কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী।

কী আশ্চর্য! এই নগরীর নাম যে অসিতাঞ্জন। অসিত তো কৃষ্ণের নামান্তর। যা সিত নয়, শ্বেত নয়। আর অঞ্জন হল কাজল। নগরীর নামে এই কালোকাজল কীসের অভিজ্ঞান তবে? কার নীরব পদসঞ্চার শুনেছিল সেদিন আর্যাবর্ত, উত্তরাপথের সেইসকল জনপদ? তাদের ভাগ্যাকাশে নিবিড় দূরবিসারী কৃষ্ণছায়া কোনও পটপরিবর্তনের বার্তা নিয়ে বিস্তৃত হচ্ছিল দ্রুত, অতিদ্রুত? ভবিষ্যতে যাঁর জীবনগাথা নানারূপে আলোড়ন তুলবে এই বিস্তৃত ভূখণ্ডে, যিনি নর থেকে নরোত্তম হয়ে ক্রমে পরম হবেন, সেই যুগপুরুষের নিভৃত পদসঞ্চার শুনেছিল কি সেদিনের মানবকুল?

বোধিসত্ত্ব-ই বা কীভাবে আবির্ভূত হবেন এই কাহিনিতে? মহাভারতের মহাযুদ্ধের পাশেই যাঁর জ্যোতির্ময় মহতী কীর্তি দীপ্যমান হয়, যিনি অধনের ধন হয়ে নৈরাশ্য থেকে সঙ্কল্পে, সংশয় থেকে সত্যসদনে উত্তীর্ণ করেন তাঁর সেই আদিপ্রকাশ কেমন ছিল? সেই অমিতবিত্ত শৌর্যের স্রোত কেমন করে মিশেছিল বৈরাগ্যদীপ্ত মহাজ্ঞানের কুলে?
ফেরা যাক কাহিনিতে। দেবগর্ভার গর্ভসঞ্চার হল। পাঠক নিশ্চয়ই অনুমান করবেন যে ইনিই পরবর্তিকালের দেবকী। যাই হোক। এই গর্ভ থেকে পুত্র জন্ম নিলে কংস ও উপকংসের রাজ্য বিনষ্ট হবে। ক্রমে স্ফুট হল গর্ভলক্ষণ। কিন্তু দেবগর্ভার গর্ভসঞ্চার হল কেমন করে? কংস ও উপকংসের কাছে অভয় পেয়ে নন্দগোপা জানালো সকল বৃত্তান্ত। কংস ও উপকংস ভাবলেন যে, ভগিনীর প্রাণহরণ অসম্ভব। এ কি কেবল প্রাণের টান নাকি আর কিছু কূটনৈতিক কারণ ছিল তা কে জানে! তবে দেবগর্ভা যদি কন্যার জন্ম দেয়, তবে সমস্যা নেই। তার প্রাণনাশ করতে হবে না। তবে পুত্র হলে তাকে বিনষ্ট করতেই হবে।
আরও পড়ুন:

সংস্কৃত দিবস

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৮ : দেয়া নেয়া

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮২: ডাবল ধামাকা

কংস আর উপকংস জানতেন কি বহু যুগ পরের ভারতবর্ষে এর বিপরীতটি ঘটলে প্রাণহরণ করবে “অমৃতের সন্তান” মানুষ! তবে সাহিত্য তো কেবল মানুষের গভীর গহন মনোলোকের সন্ধান করতে চেয়েছে, পেয়েছে কি?

এরপর অবশ্য একটা আনন্দের বিষয় হল। দুই দাদা উপসাগরের সঙ্গে বোনের বিয়ে দিলেন। দিন কাটে। ক্রমে দেবগর্ভা পূর্ণগর্ভা হলেন। যথাসময়ে তাঁর কোল জুড়ে এল একটি শিশুকন্যা। কংস ও উপকংস অতিমাত্রায় হৃষ্ট হলেন। ঈশ্বর করুণাময়! তাঁরা ভাগিনেয়ীর নাম রাখলেন অঞ্জনাদেবী।

এরপর ভগিনী ও ভগ্নীপতিকে গোবর্দ্ধমান নামে একটি গ্রাম ভোগোত্তর দান করলেন। উপসাগর সেখানে ভার্যা ও দুহিতার সঙ্গে পরমানন্দে বাস করতে লাগলেন। তাহলে বুঝি এখানেই সকল সংশয়ের মেঘ মুছে গেল? নাকি গোকুলে বাড়তে লাগল অনায়াসে?
আরও পড়ুন:

উপন্যাস, আকাশ এখনও মেঘলা/৮৫

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

কিছুদিন পরেই আবার দেবগর্ভার গর্ভসঞ্চার হল। সেই একই দিনে নন্দগোপার-ও গর্ভসঞ্চার হল। চেনা যাচ্ছে এই নন্দগোপাকে এবার? সে যাই হোক, কাল কেটে যাবে ঝঞ্ঝাবেগে। দুজনেই ক্রমে পরিণতগর্ভা হবেন। একই দিনে জন্ম নেবে সন্তান। এবার কী হবে তা আসমুদ্রহিমাচলের মানুষ জানেন বোধহয়।

এবার দেবগর্ভার হল পুত্র। নন্দগোপার কোলে এল কন্যা। কংসরা মামা হয়েছেন অনেকদিন হল। কিন্তু এবার বুঝি “কংসমামা” হলেন! দেবগর্ভা প্রমাদ গুণলেন। দাদারা জানতে পারলেই একটা অনর্থ হবে। অনিষ্ট করবেন শিশুপুত্রটির। তাই দেবগর্ভা গোপনে পুত্রটিকে পাঠিয়ে দিলেন নন্দগোপার কাছে। নন্দগোপার কন্যাকে নিজের কাছে আনিয়ে সংবাদ দিলেন দাদাদের।

সেই রাতের কাহিনি পরে বিশ্রুত হয়েছে।
দাদারা জানতে চাইলেন, পুত্র হল, না কন্যা? কী হয়েছে?
“কন্যা”
“বেশ বেশ, চমৎকার। কন্যাকে যত্নে মানুষ করে তোলো বোন।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৩: চেদিরাজ শিশুপালের কৃষ্ণবিদ্বেষ কি কৃষ্ণেরই কোন পরিকল্পিত ইচ্ছার প্রকাশ?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৪: গোখরো

দুর্দমনীয় কংসের যে চরিত্র জেগে উঠল ক্রমে ক্রমে উত্তরকালের সাহিত্যে, তার পদধ্বনি তখনো অশ্রুত। দোষে-গুণে গড়া মানুষ পরিস্থিতির শিকার হয়। তার চরিত্রধর্ম বদলায়, কিন্তু মনুষ্যধর্ম সে ছাড়ে না বোধহয়। জাতকের কংসরা মানুষ। যে কাজ উত্তরকালের কংস করছেন, তা এঁদের করতে হয়নি। তাঁদের পরিকল্পনায় তেমন কিছু থাকলেও, বাস্তবে তা করতে না হওয়ায় জাতকমালার কংস-রা হৃষ্ট-ই হয়েছিলেন বুঝি। সম্পর্কবন্ধন একেবারে পরিত্যক্ত হয়নি। তবে তাঁদের পথ চলা এখনো অনেক বাকি।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

ক্রমে ক্রমে দেবগর্ভার দশটি পুত্র হল। নন্দগোপার হল দশটি কন্যা। পুত্রদের পালন করতে লাগলেন নন্দগোপা। কন্যাদের পালিকা হলেন দেবগর্ভা। নন্দগোপা ও দেবগর্ভার সামাজিক ব্যবধান তো ছিলোই। তবে তাঁদের আত্মবন্ধনটুকুই শাশ্বত হয়েছে। নন্দগোপা দেবগর্ভার গোপন প্রণয় ও মিলনের সত্যটি সর্বসমক্ষে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাতে তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ কংসরা শেষপর্যন্ত মনুষ্যধর্ম রক্ষা করেছেন। আর সেই গোপন অভিসারের শেষে মধুর মিলন ঘটেছিল। তাই হয়তো বা এই দুজনের সখ্য অক্ষুণ্ণ ছিল। তবে বিধির বিধানে, ঈশ্বরের সৃষ্টিতে ছয়টি রসের ধারা। তাই কিছুই সেখানে অবিমিশ্র আনন্দের নয়। তবুও জগতের গোপনপুরের অজ্ঞেয় মোহনবাঁশির সুরে এই পৃথিবী, এই মাটি, জল, বায়ু সকল-ই মধুময়, অনন্তগামী হয়। সেদিন যে মহাসঙ্কটের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল তা কোথায় নিয়ে যাবে? দেখবো, পরবর্তী পর্বে। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content