্লবীদের গতিবিধি সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ত্রিপুরার রাজ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়। স্বদেশীদের প্রতি রাজার প্রচ্ছন্ন সহানুভূতিরও আভাস পাওয়া যায় সেই আমলের বিভিন্ন ঘটনায়।
সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে ত্রিপুরা আরও বেশি করে প্রভাবিত হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবীরা ১৯২২ সালের পর চট্টগ্রামে মিলিত হয়ে নতুন কর্মসূচি নেন। আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয় যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির কাজকর্ম। পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ বাংলার বিপ্লবীরা অনেক সময় পালিয়ে এসে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতেন। এই ভাবে ব্রিটিশ বিরোধী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল ত্রিপুরাও। বিপ্লবীদের গতিবিধি সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ত্রিপুরার রাজ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়। স্বদেশীদের প্রতি রাজার প্রচ্ছন্ন সহানুভূতিরও আভাস পাওয়া যায় সেই আমলের বিভিন্ন ঘটনায়।
স্বদেশী আন্দোলনটা ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে,রাজার বিরুদ্ধে নয়। রাজা যেন তাই বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই এড়িয়ে যেতেন। এছাড়া ব্রিটিশ সরকারের নানা ধরনের নির্দেশাবলী, ইংরেজ আধিকারিকদের দাপট স্বাধীনচেতা রাজাগণ যে ভালো মনে মেনে নিতেন না তাই বলাই বাহুল্য। বিপ্লবীদের প্রতি রাজার গোপন সহানুভূতি ছিল বলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রায়ই ত্রিপুরার রাজ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করত। বিপ্লবীদের প্রতি রাজ সরকারের গোপন নৈতিক সমর্থনও থাকত বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। একবার পিস্তল চুরির অভিযোগে দু’জন বিপ্লবীকে ধরার জন্য কুমিল্লা পুলিশ পার্বত্য ত্রিপুরার সোনামুড়া অঞ্চলে প্রবেশ করলে রাজা আগে ভাগেই তাঁর লোকজন মারফৎ এই দুই বিপ্লবীকে পাহাড়ি এলাকার মাঝ দিয়ে রাজধানীতে নিরাপদে সরিয়ে আনেন বলে জানা যায়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৫: ত্রিপুরায় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫১: জরাসন্ধ কাহিনির আধুনিকতা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৭ : ঘুঘুর ফাঁদ
যাইহোক, কালক্রমে পার্বত্য ত্রিপুরার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে স্বদেশীদের তৎপরতার প্রভাব। আবার প্রভাব পড়ে অসহযোগ আন্দোলনেরও। ত্রিপুরায় যুগান্তর দল ও অনুশীলন সমিতি সম্পর্কে তড়িৎ মোহন দাসগুপ্ত লিখেছেন—”১৯২৭ সাল, যে প্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করল তার নাম ‘ছাত্রসংঘ’। প্রকাশ্যে তাদের উদ্দেশ্য ব্যায়াম করা, লাঠি খেলা, ছোরা খেলা ইত্যাদি। মুখ্য উদ্দেশ্য-সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হওয়া। সরকারের বাজেয়াপ্ত করা বইপত্র— ‘ক্ষুদিরাম’, ‘কানাইলাল’ ‘ফাঁসির সত্যেন’ ইত্যাদি পুস্তক পাঠ।
আরও পড়ুন:

দোলি হ্যায়!

সংসার ভেঙে… চলে গেলেন শঙ্কর
‘ছাত্রসংঘ’ ভেঙ্গে ‘ভ্রাতৃসংঘ’ সৃষ্টি হল। ছাত্রসংঘ অনুশীলন দলের সমর্থক, ভ্রাতৃসংঘ যুগান্তরের-নেতৃত্বে প্রধানত শচীন্দ্রলাল সিংহ, প্রভাত রায়।” আরও জানা যায় যে, যুগান্তর দলের একটি শাখা ১৯২৮ সাল থেকে ত্রিপুরায় কাজ করতে থাকে। কুমিল্লার অনুশীলন সমিতির একটি গুপ্ত শাখা ১৯৩১ সালে আগরতলার কৃষ্ণনগরে রাজাবাবুর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নেতৃত্বের মধ্যে ছিলেন প্রভাত রায়, সুশীল দেববর্মা ও কান্তি দেববর্মা। ‘স্বাধীনতা আন্দোলন ও ত্রিপুরা রাজ্য’ শীর্ষক বাণীকণ্ঠ ভট্টাচার্যের এক প্রবন্ধ সূত্রে আরও জানা যায় যে, আগরতলার মোটরস্ট্যান্ডের কাছে অনুশীলন সমিতির একটি ছোট কেন্দ্র ছিল যার পরিচালনায় ছিলেন অনন্ত দে। সে সময় আগরতলায় একটি রাজনৈতিক ডাকাতিও হয়েছিল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ
১৯৩২ সালের ২৩ চৈত্র আগরতলার মিউনিসিপ্যালিটির কাছে একটি পান দোকান থেকে বেশ কিছু টাকা ও গহনা লুট হয়ে যায়। আর এই ঘটনার অভিযোগে মেলারমাঠের একটি বাড়ি থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।গ্রেপ্তারকৃতরা অবশ্য সবাই ছিলেন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলা ও সমতল ত্রিপুরার বাসিন্দা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, ব্রিটিশ সরকার সংশ্লিষ্ট গ্রেপ্তারকৃতদের বিচারের জন্য কুমিল্লা নিয়ে যেতে চাইলে ত্রিপুরার রাজা তাতে বাধা দেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
মহারাজার যুক্তি হল ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্যেই যেহেতু তারা অপরাধ করেছে তাই ত্রিপুরাতেই তাদের বিচার হবে। এই ভাবেই সেদিন বিপ্লবী ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক আশ্রয় স্থল হয়ে উঠেছিল ত্রিপুরা। শেষ পর্যন্ত সেদিন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজার এমন এক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল যাতে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত যে কোনও ব্যক্তিকে স্বাধীন ত্রিপুরা থেকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে পারতো।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















