
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ সর্বদা সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে গিয়েছেন। রাজা এবং রাজপরিবারের লোকেরা নিজেরাও সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করেছেন। পঞ্চদশ শতকে মহারাজা ধর্ম মাণিক্য ‘রাজমালা’ রচনা করান। বলা যায় এর মাধ্যমেই ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাদের সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতার সূচনা ঘটে। ত্রিপুরায় সঙ্গীত চর্চার প্রসারে পরবর্তী রাজা ধন্য মাণিক্য মিথিলা থেকে রাজ্যে কয়েকজন সঙ্গীতজ্ঞ আনিয়েছিলেন। এই ভাবে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মাণিক্য রাজাদের সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার কথা ছড়িয়ে আছে ইতিহাসে।
পূর্বতন রাজাদের মতো বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যও সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রকাশিত হয় ‘শ্রীরাজমালা’। তিনি পৃথক ভাবে ‘রাজমালা’ সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যালয় স্হাপন করেছিলেন। ‘রবি’ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশেও রাজা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। বীরবিক্রম একজন কবি ও নাট্যকার ছিলেন। অবশ্য তাঁর সাহিত্য বিষয়ক তৎপরতা মূলত রাজপরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি হোলি বিষয়ক একটি সঙ্গীত গ্রন্হ রচনা করেছিলেন।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৩: শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষতায় বীরবিক্রম

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?
উল্লেখ করা যায় যে,রাজ আমলে ত্রিপুরায় হোলি ছিল অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই উৎসবে রাজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। ১৯৪১ সালে বীরবিক্রমের হোলি বিষয়ক সঙ্গীত গ্রন্হ ‘হোলী’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু গ্রন্হটি প্রকাশিত হয় ফাগুয়া সংঘের নামে। এ সম্পর্কে রাজার ব্যক্তিগত সচিব দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত লিখেছেন— “হোলি গ্রন্হটি বাহির হইল ১৯৪১ সালে। লেখক ছদ্মনামে লিখিত হইয়া ফাগুয়া সংঘ কর্তৃক প্রকাশিত হইল। আগের বছর হইতেই মহারাজ বীরবিক্রম এই বইয়ের জন্য ডায়েরিতে গান লিখিয়া রাখিতেছেন।…”
বীরবিক্রমের লেখা একটি হোলি গানের কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে—
“…এমন সুন্দর হোলির দিনে,
রসিক নাগর শ্যাম বিনে,
খেলিব ফাগ কাহার সনে,
আমার খেলাত হল না খেলা।”
বীরবিক্রমের লেখা একটি হোলি গানের কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে—
রসিক নাগর শ্যাম বিনে,
খেলিব ফাগ কাহার সনে,
আমার খেলাত হল না খেলা।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৪: ভুবন চিল ও শঙ্খচিল

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৩: পরেশের পরশপাথর
রাজা সাহিত্য সংস্কৃতির অকৃপণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে অনেক গুণী শিল্পী আগরতলায় রাজদরবারে এসেছেন। কিন্তু রাজা ছিলেন প্রচার বিমুখ। তাঁর সাহিত্য সংস্কৃতির তৎপরতা প্রাসাদ পরিমন্ডলেই সীমাবদ্ধ ছিল। রাজার লেখা গানগুলোর রসাস্বাদন করে পরবর্তীকালের সঙ্গীত রসিকরা অবাক হয়ে গেছেন গীতিকার হিসেবে রাজার প্রতিভা দেখে। তিনি ব্রজবুলিতে হোলির গান লিখেছেন—
“আজু হেরি এ নব প্রেম চমক আওয়ে।
গোপ নারী সঙ্গ হোরী খেলন যাওয়ে।।
পর নারী সঙ্গ প্রেমসে করত রঙ্গ,
রসে রসিক নাগর কো সরমন আওয়ে।।…”
গোপ নারী সঙ্গ হোরী খেলন যাওয়ে।।
পর নারী সঙ্গ প্রেমসে করত রঙ্গ,
রসে রসিক নাগর কো সরমন আওয়ে।।…”
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২০: রবীন্দ্রনাথ আশ্রমের একমাত্র তাঁকেই প্রণাম করতেন

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা
কাব্য ও সঙ্গীত রচনার পাশাপাশি গদ্য রচনাতেও বীরবিক্রমের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। হোলি উৎসবের প্রাচীনত্ব ও উৎস নিয়ে তিনি ‘হোলী’ গ্রন্হের অবতরণিকা অংশে পাণ্ডিত্য পূর্ণ আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন—”যখন দারুণ শীত অবসানে নীরস পল্লববিহীন তরু আবার সরস নব পল্লবে নবীন হইয়া উঠে,যখন কাননে বাগানে ফুল আবার জগতকে সুশোভিত ও সুবাসে আমোদিত করিয়া তোলে, যখন আবার কোকিল পঞ্চমে গান গায়,যখন আবার পবন মন্দ গতিতে বহিতে থাকে-যে পবন শত কুসুম-হৃদয়-বিদারিত সুগন্ধ নিজ বক্ষে বহন করে এবং যেন প্রেমিকার দেহে মৃদু আঘাতে দেশান্তরে অবস্হিত প্রেমিকের বারতা প্রেমিকার কাছে আনে ও নিদারুণ বিরহ বেদনা আবার বিরহীর প্রাণে আনয়ন করে তবুও হয়ত অনেকে বিরহ অন্তে প্রিয়ার সঙ্গে মিলনের আশা রাখে বসন্তে-সেই মধু ঋতুতে, ফাগুনের চন্দ্রমাস অবসানে বিকলাঙ্গ চন্দ্র যখন পূর্ণ চন্দ্রে পরিণত হয়-সেই দোল পূর্ণিমাতে হোলী।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৯: গোখরো কিংবা কালাচ
এই কয়েকটি লাইন থেকেই মহারাজা বীরবিক্রমের গদ্য সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়। হোলি উৎসবের উৎপত্তি সংশ্লিষ্ট কিংবদন্তী বিষয়ে বীরবিক্রম এই অবতরণিকায় লিখেছেন—”হোলী উৎসবটি অতি প্রাচীন। এই চিত্ত বিনোদনকারী মহা মিলনোৎসব সম্বন্ধে সহস্রাধিক বৎসর পূর্বে বাৎস্যায়ন তাঁহার ‘কামসূত্রে’ উল্লেখ করিয়াছেন। কিম্বদন্তী আছে যে একদা অসুররাজ হিরণ্যকশিপুর ভগ্নী হোলিকা কৃষ্ণভক্ত প্রহ্লাদকে বিনাশ করিবার উদ্দেশ্যে হঠাৎ বাহুবেষ্টনে আবদ্ধ করিয়া অগ্নিতে ঝম্প প্রদান করে। প্রজ্জ্বলিত হুতাশন হোলীকা এবং প্রহ্লাদকে ত্বরায় আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। ইহাতে হিরণ্যকশিপু যদিও ভগ্নীর অনিবার্য্য মৃত্যুর আশঙ্কায় দুঃখিত হইলেন তবুও প্রহ্লাদের অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের আশায় ততোধিক উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন।অগ্নি প্রহ্লাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করিল না। কিন্তু সেই দাবানলে হোলীকার ধ্বংস হইল। এই হোলিকার নামানুসারে ‘হোলী’ এবং নরনারীগণ পুণ্যের দ্বারা পাপের পরাজয়ের এই অবিনশ্বর স্মৃতি যুগে যুগে হোলি উৎসব দ্বারা অনুষ্ঠান করিয়া আসিতেছে।”—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















