
ছবি: প্রতীকী।
অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকের মাণিক্য রাজপরিবারের অনেক ঘটনা আমরা ‘ত্রিপুরা দেশের কথা’ সূত্রেই জানতে পারি। ত্রিপুরার তদানীন্তন সময়ের চিত্রটা যেন আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। দুই আহোম রাজদূতের ভ্রমণ বিবরণীতে রয়েছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। সিংহাসন নিয়ে রাজপরিবারে ষড়যন্ত্র, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করা, নৃশংস ভাবে রাজার হত্যাকাণ্ড সব কিছু নিখুঁত ভাবে স্থান পেয়েছে রাজদূতদ্বয়ের ঐতিহাসিক বিবরণে।
শুধু তাই নয়, সেদিনকার ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুরের বিবরণ, রাজবাড়ি, মন্দির, পুজো-পার্বণ, দোকানপাট, ঘরবাড়ি, পথঘাট সব কিছু উঠে এসেছে সেই বিবরণে। আহোম রাজদূতেরা ত্রিপুরার রাজদরবারের আভ্যন্তরীণ অবস্থা-সহ নানা গোপনীয় তথ্য সংগ্রহে যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন তা রীতিমত কৌতুহলোদ্দীপক। ত্রিপুরার নানা তথ্য সংগ্রহে আহোম রাজদূতদ্বয় ত্রিপুরায় দু’জন গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। ত্রিপুরার রাজবাড়ির বর্ণনায় আহোম দূতদ্বয় আসামের রংপুরের রাজবাড়ির তুলনা টেনেছেন বারবার। তারা লিখেছেন, “…রাজার বাড়ির চারিদিকে ইটের গড়, ৬ হাত উঁচু হবে, পরিধি স্বর্গদেবের রংপুরের ভেতরের গড়ের সমান হবে। এই দুর্গের সামনে ইটের গড়ের সঙ্গে লাগিয়ে মাটির গড় তৈরি করেছে, উঁচু একই রকম। অনুমান, আমাদের দারিকিয়াল দুয়ার থেকে বড়ো বৈঠকখানার মাথা পর্যন্ত রাস্তার অর্ধেকটা হবে। এই এক দুর্গ। এর দরজা দক্ষিণ মুখে।…”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৮১: শিশুপালের মৃত্যু, এক সাধারণের নির্মম পরিণতি

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৯: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৭০ : কালনাগিনী

বিশেষ নিবন্ধ : মুকুন্দ দাস: স্বদেশ জাগরণের চারণকবি
ত্রিপুরার রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে দুর্গা মন্দির, দোলযাত্রার মন্দির, বিষ্ণু ও শিবের মন্দিরের কথা লিখেছেন তারা। উল্লেখ করেছেন পুজো ও রাজার নির্মাল্য গ্রহণের কথা। আহোম দূতদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, সেদিন উদয়পুর রাজবাড়ির চারদিকে ইটের তৈরি দুর্গ ছিল। দুর্গের পরিধির বর্ণনা দিতে গিয়েও তারা অসমের তদানীন্তন রাজধানী রংপুরের তুলনা টেনেছেন। ত্রিপুরার রাজার দুর্গ, রাজবাড়ি, সিংহাসন ঘর, রাজার সোনারূপার ভাণ্ডার ইত্যাদির পাশাপাশি সেদিনকার রাজধানীর হাট-বাজার এবং গোমতী নদীর বর্ণনাও দিয়েছেন দূতদ্বয়। তাঁরা আসামের তৎকালীন রাজধানী রংপুরের রাজপাটের ঘরবাড়ির সঙ্গে উদয়পুরের তুলনা টেনেছেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯১: কেন পান্থ, চঞ্চলতা!

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত
তাঁরা লিখেছেন, “সিংহাসনের ঘর থেকে লম্বায় ইটের গড় আছে, এটি পেছনের গড়ের সঙ্গে লাগানো। এই গড়ের ভেতরে রাজার থাকার ইটের, ছন বাঁশের ঘর আছে। ভেতরের দুর্গের প্রাচীরের কাছে তাল নারকেলের গাছ আছে।…” ত্রিপুরায় অতীতে যোগাযোগ-সহ পণ্য পরিবহণে গোমতী নদীর এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বহির্শত্রুরা যেমন জলপথে ত্রিপুরা আক্রমণে গোমতী নদীকে ব্যবহার করেছে, তেমনই সওদাগররাও তাদের পণ্য সামগ্রী নিয়ে গোমতী নদী পথে উদয়পুরে আসতেন।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট
গোমতী নদীর কথা উল্লেখ করে দূতদ্বয় লিখেছেন, “এই রাস্তার মাথায় গোমতী নদী ঘুরে গেছে। নদীর ওপারে জঙ্গল-পাহাড়, সেখানে ত্রিপুরা লোকদের বসবাস। এ ছাড়া মগদেশ জয় করে যাদের এনেছিল তাদেরও বসিয়েছে। ওরা ধান, কার্পাস ইত্যাদির চাষ করে।….পাহাড়ের পাশ থেকে দুর্গের কিনারা পর্যন্ত ত্রিপুরাদের বাড়ি, সম্ভ্রান্ত বিশিষ্ট লোকেরও ঘরবাড়ি রয়েছে। তাদের বাগানেও তাল, নারকেল গাছ আছে। দুর্গের পশ্চিমে কাছাকাছি আছে বড় ঠাকুরের বাড়ি। তার পশ্চিমে ত্রিপুরাদের ঘরবাড়ি। গোমতী নদীর ওপারে পূবে-পশ্চিমে এক রাজপথ। নদীর কাছে এই রাস্তায় এক বাজার আছে। সেখানে তামা, পিতল, কার্পাস, কাপড়, তেল, নুন, ঘি এবং অন্য জিনিসও পাওয়া যায়।…”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১৩ : ত্রিপুরায় আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ/১
১৭১২ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে ত্রিপুরার রাজা ২য় রত্ন মাণিক্য আহোম দূতদ্বয়কে রাজদরবারের মধ্যে বরণ করেছিলেন। এটি ছিল দূতদের দ্বিতীয়বারের ত্রিপুরা সফর। আহোম দূতদের সফর বিবরণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্ভবত ত্রিপুরার প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং সিংহাসন থেকে রাজাকে উৎখাতের অধ্যায়। রাজার বৈমাত্রেয় ভাই ঘনশ্যাম বড়ঠাকুর ২য় রত্ন মাণিক্যকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করে মহেন্দ্র মাণিক্য নাম ধারণ পূর্বক ১৭১২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সিংহাসনে বসেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র-সহ সিংহাসনে রাজা বদলের সময়কালে আহোম দূতদ্বয় ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুরে অবস্থান করছিলেন। এমনকি রাজাকে যে সিংহাসন থেকে টেনে নামানো হয়েছিল সেই ঘটনাও তাদের চোখের সামনেই ঘটেছিল। তারা লিখেছেন, “…এমন সময় ঘনশ্যামের প্রেরিত এবং বাঙ্গালা দেশ হইতে নব নিযুক্ত পীতাম্বর হাজারি অনুমান কুড়িজন হিন্দুস্হানী সঙ্গে লইয়া সিংহাসন ঘরে উঠিয়া রাজাকে বলিল, ‘তুমি সিংহাসন হইতে নামিয়া আস। ঘনশ্যাম ঠাকুর রাজা হইয়াছে।’…তখন পীতাম্বর হাজারি রাজার হাত ধরিয়া তাহাকে সিংহাসন হইতে নামাইয়া আনিল।…”—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















