কলকাতায় বৃষ্টি

কালনাগিনী।

“লোহার ঘর দেখ্যে কালি (কালনাগ বা কালনাগিনী) ভাবিতে লাগিল।
কেমনে যাইব আমি পথ না রাখিল।।
তাল প্রমাণ ছিল নাগ শলিতা হইল।
পবন মারিয়ে নাগ বাসরে সামাল্য।।

***

শিঅর ছাড়িয়ে নাগ পা-তলে দান্ডাল্য।
নিন্দের আলিসে বাণ্যা দন্ডে লাথি মাল্য।।
চন্দ্র সূর্য্য বাপাহে তোমরা থাক সাক্ষী।
মিনিদোষে বাণ্যার ছা(ও)য়াল দন্ডে মাল্য লাথি।।
সাক্ষী ত রাখিয়ে নাগ কামড় জুড়িল।
সোনারবরণ লখা কালি যে হইল।।”


কালনাগ বা কালনাগিনী যাকে মনসামঙ্গলে ছোট করে ‘কালি’ বলা হয়েছে সে বেহুলা ও লক্ষীন্দরের বাসরঘরে সেঁধিয়ে গিয়ে লক্ষীন্দরের পায়ে দংশন করল। আর তার ফলে লক্ষীন্দরের সোনারঙের শরীর কালো হয়ে গেল। সপ্তদশ শতকে কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের লেখা (কানা হরিদত্ত, নারায়ন দেব, বিজয় গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই প্রমুখ লেখকগণ ক্ষেমানন্দের পূর্ববর্তী রচয়িতা) মনসামঙ্গলের এই অংশে লক্ষীন্দরকে কালনাগিনী সাপের দংশন সংক্রান্ত যা বর্ণনা করা হয়েছে তার সাথে অন্যান্য লেখকের লেখায় বিষয়বস্তুর কোনও পার্থক্য নেই। অর্থাৎ চাঁদ সদাগর, মনসাদেবী, বেহুলা ও লক্ষীন্দরকে নিয়ে বাংলার অসাধারণ এই মঙ্গলকাব্যে যদি হিরো (হিরোইন!) বলতে হয় কাউকে তবে সে হল কালনাগিনী সাপ।
মনসামঙ্গলের হিরো হলে কী হবে, সাপ নিয়ে যাঁরা একটু চর্চা করেন তাঁদের কাছে কালনাগিনী কিন্তু একটি ‘বিগ জিরো’! নামটা শুনলেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে সবার! মনে হয় যেন ভয়ংকর বিষাক্ত সাপ। অথচ বাস্তব হল এই সাপের বিষ নেই বললেই চলে। অতি ক্ষীণ বিষসম্পন্ন সাপ হল কালনাগিনী। এই সাপের কামড়ে ২০ গ্রাম ওজনের একটা টিকটিকিও মরে না। তার ওপর বেজায় ভীতু সাপ। কিন্তু মনসামঙ্গলের সৌজন্যে লোকমুখে সে হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর ও তীব্র বিষধর! এমন বিষধর যে কোনও গাছের ওপর তার বিষ যদি এক ফোঁটা পড়ে তো এই বিষের তেজে গাছ মুহূর্তে পুড়ে যায়! বাংলায় একটা প্রবাদ আছে গল্পের গোরু গাছে চড়ে! একটু পাল্টে নিয়ে যদি বলা যায়, মনসামঙ্গলের কালনাগিনীর বিষে গাছ পোড়ে, একটুও বেমানান হবে না। সুন্দরবনের পশ্চিমে এই সাপের নামেই রয়েছে কালনাগিনী নদী। মঙ্গলকাব্য অনুসারে চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যযাত্রাপথে এই নদীও ছিল। যদিও সেখানে কালনাগিনী নামের নদীর কথা পাই না। সুতরাং নদীর এই নামকরণ মনে হয় পরবর্তীকালে হয়েছে মনসামঙ্গলের প্রভাবে। বর্তমানে মৃতপ্রায় হলেও অতীতে এই নদী খুবই ভয়ংকর ছিল। মনে হয় এই কারণেই এই নামকরণ। অবশ্য কোনও মানুষের নাম কালনাগিনী হতে শুনিনি!
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৯১: কেন পান্থ, চঞ্চলতা!

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৯: হেলে

শারদীয়ার গল্প/১ : ষষ্ঠীর সন্ধ্যা

নানা জায়গায় কালনাগিনী সাপ নানা নামে পরিচিত যেমন কালনাগ, কালসাপ, কালিন্দী, উদয়কাল ইত্যাদি। নামে যতই ভয়াবহতা থাক না কেন রূপে ততই মনোমুগ্ধতা। মনে হয় এই কারণেই মনসামঙ্গলের কবিরা এই সাপকে তাঁদের কাব্যে হিরোর মর্যাদা দিয়েছিলেন। পূর্ণবয়স্ক কালনাগিনীর দৈর্ঘ্য হয় প্রায় এক মিটার। তবে স্ত্রী সাপ পুরুষদের চেয়ে সামান্য বড় হয়। বেশ রোগাটে চেহারার লিকলিকে সাপ হল কালনাগিনী। এদের দেহের রঙ হালকা সবুজ বা জলপাই রঙের। তার ওপর রয়েছে কালো ও হলুদের আড়াআড়ি ডোরা। পিঠ বরাবর রয়েছে সিঁদুরে লাল বা ইট রঙের এক সারি ছোপ। দুটি লাল ছোপের মাঝে সাধারণত দুটি কালো ছোপ দেখা যায়। কালো ছোপগুলো অনেক সময় তাসের ‘ক্লাবস’-এর মতো দেখতে হয়। পিঠ বরাবর মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত লাল ছোপের সংখ্যা হয় প্রায় ৮০টি। এদের পেটের দিকের রঙ হালকা সবুজ। মাথা ছোট ও চামচের মতো চ্যাপ্টা। কালো রঙের মাথার ওপরে সাধারণত চারটি আড়াআড়ি সাদা দাগ থাকে, নাসারন্ধ্র থেকে চোখের মধ্যে একটি এবং চোখ থেকে ঘাড়ের মধ্যে তিনটি। দুটো চোখ কালো রঙের পুঁতির দানার মতো। লেজটা সরু ও লম্বা, দেহের প্রায় এক চতুর্থাংশ। পেটের দিকের আঁশ একটি সারিতে বিন্যস্ত এবং আঁশগুলি চওড়া। পেটের ওপর দিয়ে সামনে থেকে পেছনে হাত বোলালে মনে হবে আঁশগুলি মসৃণ কিন্তু উল্টোদিকে হাত বোলালে মনে হবে কাঁটাযুক্ত। এই ধরনের আঁশের জন্য এরা গাছের গায়ে এবং খাড়া দেওয়ালে ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে। কালনাগিনী সাপের বয়স বাড়লে দেহের কালচেভাব কমে আসে এবং সবুজভাবের প্রকাশ বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৭: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

শারদীয়া স্পেশাল, রাজীব হত্যা : অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন অনিন্দ্য ভুক্ত

সুন্দরবন অঞ্চলে কালনাগিনী সাপ অধিকাংশই রয়েছে জঙ্গল এলাকায়। এরা মানুষের উপস্থিতি এবং জনবসতি পছন্দ করে না। আর তাই সুন্দরবনের জনবসতি এলাকায় এই সাপ খুব বেশি দেখা যায় না। সুন্দরবন অঞ্চলে এমনও অনেক এলাকা আছে যেখানে কখনোই কালনাগিনী সাপ দেখা যায়নি। এরা জঙ্গল থেকে কাটা কাঠের সাথে অনেক সময় নৌকো করে বসতি এলাকায় চলে এসেছে এবং তারপর সেখানে বংশবিস্তার করেছে। জনবসতি এলাকায় এদের জলাশয়ের ধারে, ঝোপে-ঝাড়ে ও বড় বড় গাছে থাকতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে পাতাবহুল বৃক্ষ জাতীয় গাছ এদের পছন্দ। মাটিতে কখনো কখনো নেমে এলেও এরা মূলত বৃক্ষবাসী সাপ। একটি গাছে একাধিক কালনাগিনী বসবাস করতে পারে। এই কারণে কালনাগিনীকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Golden Tree Snake’। এদের ইংরেজিতে আরও একটা নাম রয়েছে, ‘Flying Snake’। বাংলায় বলা যেতে পারে উড়ুক্কু সাপ। না, এরা কিন্তু প্রকৃত ওড়ে না। গাছের ওপর থেকে নিচের ডালে বা মাটিতে লাফ দিয়ে নামার সময় সোজাসুজি নিচে পড়ে না। এরা দেহটাকে কিছুটা দু’পাশে প্রসারিত করে ফুলিয়ে নেয় আর তার ফলে ধপাস করে নিচে না পড়ে কিছুটা ধীরগতিতে তীর্যকভাবে গ্লাইডিং করে নেমে আসে। এই কারণেই একে ‘flying snake’ বলা হয়েছে। এরা কিন্তু এইভাবে কেবল নিচে নামতে পারে, নিচে থেকে ওপরে যেতে পারে না। বাংলাতে কেউ কেউ এদের বলে রামধনু সাপ। বোঝাই যায় রঙের বৈচিত্র্য ও বাহারের জন্য এমন নাম। কোথাও আবার এদের নাম উদয়কাল। এরা দিবাচর সাপ। খাবারের সন্ধানে সূর্যোদয়ের সময় বেরিয়ে আসে। তাছাড়া পিঠের ওপর সিঁদুরে রঙের যে ফোঁটা দেখা যায় তা উদীয়মান সূর্যের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত। হয়তো সেই কারণেই নাম হয়েছে উদয়কাল। এদের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Chrysopelea ornata’।
আরও পড়ুন:

দশমী

শারদীয়ার গল্প/২ : কনটেন্ট

কালনাগিনী সাপের প্রধান খাদ্য হল টিকটিকি, গিরগিটি, ছোট ব্যাঙ, ছোট ইঁদুর, পোকামাকড়, পাখির বাচ্চা ইত্যাদি। কখনও কখনও সাপের বাচ্চা ধরে খেতেও দেখা গিয়েছে। গ্রীষ্মকালে সকালের দিকে পুকুরপাড়ে কিংবা ঘন পানাভরা পুকুরে পানার ওপরে ঘুরে বেড়িয়ে শিকারের খোঁজে এদের দেখা যায়। এরা সাধারণত শিকারকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে পিষে দেয় এবং তারপর তাকে আধমরা করে গিলে নেয়। সাধারণত ভোর থেকে বেলা ১১ টা পর্যন্ত এদের খাবারের সন্ধানে ঘুরতে দেখা যায়। রাতে এরা গাছের কোটরে কিংবা গাছের ডালে ঘন পাতার আড়ালে বিশ্রাম নেয়। শিকার ধরার সময় এরা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং অব্যর্থ নিশানায় লাফ দিতে পারে। দেখা গিয়েছে এক লাফে এরা ৩-৪ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। যেহেতু গাছে গাছে ঘোরে তাই প্রবল গরমে এরা বেশ স্বচ্ছন্দেই থাকে পাতার আড়ালে। আর আগেই বলেছি যে, এদের পেটের দিকের আঁশের বিশেষ গঠনের জন্য খুব সহজেই গাছের ডাল আঁকড়ে ধরতে পারে। কখনোই পিছলে পড়ে যায় না।

কালনাগিনী সাপের প্রজনন ঋতু হল মে-জুন মাস। স্ত্রী ও পুরুষ কালনাগিনীর যৌন মিলনের প্রায় দুমাস পর স্ত্রী কালানাগিনী একসঙ্গে ৬-১২ টি ডিম পাড়ে। সাদা রঙের, নরম ও লম্বাটে ধরনের ডিম। ডিমের দৈর্ঘ্য ২-৭ সেন্টিমিটার। বড় গাছের কোটরে বা ফাঁপা অংশে এরা ডিম পাড়ে। সাধারণত ৭০ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। বাচ্চাদের দৈর্ঘ্য হয় ৪.৫-৬ ইঞ্চি। আর বাচ্চাদের রঙ হয় কালো। এই কারণেও কালনাগিনী নাম হতে পারে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১৩ : ত্রিপুরায় আহোম রাজদূতের গুপ্তচর নিয়োগ/১

আগেই বলেছি কালনাগিনী হল অতি ক্ষীণ বিষসম্পন্ন সাপ। মানুষের উপর এই বিষ কোনও প্রভাব ফেলতে পারে না। তাছাড়া এরা পশ্চাৎ বিষদন্তী হওয়ায় কামড়ানোর সময় ওই সামান্য পরিমাণ বিষও ঢালা সম্ভব নয়। ফলে এরা যখন কামড়ায় তখন কামড়ানোর জায়গায় নির্বিষ সাপের দংশনের মতো অনেকগুলি দাঁতের দাগ থাকে। অনেকটা আঁচড়ানোর মতো। আর সেই দাগগুলিকে জুড়লে একটা অর্ধবৃত্তাকার দাগ হয়। ক্ষতস্থানে সামান্য রক্তপাত ও জ্বালা অনুভূতি ছাড়া আর কিছু হয় না। জীবাণুনাশক দিয়ে ক্ষতস্থানটি ভালো করে ধুয়ে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তপাত বন্ধ হয় ও জ্বালা অনুভূতি থাকে না। এমনিতে চিকিৎসকের কাছে না গেলেও চলে, তবে যেহেতু অধিকাংশ মানুষ সাপের ভয়ে ভীত তাই দংশনের পর চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াই ভালো। তবে এই সাপ অত্যন্ত ভীতু হওয়ায় এবং মনুষ্য বসতিতে কম দেখা যাওয়ায় সচরাচর মানুষকে দংশন করার ঘটনা তেমন ঘটে না। তবে ভীত মানুষ ওঝা বা গুণিনের কাছে গেলে তারা মানুষকে এমন ভয় দেখায় যে সাধারণ মানুষ ভেবে নেয় এই সাপের দংশনে মৃত্যু অনিবার্য! তারপর বিষ নামানোর নামে চলে কেরামতি! আসলে কালনাগিনীর অতি ক্ষীণ বিষের তুলনায় ওঝা-গুণিনের ‘বিষ’ অনেক বেশি।

যেহেতু কালনাগিনী সাপ নিয়ে মনসামঙ্গলের কারণে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ভীতি ও ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে তাই মানুষ এদের দেখতে পেলেই মেরে ফেলে। তাই সুন্দরবনের জনবসতি এলাকায় এই সাপের সংখ্যা খুব কম। প্রকৃতির এই রূপসী ও অ-ক্ষতিকর সাপকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে আমাদের সাপ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে হবে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content