মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৩২৬ বঙ্গাব্দে (১৯১৯ সালে) কবি শিলং সফর করেন। সেবারই গুয়াহাটি হয়ে তাঁর মণিপুর যাবার কথা ছিল। ১৯১৯ সালের ৩০ অক্টোবর শিলং থেকে কবি লিখছেন—’কাল আমি শিলং ছেড়ে গৌহাটি যাবো-তারপর সেখান থেকে আমাদের মণিপুর যাবার কথা চলছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কবির আর মণিপুর যাওয়া হয়নি। কবি গুয়াহাটি হয়ে সিলেট যান। তারপর সিলেট থেকে আসেন ত্রিপুরায়।
উল্লেখ্য, তদানীন্তন সময়ে মণিপুরে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। মণিপুরে যাওয়ার জন্য অনুমতি পত্র লাগতো। সম্ভবত কবি সেই অনুমতি পাননি। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরের সিংহাসনে ছিলেন চূড়াচান্দ সিংহ। তিনি প্রয়াত হয়েছেন অনেককাল আগে। রাজকন্যা মহারাজকুমারী বিনোদিনী দেবীর সঙ্গে কয়েক বছর আগে আগরতলা থেকে আমি টেলিফোনে কথা বলেছিলাম ইম্ফলে। তিনিও এখন আর নেই। বিনোদিনী দেবী মণিপুরের বিশিষ্ট গল্পকার, ঔপন্যাসিক। তিনি সাহিত্য একাদেমী পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন পদ্মশ্রী। রবীন্দ্রনাথও মণিপুরী নৃত্য প্রসঙ্গে কথা তুলতেই সেদিন যেন তিনি ফিরে গিয়েছিলেন অতীতে।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৫৯: রবীন্দ্রনাথ আগরতলা ও সিলেটে মণিপুরী নৃত্য-গীত দেখে মুগ্ধ হন

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে

রবি অনুরাগিনী মহারাজকুমারী পড়াশোনা করেছেন শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্র চেতনায় যেন নিয়ত উদ্ভাসিত তিনি। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু যেতে পারেননি মণিপুর। সেদিনকার এই ঘটনা সম্পর্কে মহারাজকুমারী বললেন, আমি তখন খুবই ছোট। বড় হয়ে শুনেছি। ইচ্ছা থাকলেও কবি আসতে পারেননি। হি ওয়াজ নট এলাউড। এখন কি আফসোস হচ্ছে? মহারাজকুমারী যেন একটু হাসলেন। আফসোস করে আর কি হবে! এটাতো ইতিহাস। তিনি আসতে চেয়েছিলেন, পারেননি। তবে গুরুদেব শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য ধারা প্রবর্তন করেছেন। চালু হয়েছে শিক্ষাক্রম। শান্তিনিকেতনের মাধ্যমে মণিপুরী নৃত্য ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। উই আর প্রাউড। গুরুদেবের এই কাজে আমরা গর্বিত।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৮: রক্তে ভেজা মাটিতে গড়ে ওঠে সত্যিকার প্রাপ্তি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৩: একটি হিংসা অনেক প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, হত্যা এবং মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে সর্বত্র

যাইহোক, রবীন্দ্রনাথ হয়তো সে সময়ে শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য শিক্ষার বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছিলেন। তিনি সফর করেন গৌহাটি, সিলেট। গুয়াহাটিতে অসমীয়া মেয়েদের বয়নশিল্পের কাজ দেখেছেন তিনি। সিলেটে দেখেছেন মণিপুরী নৃত্য। কবি এ সব ব্যাপারে আগ্রহী হয়েছেন। শান্তিনিকেতনের নৃত্য ধারায় মণিপুরী নৃত্য প্রবর্তন-সহ বাংলার ঘরে ঘরে বয়নশিল্প চালুর জন্য উদ্যোগী হয়েছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মণিপুর, শিলচর থেকেও নৃত্য শিক্ষক শান্তিনিকেতনে গিয়েছেন। মণিপুরী নৃত্য শৈলী রপ্ত করার জন্য শান্তিদেব ঘোষও মণিপুর গিয়েছিলেন। ত্রিপুরার নৃত্য শিক্ষকদেরও কেউ কেউ আগে মণিপুর গিয়ে তালিম নিয়ে এসেছিলেন।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৭: শ্রীমার কথায় ‘ঠাকুরের দয়া পেয়েচ বলেই এখানে এসেচ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৫: সর্বত্র বরফ, কোত্থাও কেউ নেই, একেবারে গা ছমছম করা পরিবেশ

ত্রিপুরা থেকে মণিপুরী নৃত্য শিক্ষক বুদ্ধিমন্ত শান্তিনিকেতনে আসার পর রবীন্দ্রনাথ ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ১৯ মাঘ ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোরকে লিখেছেন—”মহারাজ বুদ্ধিমন্ত সিংহকে আগরতলা পাঠাইয়াছেন সে জন্য আমরা আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ হইয়াছি। ছেলেরা অত্যন্ত উৎসাহের সহিত তাহার নিকট নাচ শিখিতেছে। মণিপুরী শিল্পকার্য্য শিখিতে উৎসুক প্রকাশ করিতেছে। মহারাজা যদি বুদ্ধিমন্তের স্ত্রীকে এখানে পাঠাইবার আদেশ দেন তবে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হইবে। আমাদের দেশের ভদ্র ঘরের মেয়েরা কাপড় বোনা প্রভৃতি কাজ নিজের হাতে করিতে অভ্যাস করে ইহাই আমাদের ইচ্ছা।এই জন্য আসাম হইতে একজন শিক্ষয়িত্রী এখানকার মেয়েদের তাঁতের কাজ শিখাইতেছে। কিন্তু সিলেটে আমি মণিপুরী মেয়েদের যে কাজ দেখিয়াছি তাহা ইহার চেয়ে ভাল। আমি বুদ্ধিমন্তের নিকট আমার প্রস্তাব জানাইয়াছি। সে মহারাজের সম্মতি পাইলে তাহার স্ত্রীকে আনাইয়া এখানকার মহিলাদিগকে মণিপুরী নাচ এবং শিল্পকার্য্য শিখাইবার ব্যবস্থা করিতে পারিবে এ রূপ বলিয়াছে। এই জন্য এ সম্বন্ধে মহারাজের সম্মতি ও আদেশের অপেক্ষায় রহিলাম।”
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-৯৭: পাতি সরালি

পঁচিশে বৈশাখ

বাংলার ঘরে ঘরে মেয়েরা যাতে বয়নশিল্পের কাজ করে, নিজের হাতে কাপড় বোনার অভ্যাস করে কবি সেটা চেয়েছিলেন। অসমের মতো সিলেটেও তিনি মেয়েদের তাঁতের কাজ লক্ষ্য করেছিলেন। তবে সিলেটের মণিপুরী মেয়েদের তাঁতের কাজ তাঁর কাছে তুলনায় ভালো মনে হয়েছিল। কবি চেয়েছিলেন বাংলাদেশেও মেয়েদের কাপড় বোনার কাজ সমাজ জীবনের অঙ্গ হোক। এ জন্য গুয়াহাটি থেকেও তিনি এক অসমীয়া মহিলাকে সেদিন শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। —চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content