কলকাতায় বৃষ্টি
লক্ষ্মী পদটি সংস্কৃত লক্ষ্ ধাতু থেকে ব্যুত্পন্ন। লক্ষ্ ধাতুর অর্থে লক্ষ্য করার একটা তাত্পর্য আছে। এছাড়াও, “লক্ষ্ম” পদটির অন্যতম অর্থ কলঙ্ক, চন্দ্রাঙ্ক। চারপাশে শোনা অজস্র এমন শব্দগুলোর মধ্যে রামানুজ লক্ষ্মণের নামের মূলেও লক্ষ্মী বা ভাগ্যবিশিষ্ট হওয়ার তাত্পর্য আছে। কেবল লক্ষ্মণ কেন, রাম পদটিতে যে আনন্দবিধানের তাত্পর্য, লক্ষ্মীর সমার্থক বিষ্ণুদয়িতা রমা-পদেও সেই আনন্দের উদ্ভাস। কমলপ্রিয়া কমলা কিংবা পদ্মাকে নিয়ে শাস্ত্রে-পুরাণে-তন্ত্রে বহু আলোচনা, আখ্যান-উপাখ্যান। যে লক্ষ্য করার কথা শুরুতেই বলা হল, তা বেশ বোঝা যায় লক্ষ্মীদেবীর বাহনটিকে দেখে। আঁধাররাতে নির্নিমেষ চোখদুটি লক্ষ্য করে অতন্দ্র একাগ্রচিত্তকে। কোজাগরীর নিশীথে নিভৃত গৃহকোণে তাঁকে অচঞ্চলা করার সাধনায় নিরত হন গৃহস্থ।
গৃহস্থ, তবে নারীর সঙ্গে লক্ষ্মী একাত্ম হয়েছেন এই সমাজব্যবস্থায়। ইতিহাস-মহাকাব্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, সম্পদ ও অধিকারের দ্বন্দ্ব নারী ও ভূমিকেন্দ্রিক। সে ব্যাস-বাল্মীকি থেকে হোমার, সকলেই বুঝি একসূত্রে জীবনকে গেঁথেছেন। অর্থশাস্ত্রকার কৌটিল্য-ও গ্রন্থারম্ভে “অর্থের” মাহাত্ম্যটি বোঝাতে গিয়ে ভূমির কথা উত্থাপন করেছেন। তাঁর “অর্থ” ভূমিকেন্দ্রিক। আরো স্পষ্ট করে বললে, ভূমির অধিকারকেন্দ্রিক। তাই এসে পড়বে ক্রমে ক্রমে ক্ষমতা, বিজীগিষা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত-বধ-বন্ধনের প্রসঙ্গ। সে কথা থাক, যে নারীর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হল, চঞ্চলা লক্ষ্মীদেবীকে অচঞ্চলা করার দায়ভার, দায়িত্ব কিংবা অধিকার যাদের ওপর বর্তেছে বরাবর, সেই নারীই মহামায়া, উমা, পার্বতী, দুর্গা হয়ে শক্তিরূপিণী হন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯১: কেন পান্থ, চঞ্চলতা!

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৯: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৭১ : লাউডগা

বিশেষ নিবন্ধ : মুকুন্দ দাস: স্বদেশ জাগরণের চারণকবি

সেই উত্সবের যাপনকাল সম্পদের অধিষ্ঠাত্রীর আরাধনায় জগতে শান্তশ্রীর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ণিমার পরে ক্রমে ক্রমে পৌঁছবে আরেকটি অমাবস্যার কূলে। তখন পূর্ণ হবে তার উত্সবের পথচলা। আনন্দময়ী, চিন্ময়ী দীপান্বিতা শক্তিস্বরূপা হবেন। পূর্ণিমার দিগন্তপ্লাবী শ্রীমণ্ডিত আলো-কে, অমাবস্যার দিগন্তব্যাপিনী নিশীথিনীর তমিস্রাকে দীপালিকায় শ্রীময়ী করে তোলার এই সাধনায়, চর্যায় “শ্রী”র ভূমিকাটি অর্থবহ বটে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৮১: শিশুপালের মৃত্যু, এক সাধারণের নির্মম পরিণতি

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত

যার শ্রী নেই, সে বিশ্রী। সামাজিক নানা কাহিনি, উপকাহিনিতে বিগতশ্রী লক্ষ্মী অর্থাৎ অলক্ষ্মী মূর্ত হন। তিনি বাঞ্ছিতা নন। আবার যিনি চিরবাঞ্ছিতা, তিনি চঞ্চলা। বাণভট্ট কাদম্বরীতে সেই চঞ্চলা লক্ষ্মীর দুর্নিবার আকর্ষণ বিপথগামী মানুষের জন্য কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে জানিয়েছেন অতি বিশদে। লক্ষ্মীর যে শান্তশ্রী ভুবনবিদিত, তা এখানে যেন এক বিরাট প্রহসন। সে যাই হোক, সমুদ্রমন্থনে লক্ষ্মী, অমৃত, বিষ সকলই পেয়েছিল মর্ত্য ও অমর্ত্যলোক। লক্ষ্মীর প্রসঙ্গে তাই একে একে জুড়ে থাকে শুভবোধ, অচাঞ্চল্যের সাধনা, থাকে অলক্ষ্মী, চঞ্চলা, অশুভের প্রসঙ্গ। দীপান্বিতা অমাবস্যায় অগণ্য প্রজ্বলিত দীপের ভাস্বর শিখাগ্নি বিশ্বসংসারের জাগতিক অন্ধকার, অজ্ঞানমোহের বিপুল তমঃকে দূর করে শান্তশ্রীর অচঞ্চল আলোকবর্তিকাকে স্থিত করবে এই আকাঙ্ক্ষাটুকু জেগে থাকে সর্বদাই। আর এর মাঝেই জেগে থাকে লক্ষ্মী-অলক্ষ্মীর চিরাচরিত দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গ, সৌন্দর্যের কথা। বিশ্রী অসুন্দর। বাহ্যতঃ যা কিছু অসুন্দর, কিংবা যে অসুন্দর মানসিক স্তরে লুকিয়ে থাকে সকল-ই বিশ্রী। মরীচিকাকেও দূর থেকে সুন্দর লাগে, তবে তাকে পাওয়া যায় না মোটেই। সমাজের বুকেও এমন সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষা ও মূল্য সমধিক। তবে সে যে সোনার হরিণ হয়ে কেবল চোখে ধাঁধা লাগায় কেবল, তা বুঝতে একটা মহাকাব্য পার হয়ে যায়।

অলক্ষ্মী, অসুন্দর, বিশ্রীর সঙ্গেও সমাজমানসের বোঝাপড়া এমন জটিল, ভাল মন্দ যাহাই আসুক তাকে সহজ সত্য বলে গ্রহণ করার মতো প্রস্তুতি থাকে না তার। সে শ্রীর সন্ধান করতে থাকে, হতকুচ্ছিত্ কাজকর্ম বলে যখন তখন দাগিয়ে দেয়ে যেটা তার ভাল লাগে না তাকেই, ছিরিছাঁদ খুঁজতে খুঁজতে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়, কিন্তু আত্মা শুদ্ধ হয় না।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

চারপাশে শ্রীযুক্ত, শ্রীমান, শ্রীমতী, সর্বশ্রী, বিশ্বশ্রীদের ভিড়ে মনে হয়ে এই জগৎ বুঝি নন্দনকানন, এখানে বিশ্রীর কোনও জায়গা নেই। অথচ কেউ-ই কারো কাজেই “ছিরিছাঁদ” খুঁজে পাচ্ছে না। এই শ্রীছাঁদের ছন্দ বেঁধে দেন লক্ষ্মী, যিনি অলক্ষ্মী নন অথচ চঞ্চলা ওই সোনার হরিণের মতোই, যাঁকে স্থির অচঞ্চল করার সাধনাতে সেই কোন কাল থেকেই মানুষ স্থির করেছে “বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী”।

সংসারের কোণে কোণে কায়মনোবাক্যে সেই “শ্রী”কে যাপন করার সাধনা, পালন করার বাধ্যতা, অনর্থের ভয়ে। অথচ, যাপন আর পালনের মাঝে থাকা ব্যবধানটুকুর খোঁজ রাখে না কেউ। ভালমন্দের সঙ্গে জুড়ে থাকা সত্যটুকু মেনে নিতে পারি কজন? তাই তর্কগুলো দীর্ঘ হয়, তাদের মীমাংসা থাকে না। তাই লক্ষ্মী-অলক্ষ্মী, শুভ-অশুভ, ভাল-মন্দ, আলো-অন্ধকার মিলে মিশে যায় কেবলই। কখনো এর পাল্লা ভারি তো, কখনো ওর। শেয়ার মার্কেটের দরের মতো নামে ওঠে, থামে না। এর মাঝেই লক্ষ্মী, অলক্ষ্মী, সাদা, কালোর সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে লজ্জা, শোভন, বন্ধন, শৃঙ্খল কিংবা শৃঙ্খলার নানা তত্ত্ব। শ্রী কিংবা শৃঙ্খলা, বিশ্রী কিংবা বিশৃঙ্খলা কোথাও কোথাও মিলেমিশে যায়, কোথাও সাবধান ব্যবধান রেখে চলে নিঃশব্দে। এইভাবে শ্রী তার মণ্ডিত সৌষ্ঠব, আকাঙ্ক্ষিত, যুগলালিত সৌন্দর্যবন্ধন নিয়ে, তাকে আশ্রয় করে থাকেন বিশ্রী বিশৃঙ্খলার পাশেই। লক্ষ লক্ষ ছিরিছাঁদহীন বিশৃঙ্খলার মধ্যেই নীরব পদপাতে লক্ষ্মীশ্রী জাগেন লক্ষ্যে, নিভৃত অলক্ষ্যে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১৩ : ত্রিপুরায় আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ/১

নারীর ওপরেই লক্ষ্মীরূপের দায়ভার ন্যস্ত হলেও “লক্ষ্মীছেলে” হয়ে উঠতে অসুবিধা হয় না। ভাষাতত্ত্ব এর গভীরে অন্য ব্যঞ্জনার অভিঘাত সন্ধান করে হয়তো বা। সুকুমার রায় জানিয়েছেন যে, জগতের যাবতীয় ধুলো ময়লা ইত্যাদি আবর্জনায় ছেলেদের নির্মাণ, মেয়েরা তার বিপরীতে নানা ভালো ভালো দ্রব্যে, বিশেষতঃ দুগ্ধজাত ক্ষীর, ননী, ছানা ইত্যাদিতে গড়া। শ্রীমণ্ডিত হওয়ার এর চেয়ে অনায়াস ব্যাখ্যা বোধহয় পাওয়া একটু কঠিন। তবে শেষ পর্যন্ত হাতে পেনসিল থেকে যাওয়ার বিপদ থাকেই, যেখানে আমিও ভাল, তুমিও ভাল, সস্তা কিংবা দামিও ভাল। আর সব থেকে কী ভাল তা পাঠক জানেন, নচেৎ সুকুমার তো আছেন-ই। শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদের পাশেই সোনার হরিণের চকিত মায়া। সোনার কথা বললে “ধনতেরাসের” কথা মনে আসতে পারেনি। কেউ কেউ একে “ত্রাস” বলেন, সে বলুন। তেরো পার্বণ আর তেত্রিশ দেবতার জগৎ কেবলই আনন্দময়। তবে একটা কথা, দিনটা কুবেরের পুজো নাকি ধন্বন্তরীর ত্রয়োদশী ইত্যাদি প্রভৃতি নিয়ে বিদগ্ধ আলোচনার শেষে রাস্তায় এখন সহস্র হাতে লক্ষ লক্ষ ঝাড়ু বাড়ি আসছে জগতের ধুলো ময়লা, বিশ্রী অন্ধকার, রোগশোক ঝেঁটিয়ে বিদায় করার জন্য। চতুর্দশী পার করে জগতে জাগবে গভীর তমিস্রার মোহমায়া, তাকে অতিক্রম করার শক্তি জেগে উঠুক প্রতি প্রাণে, আলোয় আলোয়।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content