
আজ বিদ্যাসাগরের জন্মদিন। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র। এই পৃথিবী খ্যাতকীর্তি মানুষকে কিংবদন্তিতে বেঁধে তাঁকে অপার মহিমার স্বর্গে স্থাপন করে। বিদ্যাসাগর এই পথেই ‘ঈশ্বর’, রবীন্দ্রনাথ ‘ঠাকুর’ হয়ে ওঠেন। এই জগতে অনেকেই বড় হতে চায়, প্রতিষ্ঠা করতে চায় নিজের মাহাত্ম্য, অনেকে বড় হনও। কিন্তু কবি জীবনানন্দ দাশ যেমনটি বলেছিলেন, তেমন করেই বলা যেতে পারে এই যে, সকলেই ‘বিদ্যাসাগর’ হন না, কেউ হন।
বিদ্যাসাগর উপাধি ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একাই কেবল পাননি। সংস্কৃত কলেজের বিশেষ এই উপাধিতে ভূষিত বহু বিদ্যাসাগর আছেন। ইতিহাসে তাঁরাও আছেন তাঁদের সারস্বত সাধনার তাত্পর্য নিয়ে। তবুও, বিদ্যাসাগর বিপুল ও অভ্রভেদী হয়েছেন। কারণ, সকলেই যেমন কবি নন, কেউ কেউ কবি, তেমন-ই সকলেই যে ঈশ্বরচন্দ্র হতে পারেন না।
জন্মের অনেক অনেক বছর পরেও কোনও কবির বাণী, কোনো মনস্বী কর্মীর বহুবিস্তৃত অভাবনীয় কর্মকাণ্ড কেন প্রাসঙ্গিক মনে হয়, তার উত্তর একমাত্র ‘সময়’ নামের সেই দুর্জ্ঞেয় অথচ নিত্যদিনের সহচর একমাত্র সত্যের কাছে আছে। এঁরাই মনীষী হন। যাঁরা মনীষী হন, তাঁদের চলার পথে নানা কাঁটা থাকে। অপমানের কাঁটা, বাধার পাহাড়, তীব্র বিদ্বেষের বিষ কিংবা স্বার্থ-রিপুর বিকট উদ্গার। এদের সামনে মনুষ্যত্ব-ও সঙ্কোচে নত হয়, কিন্তু এঁরা হন না। এঁরা সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল ফোটান পাথরের বুকে। এঁরা জানেন, সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান।
বিদ্যাসাগর উপাধি ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একাই কেবল পাননি। সংস্কৃত কলেজের বিশেষ এই উপাধিতে ভূষিত বহু বিদ্যাসাগর আছেন। ইতিহাসে তাঁরাও আছেন তাঁদের সারস্বত সাধনার তাত্পর্য নিয়ে। তবুও, বিদ্যাসাগর বিপুল ও অভ্রভেদী হয়েছেন। কারণ, সকলেই যেমন কবি নন, কেউ কেউ কবি, তেমন-ই সকলেই যে ঈশ্বরচন্দ্র হতে পারেন না।
জন্মের অনেক অনেক বছর পরেও কোনও কবির বাণী, কোনো মনস্বী কর্মীর বহুবিস্তৃত অভাবনীয় কর্মকাণ্ড কেন প্রাসঙ্গিক মনে হয়, তার উত্তর একমাত্র ‘সময়’ নামের সেই দুর্জ্ঞেয় অথচ নিত্যদিনের সহচর একমাত্র সত্যের কাছে আছে। এঁরাই মনীষী হন। যাঁরা মনীষী হন, তাঁদের চলার পথে নানা কাঁটা থাকে। অপমানের কাঁটা, বাধার পাহাড়, তীব্র বিদ্বেষের বিষ কিংবা স্বার্থ-রিপুর বিকট উদ্গার। এদের সামনে মনুষ্যত্ব-ও সঙ্কোচে নত হয়, কিন্তু এঁরা হন না। এঁরা সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল ফোটান পাথরের বুকে। এঁরা জানেন, সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান।
বিদ্যাসাগর তাই নির্ভয় হতে পেরেছিলেন। তাঁর স্বাভিমানবোধ প্রবল ছিল, অভিমান-ও ছিল এই বিচিত্র পৃথিবী ও সংসারের জন্য। কিন্তু মনুষ্যত্বের অটুট আদর্শের প্রতি তিনি বোধহয় কখনোই বিদ্বেষপোষণ করেননি। দোষে-গুণে ঠিক-ভুলে গড়া মানুষ হয়েও সামাজিক ন্যায়স্থাপনার জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে চলার এই শক্তি কোথা থেকে আসে তার উত্তর একমাত্র জীবনের কাছেই আছে বোধহয়।
সাগরে যে অগ্নি থাকে সেই কল্পনাকে তিনি মূর্ত করেছিলেন। বিদ্যা, দয়া, জেদ, করুণা ইত্যাদি নানা গুণ তাঁকে আশ্রয় করেছিল। শোনা যায়, তাঁকে যা বলা হতো তার উল্টোটা নাকি তিনি করতেন! তাঁর অপরিসীম এই জেদ তাঁকে জীবনের নানা পর্যায়ে নেপথ্য থেকে প্রেরণা দিয়েছিল। শিশুশিক্ষা, নারীশিক্ষা, নানা পাঠ্যপুস্তক রচনা, বাংলাভাষাকে একটি নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেওয়া, বাল্যবিবাহ রোধ, বিধবাবিবাহের বিল পাশ করানো, অসংখ্য বিধবাবিবাহের আয়োজন, বহু নিরন্ন কিংবা অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকা, এবং এসব করতে গিয়ে ঠকে যাওয়া — নানাভাবে তাঁকে সমাজ দেখবে। তিনি গোপাল বালককে সুবোধ বলেন, রাখালকে বলেন দুষ্ট, তাঁর গল্পে এমন রাখালরাই বুঝি অপ্রতিরোধ্য ভুবন হয়ে ওঠে। শেষে প্রায়শ্চিত্ত হয় কীনা জানা নেই, আর, সেই অপ্রতিহত অখণ্ড ‘সময়’ বয়ে যেতে যেতে দেখিয়ে যেতে থাকে ভুবনের মাসিদের কাটা কানের গভীর ক্ষতটুকু। ঈশ্বরচন্দ্র যে আদর্শে সমাজকে দেখেছেন, দেখতে চেয়েছেন বা গড়তে চেয়েছেন সেখানে বিতর্ক থাকতে পারে, নাও পারে হয়তো, কিন্তু তিনি জেগে থাকেন।
সাগরে যে অগ্নি থাকে সেই কল্পনাকে তিনি মূর্ত করেছিলেন। বিদ্যা, দয়া, জেদ, করুণা ইত্যাদি নানা গুণ তাঁকে আশ্রয় করেছিল। শোনা যায়, তাঁকে যা বলা হতো তার উল্টোটা নাকি তিনি করতেন! তাঁর অপরিসীম এই জেদ তাঁকে জীবনের নানা পর্যায়ে নেপথ্য থেকে প্রেরণা দিয়েছিল। শিশুশিক্ষা, নারীশিক্ষা, নানা পাঠ্যপুস্তক রচনা, বাংলাভাষাকে একটি নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেওয়া, বাল্যবিবাহ রোধ, বিধবাবিবাহের বিল পাশ করানো, অসংখ্য বিধবাবিবাহের আয়োজন, বহু নিরন্ন কিংবা অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকা, এবং এসব করতে গিয়ে ঠকে যাওয়া — নানাভাবে তাঁকে সমাজ দেখবে। তিনি গোপাল বালককে সুবোধ বলেন, রাখালকে বলেন দুষ্ট, তাঁর গল্পে এমন রাখালরাই বুঝি অপ্রতিরোধ্য ভুবন হয়ে ওঠে। শেষে প্রায়শ্চিত্ত হয় কীনা জানা নেই, আর, সেই অপ্রতিহত অখণ্ড ‘সময়’ বয়ে যেতে যেতে দেখিয়ে যেতে থাকে ভুবনের মাসিদের কাটা কানের গভীর ক্ষতটুকু। ঈশ্বরচন্দ্র যে আদর্শে সমাজকে দেখেছেন, দেখতে চেয়েছেন বা গড়তে চেয়েছেন সেখানে বিতর্ক থাকতে পারে, নাও পারে হয়তো, কিন্তু তিনি জেগে থাকেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৫: আইসিইউ কেবিন নং ২০৪

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৩: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

বিনায়ক : বিশ্বকর্মা
তিনি জেগে থাকেন অননুকরণীয় মনুষ্যত্বে। যে মনুষ্যত্বের আলো ধুতি-চাদর-খড়মে সুতীব্র, অনাবিল, মহিমাময়। তার ওজস্বী তেজের প্রকাশে সম্পদ, মহার্ঘ্য বস্ত্র, পদমর্যাদা, কৌলীন্য সকল-ই নিতান্ত তুচ্ছ। আর তুচ্ছ বলেই, ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যাসাগর হয়ে, “অবিশ্বাসীদের প্রত্যয়” হয়ে বেঁচে থাকেন।
তাঁর দৃঢ় সিংহহৃদয়ের মধ্যেও বিপুল করুণা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ কিংবা পুঞ্জীভূত বেদনা তাঁকে আবেগমথিত করলেও আবেগসর্বস্ব করেনি। কারণ, বিদ্যাসাগর উপযোগিতাবাদে (Pragmatism) বিশ্বাসী ছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তাঁর যাবতীয় কর্মকান্ডকে ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর হাত ধরে সমকালীন বাঙালির জীবনে সংস্কৃত ভাষার অধ্যয়ন যুগোপযোগী হয়েছে, আত্মপ্রকাশ করেছে বর্ণপরিচয়, ব্যাকরণকৌমুদী ইত্যাদির মতো অপরিহার্য গ্রন্থ কিংবা বাংলা বর্ণমালা। শিশুর বিকাশে মাতৃভাষায় পঠনপাঠন কিংবা ইংরাজি ভাষাশিক্ষা কিংবা ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন — এদের সংঘাতহীন পথচলাই যে বিদ্যাশিক্ষার যথার্থ প্রয়োগ, তা উপযোগিতাবাদী বিদ্যাসাগর প্রমাণ করেছেন।
তাঁর দৃঢ় সিংহহৃদয়ের মধ্যেও বিপুল করুণা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ কিংবা পুঞ্জীভূত বেদনা তাঁকে আবেগমথিত করলেও আবেগসর্বস্ব করেনি। কারণ, বিদ্যাসাগর উপযোগিতাবাদে (Pragmatism) বিশ্বাসী ছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তাঁর যাবতীয় কর্মকান্ডকে ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর হাত ধরে সমকালীন বাঙালির জীবনে সংস্কৃত ভাষার অধ্যয়ন যুগোপযোগী হয়েছে, আত্মপ্রকাশ করেছে বর্ণপরিচয়, ব্যাকরণকৌমুদী ইত্যাদির মতো অপরিহার্য গ্রন্থ কিংবা বাংলা বর্ণমালা। শিশুর বিকাশে মাতৃভাষায় পঠনপাঠন কিংবা ইংরাজি ভাষাশিক্ষা কিংবা ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন — এদের সংঘাতহীন পথচলাই যে বিদ্যাশিক্ষার যথার্থ প্রয়োগ, তা উপযোগিতাবাদী বিদ্যাসাগর প্রমাণ করেছেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৭: শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমার যোগ্য, কেন? এর কোন তাৎপর্য আছে কি?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
এই যেমন বাংলা বর্ণমালার কথাই ধরা যাক। অকার থেকে ঔকার পর্যন্ত গিয়ে তা যখন ব্যঞ্জনবর্ণে প্রবেশ করছে তখন যেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে গেল। সংস্কৃতভাষা তথা পাণিনীয় ব্যাকরণের ভিত্তিমূলে আছে চোদ্দটি শিবসূত্র বা মাহেশ্বরসূত্র। এগুলিকে সরলার্থে বর্ণমালা বলা যায়। তার মাঝেও আছে ভাষাবিজ্ঞানের নিয়ম ও বিস্ময় এবং বিশিষ্ট এক বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা বা মেকানিজ়ম, যেখানে অনুবন্ধ, প্রত্যাহার ইত্যাদির মতো ব্যবস্থাপনা বর্ণব্যাবস্থাপন বা বর্ণক্রমের বীজন্যাসকে মহীরূহ করেছে কালে কালে। কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ।
প্রথম চারটি সূত্র পার হয়ে ব্যঞ্জনবর্ণে প্রবেশ করে দেখা যাবে, তা শুরু হচ্ছে “হ”বর্ণ দিয়ে। ক্রমে আসবে য, ব, র ইত্যাদি। পরে সুকুমার রায় যাকে অবিস্মরণীয় করে দেবেন ‘হ য ব র ল’ লিখে। বর্তমান বাংলা বর্ণমালায় একদম শেষের দিকে স্থান পেয়েছে হ-বর্ণ। এছাড়াও বর্তমানের সাপেক্ষে শিবসূত্রে পঞ্চম, চতুর্থ, তৃতীয়, দ্বিতীয়, প্রথম এই ক্রমে বর্গীয় বর্ণগুলির বিন্যাস। বর্তমান বর্ণমালায় এই ক্রম ঠিক তার বিপরীত এবং বর্গে বর্গে বিন্যস্ত। প্রতি বর্গেই প্রতি স্থানের একটি করে করে পাঁচটি বর্ণের ব্যবস্থা। এছাড়াও ড়, ঢ়, য়, খণ্ড ত (ত্), অনুস্বার, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু ইত্যাদির বিন্যাস বাংলা বর্ণমালায় আছে। বাংলা ভাষার গড়ে ওঠার লগ্নে এই বিশিষ্ট ব্যবস্থার নেপথ্যে আছে সেই উপযোগিতাবাদ, আছে বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণচর্চার অভিজ্ঞতার প্রয়োগ। শিবসূত্র এবং বাংলা বর্ণমালা — উভয় ক্ষেত্রেই বর্ণক্রমের ভাষাতাত্ত্বিক কারণ, আদর্শ ও প্রায়োগিক তাত্পর্য আছে। তবে অনমনীয় এক জেদকে আঁকড়ে ধরে যে বিদ্যাসাগর প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে যেতে কখনোই কুণ্ঠিত হননি, বর্ণমালাকে এই নতুন আঙ্গিকে সাজানোর মধ্যেও বুঝি তিনিই থেকে গেছেন স্বমহিমায়। রবীন্দ্রনাথ শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিলেন—”পিতা তাঁহার স্বভাব বুঝিয়া চলিতেন। যে দিন সাদা বস্ত্র না থাকিত, সে দিন বলিতেন, আজ ভাল কাপড় পরিয়া কলেজে যাইতে হইবে। তিনি হঠাৎ বলিতেন, না, আজ ময়লা কাপড় পরিয়া যাইব। যে দিন বলিতেন, আজ স্নান করিতে হইবে, শ্রবণমাত্র দাদা বলিতেন যে, আজ স্নান করিব না; পিতা প্রহার করিয়াও স্নান করাইতে পারিতেন না। সঙ্গে করিয়া টাঁকশালের ঘাটে নামাইয়া দিলেও দাঁড়াইয়া থাকিতেন। পিতা চড়চাপড় মারিয়া জোর করিয়া স্নান করাইতেন।’
প্রথম চারটি সূত্র পার হয়ে ব্যঞ্জনবর্ণে প্রবেশ করে দেখা যাবে, তা শুরু হচ্ছে “হ”বর্ণ দিয়ে। ক্রমে আসবে য, ব, র ইত্যাদি। পরে সুকুমার রায় যাকে অবিস্মরণীয় করে দেবেন ‘হ য ব র ল’ লিখে। বর্তমান বাংলা বর্ণমালায় একদম শেষের দিকে স্থান পেয়েছে হ-বর্ণ। এছাড়াও বর্তমানের সাপেক্ষে শিবসূত্রে পঞ্চম, চতুর্থ, তৃতীয়, দ্বিতীয়, প্রথম এই ক্রমে বর্গীয় বর্ণগুলির বিন্যাস। বর্তমান বর্ণমালায় এই ক্রম ঠিক তার বিপরীত এবং বর্গে বর্গে বিন্যস্ত। প্রতি বর্গেই প্রতি স্থানের একটি করে করে পাঁচটি বর্ণের ব্যবস্থা। এছাড়াও ড়, ঢ়, য়, খণ্ড ত (ত্), অনুস্বার, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু ইত্যাদির বিন্যাস বাংলা বর্ণমালায় আছে। বাংলা ভাষার গড়ে ওঠার লগ্নে এই বিশিষ্ট ব্যবস্থার নেপথ্যে আছে সেই উপযোগিতাবাদ, আছে বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণচর্চার অভিজ্ঞতার প্রয়োগ। শিবসূত্র এবং বাংলা বর্ণমালা — উভয় ক্ষেত্রেই বর্ণক্রমের ভাষাতাত্ত্বিক কারণ, আদর্শ ও প্রায়োগিক তাত্পর্য আছে। তবে অনমনীয় এক জেদকে আঁকড়ে ধরে যে বিদ্যাসাগর প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে যেতে কখনোই কুণ্ঠিত হননি, বর্ণমালাকে এই নতুন আঙ্গিকে সাজানোর মধ্যেও বুঝি তিনিই থেকে গেছেন স্বমহিমায়। রবীন্দ্রনাথ শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিলেন—”পিতা তাঁহার স্বভাব বুঝিয়া চলিতেন। যে দিন সাদা বস্ত্র না থাকিত, সে দিন বলিতেন, আজ ভাল কাপড় পরিয়া কলেজে যাইতে হইবে। তিনি হঠাৎ বলিতেন, না, আজ ময়লা কাপড় পরিয়া যাইব। যে দিন বলিতেন, আজ স্নান করিতে হইবে, শ্রবণমাত্র দাদা বলিতেন যে, আজ স্নান করিব না; পিতা প্রহার করিয়াও স্নান করাইতে পারিতেন না। সঙ্গে করিয়া টাঁকশালের ঘাটে নামাইয়া দিলেও দাঁড়াইয়া থাকিতেন। পিতা চড়চাপড় মারিয়া জোর করিয়া স্নান করাইতেন।’
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪
রবীন্দ্রনাথ “বিদ্যাসাগরচরিত” প্রবন্ধে এই বিদ্যাসাগরকে সন্ধান করেছেন। জানিয়েছেন —
“….যাঁহারা যথার্থ মনুষ্য তাঁহাদের শাস্ত্র তাঁহাদের অন্তরের মধ্যে, অথচ বিশ্বব্যাপী মনুষ্যত্বের সমস্ত নিত্যবিধানগুলির সঙ্গে সে শাস্ত্র আপনি মিলিয়া যায়। অতএব, অন্যান্য প্রতিভায় যেমন ‘ওরিজিন্যালিটি’ অর্থাৎ অনন্যতন্ত্রতা প্রকাশ পায়, মহচ্চরিত্রবিকাশেও সেইরূপ অনন্যতন্ত্রতার প্রয়োজন হয়। অনেকে বিদ্যাসাগরের অনন্যতন্ত্রপ্রতিভা ছিল না বলিয়া আভাস দিয়া থাকেন; তাঁহারা জানেন অনন্যতন্ত্রত্ব কেবল সাহিত্যে এবং শিল্পে, বিজ্ঞানে এবং দর্শনেই প্রকাশ পাইয়া থাকে। বিদ্যাসাগর এই অকৃতকীর্তি অকিঞ্চিৎকর বঙ্গসমাজের মধ্যে নিজের চরিত্রকে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে প্রস্ফুট করিয়া যে এক অসামান্য অনন্যতন্ত্রত্ব করিয়াছেন তাহা বাংলার ইতিহাসে অতিশয় বিরল। এত বিরল যে, এক শতাব্দীর মধ্যে কেবল আর দুই-এক জনের নাম মনে পড়ে এবং তাঁহাদের মধ্যে রামমোহন রায় সর্বশ্রেষ্ঠ।”
“….যাঁহারা যথার্থ মনুষ্য তাঁহাদের শাস্ত্র তাঁহাদের অন্তরের মধ্যে, অথচ বিশ্বব্যাপী মনুষ্যত্বের সমস্ত নিত্যবিধানগুলির সঙ্গে সে শাস্ত্র আপনি মিলিয়া যায়। অতএব, অন্যান্য প্রতিভায় যেমন ‘ওরিজিন্যালিটি’ অর্থাৎ অনন্যতন্ত্রতা প্রকাশ পায়, মহচ্চরিত্রবিকাশেও সেইরূপ অনন্যতন্ত্রতার প্রয়োজন হয়। অনেকে বিদ্যাসাগরের অনন্যতন্ত্রপ্রতিভা ছিল না বলিয়া আভাস দিয়া থাকেন; তাঁহারা জানেন অনন্যতন্ত্রত্ব কেবল সাহিত্যে এবং শিল্পে, বিজ্ঞানে এবং দর্শনেই প্রকাশ পাইয়া থাকে। বিদ্যাসাগর এই অকৃতকীর্তি অকিঞ্চিৎকর বঙ্গসমাজের মধ্যে নিজের চরিত্রকে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে প্রস্ফুট করিয়া যে এক অসামান্য অনন্যতন্ত্রত্ব করিয়াছেন তাহা বাংলার ইতিহাসে অতিশয় বিরল। এত বিরল যে, এক শতাব্দীর মধ্যে কেবল আর দুই-এক জনের নাম মনে পড়ে এবং তাঁহাদের মধ্যে রামমোহন রায় সর্বশ্রেষ্ঠ।”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি
এঁরা পৃথিবীতে নিত্য-নিয়মিত আসেন না। তাই এঁরা ক্ষণজন্মা। এঁরা কেন আসেন, কোন পরিস্থিতি একজন মানুষকে মনীষী করে, তার সন্ধান হয়তো চলবে। তবে একজন মানুষ পরিস্থিতির বা প্রতিবেশের অনুকূলে বা প্রতিকূলে চলে কীভাবে নির্মাণ করতে থাকেন মনুষ্যত্বের ভাষ্য কিংবা আখ্যান, তা জানার জন্য আমাদের প্রতিবার ফিরে যেতে হবে বিদ্যাসাগরের কাছে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















