শুক্রবার ১৩ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

বীরবিক্রম।

বীরবিক্রমের সাহিত্য প্রতিভার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় তাঁর রচনায়। প্রত্যন্ত এক পার্বত্য রাজ্যের রাজা ভারতীয় সংস্কৃতির গভীরে ডুব দিয়ে তুলে ধরেন ভারতের উৎসব ঐতিহ্যকে। রাজার সোনামুড়া ও উদয়পুর ভ্রমণের বিবরণীতে রয়েছে তাঁর গদ্যের আরও নিদর্শন। ‘আমার সোনামুড়া ও উদয়পুর বিভাগ পরিভ্রমণ’ নামে রাজার ডায়েরী গ্রন্হ হিসেবে প্রকাশিত হয়। রাজা লিখেছেন—”…আজ সকাল ৯টায় গোবিন্দ মাণিক্যের রাজবাড়ি দেখিতে যাই। রাজবাড়িটি একটি উচ্চ পাহাড়ে অবস্হিত, ইহার পশ্চিম দিকে গোমতী প্রবাহিত এবং অন্যদিকে খাল। ইচ্ছা করলেই গোমতীর জলে খালটি পূর্ণ করা যায়।অতএব এই রাজবাড়িতে শত্রু প্রবেশ করিতে সহজে পারে না। উদয়পুরের পুরাণ দালানের মধ্যে এই রাজবাড়িটি সকলের চেয়ে বড়। ইহার বর্তমান অবস্থা একেবারে খারাপ হয় নাই।এই রাজবাড়িটিকে রক্ষা করা উচিত মনে করি।…”
নতুন ভাবে ‘রাজমালা’র প্রকাশও বীরবিক্রমের এক উল্লেখযোগ্য কাজ। সে যুগের বিশিষ্ট পণ্ডিত তথা পদস্থ রাজকর্মচারী কালীপ্রসন্ন সেন বিদ্যাভূষণ ‘রাজমালা’র সম্পাদনা করেছিলেন যা ‘শ্রীরাজমালা’ নামে তিনটি লহরে প্রকাশিত হয় রাজার উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায়।বীরবিক্রম রাজমালা বিভাগকে পুনর্গঠন করেন। সে জন্য পৃথক অফিস করা হয়। ত্রিপুরার অতীত ইতিহাস পুনরুদ্ধার, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে রাজা আন্তরিক প্রয়াসী ছিলেন। ত্রৈমাসিক ‘রবি’ এবং মাসিক সাময়িকী ‘জাগরণ’ প্রকাশনার ব্যাপারেও রাজা খুব উৎসাহী ছিলেন। ১৯৪১ সালে ‘রাজমালা’ কার্য্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছিল কালীপ্রসন্ন সেনগুপ্তের ‘পঞ্চ-মাণিক্য’। এই গ্রন্হটিও মহারাজা বীরবিক্রমের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হয়েছিল।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৪: ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ সাহিত্য সংস্কৃতির অকৃপণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২১: মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন

রাজার লেখা সঙ্গীত ও গদ্য সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। রাজা কিন্তু নাটকও লিখেছেন। তাঁর লেখা ঐতিহাসিক নাটক ‘জয়াবতী’ রাজধানীতে মঞ্চস্হ হয়েছিল। তদানীন্তন সময়ে রাজার লেখা নাটকটি দর্শক ও সাহিত্য সমালোচকদের উচ্চ প্রশংসা লাভ করে। রাজা যেমন গান লিখতেন, সাহিত্য চর্চা করতেন, তেমনই এ সব ক্ষেত্রে ছিল তাঁর এক ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা। তাঁর রাজত্বকালে অনেক গুণী শিল্পী আগরতলায় এসেছেন। এনায়েত খাঁ,আলাউদ্দিন খাঁ, মজফর খাঁ, মুন্না খাঁ প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায় এ ক্ষেত্রে। মণিপুরী নৃত্যের অঙ্গনেও ত্রিপুরার খ্যাতি লাভ ঘটে তখন। মণিপুরী নৃত্যের তালিম দেয়ার জন্য ঠাকুর নবকুমার সিংহকে তখন আগরতলা থেকে শান্তিনিকেতনে পাঠানো হয়েছিল। পিতা বীরেন্দ্র কিশোরের মতো চিত্রকলাতেও গভীর আগ্রহ ছিল বীরবিক্রমের। তবে সব কিছুকে যেন ছাপিয়ে যায় রাজার সাহিত্য প্রতিভা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৫: গাঙচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

বীরচন্দ্র থেকে বীরবিক্রম-ত্রিপুরার চার মাণিক্য রাজার সঙ্গেই ছিল কবির সম্পর্ক। এক রাজবংশের চারজন রাজার সঙ্গে কবির এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিঃসন্দেহে এক আশ্চর্য ঘটনা।প্রথম যোগাযোগের সময় বীরচন্দ্র প্রৌঢ়, কবি তরুণ বয়স্ক। আর শেষ বেলায় বীরবিক্রম যখন যুবক রাজা কবি তখন প্রৌঢ়।বীরবিক্রমের সঙ্গে কবির বার কয়েক সাক্ষাৎ ঘটেছে। ত্রিপুরার পুরাতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণে কবি রাজাকে পরামর্শ দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন শেষবারের মতো আগরতলা সফরে আসেন তখনই কবির সঙ্গে নবীন রাজা বীরবিক্রমের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল। এই সফরকালে কবি রাজাকে ত্রিপুরার প্রত্ন সম্পদের উপযুক্ত সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। ‘রাজমালা’,’গীত চন্দ্রোদয়’ সম্পাদনা,ত্রিপুরার প্রাচীন মন্দির, প্রাসাদ ইত্যাদির সংরক্ষণের বিষয়াদি নিয়ে কবি ও রাজার মধ্যে আলোচনা হয়।১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে কলকাতার টাউন হলে রবীন্দ্র শিল্প মেলা ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

বীরবিক্রম এই মেলার উদ্বোধন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে ভাষণ প্রসঙ্গে রাজা তাঁর পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহের সঙ্গে কবির সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। রাজা আরও বলেন,নিজ দেশের শিল্পকলাকে যথার্থ ভাবে দেখার শিক্ষা আমরা কবির কাছেই পেয়েছি। ১৯৩৯ সালে বীরবিক্রম শান্তিনিকেতন সফর করেন। ৭ জানুয়ারি আম্রকুঞ্জে রাজাকে আনুষ্ঠানিক সম্বর্ধনা জানানো হয়। বিশ্বভারতীর অধ্যাপক, ছাত্রছাত্রী সহ আশ্রমবাসীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৪১ সালের ২৫ বৈশাখ মহারাজা বীরবিক্রম রবীন্দ্রনাথকে ‘ভারত ভাস্কর’ উপাধি প্রদান করেন।এই উপলক্ষ্যে আগরতলায় উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদের খাস দরবার হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘রবীন্দ্র জয়ন্তী’ বিশেষ দরবার। তারপর শান্তিনিকেতনে কবির হাতে ‘ ভারত-ভাস্কর’ অভিজ্ঞানপত্র তুলে দেবার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২০: একেজি কলিং

রবীন্দ্রানুরাগী হিসেবে সেদিন ত্রিপুরার রাজা বীরবিক্রমের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার বাইরেও। ১৯৪১ সালের জুন মাসে মহারাজা পুরীতে রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধন করেন। পুরী বঙ্গ সাহিত্য পরিষদ ও পুরী সঙ্গীত সম্মিলনীর পক্ষ থেকে মহারাজাকে সম্বর্ধনা জানানো হয়।
সাহিত্য চর্চা, গীত রচনা তথা সাহিত্য-সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য বীরবিক্রম উজ্জ্বল হয়ে আছেন ত্রিপুরার ইতিহাসে।রাজার সঙ্গে কবির সম্পর্কের অধ্যায় নিঃসন্দেহে সেই ইতিহাসকে আরও ঔজ্জ্বল্য দান করেছে। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন বীরবিক্রম। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে ত্রিপুরার ভারতভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন তিনি।—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content