কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। ছবি: সংগৃহীত।

জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠিরায়োজিত রাজসূয়যজ্ঞে প্রবীণতম কুরুপ্রধান ভীষ্মের নির্দেশে, কৃষ্ণকে অর্ঘ্য দান করা হল।চেদিরাজ শিশুপালের সেই পূজা অসহনীয় মনে হল। শিশুপালস্তু তাং পূজাং বাসুদেবে ন চক্ষমে। তাঁর তিরস্কারের লক্ষ্য হলেন ভীষ্ম ও যুধিষ্ঠির। অন্যান্য সম্মানীয় যোগ্য ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও নিতান্তই অপাত্র কৃষ্ণের কেন এত সমাদর? কেন এত শ্রদ্ধাপ্রদর্শন? প্রতিবাদে সভাত্যাগে উদ্যত চেদিরাজের কাছে ভীষ্মের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করলেন আয়োজক যুধিষ্ঠির। ভীষ্ম তাঁর কৃষ্ণপ্রীতির সমর্থনে গভীর তাত্ত্বিক যুক্তির অবতারণা করলেন। যুক্তি ও প্রতিযুক্তির চাপানউতর চলতেই থাকল। সহদেব কৃষ্ণপূজা সম্পন্ন করলেন। শিশুপাল ও তাঁর সমর্থক রাজারা ক্রোধে আত্মহারা হয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন যুধিষ্ঠিরাভিষেকঞ্চ বাসুদেবস্য চার্হণম্। ন স্যাদ্ যথা তথা কার্য্যমেবং সর্ব্বে তথাঽব্রুবন্।। যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেক ও বাসুদেব কৃষ্ণের পুজো যাতে ব্যর্থ হয় সেই কাজটাই করতে হবে। কুরুপ্রধান ভীষ্ম, শিশুপালের কৃষ্ণবিরোধিতার মূলে কৃষ্ণের কোন পরিকল্পনার ছায়া যেন দেখতে পেলেন।

চেদিরাজ শিশুপাল, এর প্রত্যুত্তরে কর্কশভাষায় বিষোদ্গার শুরু করলেন। তাঁর মতে কুরুকুলের কলঙ্ক ভীষ্ম, বৃদ্ধ হয়েও ভীতিপ্রদ অলীক কথা বলে সব রাজাদের ভয় দেখাচ্ছেন অথচ সেই কারণে তিনি একটুও লজ্জিত নন।ভীষ্ম তৃতীয় লিঙ্গের অর্থাৎ তিনি নপুংসক। তাই এমন ধর্মবিরুদ্ধ কথা বলেও তিনি কুরুশ্রেষ্ঠ হয়েছেন। শিশুপাল আরও ব্যাখ্যা করে বললেন, একটি নৌকার সঙ্গে বদ্ধ নৌকা (স্বয়ং চলচ্ছক্তিহীন) যেমন অন্ধের মতো চলন্ত নৌকায় অনুসরণ করে তেমনই কুরুবংশীয়রাও (যুধিষ্ঠির প্রভৃতি) ওইরকমই (ভীষ্মের অন্ধ অনুসরণ করে থাকেন)। ভীষ্ম তাঁদের মধ্যে অগ্রবর্তী (চালিকা নৌকার মতো)। শিশুপাল, আক্রমণাত্মকভাষায় বললেন, ভীষ্ম কৃষ্ণার্চনার পক্ষে বলেছিলেন, কর্ম্মাণ্যপি চ যান্যস্য জন্মপ্রভৃতি ধীমতঃ। বহুভিঃ কথ্যমানানি নরৈর্ভূয়ঃ শ্রুতানি মে।। লোকমুখে বুদ্ধিমান কৃষ্ণের বহু কীর্তিকাহিনি জন্মাবধি শুনে এসেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হল পূতনারাক্ষসীর বধবৃত্তান্ত। প্রসঙ্গক্রমে এই ঘটনার উল্লেখ করলেন শিশুপাল।
এই ঘটনার উল্লেখ করে, শিশুপাল ভীষ্মকে ভর্ৎসনা করে বললেন, গর্বিত ও মূর্খ কৃষ্ণের স্তুতি শুনতে ইচ্ছুক ভীষ্মের জিহ্বা কেন শতভাগে বিদীর্ণ হচ্ছে না? বয়োবৃদ্ধ ভীষ্মের সমালোচনায় ভীষ্মের গলায় ব্যঙ্গের সুর — অতিশিশুদের পর্যন্ত কৃষ্ণের কুৎসা করা সাজে, আর জ্ঞানবৃদ্ধ হয়ে ওই গোয়ালার স্তুতি করতে ইচ্ছা হয়েছে তোমার? যত্র কুৎসা প্রয়োক্তব্যা ভীষ্ম! বালতরৈর্নরৈঃ। তমিমং জ্ঞানবৃদ্ধঃ সন্ গোপং সংস্তোতুমিচ্ছসি।। কৃষ্ণকে হেয় প্রতিপন্ন করে শিশুপাল আরও বললেন, শৈশবে সে (কৃষ্ণ) পূতনাকে (একজন নারীমাত্র) বধ করেছিল বলে আশ্চর্যের কি আছে? সেই যুদ্ধনিপুণ নয় যে অশ্বাসুর ও বৃষাসুর,তাদেরকে বধ করাতেও বিস্ময়কর কিছু নেই। অচেতন কাঠের শকটটি পা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল কৃষ্ণ। সেখানেও কি এমন অদ্ভুত কাজ সে করেছে? কৃষ্ণের সমস্ত কৃতিত্ব নস্যাৎ করে শিশুপাল বললেন, উইয়ের ঢিপিমাত্র ওই গোবর্দ্ধন পাহাড়টাকে সপ্তাহখানেক ধরেছিল এই কৃষ্ণ, আমার মতে তাতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। বল্মীকমাত্রঃ সপ্তাহং যদ্যনেন ধৃতোঽচলঃ।তদা গোবর্দ্ধনো ভীষ্ম! ন তচ্চিত্রং মতো মম।। কৃষ্ণ, পাহাড়চূড়ায় খেলা করতে করতে প্রচুর অন্ন ভক্ষণ করেছিল, এটা শুনে অন্যরা বিস্মিত হয়েছেন বটে (শিশুপাল কিন্তু বিস্মিত নন)।

কৃষ্ণের বিরুদ্ধে চেদিরাজের আরও অনেক অভিযোগ আছে। ধর্মজ্ঞ ভীষ্ম জানেন, ওই কৃষ্ণ, যে বলবান কংসের অন্ন খেয়েছে, সেই কংসকেই সে হত্যা করেছে।এটাই মহা অদ্ভুত কাণ্ড। শিশুপাল যে সব তথ্য বলবেন, ভীষ্ম নিশ্চয়ই সজ্জনদের কাছে সেগুলি শোনেননি। যেমন, স্ত্রীলোক, গরু, ব্রাহ্মণ, অন্নদাতা এবং আশ্রয়দাতার প্রতি অস্ত্রাঘাত করা, উচিত নয় — সৎ ও ধার্মিকরা সর্বদা এমন উপদেশ দিয়ে থাকেন।অথচ ভীষ্ম এ সব কিছুই মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। শিশুপালের মতে, কুরুকুলের অধম সন্তান ভীষ্ম, কেশবের স্তাবকতা করেন এই ভেবে যেন শিশুপাল কৃষ্ণের স্বরূপ জানেন না। তাই ভীষ্ম তাকে (কৃষ্ণকে) জ্ঞানবৃদ্ধ এবং বয়োবৃদ্ধ আখ্যা দিয়েছেন। কৃষ্ণ গোহত্যা করেছে, সে নারীহন্তাও বটে। ভীষ্মের কথামতো তাঁর পূজা হল। হে ভীষ্ম, এমন মানুষ কি সংসর্গের যোগ্য হতে পারে? এবম্ভূতশ্চ যো ভীষ্ম! কথং সংস্রবমর্হতি। ওই কৃষ্ণ বুদ্ধিমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, সে জগতের প্রভু— ভীষ্মের এই সব সিদ্ধান্ত, কৃষ্ণ প্রমাণ করেছে। অথচ এই সব কিছুই নিশ্চিতভাবেই মিথ্যা।স্তুতিগায়করা বহু স্তুতি গান করলেও কেউ তাকে শাস্তি দেয় না। কুলিঙ্গপাখিদের মতো প্রাণীরা নিজের স্বভাব অনুসরণ করে থাকে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৪: সোনার হরিণ কোথায় নেই? আছে সর্বত্র

উপন্যাস, পর্ব-পর্ব-৮৬ : আকাশ এখনও মেঘলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৫: শিয়রচাঁদা

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

রাজা শিশুপাল, ভীষ্মের প্রতি অসম্মানজনকভাষা প্রয়োগ করলেন, তোমার এই স্বভাব নিঃসংশয়ে জঘন্য। সেই কারণেই পাণ্ডবদের স্বভাবও এমনধারা পাপমনস্ক হয়েছে বলে মনে করা হয়। নূনং প্রকৃতিরেষা তে জঘন্যা নাত্র সংশয়ঃ। ততঃ পাপীয়সী চৈষাং পাণ্ডবানামপীষ্যতে।। শিশুপালের অভিযোগের যেন শেষ নেই। তার কারণ, যাদের (পাণ্ডবদের) শ্রেষ্ঠ পূজ্য ব্যক্তিত্ব কৃষ্ণ, ভীষ্ম তাদের পথনির্দশ দিয়ে থাকেন। সত্যপথ থেকে বিচ্যুত ভীষ্ম যথার্থই অধর্মজ্ঞ। জ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে আছেন যিনি নিজেকে ধার্মিক জেনেও ভীষ্মের মতো ধর্ম পর্যালোচনা করে এমন কাজ করেন? ভীষ্ম নিজেকে প্রাজ্ঞ বলে মনে করেন। অথচ তিনি অন্য পুরুষে আসক্তা এবং ধর্মজ্ঞা, অম্বা নামে কন্যাকে অপহরণ করেছিলেন কেন? ভীষ্মের ভাই সচ্চরিত্র বিচিত্রবীর্য সেই অপহৃতা কন্যাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। নিজেকে প্রাজ্ঞ মনে করেন যে ভীষ্ম, তাঁর উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে, তাঁর সম্মুখেই,অপর ব্যক্তি (বেদব্যাস) দুই ভার্যার গর্ভে (অম্বিকা ও অম্বালিকা) সজ্জনদের অনুসৃত পথে (নিয়োগবিধি অনুসারে) সন্তানদের জন্ম দিয়েছিলেন।শিশুপাল,ভীষ্মের কঠোর সমালোচনা করে বিদ্রূপ করলেন, কো হি ধর্ম্মোঽস্তি তে ভীষ্ম! ব্রহ্মচর্য্যমিদং বৃথা। যদ্ধারয়সি মোহাদ্বা ক্লীবত্বাদ্বা ন সংশয়ঃ।। হে ভীষ্ম, কোথায় তোমার ধর্মবোধ? তোমার এই ব্রহ্মচর্য্যও বৃথা।এই বিষয়ে কোনও সংশয় নেই যে, তুমি মোহবশত ও ক্লীবতাবশত ব্রহ্মচর্য্য ধারণ করেছ।শিশুপালের উপলব্ধি হল — তিনি ধর্মজ্ঞ ভীষ্মের কোথাও উন্নতি দেখছেন না। কারণ ভীষ্ম (উপদেশগ্রহণের জন্য) কোনও বৃদ্ধের সেবা করেননি যে কারণে তিনি ধর্মোপদেশ দিতে পারেন। যজ্ঞ, দান, অধীত বিদ্যা,বহু দক্ষিণা দান করা হয় যে যজ্ঞে এমন বহুদক্ষিণা যজ্ঞ, এগুলি সবই সন্তানোৎপাদনের ষোল ভাগের এক ভাগের সমানও নয়।বহু ব্রত ও উপবাসজনিত অর্জিত পুণ্য, সেগুলি সবই নিঃসন্তান মানুষের নিশ্চিতরূপে ব্যর্থ প্রতিপন্ন হয়। শিশুপাল ভীষ্মকে ভর্ৎসনা করলেন, নিঃসন্তান, বৃদ্ধ এবং মিথ্যাধর্মের অনুসরণকারী তুমিও হাঁসের মতোই জ্ঞাতিদের হাতে নিহত হবে। সোঽনপত্যশ্চ বৃদ্ধশ্চ মিথ্যাধর্ম্মানুসারকঃ। হংসবত্ত্বমপীদানীং জ্ঞাতিভিঃ প্রাপ্নুয়া বধম্।। এই বলে একটি প্রাচীনকালে জ্ঞানীদের বলা হংসকাহিনি বর্ণনা করলেন শিশুপাল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৩: জোড়া আন্তোনিওর রহস্য

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

পুরাকালে সমুদ্রের কাছে ধর্মবাদী, অন্যরকম চরিত্রের এক বৃদ্ধ হাঁস বাস করত,সে পাখিদের উপদেশ দিত।তাঁর মুখে এক কথা — ধর্মাচরণ কর,অধর্মাচরণ নয়। ধর্ম্মং চরত মাঽধর্ম্মমিতি। তস্য বচঃ কিল। পাখিরা সদা সত্যবাদী হাঁসের কথা শুনত।অন্যান্য জলচর পাখিরা ধর্মের কারণেই সমুদ্র হতে তাঁর খাদ্য যোগাড় করে আনত। পাখিরা সেই হাঁসের কাছে তাদের ডিমগুলি গচ্ছিত রেখে সমুদ্রে বিচরণ করত এবং জলে ডুব দিত। নিজের কাজে সতর্ক সেই পাপী হাঁসটি অসাবধান পাখিদের ডিমগুলি ভক্ষণ করত। ডিমগুলির সংখ্যা হ্রাস হতে দেখে, মহাপ্রাজ্ঞ অন্য একটি হাঁস আশঙ্কা করে কোন এক সময়ে লক্ষ্য করল। আশঙ্কিত হাঁসটি, পাপিষ্ঠ হাঁসটির সেই পাপকাজ দেখল। পরম বেদনার্ত হাঁসটি, সমস্ত পাখিদের সেই খবর জানাল। তার পরে, সমাগত সব পাখিরা স্বচক্ষে ঘটনাটি পরখ করে, মিথ্যাচারী হাঁসটিকে হত্যা করল। কাহিনি শেষে, গল্পটির প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? সেটি শিশুপাল ব্যখ্যা করলেন। হে ভীষ্ম,ক্রুদ্ধ হাঁসের মতো অন্যান্য রাজারা, সেই (পাপী) হংসধর্মীর সমতুল্য তোমাকে বধ করবে। তত্ত্বাং হংসধর্ম্মাণমপীমে বসুধাধিপাঃ। নিহন্যুর্ভীষ্ম! সংক্রুদ্ধাঃ পক্ষিণস্তমিবাণ্ডজম্।। পুরাণবিদদের গীত গল্পগাথাটি ভীষ্মকে যথাযথ বর্ণনা করে শিশুপাল উপসংহারে বললেন,হে হংস,তোমার অন্তঃকরণ অপবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তোমার অশুভ ঘৃণ্য মিথ্যাচারপ্রসূত কাজ তোমার ধর্মাচরণের উপদেশমূলক বাক্যকে অতিক্রম করেছে। অন্তরাত্মন্যভিহিতে রৌষি পত্ররথাশুচি।অশুভক্ষণকর্ম্মেদং তং বাচমতীয়তে।।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : হৃদয়হরণ

রাজসূয়যজ্ঞে কৃষ্ণের অর্চনার বিপক্ষে চেদিরাজ শিশুপাল। যেহেতু কুরুকুলপ্রধান ভীষ্মের সম্মতিক্রমে এই কৃষ্ণের প্রতি সম্মাননাপ্রদান, তাই শিশুপালের আক্রমণের লক্ষ্য হলেন প্রবীণ কৌরবপিতামহ ভীষ্ম। তর্কবিতর্ক চলতে থাকল। শেষ পর্যন্ত যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেক ও কৃষ্ণের অর্চনার আয়োজন বিনষ্ট করাই হল শিশুপাল ও তাঁর সমর্থক রাজাদের উদ্দেশ্য। কোনওঁ বৃহৎ উদ্যোগে উদ্যোক্তা ও তাঁর বিরোধীদের মধ্যে মতবিরোধ হতেই পারে।আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে সদর্থকতা খুঁজে নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার মধ্যে আছে আয়োজনের সম্পূর্ণতা। বক্তা যখন প্রতিপক্ষের সমস্ত সদর্থক দিকগুলির নঞর্থক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন এবং বাচিক আক্রমণকে নিতান্তই কুৎসিত ঝগড়ার পর্যায়ে নিয়ে যান তখন বক্তার উদ্দেশ্য এবং অবস্থানবিষয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনপূর্ব প্রচার অভিযানে প্রার্থীদের পারস্পরিক সমালোচনার কাদাছোঁড়াছুঁড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়।

শিশুপাল ভীষ্মকে তৃতীয়লিঙ্গ অর্থাৎ নপুংসক শ্রেণীর অন্তর্গত বলে মনে করেন। তাঁর এই বক্রোক্তির কারণ, ভীষ্ম চিরকৌমারব্রতের আশ্রয় নিয়েছিলেন। কারণটি কারও অজানা নয়। ভীষ্মের নারীসঙ্গপরিত্যাগের এই যে কঠোর সিদ্ধান্ত, তার মধ্যে নিহিত যে ইন্দ্রিয়সংযমের গৌরববোধ সেটি শিশুপাল নস্যাৎ করে দিলেন। ভীষ্ম নামটির মাহাত্ম্য ভুলে গেলেন শিশুপাল। শিশুপালের মতে, নপুংসকত্বের কারণে ভীষ্মের এই অধার্মিক মনোভাব।শিশুপালের এই ব্যাখ্যা, সব লিঙ্গের প্রতি সমদর্শিতার পরিপন্থী,তাই অমানবিক বললে অত্যুক্তি হয় না। শিশুপাল, পাণ্ডবদের, চলনে অশক্ত, অপর নৌকার সঙ্গে বদ্ধ নৌকার মতো জড়বস্তু কিংবা অন্ধকে অনুসরণরত অপর অন্ধের মতো বলে মনে করেন। চসমালোচক শিশুপাল পিতামহসহ পাণ্ডবদের জড়পদার্থ আখ্যা দিয়েছেন। প্রকারান্তরে পাণ্ডবপিতামহ ভীষ্মকে জ্ঞানদৃষ্টিহীন অন্ধ পথপ্রদর্শকরূপে হেয় করেছেন। শিশু কৃষ্ণ, তাঁকে হত্যা করতে উপস্থিত পূতনাকে বধ করেছিলেন —কৃষ্ণের প্রশংসায় ভীষ্ম,এই ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন।শিশুপালের মতে, এই নারীহত্যা আশ্চর্যের নয়। কারণ হয়তো, সে যে অবলা নারীমাত্র, সে কৃষ্ণের সমকক্ষ কেউ নয়। শিশুপাল স্বাজাত্যভিমানবশে প্রশ্ন তুলেছেন, কৃষ্ণ দীর্ঘদিন গোপদের সঙ্গে মেলামেশার কারণে গোয়ালাসম্প্রদায়ভুক্ত, সে কিভাবে ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠ ভীষ্মের স্তুতিভাজন হল? কৃষ্ণ গিরিগোবর্দ্ধন ধারণ করেছিলেন।তাঁর এই কীর্তি, সপ্তাহখানেক নেহাতই উইপোকার আস্তানা ওই লঘু গোবর্দ্ধনপর্বতধারণ, নিতান্তই ছেলেখেলার পর্যায়ভুক্ত কাজ। মোটেই তা আশ্চর্যজনক নয়। কৃষ্ণ, কংসের কৃষ্ণহত্যাচক্রান্ত ব্যর্থ করে কংসকে হত্যা করেছিলেন।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

এই হত্যার নিন্দা করে শিশুপাল বলেছেন, যস্য চানেন ধর্মজ্ঞ! ভুক্তমন্নং বলীয়সঃ।স চানেন হতঃ কংস ইত্যেতত্তু মহাদ্ভুতম্।। কৃষ্ণ যাঁর অন্ন ভোজন করেছে সেই কংসকেই হত্যা করেছে, এই ঘটনা মহাবিস্ময়কর বটে। শিশুপাল কৃষ্ণের আরও দুই কীর্তির উল্লেখ করলেন। খুবই তাৎপর্যহীন ঘটনা হল,যুদ্ধনিপুণ নয় এমন দুই অসুর, অশ্বাসুর ও বৃষাসুরকে কৃষ্ণ বধ করেছিল। যুদ্ধবিদ নয়,এমন দুই অসুরবধ কোন আশ্চর্যজনক কাজ নয়।প্রসঙ্গক্রমে সজ্জনকথিত যে বচনের উল্লেখ করেছেন শিশুপাল সেটিও অপ্রাসঙ্গিক এবং সেটি একটি বিতর্কের সূচনা করতে পারে। যে নারী (হত্যা করতে উদ্যত) প্রাণহরণের উদ্দেশ্যে এসেছে তার হত্যা, একই উদ্দেশ্যে সমাগত ব্রাহ্মণবধ, হত্যার দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত অন্নদাতার হত্যা এবং এই একই উদ্দেশ্য যে আশ্রয়দাতার, তাদের প্রতি অস্ত্রাঘাত বৈধ কি না। আধুনিক বিচারব্যবস্থায়, আত্মরক্ষার্থে হত্যাকারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ এবং প্রয়োজনে তার প্রাণহরণ শুধু আইনসম্মত নয়, বৈধ তো বটেই। ভীষ্ম, তাঁর দুই বৈমাত্রেয় ভাইদের বিবাহের পাত্রীরূপে কাশিরাজকন্যা অম্বা-সহ, অম্বার ভগিনীদ্বয় অম্বিকা ও অম্বালিকাকেও অপহরণ করেছিলেন। অম্বা অন্যপুরুষে আসক্তা জেনে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ভীষ্মের সম্মতিক্রমে বিধবা দুই ভ্রাতৃবধূর সঙ্গে নিয়োগপ্রথানুসারে মিলিত হন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস এবং তিনি সন্তানোৎপাদন করেন। শিশুপালের মতে, চিরকৌমার্যগ্রহণরূপ ব্রহ্মচর্য্যধারণে প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব ভীষ্মের যুগান্তকর এই সিদ্ধান্ত শুধু মোহবশের, ক্লীবত্বের প্রকাশ। সন্তানোৎপাদন থেকেও গৌরবজনক নয় যজ্ঞ ইত্যাদি এবং সন্তানহীন মানুষদের ব্রত, উপবাসজনিত পুণ্যফল ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ভীষ্ম চিরকুমার তাই সন্তানদের পিতা হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই জেনেই এমন তির্যকোক্তি করেছেন শিশুপাল।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। ছবি: সংগৃহীত।

একটি নিন্দাবিসংবাদ কতটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে পারে তার উদাহরণ শিশুপালের ভীষ্মের প্রতি এই সব বিষোদ্গার। একটি অহঙ্কার লড়াই মানুষকে শালীনতাবোধের গণ্ডী অতিক্রম করতে বাধ্য করে, শিশুপাল তার উদাহরণ।শিশুপালের মুখ্য লক্ষ্য কৃষ্ণস্তুতির বিরোধিতা, ভীষ্ম তাঁর মূল লক্ষ্য নন। তবুও শিশুপাল, কৃষ্ণনিন্দাপ্রসঙ্গে ভীষ্মের নৈতিকতা, তাঁর কঠোর আত্মত্যাগ, ভীষ্মের কৃষ্ণপ্রীতি অবান্তর এবং পক্ষপাতদুষ্ট বলে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। পারিবারিক পরিমণ্ডলে ভীষ্মের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিশুপাল। রাজনীতির পরিসরে প্রতিপক্ষের সমালোচনায় হিতাহিতজ্ঞানশূন্যতার পরিচয় রেখেছেন শিশুপাল। এখন পর্যন্ত সেই ধারা দুরন্তগতিতে প্রবহমান। তবে যাঁর চিরকৌমার্যের প্রতিজ্ঞাটি আজও ‘ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা’ এই প্রবাদের গরিমায় উন্নীত হয়েছে তাঁকে মনে রেখেছে ভরতবংশীয়রা।মনে রাখেনি নিন্দুক চেদিরাজ শিশুপালকে। তবে শিশুপালের নিন্দাচ্ছলে কৃষ্ণের কীর্তিকাহিনিস্মরণে যেন সমুদ্রমন্থনের ফলে বিষের সঙ্গে অমৃতও উঠে এসেছে, হয়েছে অনেক উজ্জ্বল উদ্ধার।ভীষ্ম স্বমহিমায় আজও উত্তরাধিকারীদের মনোজগতে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে মিথ্যার আবরণে সত্য কখনও অপ্রকাশিত থাকে না, তার উদ্ভাস স্বতঃস্ফূর্ত এবং যুগজয়ী।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content